শিরোনাম :

মাংস আপনার, হাড্ডি আমার


বৃহস্পতিবার, ৩০ নভেম্বর ২০১৭, ০৪:৩৮ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

মাংস আপনার, হাড্ডি আমার

প্রভাষ আমিন: গল্পটা যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এক বন্ধুর কাছ থেকে শোনা। প্রবাসী এক ভদ্রলোকের ছেলে খুব দুষ্টামি করে, পড়ালেখা করে না। মারা তো দূরের কথা বকা দিলেই সে ৯৯৯ এ ফোন করে। ফলে সেই বাবা কিছুতেই ছেলেকে সামলাতে পারেন না। একবার ছেলেকে নিয়ে বাংলাদেশে এলেন। বিমানবন্দরে নেমেই ছেলেকে মারধোর শুরু করলেন, আর বললেন, এবার ডাক তোর ৯৯৯। ছেলেকে শায়েস্তা করে বললেন, এবার আমেরিকা গিয়ে দুষ্টামি করলে, আবার বাংলাদেশে নিয়ে আসবো।
.
যুক্তরাষ্ট্রে সব ধরনের শিশু নির্যাতন শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও কিছুদিন আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে শিশুদের ওপর পিতা-মাতা-শিক্ষকদের মারধোর জায়েজ ছিল। এখন বাংলাদেশে শিশুদের শারীরিক-মানসিক নির্যাতন নিষিদ্ধ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ব্যাপারে বারবার তার কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। আহা, আমাদের ছেলেবেলায় যদি শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকতেন।

আমাদের ছেলেবেলা কেটেছে জিয়াউর রহমান আর এরশাদের সামরিক শাসনের আমলে। রাষ্ট্রে যেমন সামরিক শাসন ছিল, তেমনি সামরিক শাসন ছিল বাসায় এবং স্কুলেও। আব্বা কখনো আমাদের মারেননি। কিন্তু আম্মা ছিলেন খুব কড়া। অনেকবার মার খেয়েছি তার হাতে। পড়াশোনায় ফাঁকি, দুষ্টামি, মাগরিবের আজানের পর বাড়ি ফেরা, বড় বোনের সাথে মারামারি ইত্যাদি হরেক কারণে মার খেতে হয়েছে।

প্রথমদিন বাড়ির পাশে চাঁদগাও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে ঘুরে চলে এসে বলেছিলাম, স্কুলে জায়গা নেই। শুনে আম্মা খাটের পায়ের সাথে বেঁধে মার দিয়েছিলেন। তারপর আর কোনোদিন স্কুলে জায়গার সমস্যা হয়নি। বাড়িতে যাই হোক, স্কুলের একেকজন শিক্ষক ছিলেন নিষ্ঠুর যমের মত।

আমাদের সময় অভিভাবকরা বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি করার সময় বলতেন, ‘এই গাধাকে পিটিয়ে মানুষ বানিয়ে দিন। মাংস আপনার, খালি হাড্ডিগুলো ফেরত দিয়েন।’ অভিভাবকদের এই স্বাধীনতার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতেন শিক্ষকদের কেউ কেউ। পড়ানোর ব্যাপারে যাই হোক, শাস্তি দেয়ার ব্যাপারে একেকজনের সৃষ্টিশীলতা কল্পনার সীমা ছাড়িয়ে যেতো।

জালি বেতের বেদম মার তো ছিল সবচেয়ে সহজলভ্য। তাছাড়া ডাস্টার ছুড়ে মারা, কান মলা, মাথায় ঠুয়া মারা, পেটের চামড়া ধরে টান দেয়া, জুলফির চুল ধরে টানা, পায়ের নিচ দিয়ে হাত নিয়ে কান ধরে ব্যাঙের মত বসিয়ে রাখা, কপালে চাড়া নিয়ে সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকা, কানে ধরে টুলের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখা- হরেক রকমের নিষ্ঠুর সৃষ্টিশীলতার প্রয়োগ হতো স্কুলে। শিক্ষকরা কারণে-অকারণে মারতেন।

এখন বুঝি তাদের সব বঞ্চনার শোধ নিতেন আমাদের ওপর। অনেক সময় বাড়িতে ঝগড়া করে এসে চড়াও হতেন আমাদের ওপর। এ নিয়ে কারো কাছে বিচার দেয়ারও উপায় ছিল না। বিচার দিলে যে কারণে শিক্ষক মেরেছেন, সেই একই কারণে বাড়িতে আরেক দফা মার খেতে হতো। তাই মার খেয়ে মার হজম করে ফেলাটাই ছিল বুদ্ধিমানের কাজ।

সান্ত্বনা ছিল, পিতা-মাতা বা শিক্ষক যেখানে মারেন, সে জায়গাটা বেহেশতে যাবে; এই বিশ্বাস। শরীরের একটা অংশ আলাদা করে কিভাবে বেহেশতে যাবে, সেই প্রশ্ন তখন আসেনি মনে। তবে বেহেশতে যাওয়ার আশায় মার খেয়ে মার হজম করে ফেলতাম।

এখন দিন বদলে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর কড়া অবস্থানের কারণেই হোক আর অভিভাবকদের বদলে যাওয়া মানসিকতার কারণেই হোক, শিশু নির্যাতন এখন বাংলাদেশেও প্রায় নিষিদ্ধ। আমি কখনো আমার ছেলে প্রসূনকে মারিনি, বকাও দেইনি। মুক্তি মাঝে মাঝে বকা দিয়েছে। কিন্তু ছেলেবেলায় বকা দিলেই প্রসূন প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার দেয়ার হুমকি দিতো। তবুও শিক্ষকরা মাঝে মাঝে তাদের পুরোনো অভ্যাস ভুলতে পারেন না।

কিন্তু কোথাও কিছু ঘটলেই গণমাধ্যম এমনভাবে নজর রাখে, শিক্ষকরা খুব একটা সুবিধা করতে পারেন না। তবে শারীরিক নির্যাতন কমে এলেও মানসিক নির্যাতন চলছেই। বিশেষ করে কোচিংয়ে বাধ্য করার জন্য শিক্ষকরা নতুন নতুন কৌশলে মানসিক নির্যাতন চালায়।

তবে সম্প্রতি আইনী সহায়তা প্রতিষ্ঠান ব্লাস্ট পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এখনও স্কুলে শাস্তিতে সাঁয় আছে ৬৯ শতাংশ অভিভাবকের। কী ভয়ঙ্কর! তার মানে আমাদের অভিভাবক বা শিক্ষকদের মনে এখনও সেই স্যাডিস্ট মানসিকতা রয়ে গেছে।

আমাদেরকে এই মানসিকতা থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। সন্তানকে অবশ্যই মানুষ করতে হবে। তবে মেরে নয়, ভালোবাসা দিয়েই সন্তানের কাছ থেকে সবচেয়ে ভালোটা আদায় করা সম্ভব। শারীরিক মানসিক নির্যাতন কমে এলেও ভিন্ন কৌশলে নির্যাতন চলছে এখনও। সব নির্যাতন ছাপিয়ে যায় পরীক্ষার নামে উপর্যুপরি নির্যাতন। আমাদের সময় প্রথম পাবলিক পরীক্ষা ছিল এসএসসি মানে ক্লাশ টেনের পর।

এখন তার আগেই শিক্ষার্থীদের আরো দুটি পরীক্ষা দিতে হয়- প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) এবং জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি)। ঠিকমত শিক্ষার্থী হওয়ার আগেই আমাদের সন্তানরা পরীক্ষার্থী হয়ে যায়। এ দুটি পরীক্ষা এখন আমাদের শিশুদের নির্যাতনের বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেয়া পিইসি ও জেএসসি- এ দুটি পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে বলেছেন, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মন থেকে থেকে পরীক্ষা ভীতি দূর করার জন্যই পিইসি পরীক্ষার প্রবর্তন। তিনি আরো বলেছেন, আগে পঞ্চম শ্রেনিতে বৃত্তি পরীক্ষার নামে কয়েকজনকে আলাদা করে বিশেষভাবে পড়শোনা করানো হতো। তাতে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হতো।

কিন্তু এখন পিইসির জন্য সবার প্রতি সমান নজর দিতে হয়। খুব ভালো যুক্তি সন্দেহ নেই। শিশুদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মমতাটা আমি জানি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই ভাবনা স্কুল পর্যন্ত যেতে যেতে একদম উল্টে যায়। পিইসি পরীক্ষার জন্য শিশুদের যে স্টিম রোলারের ভেতর দিয়ে যেতে হয়, তাতে তাদের মন থেকে পরীক্ষা ভীতি দূর হওয়ার বদলে স্থায়ী পরীক্ষা ভীতি চাপিয়ে দেয়। পড়াশোনাটাই তাদের কাছে ভীতিকর হয়ে যায়।

ক্লাশের পর একের পর এক কোচিংয়ের শিডিউলে হারিয়ে যায় তাদের শৈশব। তুমুল প্রতিযোগিতার এই সময়ে একজন শিশুকে যতটা প্রস্তুতি নিতে হয়, আমাদের সময় এসএসসির জন্যও ততটা পড়াশোনা করতে হয়নি। ক্লাশ এইটের বিজ্ঞানের বিষয় নাকি ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালের কাছেও কঠিন লাগে!

ক্লাশ, কোচিং, পরীক্ষা পর্যন্ত না হয় ঠিক ছিল। কিন্তু তার সাথে যুক্ত হয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁস। কর্তৃপক্ষ স্বীকার করুক আর নাই করুক; গত কয়েকবছরে দেশের প্রায় সব পাবলিক পরীক্ষা, ভর্তি পরীক্ষা, চাকরির পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে, হচ্ছে। এখন পিইসির সুবাদে ক্লাশ ফাইভের শিক্ষার্থীও প্রশ্ন ফাঁসের বিষে অভ্যস্ত হয়ে যায়।

তবে শিশুদের পক্ষে তো ফাঁস হওয়া প্রশ্ন পাওয়া সম্ভব নয়। আমরা অভিভাবকরাই শিশুদের হাতে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন তুলে দিয়ে তাদের মনে অনৈতিকতার বীজ বুনে দেই। তবে এখানে একটা দারুণ বৈষম্য আছে। ফাঁস হওয়া প্রশ্ন গ্রামের শিক্ষার্থীরা পায় না।

শহুরে অভিভাবকরা ফেসবুক থেকে বা পয়সা দিয়ে প্রশ্ন কিনে তুলে দেন সন্তানের হাতে। কী ভয়ঙ্কর! প্রশ্ন ফাসেঁর সাথে ইদানিং আরেকটা উপসর্গ যোগ হয়েছে- প্রশ্নে ভুল। এ বছর পিইসির প্রশ্নে এমন হাস্যকর সব ভুল এবং উত্তর নিয়ে এমন বিভ্রান্তি ছিল; এই শিশুদের জন্য আমার মায়াই লেগেছে।

এখন প্রশ্ন হলো, প্রশ্ন ফাঁস ভালো না প্রশ্নে ভুল ভালো? সবক্ষেত্রে আমাদের অবস্থা্ এখন এমন, ভালো কিছু পাওয়া কঠিন, বেছে নিতে হবে খালি মন্দের ভালো। আসলে প্রশ্ন ফাঁস, প্রশ্নে ভুল- দুটিই বিষ। এই বিষ কুরে কুরে খাচ্ছে আমাদের।

এই বিষ থেকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে, শিক্ষার্থীদের মুক্ত করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এর আশু কোনো মুক্তির উপায় দেখছি না। সরকার যেহেতু প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি স্বীকারই করে না, তাই এটা সমাধানের কোনো সম্ভাবনাই নেই। আর মানসম্পন্ন শিক্ষক না থাকলে প্রশ্নে ভুল থাকবেই।

এখন আমাদের এই বিষ গলায় নিয়ে সবাইকে নীলকণ্ঠ হতে হবে। তবে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আমার একটা প্রস্তাব আছে। পরীক্ষার ২/৩ দিন আগে সারাদেশে একযোগে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশ্ন ফাঁস করে দেয়া হোক। তখন দুটি ব্যাপার হবে। প্রথমত ফাঁস হওয়া প্রশ্ন কেউ পাবে কেউ পাবে না; এই বৈষম্য দূর হবে। দ্বিতীয়ত, প্রশ্নে কোনো ভুল থাকলে, তাও পরীক্ষার আগেই ধরা পড়ে যাবে।

যে কোনো খেলা বা পরীক্ষায় লেভেলে প্লেয়িং ফিল্ড থাকাটা জরুরি। ২/৩ দিন আগে প্রশ্ন ফাঁস করে দিলে তা সবার জন্য সমান হবে। আরেকটা প্রস্তাব হলো, সবাইকে বই দেখে লিখতে দেয়া হোক। তাহলে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা যাবে। এছাড়া আর কোনো সহজ সমাধান জানা নেই আমার।

শুরু করেছিলাম শিশুদের নির্যাতনের কথা দিয়ে। এখন হয়তো আর ‘মাংস আপনার, হাড্ডি আমার’ ধরনের কথা কোনো অভিভাবক মুখে বলেন না। কিন্তু কোচিং, পরীক্ষা, প্রশ্নপত্র ভুল, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ফাঁস চেপে বসেছে শিশুদের গলায়। এখন আর পিটিয়ে হাড়-মাংস আলাদা করার দরকার নেই। প্রবল চাপে এমনিতেই তাদের হাড়-মাংস একাকার হওয়ার জোগাড়। আমাদের সন্তানদের কে বাঁচাবে?

প্রভাষ আমিন : সাংবাদিক, কলাম লেখক; বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ।
probhash2000@gmail.com

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন