শিরোনাম :

‘নাবালক’ বিএনপি ও চান্দিনার রাজনীতি


বুধবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৪:৫৬ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

‘নাবালক’ বিএনপি ও চান্দিনার রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে নানা মুনির নানা মত থাকলেও সহনীয় মতকে প্রাধান্য দিয়ে এ সংস্কৃতিকে গ্রহণ বা বর্জনের বিষয় নতুন কিছু নয়। আবার কেউ কেউ তার নিজস্ব মতকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে রাজনৈতিক দলকে হেয় করতেও যে কুন্ঠিত হন না তা আমাদের দেশের রাজনীতির অমিয় উদাহরণ বললেও অত্যুক্তি হবে না। দলীয় স্বার্থকে উপেক্ষা করে কেউ কেউ নিজের স্বার্থ সিদ্ধিতে সদা জাগ্রত প্রহরীর কাজ করে দলের বারোটা বাজাতে ভুল করেন না। মাশুলটাও বেশ ভালো করে দিতে হয় প্রহরীর রাজনৈতিক দলকে।

বাংলাদেশের রাজনীতির বিস্তৃত পথ মসৃণ হচ্ছে কিছু দলভোগী নেতাদের জন্য, যেখানে ত্যাগীরা অনেক সময় বঞ্চনার স্বীকার হয়ে কেউ কেউ রাজনীতি থেকে নিজেদের দূরে রেখেছেন, কেউবা আবার দলে থেকেও কোন প্রকার ভূমিকা রাখতে পারছেন না। এক এগারো পরবর্তী এমন পরিস্থিতিতে দলকে যখন সুসংগঠিত করা নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব, তখন নিজ স্বার্থ ও স্বজনপ্রীতিকে দূরে ঠেলে অভিজ্ঞ, যোগ্য ও মেধাবীদের রাজনীতিতে আনার ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা আবশ্যক।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠিত দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তৃণমূল ও জাতীয়ভাবে জনপ্রিয় দুইটি রাজনৈতিক দল। এ দুই দলের গ্রহণযোগ্যতাও আকাশচুম্বী। দল দুটিই নির্বাচনমুখী হলেও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় রাজনৈতিক সহিংসতায় আক্রান্ত হয়েছে সারাদেশ। নিজেদের ভুল সুধরে সামনের দিনগুলোতে রাজনীতিতে আসার প্রত্যয়ে কাজ করার তাগাদা নিয়ে গত কাউন্সিলে ভারমুক্ত করা হয়েছে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে, ঘোষণা করা হয়েছে ৫০১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি। ৫০১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিতে নেতাদের সন্তানদের প্রাধাণ্য দেয়া হয়েছে, বিমূখ করা হয়েছে অনেক তরুণ ও মেধাবীদের। অপরদিকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ছোট পরিসরে যোগ্য, তরুণ-অভিজ্ঞদের নিয়ে দল গঠনে চমক দেখিয়েছেন।

এবার আসা যাক মূল আলোচনায়, চান্দিনার উপজেলার (নির্বাচনী আসন কুমিল্লা-৭) রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জনপ্রিয়তা প্রায় সমানই বলা চলে। নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ মাঠ চষে বেড়ালেও বিএনপি যেন প্রচারণাবিমুখ দলে পরিণত হয়েছে। আবার, চান্দিনায় বিএনপির কমিটি ঘোষণা নিয়ে দলের অভ্যন্তরে ক্ষোভ থাকলেও এ নিয়ে কেউ কিছু বলছেন না। বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও কমিটি দেয়ার তৎপরতা তেমন নেই। নির্বাচনমুখী একটি দলের এমন পরিণতিতে যারপরনাই হতাশ দলের কর্মীরা।

সম্প্রতি কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি ও চান্দিনায় ২০ দলীয় জোটের মনোনয়ন প্রত্যাশী আলহাজ্ব খোরশেদ আলমের ‘সুযোগ্য’ সন্তান আতিকুল আলম শাওনকে (২৬) উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি হিসেবে মনোনীত করায় সিনিয়র ও ত্যাগী নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। উপজেলার কয়েকজন ত্যাগী ও সিনিয়র নেতাদের সাথে কথা বলে এমনটি জানা যায়। দলকে সুসংগঠিত করার পরিবর্তে ত্যাগী ও সিনিয়র নেতাদের বাদ দিয়ে রাজনীতিতে একেবারেই নবীন এবং ‘নাবালক’ ছেলের অন্তর্ভূক্তি কি স্বজনপ্রীতি ও পরিবারতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টাকে বলীয়ান করছে?

চান্দিনার রাজনীতিতে এমনটি এর আগে হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এহেন দৃষ্টান্ত দলের অভ্যন্তরে ভাল প্রভাব ফেলবেনা। রাজনীতিতে ত্যাগী, অভিজ্ঞ ও সিনিয়রদের বাদ দিয়ে রাজনীতিতে আনাড়ি সন্তানকে দায়িত্ব দেয়াটা কতোটা সমীচীন তা বলা বাহুল্য। শুধুমাত্র নেতার সন্তান হলেই পোষ্ট বাগিয়ে নেয়া যায়, এমন চর্চা রাজনীতির জন্য অশণি সংকেত ছাড়া আর কিছুই নহে। এমন চর্চা মেধাবী তরুণদের রাজনীতি বিমুখ করলে এর দায় রাজনীতিবিদরা এড়াতে পারেন না। সিনিয়র কয়েকজন নেতা অভিযোগ করে বলেন, বিএনপির রাজনীতির সাথে দীর্ঘদিন জড়িত থেকে এমন পরিস্থিতি দেখে হতাশ। তৃণমূলের এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দল ক্ষতিতে নিমজ্জমান হবে বলে মনে করেন তারা।

বর্তমান সংসদ সদস্য অধ্যাপক আলী আশরাফ এমপি’র ছেলে মুনতাকিম আশরাফ টিটুও চান্দিনা উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বলে রাখা ভাল, বর্তমান সংসদ সদস্য অধ্যাপক আলী আশরাফ এমপি ৫ বারের সংসদ সদস্য হয়েও তার ছেলেকে রাজনীতিতে আগমন ঘটাননি। এক্ষেত্রে টিটুর রাজনীতিতে বিচরণ সময়োপযোগী ছিল বলে মনে করছে জনগণ। যথাসময়েই তিনি রাজনীতিতে এসছেন বলে অনেকে মনে করলেও বিএনপি নেতরি ছেলের এমন অপ্রত্যাশিত আগমনকে দলের জন্য ক্ষতিকর হিসেবেই দেখছেন নেতাদের অনেকে। আবার, সাবেক সাংসদ এড. রেদোয়ান আহমেদ বিগত জোট সরকারের সময়ে তার ছেলেকে রাজনীতিতে আনার সুযোগ থাকলেও তিনি তা করেন নি। তিনিও ৩ বার সংসদ সদস্য ছিলেন। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে জনগণের জন্য কাজ করার প্রত্যয়ে এবারই প্রথম আওয়ামী লীগের টিকিটে মনোনয়ন প্রত্যাশী অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত ৬৫ বছর বয়সে রাজনীতিতে আসলেও পারিবারের সদস্যদের রাজনীতিতে নিয়ে আসার দৃশ্য চোখে পড়েনি।

বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দলের পর যে দলটির কথা জণগন অকপটে ভাবতে পারে সেটি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-(বিএনপি)। দলটির ক্ষমতায় আসার যোগ্যতা ও জনসমর্থনও রয়েছে, বলা যায় জনপ্রিয় দল। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালুর পর থেকে এই দলটিই কখনো সরকারি দলে আবার কখনো বিরোধীদলে ছিল। কিন্তু বর্তমানে দলটি এমন বেহাল দশায় নিমজ্জমান, যেখান থেকে পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত দলটি।এমন পরিস্থিতিতে নিজের ‘নাবালক’ ছেলেকে চান্দিনা উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি হিসেবে মনোনয়ন রাজনৈতিক অপরিপক্কতার প্রমাণ বৈবি! রাজনীতিকে সকলের জন্য উন্মুক্ত করার কথা থাকলেও স্বজনপ্রীতি ও পরিবারতন্ত্রের বেড়াজালে আটকে যাচ্ছে সামগ্রীক রাজনীতি। স্বজনপ্রীতি ও পরিবারতন্ত্রের উর্ধ্বে উঠে নবীন-প্রবীণ-অভিজ্ঞদের নিয়ে রাজনীতির চিন্তাকে প্রাধান্য দিয়ে সকল নাগরিকের জন্য খোলা বাতায়নের ব্যবস্থা সম্মুখপানে এগিয়ে যাওয়ার সমাধান হতে পারে।
মোঃ সারোয়ার আহমাদ
সাংবাদিক
sarwar.ahmad74@gmail.com

 

 

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন