শিরোনাম :

রাজনৈতিক বায়োডাটা দেখে মনোনয়ন দেয়া উচিত


রবিবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০১৭, ০২:৩৪ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

রাজনৈতিক বায়োডাটা দেখে মনোনয়ন দেয়া উচিত

এখলাসুর রহমান: আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘জনগণের সাথে যাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে তারাই আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন।’ অতীতে তিনি এরকম ভাবে হাইব্রিড, কাউয়া, মৌসুমি পাখি ও ফার্মের মুরগিসহ আরও অনেক কথাই বলেছেন। কিন্তু এসব হাইব্রিড গংদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ হয়েছে কি কখনও? মানুষ প্রত্যাশা করেছিল তিনি আওয়ামী লীগে রাজনৈতিক ফাটাকেষ্ঠে’র ভূমিকা পালন করবেন।

তিনি কি আদৌ সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছেন? কাউকে মনোনয়ন দেয়ার আগে তার অতীত রাজনীতির রেকর্ড পর্যালোচনা করা উচিত। কোন পত্রিকায় সাংবাদিক হিসাবে নিয়োগ পেতে গেলেও কর্তৃপক্ষ জেনে নেয় আগে কোন পত্রিকায় কাজ করেছে। কতদিন কাজ করেছে। কী পদে কাজ করেছে। অতীত অভিজ্ঞতা ও কার্যবিবরণীকেই তারা সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করে থাকে। এরপরও লিখিত পরীক্ষা ও ভাইবা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে তার চলমান যোগ্যতা ও মেধার বিচার করে থাকে কর্তৃপক্ষ। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষীয় কোন পত্রিকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি কোন নিয়োগ প্রত্যাশীর পরিচয় পায় যে সে জামাতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম থেকে এসেছে। সেক্ষেত্রে এই আবেদনকারী কি সেখানে নিয়োগ পেতে পারে? অথচ রাজনৈতিক দলের সদস্য গ্রহণ ও দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্তিতে অতীত রেকর্ডের কোন মূল্যায়ন নেই।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অতীত রেকর্ডের অনেক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তধারীও মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছে। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে যারা অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা ও জেল জুলুমের শিকার হয়েছে। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ এর ভূমিকা, এরশাদ বিরোধী আন্দোলন, বিএনপি-জামাতের সাম্প্রদায়িকতা লালনের দুঃশাসন বিরোধী আন্দোলন, ওয়ান ইলেভেনের বিরাজনীতিকীকরনের সময়ে ভূমিকা প্রভৃতিই মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত নয় কি? অথচ বিগত দিনে দেখা গেছে যাদের রাজনৈতিক নূন্যতম কোন রেকর্ড নেই তারাই রাজনৈতিক রেকর্ডধারীদের পেছনে ফেলে সামনে চলে গেছে।

দৃষ্টান্ত হিসেবে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অজয় কর খোকন ও জুতা ব্যবসায়ী আফজাল হোসেনের কথা উল্লেখ করা যায়। দলীয় তৃণমূল নেতাকর্মী ও জনগণের মধ্যে অজয় কর খোকনের ছিল বিশাল যোগাযোগ। কিন্তু দলীয় মনোনয়ন দেয়া হল আফজাল হোসেনকে। নেতা-কর্মীদের আগ্রহে অজয় কর খোকন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন দাখিল করল। জনমত চলে গেল অজয় কর খোকনের দিকে। তখন আফজাল হোসেনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতানোর জন্য কৌশলে অজয় কর খোকনের মনোনয়নপত্র বাতিল করিয়ে দেয়া হল। এই সুযোগে আফজাল হোসেন কিশোরগঞ্জের নিকলী-বাজিতপুর আসনের বিনা ভোটে ১৫৪ এমপির একজন হয়ে গেলেন।ঢাকা উত্তর-মেয়র আনিসুল হক-ওবায়দুল কাদের

বিনা-প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের একটি অন্যতম দুর্বল দিক। পরবর্তীতে এসব এমপিদের অনেকেই আরও জনবিচ্ছিন্ন, দলবিচ্ছিন্ন হয়ে সাঙ্গোপাঙ্গ কেন্দ্রিক আধিপত্যবাদে জড়িয়ে পড়ে। ক্ষমতার অপব্যবহার, দমনপীড়নসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। তারা জনগণ ও দল কোনটাকেই গুরুত্ব দেন না। তারা জনগণের সাথে বাস্তবেও নেই সোশ্যাল মিডিয়াতেও নেই। খবরে প্রকাশ প্রায় আট কোটি মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া সম্পৃক্ত। এদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি। যদি ১০ কোটি ভোটার হয় হয়তো ভোট কাস্টিংই হবে আট কোটি। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, বাম দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে এ ভোট ভাগাভাগি হলে কতকোটি ভোট লাগবে জিততে? তবু কেন কতিপয় সাংসদ সোশ্যাল মিডিয়া সম্পৃক্ত হলো না। কতজন সাংসদ সোশ্যাল মিডিয়া সম্পৃক্ত হয়েছেন আর কতজন হননি? এর কি কোন তথ্য আছে নীতিনির্ধারকদের হাতে?

দল ক্ষমতায় গেলে মৌসুমি গং সম্পর্কিত আনুগত্যবাদের ব্যাপক তোড়জোড় বেড়ে যায়। খোদ দলই হয়ে উঠে এমপিমুখী। অথচ দল তাকে এমপি বানিয়েছে, তাই এমপিকেও তো দলমুখী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হচ্ছে উল্টোটাই। দলীয় নেতারা গিয়ে ধর্না দেয় তাদের কাছে। গান গেয়ে গায়ক হয়, কবিতা লিখে কবি হয়, অভিনয় করে অভিনেতা হয়, আর্ট করে আর্টিস্ট হয়। আর্টিস্ট গায়ক হতে পারেনা আর গায়ক আর্টিস্ট হতে পারেনা।

অভিনেতা হতে পারেনা কবি ও কবিও হতে পারেনা অভিনেতা। যদি কেউ হয় তা খুবই বিরল প্রতিভা। সবক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মদক্ষতাই যোগ্যতার মানদণ্ড হয়। কিন্তু রাজনীতিতে রাজনৈতিক যোগ্যতা মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারলো না। আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে যদি মনোনয়নের যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা না করা হয় তাহলে কিন্তু জনবিচ্ছিন্নদের পাল্লাই ভারী হবে।একজন গায়ক জনসম্পৃক্ত হয় গান গেয়ে, একজন অভিনেতা অভিনয় করে ও একজন কবি কবিতা লিখে। একজন রাজনৈতিকেরও জনসম্পৃক্ততা অর্জনের মাধ্যম হবে রাজনীতি, তাই হওয়া উচিত নয় কি?

মনোনয়নে জনসম্পৃক্ত ব্যক্তির আগমন ঘটাতে হলে রাজনীতির অতীত রেকর্ড পর্যালোচনা করেই প্রার্থীতা চূড়ান্ত করতে হবে। মূল্যায়িত হতে হবে স্বাধীনতা যুদ্ধের ভূমিকা, ১৯৭৫ এর ভূমিকা, স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের ভূমিকা, চারদলীয় জোট সরকারের আমলে জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী রাজপথে লড়াই সংগ্রাম প্রভৃতি। কারণ একজন রাজনৈতিকের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডই জনসম্পৃক্ততা অর্জনের ভিত্তি। চার দলীয় জোট সরকারের আমলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগ দলীয় এমপিদের একটা সমাবেশে তৎকালীন পুলিশ লাঠিচার্জ করছিল। লাঠি চার্জ করে এমপিদের বের করে দেয়ার সময় খুবই নাস্তানাবুদ হয়েছিল তাজউদ্দিনের পুত্র সোহেল তাজ এমপিকে বের করতে গিয়ে। লাঠিচার্জ করে পুলিশ তাকে বারবার বের করে আর সোহেল তাজ আবারও সেখানে গিয়ে বসে। পুলিশ তাকে সরাতেই পারছিল না। কিন্তু বাস্তবতা কি? সেদিন যারা দৌড়ের আগে ছিল তারা আজ কোথায় আর সোহেল তাজ কোথায়? সোহেল তাজের মা জোহরা তাজউদ্দিন, ‘তাজউদ্দিন’ হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, ‘আমার ক্ষতির চেয়ে জাতির অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেল। আর তাই আজ আমি আমার রক্তে মাখা আঁচল নিয়ে আপনাদের কাছে বিচার দিয়ে গেলাম।’ এমন নিবেদিতপ্রাণ রাজনৈতিক দম্পতির পুত্রটি কেন মন্ত্রিসভায় থাকতে পারল না? কাদের জন্য থাকতে পারল না? আর যাদের জন্য থাকতে পারলনা তারা কারা ও তাদের রাজনৈতিক রেকর্ড কী?

মৌসুমি পাখি, হাইব্রিড কারা হয়? হয় দলবদলকারী ডিগবাজ, হয় ব্যবসায়ী ও আমলারা। আর যারা দুর্দিনে লেগেপড়ে থেকে সুদিনের ক্ষেত্র সৃষ্টি করে তারা সারাজীবন কামলাই থেকে যায়। আসন্ন একাদশ সংসদের মনোনয়নে এসব কামলাদের জয়জয়কার হবে কি?আত্মীয় তোষণ, গ্রুপ তোষণ, স্তুতিকথা তোষণ ও বিত্ততোষণ যেন মনোনয়নের নিয়ামক না হয় এমন প্রত্যাশাই মানুষের। যোগ্যতার মানদণ্ড যেন হয় তার রাজনৈতিক কর্মপ্রক্রিয়ার যথাযথ মূল্যায়ন। রাজনৈতিকের যোগ্যতা হোক রাজনীতি। যদি তা না হয় তাহলে জনসম্পৃক্ত প্রার্থীর মনোনয়ন কেবলই কথার কথাই রয়ে যাবে। প্রতি মনোনয়ন প্রত্যাশীর বিভিন্ন লড়াই সংগ্রামের রাজনৈতিক ভূমিকার চুলচেরা মূল্যায়ন করেই তবে যেন প্রার্থিতা চূড়ান্ত করা হয়। এবারের নির্বাচন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মত হবেনা। তখন তো বিনাভোটে ১৫৪ জন এমপি হয়ে গেল। তাদের অনেকেই তখনও ভোট হলে হেরে যেতো। আর এবার কিন্তু তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা পূর্ণ ভোটে জয়ী হয়ে আসতে হবে। অতএব সময় থাকতে সাধু সাবধান।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন