শিরোনাম :

প্রশ্ন ফাঁস; গলার ফাঁস


বৃহস্পতিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৪:৪৯ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

প্রশ্ন ফাঁস; গলার ফাঁস

আমীন আল রশীদ: সংবাদটি ভয়াবহ এবং আতঙ্কের; সেইসঙ্গে লজ্জার। চাকরি বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নয়, বরং এবার প্রথম শ্রেণির প্রশ্নও ফাঁস হয়েছে এবং এরপর নাটোর সদর উপজেলার আগদিঘা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির গণিত পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। এর আগে দ্বিতীয় শ্রেণির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় এবং এটি জানাজানি হবার পর বরগুনার বেতাগী উপজেলার ১৪০টি বিদ্যালয়ের পরীক্ষা স্থগিত করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। এই সংবাদগুলো আমাদের অনেকগুলো প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

১. প্রথম দ্বিতীয় শ্রেণির একজন শিশুশিক্ষার্থী প্রশ্ন ফাঁসের কী বোঝে? যদি না বোঝে, তাহলে এই প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে কি তার অভিভাবকরা জড়িত? যে অভিভাবক তার শিশুকে ফাঁস করা প্রশ্নে পরীক্ষা দিতে উদ্বুদ্ধ করেন, সেই অভিভাবক ভবিষ্যতে এই সন্তানকে কী বানাবেন? চোর, দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, খুনী, ধর্ষক?

২. প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণির পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস করে কী এমন উদ্ধার হবে? যে শিশু ক্লাসে থার্ড হতো, ফাঁস করা প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে সে কি ক্লাসের ফার্স্ট বয়/গার্ল হবে?

৩. এই বয়সেই যে শিশুর এমন দুই নম্বরিতে হাতেখড়ি হলো, সে কি ভবিষ্যতে আর কোনও পরীক্ষায় সৎভাবে অংশ নিতে পারবে? সে কি তাহলে জীবনের সবগুলো পরীক্ষায় এরকম প্রশ্ন ফাঁসের ধান্দায় থাকবে বা অন্য কোনো অসদুপায়ে পাস করার চেষ্টা করবে না?

৪. শিশু শ্রেণির প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে নিশ্চয়ই শিক্ষকদেরও একটি অংশ জড়িত। তাহলে এই শিক্ষকদের কাছ থেকে শিশুরা কী ধরনের মোরালিটি বা এথিকস শিখবে? ওই শিক্ষকের কি আদৌ কোনও মোরালিটি বা এথিকস বলে কিছু আছে? যদি না থাকে তাহলে তাকে শিক্ষক পদ থেকে বহিষ্কার করে কেন ফাঁসিতে ঝোলানো হবে না?

বস্তুত প্রশ্ন ফাঁস এখন এক মহামারি এবং যেকোনও সংক্রমক ব্যাধির চেয়েও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বিশেষ করে যখন খোদ শিক্ষামন্ত্রীও সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইনিয়ে-বিনিয়ে প্রশ্ন ফাঁসকে বৈধতা দেন কিংবা বাস্তবতা অস্বীকার করেন বা করতে চান, তখন এই ব্যাধি থেকে মুক্তির আপাতত কোনো পথ পাওয়া যায় না।

‘প্রশ্ন ফাঁস আগেও হয়েছে, এটা নতুন কিছু নয়, আমরা প্রশ্ন ফাঁস রোধে ব্যবস্থা নিচ্ছি’––এ জাতীয় বক্তৃতা-বিবৃতি যে সংকটের কোনো সমাধান দেয়নি বরং চাকরির পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এবং সবশেষ প্রাথমিক স্তরেও এই বিভীষিকা ছড়িয়ে পড়েছে, তা এখন নির্মম বাস্তবতা। আমরা এ কারণে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও চাইতে পারি। তিনি পদত্যাগ করতেও পারেন। কিন্তু তাতেই কি সবকিছু বদলে যাবে?

যে পঁচন শুরু হয়েছে মানুষের মগজে, যে বাবা-মা তার নিজের সন্তানের প্রশ্ন ফাঁস করেন কিংবা পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে খাতা নিয়ে এসে উত্তর লিখে দেন, সেই অবক্ষয় আমরা রোধ করব কী করে? একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ কিংবা টেলিভিশনের টকশোতে বুদ্ধিজীবীদের আহা উহু অথবা ক্ষোভ ঝেড়ে পত্রিকার পাতা ভরে ফেললেই যে প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ হয়ে যাবে, ব্যাপারটা এমন নয়। বরং সমস্যাটা অন্যখানে।

১. এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমাদের রাষ্ট্রে, সমাজে এবং পরিবারের মধ্যে ঘাতক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। সেটি হলো, যে করেই হোক প্রথম হতে হবে। দ্বিতীয় শ্রেণির একটি শিশুকে পরীক্ষায় প্রথম হতে হবে, তাকে স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় প্রথম হতে হবে, চিত্রাঙ্কনে প্রথম হতে হবে, নাচেও প্রথম হতে হবে। আর সবখানে প্রথম হতে চাওয়ার এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অস্ত্র হিসেবে খোদ অভিভাবকরাই চোরাগলির সন্ধানে নেমে পড়েন।

২. প্রয়াত পপগুরু আজম খান ভারতের প্রখ্যাত শিল্পী কবীর সুমনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমাদের অজস্র ভাঙা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হয়েছে। কিন্তু এখনকার তরুণেরা লিফট দিয়ে উপরে উঠতে চায়। কোনো সাধনা বা চর্চা ছাড়াই তারা তারকা হতে চায়।’ এই বাস্তবতা শুধু যে গানের জগতে তাই নয়, বরং এই লিফটে ওঠার প্রবণতা সবখানেই। সহজে পাস করা, সহজে চাকরি পাওয়া, সহজে তারকা হওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, প্রশ্ন ফাঁস তারই একটি ছোট অনুষঙ্গ।

৩. সমাজে ও রাষ্ট্রে ন্যায্য আচরণ না থাকলে, ন্যায়বিচার না থাকলে, আইনের শাসন না থাকলে প্রশ্ন ফাঁস হয়। কেননা একদিকে নানাবিধ কোটা অন্যদিকে ঘুষ, দুর্নীতি আর নির্লজ্জ দলীয়করণের ফলে যখন প্রকৃত মেধাবীরা চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়, তখন অনেকেই অন্তত লিখিত পরীক্ষায় পাস করার জন্য প্রশ্ন ফাঁসের সন্ধানে থাকেন। কারণ তারা বিশ্বাস করেন, লিখিত পরীক্ষায় পাস করলে ভাইভায় গিয়ে তদবির ও ঘুষের ব্যবস্থা করা যাবে।

৪. প্রশ্ন ফাঁস এখন একটি বিশাল বাণিজ্য। অনেক চক্র এর সাথে জড়িত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে প্রায়ই অনেকে ধরা পড়ে। এই বাণিজ্যে যে অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিও জড়িত, তা বেরিয়ে এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের সদস্য ড. নাসিরউদ্দিন আহমেদের বক্তব্যেও। সম্প্রতি একজন পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা গ্রেপ্তারও হয়েছেন।

৫. সবকিছু অস্বীকার করা বা এড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতা আমাদের এখন রাষ্ট্রীয় ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। শুরু থেকেই প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টিকে সিরিয়াসলি আমলে নিয়ে সরকার যদি এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতো, তাহলে চাকরির পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের রেশ ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সিঁড়ি বেয়ে প্রাথমিকে নেমে আসত না।

৬. প্রশ্ন ফাঁস রোধে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সরকার দাবি করে। যেমন পরীক্ষার আধা ঘণ্টা আগে শিক্ষার্থীরা হলে প্রবেশ করার পর প্রশ্নপত্র পাঠানোর বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রশ্ন হলো শিক্ষকরাই যদি প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িত থাকেন, তাহলে আধা ঘণ্টা আগে প্রশ্ন পাঠিয়েই বা লাভ কী? সর্ষের ভূত তাড়াবেন কী দিয়ে? কেননা কোচিং সেন্টারগুলো শিক্ষকদের লোভ দেখায়, যে কোনোভাবে প্রশ্ন ফাঁস করে তাদের শিক্ষার্থীদের ভালো ফল করাতে পারলে কোচিং ব্যবসা ভালো হবে। ফলে অনেক শিক্ষক বাড়তি আয়ের লোভে নিজের নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে জড়িয়ে পড়েন এই অসাধু ব্যবসায়।

দুদকের ‘শিক্ষা সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টিমের’ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষা বোর্ড, বাংলাদেশ সরকারি প্রেস (বিজি প্রেস), ট্রেজারি ও পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ‘অসাধু’ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোচিং সেন্টার, প্রতারক শিক্ষক ও বিভিন্ন অপরাধী চক্রও যুক্ত থাকতে পারেন বলে দুদকের তদন্তকারীদের ধারণা। গত ১৩ ডিসেম্বর দুদকের ওই প্রতিবেদন দেওয়া হয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে, যেখানে প্রশ্ন ফাঁস, নোট-গাইড, কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ, এমপিওভুক্তি, নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রে দুর্নীতি রুখতে ৩৯ দফা সুপারিশ করা হয়েছে।

দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন টিআইবির একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় ৪০টি ধাপে প্রশ্ন ফাঁস হয়। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মডারেশন, বিজি প্রেসে কম্পোজ, প্রুফ দেখা, সিলগালা করা ও বিতরণ এবং পরীক্ষার দিন কেন্দ্রে শিকদের মাধ্যমেও প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। শুধু তাই নয়, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে শিাবোর্ড, মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি, কোচিং সেন্টার, গাইড বই ব্যবসায়ী ও সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের অনেকে সরাসরি জড়িত। ফাঁস হওয়া প্রশ্নে আকারভেদে ২০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থের লেনদেন হয় বলে টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

তাহলে এই মারণব্যাধির ‍ওষুধ কী? প্রশ্ন ফাঁসকারী, ফাঁস করা প্রশ্নের পরীক্ষার্থী এবং প্রশ্ন ফাঁস ও পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনে উদ্বুদ্ধকারী অভিভাবকদের মৃত্যুদণ্ডের বিধান করে আইন প্রণয়ন? কোনও সভ্য রাষ্ট্র নিশ্চয়ই এরকম আইন করবে না। কিন্তু এ কথাও ঠিক যে, যে দেশের মানুষ যত খারাপ সে দেশে ততবেশি আইন লাগে। খাদ্যে ভেজাল, বিশেষ করে ফরমালিন রোধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করার দাবি জানিয়েছিলেন সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ। খাদ্যে ভেজালের চেয়ে কোমলমতি শিশুদের প্রশ্ন ফাঁস কি কম অপরাধ?

লেখক: সাংবাদিক ও লেখক।

 

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন