শিরোনাম :

নবীজির (সা.) আগমনে ধন্য হলো পৃথিবী


শনিবার, ২ ডিসেম্বর ২০১৭, ০২:১৩ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

হাফেজ মাওলানা যুবায়ের আহমাদ:  ইসলামের শান্তির পয়গাম মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে বিশ্ব মানবতাকে ইহ-পরলৌকিক শান্তি ও মুক্তির সহজ, সরল ও সঠিক পথ প্রদর্শন করতে যুগে যুগে আল্লাহ তায়ালা নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে।’(সুরা রা’দ : ০৭)। অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘কোনো রাসুল না পাঠানো পর্যন্ত আমি কাউকেই শাস্তি দান করি না।’(সুরা বনি ইসরাইল : ১৫)।

হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু হওয়া নবুয়তের সেই ধারাবাহিকতার সমাপ্তি ঘটেছে বিশ্ব মানবতার পরম বন্ধু আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সা.) এর মাধ্যমে। আরবের কুরাইশ বংশে তার সম্মানিত পিতা আব্দুল্লাহর ঔরশে এবং মা আমিনার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জন্মের পূর্বেই পিতা হারানো শিশু এতিম মুহাম্মাদ (সা.) দুধ মা হালিমার কাছ থেকে দুধ পানের সময় অতিবাহিত করার পর ফিরে আসেন মায়ের কাছে। কিছুদিন পর তার সম্মানিতা মাও ইন্তিকাল করেন।

তারপর দাদা আব্দুল মুত্তালিব এবং চাচা আবু তালিবের আদরেই তিনি বড় হন। সত্যবাদিতা, আমানতদারীসহ সব অনুসরণীয় গুণাবলী নিয়ে আবির্ভূত হন সারা জাহানের রহমত হিসেবে।

পৃথিবীতে যখন আইয়ামে জাহিলিয়া বা অজ্ঞতার যুগ চলছিল, পৃথিবীবাসী যখন কারণে-অকারণে হত্যা, নারী নির্যাতনসহ সব ধরণের পাপাচারে লিপ্ত ছিল সে চরম সময়ে মানবতাকে এহেন পথ থেকে মুক্তি দানের পথ বের করতে তিনি হেরা গুহায় মহান স্রষ্টার ধ্যান করতেন। আর তখনই এলো মুক্তির ঐশী পয়গাম। সে আলোর মশালেই তিনি আলোকিত করলেন গোটা পৃথিবীকে।

নারীর প্রতি হাজার বছর ধরে চলতে থাকা নির্যাতনের সাইক্লোন থামিয়ে দিলেন কঠোর হস্তে। রক্তারক্তির পথ বন্ধ করে ভালোবাসার বাণী ছড়িয়ে দিলেন সবার মাঝে। মানবতাকে দেখালেন চিরন্তন শন্তি ও মুক্তির পথ।

যে মানুষের জন্মে পৃথিবী থেকে অজ্ঞতার অন্ধকার দুর হলো, পৃথিবীবাসী শান্তির সন্ধান পেল, নিশ্চয় তার আগমনই মানবতার জন্য পরম প্রাপ্তি। তার জন্মের সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন বিষয়ের আলোচনাই মিলাদ। মিলাদ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ‘জন্মসময়’। আল্লামা ইবনে মানযুর তাঁর সুপ্রসিদ্ধ আরবি অভিধান ‘লিসানুল আরবে’ লিখেছেন, মিলাদ হচ্ছে সে সময়ের নাম; যে সময় সে (ব্যক্তি) জন্ম গ্রহণ করেছে। ‘মিলাদ’অর্থ ‘জন্মসময়’, ‘মিলাদুন্নবী’অর্থ হলো নবীর জন্মসময়।

‘মিলাদুন্নবী’বলতে রাসুলুল্লাহ (রা.) এর জন্ম, এবং তৎসংশ্লিষ্ট ঘটনাবলী আলোচনা করাকেই বোঝায়। মিলাদ শুধুই আলোচ্য, তা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। কেননা কোনো ব্যক্তির পক্ষে এমনটি সম্ভব নয় যে সে নবীজির জন্মবৃত্তান্ত শুনে আবার নবীজির জন্মের মতো জন্ম গ্রহণ করবে।

নবীজির জন্ম তারিখ : প্রতিটি মুসলমান বিশ্বাস করেন যে, পৃথিবীর যে কোনো তথ্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হলো কোরআনুল কারিম। ঐতিহাসিক কোনো তথ্যের ব্যাপারে কোরআনের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা মুসলমানরা দ্বিধাহীনভাবে মেনে নেয়। তারপর শুদ্ধ ধারায় বর্ণিত হাদিস হলো এর দ্বিতীয় উৎস। শুধু নবীজির জন্মতারিখ বা জন্মের সময়ের ঘটনা নয়, ইসলামের যে কোনো বিষয়ে কোরআন-হাদিসের সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া গেলে তা আমরা অকপটে মেনে নেব।

এ কথা সত্য যে কোরআনুল কারিমের কোথাও নবীজি (সা.) এর জন্ম তারিখ নিয়ে কিছু আলোচিত হয়নি। নবীজি (সা.) তার জন্ম তারিখ সম্পর্কে কিছু বলেননি। সাহাবীগণও তাঁর জন্মদিন সম্পর্কে কিছু জানতে চাননি। সাহাবীরা ছিলেন কেবলই তাঁর মহান আদর্শ নিয়ে ব্যস্ত। জীবন দিয়ে হলেও তাঁর মহান আদর্শ ও শিক্ষা বাস্তবায়নে চেষ্টা করে গেছেন তারা।

নবীজি (সা.) এর জন্ম তারিখের ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের যেসব বক্তব্য পাওয়া যায়, তার প্রায় সবই গবেষণা ও অনুমাননির্ভর। এ ব্যাপারে একাধিক মত থাকায় এর কোনো একটিকে প্রাধান্য দেওয়া কঠিন।

প্রথমত নবীজি (সা.) এর জন্মের বছর (সাল)। ঐতিহাসিকরা বলছেন, নবীজি (সা.) এর জন্ম হয়েছিল হাতির ঘটনার বছর। হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) কুবাস ইবন আশইয়ামকে প্রশ্ন করেন, আপনি বড় না-কি নবীজি (সা.) বড়? তিনি উত্তরে বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমার থেকে (মর্যাদায়) বড়। তবে আমি তার পূর্বে জন্মগ্রহণ করেছি। রাসুলুল্লাহ (সা.) হাতির বছরে জন্মগ্রহণ করেন।’(তিরমিজি : ৫/৫৫০)।

যে বছর আবরাহা হাতির বাহিনী নিয়ে কা’বা ঘর ধ্বংসের জন্য এসেছিল সে বছরই নবীজির (সা.) জন্ম হয়। ঐতিহাসকদের মতে তা হয়েছিল ৫৭০ অথবা ৫৭১ খ্রিস্টাব্দে। দ্বিতীয়ত, জন্মের মাস ও তারিখ। আসলে নবীজির (সা.) জন্মের মাস ও তারিখ সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য কোরআন-হাদিসে পাওয়া যায় না।

ইসলামের ইতিহাসের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য গ্রন্থ ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’তে এ ব্যাপারে অনেকগুলো অভিমত পাওয়া যায়। ইবনে আব্দুল বার ইসতিয়াব গ্রন্থে রবিউল আউয়াল মাসের ২ তারিখের কথা উল্লেখ করেছেন। ইবনে হাময থেকে হুমায়দি বর্ণনা করেছেন, নবীজির জন্ম হয়েছিল রবিউল আউয়ালের ৮ তারিখ। ইবনে আবি শাইবা ‘মুসান্নাফ’গ্রন্থে হজরত জাবির ও ইবনে আব্বাস (রা.) এর সূত্রে বলেন, নবীজির জন্ম হয়েছিল হাতির বছর রবিউল আউয়াল মাসের ১৮ তারিখ। কেউ কেউ বলেছেন, তা হয়েছিল রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ।

হাফিজ ইবনে আসাকির বলেন, নবীজি (সা.) মুহাররম মাসের ১০ তারিখ মায়ের গর্ভে আসেন এবং রমজান মাসের ১২ তারিখ সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ২/৩৮৩)। তৃতীয়ত, জন্মের বার। নির্ভরযোগ্য হাদিসের মাধ্যমে এটা জানা যায় যে, নবীজি (সা.) এর জন্ম হয়েছিল সোমবারে।

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সোমবারে জন্মগ্রহণ করেন, সোমবারে মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনার পথে রওয়ানা করেন, সোমবারে মদিনায় পৌঁছান এবং সোমবারেই তিনি হাজরে আসওয়াদ উত্তেলন করেন।’(মুসনাদে আহমাদ : ৪/১৭২)।

কোরআন-হাদিস ও ইসলামের ইতিহাস থেকে নবীজির জন্মের ক্ষেত্রে শুধু এ বিষয়টি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে তা হয়েছিল সোমবারে। এর বাইরে জন্মের বছর, মাস ও তারিখ সবই অস্পষ্ট। ফলে ১২ রবিউল আউয়াল নবীজির জন্ম তারিখ তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কিন্তু সব ঐতিহাসিকই এ কথা বলেন যে নবীজির ওফাত হয়েছিল ১২ রবিউল আউয়ালে।

তবে ১২ রবিউল আউয়াল নবীজির জন্ম তারিখ হওয়ার ব্যাপারটি নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে এ দিনটি নবীজির ওফাত দিবস। তাই এ দিনে ঈদ বা আনন্দ নয়, বরং ইসলামে শোক পালন বৈধ থাকলে এ দিনটিই হতো মুসলিম জাতির সবচেয়ে শোকের দিন।

ইসলামে জন্মদিন পালন এবং শোক পালন কোনেটিই বৈধ নয় বলে এর উভয়টি পরিহার করে চলা উচিত। কিন্তু নবীজিকে (সা.) পাঠিয়ে আল্লাহ তায়ালা যে নিয়ামত দান করেছেন এর জন্য কি আমরা আনন্দিত হবো না? অবশ্যই। আনন্দিত হবো, আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করব। কিন্তু এর সবই হতে হবে নবীজির (সা.) দেখানো পন্থায়।

নবীজি (সা.)কে পাঠানোর জন্য আল্লাহ তাআলার দরবারে শুকরিয়া আদায়ের সুন্নত পদ্ধতি হলো বছরের প্রত্যেক সোমবার রোজা রাখা। হজরত আবু কাতাদা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহকে (সা.) সোমবার দিন রোজা রাখার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এ দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনেই আমি নবুয়্যত পেয়েছি।’(সহিহ মুসলিম : ২/৮১৯)। কেউ যদি নবীজির জন্মে আনন্দ প্রকাশ করতে চায় তাহলে সে বছরের প্রতি সোমবার রোজা রাখতে পারে।

মুসলমানদের উচিত বিশেষ কোনো দিবস পালনে মনযোগী না হয়ে সারা জীবনই নবীজির (সা.) সবগুলো সুন্নত মেনে চলার চেষ্টা করা। তার আদর্শ অনুযায়ী জীবন ও সমাজ পরিচালনায় সচেষ্ট হওয়া। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা নবীজিকে (সা.) অনুসরণ করতেই বলেছেন। এরশাদ হয়েছে, ‘(হে রাসুল) তাদের বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস তাহলে আমাকে অনুসরণ করো; তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।

আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু। (সুরা আলে ইমরান : ৩১)। আল্লাহ তায়ালা এখানে নবীজিকে (সা.) অনুসরণ করতে বলেছেন। আমাদের উচিত নবীজির (সা.) জীবনী জেনে নিজেরা তা অনুযায়ী চলা এবং সন্তানদেরকে তার মহান জীবনী জানানো।

নবীজিকে অনুসরণ করা, তার সুন্নত মেনে চলার মাঝেই রয়েছে সাফল্য। হজরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার সুন্নতকে মেনে চলবে, জীবিত রাখবে, সেই সত্যিকারে আমাকে ভালোবাসবে। আর যে আমাকে ভালোবাসবে সে আমার সঙ্গেই বেহেশতে থাকবে। (জামে তিরমিজি : ২৬৭৮)। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে জীবনের সব ক্ষেত্রে তার প্রিয় হাবিবের অনুসরণ করার তাওফিক দিন! সূত্র: পরিবর্তন

হাফেজ মাওলানা যুবায়ের আহমাদ : খতিব, বাইতুশ শফিক মসজিদ, বোর্ড বাজার (আ. গণি রোড), গাজীপুর।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন