শিরোনাম :

সাংবাদিকতার নতুন পাঠ


শনিবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৫:০০ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

সাংবাদিকতার নতুন পাঠ

প্রভাষ আমিন: গত ১৯ নভেম্বর প্রথম আলোর চারের পাতায় ‘বনানীতে আবারও হোটেলে ধর্ষণের অভিযোগ’ শিরোনামের সংবাদটি পড়ে সাংবাদিকতার নতুন পাঠ নিলাম। এতদিন জানতাম ধর্ষণের শিকার যে তার নাম গণমাধ্যমে গোপন রাখা হয়, কিন্তু ধর্ষকের নাম প্রচার করা হয়। কিন্তু এই নিউজে দুজনেরই নাম গোপন রাখা হয়েছে। অভিযুক্ত ধর্ষকের নাম কেন প্রকাশ হয়নি, তার কোনও ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি রিপোর্টে। তাহলে কি এখন থেকে প্রথম আলোতে ধর্ষণের শিকার এবং ধর্ষক কারও নামই প্রকাশ হবে না, নাকি কোনও ঘটনায় হবে, কোনও ঘটনায় হবে না? এখন কোন ঘটনায় হবে, কোন ঘটনায় হবে না, সেটা আমরা বুঝবো কিভাবে? এই ঘটনায় কেন ধর্ষকের নাম ছাপা হয়নি, তার একটা ক্লু আছে রিপোর্টের প্রথম লাইনেই, ‘অভিজাত পরিবারের এক সদস্যের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ’। তার মানে ধরে নিচ্ছি, অভিযুক্ত ধর্ষক অভিজাত পরিবারের হলে তার নাম ছাপা হবে না। তবে বনানীর রেইনট্রি হোটেল একই ধরনের ঘটনায় কিন্তু সবার নাম ও ছবি ফলাও করে ছাপা হয়েছিল প্রথম আলোর প্রথম পাতায়। আপন জুয়েলার্স হয়তো বিত্তশালী, কিন্তু প্রথম আলোর দৃষ্টিতে অভিজাত নয়। হয়তো অভিজাত পরিবারের কারও বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ উঠলেও তিনি বিশেষ সহানুভূতি পাবেন। কি জানি বুঝতে পারছি না, অভিযুক্ত ধর্ষকের নাম ছাপা না ছাপার স্ট্যান্ডার্ডটা কী?

এই প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না।এই উদাহরনটা প্রথম আলো থেকে নিয়েছি বটে। কিন্তু বাংলাদেশের গণমাধ্যমে পছন্দ-অপছন্দ, অনুরাগ-বিরাগের এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে। আমার পছন্দের কারো বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ আসলে আমি কৌশলে তার নামটি বাদ দিয়ে দেবো। প্রয়োজনে নিউজটিই ড্রপ করে দেবো। এমন উদাহরণ কিন্তু ভুরি ভুরি।অনেকে বলছেন, আদালতে অভিযোগ প্রমাণের আগ পর্যন্ত কারও নামই পত্রিকায় ছাপা হওয়া উচিত নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই যুক্তির সঙ্গে একমত। কোনও একদিন হয়তো বাংলাদেশে বা বিশ্বে গণমাধ্যমে এমন আদর্শ পরিবেশ আসবে, যখন আদালতের রায় হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা অভিযুক্তের নাম ছাপবো না।

প্রথম আলো সবসময় সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকে। আমরা যা ভাবি, প্রথম আলো তা করে দেখায়। আদালত রায় না দেয়া পর্যন্ত অভিযুক্তের নাম ছাপা হবে না- যদি এ ধরনের কোনও এডিটরিয়াল অবস্থান থেকে প্রথম আলো এই রিপোর্টে অভিযুক্তের নাম প্রকাশ না করে থাকে, তাহলে তাদের আগাম অভিনন্দন। কিন্তু আমার সন্দেহ তাদের এই বিরল সংযম শুধু এই রিপোর্টের জন্যই। কেন এই সংযম, সেই প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাবেন আরো দুয়েকটি পত্রিকা বা অনলাইনে চোখ বোলালে। এবারের ঘটনায় অভিযুক্তের নাম কুশান ওমর সুফি। এই লোক কণ্ঠশিল্পী আনুশেহ আনাদিলের ভাই। সমাজে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত এই পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে বলেই হয়তো প্রথম আলোর এই সংযম। এক নারী মামলা করেছেন বলেই কুশান ওমর সুফিকে আমি ধর্ষক মনে করছি না। আবার অভিজাত পরিবারের সদস্য হলেই কেউ ধর্ষক হতে পারবে না, এমনটাও আমি মনে করি না। দোষী-নির্দোষ আদালত নির্ধারণ করবে। আবারও মূল প্রশ্নে ফিরে যাই, তাহলে কি আদালত রায় না দেয়া পর্যন্ত অভিযুক্তের নাম প্রকাশ না করাই উচিত? আগেই বলেছি, আমি আদর্শিক অবস্থানে রায় না হওয়া পর্যন্ত নাম প্রকাশ না করার পক্ষে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনও সেই সময় আসেনি। এই যেমন এই ঘটনায় প্রথম আলো অভিযুক্তের নাম ছাপা না হলেও অধিকাংশ পত্রিকা ও অনলাইন কিন্তু কুশান ওমর সুফির নাম ছেপেছে। সেখান থেকেই আমি তার নাম-পরিচয় জেনেছি।

কেন আমি নাম না ছাপার পক্ষে সেটা আগে বলে নেই। বাংলাদেশে ট্রায়ালের চেয়ে মিডিয়া ট্রায়াল হয় বেশি এবং তা কখনও কখনও আদালতের শাস্তির চেয়েও ভয়ঙ্কর। কারও বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ এলেই গণমাধ্যম এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তার চৌদ্দগোষ্ঠি উদ্ধার করে ফেলে।গণমাধ্যম দিনের পর দিন সত্য-মিথ্যা লিখে তার সম্পর্কে সমাজের ধারণাটাই বদলে দেয়। তিনি যে নির্দোষ সেই দাবিটাও জোর গলায় করতে পারেন না। সেই অভিযোগের অনেকগুলোই থানা বা আদালত পর্যন্ত যায়ই না। অনেকগুলো থানায় গিয়ে শেষ হয়ে যায়। অনেকগুলো হয়তো আদালতে গিয়ে রায় তার পক্ষে আসে। কিন্তু ততদিনে সামাজিকভাবে তিনি ধ্বংস হয়ে যান। যার বিরুদ্ধে দিনের পর দিন গণমাধ্যমে সত্য-মিথ্যা লেখা হলো, কয়েকবছর পর আদালতে তার নির্দোষ ঘোষণার খবরটি পত্রিকায় ছাপাই হয় না। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী না নির্দোষ তাৎক্ষণিকভাবে তা জানার কোনো উপায় নেই গণমাধ্যমের। তাই সবচেয়ে ভালো হয়, আদালতের রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করা।

কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা এই অপেক্ষা অনুমোদন করে না। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর আমাদের পুরো আস্থা নেই। আর বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, অর্থের কাছে বিচার বিক্রি হয়ে যাওয়ার শঙ্কা মিলে মানুষ অপেক্ষা করতে চান না। অনেকেই মনে করেন, মিডিয়া ট্রায়ালই আসল ট্রায়াল। পরে আদালতে কী হলো না হলো, তা নিয়ে আর কেউ মাথা ঘামান না। এসব ক্ষেত্রে গণমাধ্যমই হয়ে যায় মানুষের আশা-ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল। আবার অনেক সময় গণমাধ্যমের চাপ না থাকলে ভূক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পান না। যেমন বনানীর হোটেল সুইট ড্রিমে ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে এই লেখা। কিন্তু আপনারা একটু বনানীর রেইনট্রি হোটেলের ধর্ষণ ঘটনা কথা স্মরণ করুন। সেই ঘটনায় কিন্তু প্রথম আলোসহ সব পত্রিকা অভিযুক্তদের নাম, ছবি ছেপেছে দিনের পর দিন। শুধু তাদের নয়, তাদের চৌদ্দগোষ্ঠির নাম, অপকর্মের ফিরিস্তি এখন সবার মুখে মুখে। রেইনট্রির ঘটনায় মূল অভিযুক্ত আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদসহ ৫ আসামীই এখন কারাগারে। শুধু তাই নয়, আপন জুয়েলার্সের তিন মালিকও এখন কারাগারে। একবার শুধু ভাবুন, গণমাধ্যমের প্রবল চাপ যদি না থাকতো, তাহলে এই মামলার পরিণতি কী হতো? আমার ধারণা থানায়ই এই মামলা ফাইনাল হয়ে যেতো। গণমাধ্যমের চাপ একটু ঢিলা হলেই এই মামলা টাকার কাছে বিক্রি হয়ে যাবে, এমন আশঙ্কা আছে অনেকের।শুধু রেইনট্রি হোটেলের ধর্ষণ মামলা নয়, এমন হাজারটা উদাহরণ দেওয়া যাবে, গণমাধ্যমের প্রবল চাপের কারণেই অনেক অন্যায়ের প্রতিকার হয়েছে, নির্যাতিতরা ন্যায়বিচার পেয়েছেন। নারায়ণগঞ্জের সাত খুন বা বিশ্বজিৎ হত্যা মামলাও বিচার হচ্ছে বা হয়েছে গণমাধ্যমের প্রবল চাপের কারণেই। এসব মামলায় যদি অভিযুক্তদের নাম ছাপার জন্য আদালতের রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো, তাহলে হয়তো এই মামলাগুলো আদালত পর্যন্ত যেতোই না।

গণমাধ্যমের প্রবল চাপ না থাকলে সিলেটের রাজন হত্যার বিচার হতো বলে আপনি বিশ্বাস করেন? গণমাধ্যমের লেগে থাকার কারণে যেমন অনেক ঘটনার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে, তেমনি মিডিয়া ট্রায়াল ধ্বংস করে দিয়েছে অনেক নির্দোষ মানুষের সামাজিক জীবন, ক্যারিয়ার। এমনকি রেইনট্রি হোটেলের ধর্ষণ ঘটনার পর আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদের সঙ্গে আগে তোলা ছবির কারণেও অনেককে সামাজিকভাবে অপদস্ত হতে হয়েছে। শুধু বাংলাদেশ কেন, সম্প্রতি হলিউডের প্রযোজক হার্ভি ওয়াইনস্টিনের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিনেত্রীরা যৌন হয়রানীর অভিযোগ আনছেন। এসব অভিযোগ নিয়ে তোলপাড় বিশ্বজুড়ে। এরপর ‘মি ঠু’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে বিশ্বজুড়ে যৌন হয়রানির কথা বলেছেন নারীরা। এই সামাজিক আন্দোলন ‘মি ঠু’ এবার টাইম সাময়িকীর বর্ষসেরা ঘটনার স্বীকৃতি পেয়েছে। এখন গণমাধ্যম যদি আদালতের রায় না আসা পর্যন্ত হার্ভির নাম প্রকাশে বিরত থাকতো, তাহলে চাপা পড়ে যেতো অনেক অন্যায়। আবারও মূল প্রশ্নে ফিরি। এখন তাহলে কী করা উচিত, আদালত রায় দেয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবো নাকি অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অভিযুক্তের নাম-ধাম-ছবি ছেপে দেবো?

আবার ফিরে আসি বনানীর সুইট ড্রিম ধর্ষণ মামলায়। অভিযুক্ত কুশান ওমর সুফির সঙ্গে অভিযোগকারী নারীর দেড় বছর ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু কুশানের পরিবার সম্পর্কটি মেনে নিচ্ছিল না। গত ১৯ নভেম্বর অভিযোগকারী নারী কুশানের বাসায় গেলে কুশানের বোন আনুশেহ আনাদিল তাকে বের করে দেন।পরে কুশান বিয়ের বিষয় নিয়ে আলোচনার কথা বলে সেই নারীকে নিয়ে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে সুইট ড্রিম হোটেলে ওঠেন। মামলায় বাদী বলেছেন, সেখানে তাকে মারধোর এবং ধর্ষণ করা হয়। পত্রিকায় প্রতাশিত খবর অনুযায়ী এরপর পুলিশের মধ্যস্ততায় বিয়ে করতে সম্মত হয় কুশান। কিন্তু কুশানের বোন আনুশেহ দুই দফা শর্ত দিলে ভেঙ্গে যায় বিয়ের সমঝোতা। তারপর মানে ঘটনার ১৩ দিন পর থানায় মামলা করেন সেই নারী। এখানেও কিছু প্রশ্ন আছে। যদি সেই সমঝোতা না ভেঙ্গে টিকে যেতো, যদি তাদের বিয়ে হয়ে যেতো; তাহলে কি সেই নারী ধর্ষণের মামলা করতেন? কুশান ও সেই নারীর মধ্যে দেড় বছরের প্রেমের সম্পর্ক। প্রেমিক-প্রেমিকা এক রুমে থাকলে এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক হতেই পারে। যদি সেটা পারস্পরিক সম্মতিতে হয়ে থাকে, তাহলে এটা কোনোভাবেই ধর্ষণ নয়।দুজন প্রাপ্তবয়ষ্ক নারী-পুরুষ পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে শারীরিক সম্পর্কে জড়ালে তা আইনের দৃষ্টিতে অন্যায় নয়, অনৈতিকও নয়। কিন্তু কারো অসম্মতিতে কিছু করলে সেটা বেআইনী, অন্যায়। এমনকি স্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বামী শারীরিক সম্পর্ক করলে সেটাও ধর্ষণ হবে। এখন ১৯ নভেম্বর রাতে সুইট ড্রিম হোটেলে যদি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেই থাকে, সেটা অপরাধ। আর অপরাধের বিচার হতে হবে, সমঝোতার সুযোগ নেই।আর যদি পারস্পরিক সম্মতির শারীরিক সম্পর্ককে এখন ব্ল্যাকমেইলের জন্য ধর্ষণ বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে, তাহলে অপরাধটা সেই নারীর। নারীর অপরাধ প্রসঙ্গে পরে আসছি। এই ফাঁকে আরেকটা কথা বলে নেই। বনানীর রেইনট্রি ও সুইট ড্রিম হোটেলে ধর্ষণ মামলার পর কেউ কেউ বলছেন, যে নারীরা হোটেলে যায়, তারা ধর্ষিত হতেই যায়।এই ধারণাটা খুব ভুল। একজন নারী তার প্রেমিক বা বন্ধুর সঙ্গে খেতে বা আড্ডা মারতে হোটেলে যেতেই পারেন। হোটেলে যাওয়া, আড্ডা মারা বা হেসে হেসে কথা বলা মানেই কিন্তু এই নয় যে সেই নারী আপনার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে রাজি। সে যদি ‘না’ বলে তাহলে সেটা ‘না’ই। এমনও হতে পারে সে হয়তো প্রাথমিকভাবে সম্মত ছিল, কিন্তু পরে আর তার ভালো লাগছে না। তাহলেও কিন্তু তার সঙ্গে আপনি কিছু করতে পারবেন না। ব্যাপারটা খুব সহজ। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ পারস্পরিক সম্মতিতে যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে। কিন্তু সম্মতি ছাড়া আপনি কারো সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করতে পারবেন না; সে আপনার বন্ধু হোক, স্ত্রী হোক, এমনকি যৌনকর্মী হলেও। অমুক হাসলো কেন, হোটেলে এলো কেন, এমন পোশাক পরলো কেন; এর কোনোটাই ধর্ষণের যুক্তি হতে পারে না। ধর্ষণ মানে ধর্ষণই। এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ, এর কোনো আপোষ নেই, সমঝোতা নেই।

ফিরছি নারীর অপরাধ প্রসঙ্গে। আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তের নাম প্রকাশ করা না করা প্রসঙ্গে ফেসবুকে একজন মন্তব্য করেছেন, নাম প্রকাশ করা উচিত না। কারণ বাংলাদেশে ৯০ ভাগ নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ মামলাই ভুয়া, হয়রানিমূলক। তার মন্তব্যটি একটু বেশি আবেগপ্রসূত, কিন্তু একেবারে মিথ্যা নয়। ৯০ ভাগ না হলেও বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের নামে অনেক হয়রানিমূলক মামলা হয়। তবে এখানেও জিনিসটা একটু জটিল। বাংলাদেশে সামাজিক হেনস্থার ভয়ে অনেক ধর্ষণের ঘটনা আলোর মুখ দেখে না, মামলাও হয় না। সামাজিকভাবেই মিটে যায় অনেক ঘটনা। অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীকে বিয়ে দিয়ে ধর্ষণ ধামাচাপা দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে ঘটনার অনেক পরে ধর্ষণের মামলা হয়, ততদিনে মুছে যায় সব প্রমাণ। অনেক সময় সত্যি সত্যি ধর্ষণের মামলাও অনেক দেরিতে হয়। ধর্ষিতা সামাজিক ভয়ে বা ট্রমার কারণে চুপ করে থাকেন। থানায় যাওয়ার মত সাহস অর্জন করতে অনেক সময় লেগে যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে আপোষ করতে সময় নেয় দুই পক্ষ, আপোষ না হলে মামলা হয়। আপত্তিটা এখানেই। যেটা অপরাধ সেটা অপরাধই। অপরাধকে ধামাচাপা দেয়ার, সমঝোতার সুযোগ নেই। অপরাধ করলে সাজা পেতে হবে।বাংলাদেশে নারীদের সুরক্ষা দিতে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে আইন অনেক কড়া। অভিযুক্তরা জামিন পান না। এই কঠোর আইন নারীদের যেমন নিরাপদ করেছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে কারো কারো হাতে ব্ল্যাকমেইলের অস্ত্র তুলে দেয়। কাউকে বিপদে ফেলতে বা ব্ল্যাকমেইল করতে নারীদের মামলা করার সংখ্যা কম হলেও একেবারে নেই তা বলা যাবে না। তাই নারী নির্যাতনের মামলা অভিযুক্ত পুরুষকে যেমন জামিন অযোগ্য ধারায় গ্রেপ্তার এবং সাজা দিতে হবে। তেমনি কোনও নারী যদি হয়রানিমূলক মামলা করেন, আদালতে প্রমাণ হলে তার বিরুদ্ধেও শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে।

আরেকটা প্রসঙ্গ বলে, এই লেখার ইতি টানছি। ‘বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ’ এই অভিযোগে অনেক মামলা হয়। বনানীর সুইট ড্রিম হোটেলের মামলাটিও এ ধরনেরই। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়েই নাকি ঐ নারীকে হোটেলে নেওয়া হয়েছিল। বিয়ের প্রলোভন হোক আর যেই প্রলোভনই হোক; অভিযোগকারী নারী যদি ঐ সময়ে শারীরক সম্পর্কে সম্মতি দিয়ে থাকেন, তাহলে কোনোভাবেই এটাকে ধর্ষণ বলা যাবে না। এ ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতিভঙ্গ বা প্রতারণার মামলা হতে পারে, ধর্ষণ মামলা নয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী বিয়ের কথা শুনলেই রাজি হয়ে যাবেন কেন, প্রলুব্ধ হবেন কেন?

শেষ করার আগে আবার সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি- মামলা হলেই অভিযুক্তের নাম প্রকাশ উচিত নাকি উচিত নয়? আমি এই ক্ষেত্রে প্রথম আলোর সঙ্গে একমত। গণমাধ্যম তো রোবট নয়। সে তার নিজস্ব অনুসন্ধান, এডিটরিয়াল অবস্থান, ব্যক্তিগত বিচার-বিবেচনা দিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। যদি গণমাধ্যম নিশ্চিত হয় যে ঘটনা সত্যি এবং চাপ অব্যাহত না রাখলে প্রভাবশালী ও বিত্তশালী অপরাধী পার পেয়ে যেতে পারে; তাহলে অবশ্যই তার নাম-ধাম প্রকাশ করবে। আর যদি মনে করে মামলাটি হয়রানিমূলক, তাহলে যথাযথ অনুসন্ধান এবং প্রাপ্ত তথ্যসহ তা প্রকাশ করবে। সে ক্ষেত্রে অভিযুক্তের নাম প্রকাশ না করলেও আপত্তি নেই। তবে সেটা যেন ব্যক্তিগত সম্পর্ক, অনুরাগ-বিরাগের কারণে না হয়। প্রথম আলো যদি এই রিপোর্টে অভিযুক্তের নাম প্রকাশ না করার কারণটি ব্যাখ্যা করতো, আমি তাদের ধন্যবাদই জানাতাম। কিন্তু ধরন দেখে মনে হয়েছে অভিযুক্তের সামাজিক অবস্থান এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের কারণেই নামটি প্রকাশ করা হয়নি। আপত্তিটা এখানেই। আমার কাছে বা প্রথম আলোর কাছে যদি মনে হয় কুশান ওমর সুফি নির্দোষ এবং তাকে হয়রানি করার জন্য মামলা হয়েছে; আমি অবশ্যই ন্যায্যতার প্রশ্নে তার পাশে থাকবো। কিন্তু সেই মনে হওয়াটা যৌক্তিক হতে হবে। বাংলা ট্রিবিউন

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন