শিরোনাম :

আপনাকে ‘শিশু বুদ্ধিজীবী’ বলছি না!


বুধবার, ৩ জানুয়ারি ২০১৮, ০৫:৩৭ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

আপনাকে ‘শিশু বুদ্ধিজীবী’ বলছি না!

গোলাম মোর্তোজা:পাঠকের বিবেচনায় জীবিত লেখকদের মধ্যে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালই সবচেয়ে বেশি পঠিত। তিনি বই লেখেন মূলত শিশু-কিশোরদের জন্য। পত্রিকায় শিক্ষা-রাজনীতি-সমাজ নিয়ে লেখেন বড়দের জন্য। তার শিশু-কিশোরদের নিয়ে লেখার পাঠক বড়রাও। আবার বড়দের নিয়ে লেখা কলামের পাঠক ছোটরাও।

তিনি যা লেখেন, ছোটরা তো বটেই বড়দেরও বড় একটা অংশ তা বিশ্বাস করেন। তিনি তার শিক্ষকতা পেশা, জীবনযাপন, সহজ-সরল ভাষায় লিখে তা অর্জন করেছেন। খুব কমসংখ্যক শিক্ষক-লেখক তা অর্জন করতে পারেন। সত্য ও ন্যায়নিষ্ঠার প্রতি অবিচল, নীতি-নৈতিকতা সম্পন্ন মানুষ হিসেবে তিনি শিশু-কিশোর ও পরিণত বয়সের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন। আমার ধারণা অভিমত সৃষ্টির ক্ষেত্রে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বাংলাদেশে সবচেয়ে প্রভাবশালী লেখক-শিক্ষক।
ব্যক্তিগত জীবনে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের সঙ্গে শ্রদ্ধা-স্নেহের সম্পর্ক বহু বছর ধরে। অন্য অনেকের মতো আমিও তার লেখা পড়ি, বিশেষ করে রাজনৈতিক কলাম।

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল গত ২৯ ডিসেম্বর ‘বছরটা কেমন গেল?’ শিরোনামে একটি লেখা লিখেছেন। সেই লেখাটি পড়তে গিয়ে খুব বড়ভাবে একটা ধাক্কা খেয়েছি। সেখানে তিনি এই সমাজের কিছু মানুষকে ‘খাঁটি বুদ্ধিজীবী’ বলছেন। ভাবছিলাম, তারা বা তাদের কেউ যদি তাকে ‘শিশু বুদ্ধিজীবী’ বলেন? নিজে কি বিষয়টি নিয়ে লিখব? মানুষটি ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেই হয়তো না লিখে ভাবছিলাম, লিখব কী লিখব না। এর মধ্যে চোখে পড়লো ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল যাদের ‘খাঁটি বুদ্ধজীবী’ বলেছেন, তাদের একজন লেখক–গবেষক, অ্যাক্টিভিস্ট কল্লোল মোস্তফা বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন। বলে রাখা দরকার, কল্লোল মোস্তফা নিশ্চয়ই ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের মতো জনপ্রিয় নন, তবে তার নীতি-নৈতিকতা, সততা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। তিনি যদিও তার লেখায় ‘শিশু বুদ্ধিজীবী’ শব্দ ব্যবহার করেননি। তিনি যুক্তির ওপর নির্ভর করেছেন। আমিও আপনাকে ‘শিশু বুদ্ধিজীবী’ বলছি না। আপনার আগের ও বর্তমানের লেখার আলোকে কিছু কথা বলতে চাইছি।

১. আমাদের সমাজ থেকে শ্রদ্ধাবোধ বিষয়টি প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার পর্যায়ে চলে গেছে। কারণে-অকারণে একজন আরেকজনকে অশ্রদ্ধা-অসম্মান করেন। অসম্মান-অশ্রদ্ধা করেন রাজনৈতিক দ্বিমতের কারণে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দৃঢ়কণ্ঠ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল নিজে তা খুব ভালো করে জানেন। স্বাধীনতাবিরোধীরা প্রতিনিয়ত তাকে অশ্রদ্ধা-অসম্মান করেন।

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল নিজে কাউকে নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করতে পারেন, তা বিশ্বাস করা কষ্টকর বলেই ‘খাঁটি বুদ্ধিজীবী’ শব্দটিতে এত বড় ধাক্কা খেয়েছি। ‘খাঁটি বুদ্ধিজীবী’ বলে তিনি যাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করেছেন, দেশ ও জনগণের প্রতি দায়াবদ্ধতা, নিষ্ঠা-সততা-নৈতিকতা, অন্য যে কারও চেয়ে তাদের বেশি ছাড়া কম নয়, এমনকী ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের চেয়েও। যারা জনগণের প্রাকৃতিক সম্পদ পাচার ঠেকাতে আন্দোলন করেন, ফুলবাড়ির গরিব মানুষের সঙ্গে থাকেন, সুন্দরবন বাঁচাতে চান, ভয়ঙ্কর ঝুঁকিপূর্ণ নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের ঝুঁকি-ক্ষতি বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করেন, তাদের প্রতিনিধি প্রকৌশলী শেখ মহম্মদ শহীদুল্লাহ, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদরা। জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ও নৈতিক-আর্থিক সততার বিবেচনায় তারা বাংলাদেশের যে কারও চেয়ে পিছিয়ে থাকবেন না। সেই মানুষদের সরকারি প্রোপাগান্ডা স্টাইলে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ‘খাঁটি বুদ্ধিজীবী’ বলে কটাক্ষ করছেন।

আগেই বলেছি, মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা মানুষ বিশ্বাস করেন। তিনি কাউকে কটাক্ষ বা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করলে মানুষ, বিশেষ করে শিশু-কিশোররা তা বিশ্বাস করে ফেলবে। অথচ তিনি যাদের কটাক্ষ করছেন, তারা একেকজন সততার প্রতীক।

আমরা ‘অবক্ষয়’ নামক শব্দটি নিয়ে আলোচনা করি। একটা সমাজের অবক্ষয় কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের মতো মানুষও অন্যদের প্রতি অশ্রদ্ধা-অসম্মান ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছেন। তাদের সাহস-সততা-নৈতিকতা বিষয়ে যে তিনি জানেন না, তা নয়। জেনে-বুঝেই তিনি তা করছেন। এর চেয়ে বড় ‘অবক্ষয়’ আর কী হতে পারে!

২. এবার আসি ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও ‘খাঁটি বুদ্ধিজীবী’ কল্লোল মোস্তফার লেখা প্রসঙ্গে। ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ২৯ ডিসেম্বর ২০১৭ সালে নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিষয়ে লিখেছেন, ‘... খাঁটি বুদ্ধিজীবীরা অবশ্য নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, রাশিয়ার চেরনোবিল, জাপানের ফুফুসিমার উদাহরণ দেয়। আমার অবশ্যি সে রকম দুর্ভাবনা নেই।’

‘খাঁটি বুদ্ধিজীবী’ কল্লোল মোস্তফা জাফর ইকবালের পুরনো লেখা থেকে উদ্ধৃত করেছেন। ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল প্রথম আলোতে চেরনোবিল কিংবা থ্রিমাইল আইসল্যান্ডের দুর্ঘটনার উদাহরণ দিয়ে লিখেছেন, ‘কখনই দুর্ঘটনা ঘটবে না’– এ রকম কোনো গ্যারান্টি যে আর সব প্রযুক্তির মতো নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রেও দেওয়া যায় না, তা উল্লেখ করে লিখেছিলেন, ‘রাশিয়ার চেরনোবিল দুর্ঘটনা ঘটার পর পুরো শহরটিকেই বাতিল করে দিতে হয়েছিল। চেরনোবিল এবং থ্রি মাইল ছিল বড় দুর্ঘটনা। গণমাধ্যমে আসেনি, এরপর ছোট দুর্ঘটনা কিন্তু অসংখ্য... নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্র দুর্ঘটনা হতে পারে জেনেও মানুষ নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্র তৈরি করে। চেষ্টা করে দুর্ঘটনার আশঙ্কা কমাতে, কিন্তু কখনও দুর্ঘটনা হবে না কেউ সেই গ্যারান্টি দিতে পারে না।’

লেখাটিতে নিউক্লিয়ার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘আমাদের বাংলাদেশে নিউক্লিয়ার শক্তি কেন্দ্র বসানো হলে সেখান থেকেও তেজষ্ক্রিয়তার বর্জ্য বের হবে, সেই বর্জ্য আমরা কোথায় রাখব? মাঝেমধ্যেই খবরের কাগজে দেখি, ভয়ানক বর্জ্য দিয়ে দূষিত পুরোনো জাহাজ সারা পৃথিবী থেকে পরিত্যক্ত হয়ে বাংলাদেশে চলে আসে ভাঙার জন্য। নিউক্লিয়ার বর্জ্যের বেলায়ও সে রকম কিছু হবে না তো?’

নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্র ডিকমিশনিং এর ঝুঁকি ও খরচ নিয়ে লিখেছিলেন, ‘নিউক্লিয়ার শক্তি কেন্দ্র তৈরি করার প্রক্রিয়া যে রকম জটিল, আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ার পর সেটাকে পরিত্যাগ করা বা নতুন করে তৈরি করার প্রক্রিয়া কিন্তু একই রকম জটিল। কাজেই নিউক্লিয়ার শক্তি কেন্দ্রটির অবস্থা ৩০ বছর পর কী হবে? (ভবদহের কথা মনে আছে? প্রকল্পটি ৩০ বছরের কাছাকাছি সময়সীমার জন্য ছিল। সেই সময়টুকু পার হওয়ার পর পুরো এলাকার মানুষের জন্য কী ভয়ানক দুর্ভোগ নিয়ে এসেছিল মনে আছে?) কাজেই একটা নিউক্লিয়ার শক্তি কেন্দ্র তৈরি করা হলেই কাজ শেষ হয় না, সেটাকে সংরক্ষণ করতে হয় এবং সময় শেষ হলেই সেটাকে ঠিকভাবে পরিত্যাগ করার বিশাল একটা ঝুঁকি সামলাতে হয়।’

নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের খরচ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘নিউক্লিয়ার শক্তি কেন্দ্র তৈরি করতে কত খরচ পড়ে? আমি এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত না, তাই ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করে জানতে পেরেছি, পাঁচ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার, টাকার অঙ্কে তিন থেকে ছয় হাজার কোটি টাকা। টাকাটা কোথা থেকে আসবে, কী সমাচার সেই প্রশ্নের উত্তর দেবেন দেশের নীতিনির্ধারকেরা, দেশের অর্থনীতিবিদেরা।’

২০১৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ইলেকট্রনিক অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পিএইচডি’র শিক্ষার্থী আরিফ মইনুদ্দিন সিদ্দিকী ‘বাংলাদেশে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং সতর্কতার কিছু বিষয়’ শিরোনামে একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা লিখেছিলেন। তিনিও ড. জাফর ইকবালের ২০০৯ সালের লেখা উদ্ধৃত করেছিলেন, ‘...কাজেই আমাদের দরিদ্র দেশের যৎসামান্য সম্পদ ব্যবহার করে দেশের মানুষের একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমার ইচ্ছা, আমলারা যেমন করে একমুখী শিক্ষা বা স্কুল বেসড এসেসমেন্টের সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে থাকেন এবারে যেন সেটা না ঘটে। দুই-চারজন আমলা কিংবা ইন্টারনেটে দুই পাতা পড়ে রাতারাতি গজিয়ে ওঠা বিশেষজ্ঞরা যেন এই সিদ্ধান্ত না নেন। আমাদের দেশের অনেক বড় বড় বিশেষজ্ঞ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে, তাঁদের সম্মিলিত চিন্তাভাবনা এবং চুলচেরা বিশ্লেষণ করে যেন সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়।” অর্থাৎ সঠিক এবং যোগ্য লোকদেরই নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট-এর মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা পয়েন্ট, যখন দেশটা বাংলাদেশ!

৩. ২০০৯ সালে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ভেতরে উদ্বেগ যে কতটা ভয়ঙ্কর ছিল, তা তার লেখা থেকে পরিষ্কার।নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্র নিয়ে, সহজ-সরল ভাষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখাটি তো তিনিই লিখেছিলেন। আর ২০১৭ সালে উদ্বেগ প্রকাশকারীদের ‘খাঁটি বুদ্ধিজীবী’ বলে কটাক্ষ করছেন। এই ৭ বছরে তার সব উদ্বেগ কেটে গেছে। ২০০৯ সালে রাশিয়ার প্রযুক্তিতে নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্র নির্মাণের কথা হয়েছিল, এখন সেই প্রযুক্তিতেই নির্মিত হতে যাচ্ছে। তখন ঝুঁকি-উদ্বেগ থাকল, এখন থাকল না, তার নিশ্চয়ই কিছু কারণ আছে। সেই কারণগুলো কী?

হ্যাঁ, মুহম্মদ জাফর ইকবালের উদ্বেগ কাটাতেই পারে। পরিবর্তন হতে পারে তার অবস্থানের। প্রত্যাশা করি, ‘উদ্বেগ’ কেটে যাওয়া বা অবস্থান পরিবর্তনটা হবে যুক্তি দিয়ে। যুক্তি দিয়ে যদি নাও হয়, রাজনীতি বা অন্য কোনো কারণেও যদি হয়, তা অনেকের মানতে কষ্ট হলেও মেনে নিতে হবে। কারণ স্বাধীনভাবে যেকোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তার আছে। কিন্তু মুহম্মদ জাফর ইকবালের যারা পাঠক, যারা তাকে শ্রদ্ধা-সম্মান করেন, বিশ্বাস করেন, তাদের নিশ্চয়ই জানার অধিকার আছে, আগের উদ্বেগের বিষয়টি তিনি কেন লিখেছিলেন? তখন তিনি প্রকল্প ব্যয় ৫ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার জেনেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।টাকা কোথা থেকে আসবে, জানতে চেয়েছিলেন। এখন ব্যয়ের হিসাব প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে, অবধারিতভাবে আরও বাড়বে। এতেও তিনি উদ্বিগ্ন হচ্ছেন না। প্রায় পুরো টাকা যে ঋণ করে আনা হচ্ছে, এই তথ্যও তো এখন জানা।চড়া সুদের ঋণও কোনও ‘উদ্বেগ’ তৈরি করছে না? কারণ কী?

এখন যখন লিখছেন,’আমার অবশ্যি সে রকম দুর্ভাবনা নেই’ পূর্বে দুর্ভাবনা ছিল কেন? কাটল কিভাবে? পূর্বে না বুঝে লিখেছিলেন, এখন বুঝে লিখলেন? পূর্বের লেখা প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন? সরকার গত ৭ বছরে এতটা সক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছে যে, আপনার সব উদ্বেগ কেটে গেল? পৃথিবীর কোনও দেশ উদ্বেগ কাটাতে পারল না, বাংলাদেশ কাটিয়ে ফেলল? এ বিষয়ক দক্ষ লোকবল নেই, তৈরি করা হবে—এর বাইরে তো আর কোনও উদ্যোগের কথা জানা যায়নি। নিশ্চিত করেই বলা যায়, রূপপুর নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্র নিয়ে আপনিও ততটাই জানেন, যতটা গণমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে। সংসদে বা দেশের কোথাও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা বা পর্যালোচনা হয়নি। আমলান্ত্রিক উপায়ে মোটামুটি গোপনে, দেশে অবস্থারত বিদেশে কর্মরত দেশীয় বিশেষজ্ঞ কারও পরামর্শ নেওয়া হয়নি, জনগণকে কিছু না জানিয়েই ঋণ চুক্তিসহ সব কিছু সম্পন্ন করা হয়েছে। আপনি ২০০৯ সালের লেখায় যা আশঙ্কা করেছিলেন, সেই প্রক্রিয়াতেই আর দশটি বিষয়ের মত আমলান্ত্রিক সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এখন যেসব প্রশ্নের অবতারণা করছি, উত্তর মুহম্মদ জাফর ইকবাল কোনও দিন দেবেন কি না, আসলেই জানি না। কিন্তু তার যে শিশু-কিশোর পাঠক, তারা কী সিদ্ধান্ত নেবে? মুহম্মদ জাফর ইকবালের ২০০৯ সালের, না ২০১৭ সালের বক্তব্য ঠিক মনে করবে? কতটা বিভ্রান্তিতে পড়বে তারা? এই দায় কি মুহম্মদ জাফর ইকবালকে নিতে হবে না?

৪. মুহম্মদ জাফর ইকবাল লিখেছেন, ‘... বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, দেশের বিদ্যুতের প্রয়োজন মেটাতে পারলেই দেশটি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যাবে। নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্র থেকেই শুধু বড় মাপের বিদ্যুৎ তৈরি করা সম্ভব। পৃথিবীর সব দেশে এই প্রযুক্তি থাকবে আমাদের থাকবে না, এটি কেমন কথা!’

ক. পৃথিবীর সব দেশে এই প্রযুক্তি আছে, তথ্য হিসেবে যা সত্য নয়। সত্য হলো, পৃথিবীর অনেক দেশে আছে, সব দেশে নয়। শুধু এই প্রযুক্তি থেকেই বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা যায়, এটাও ঠিক তথ্য নয়।

খ. এখন পর্যন্ত ১ লাখ ২০ হাজার কোটি (যা আরও বাড়বে) ঋণ নিয়ে সম্পূর্ণ বিদেশি লোকবলের ওপর নির্ভর করে, পৃথিবীর আর কোন কোন দেশ নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্র তৈরি করেছে, মুহম্মদ জাফর ইকবাল যদি তা জানাতেন, দেশ ও দেশের মানুষ উপকৃত হওয়ার সুযোগ পেতো।

গ. ২০০৯ সালে রূপপুর নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্রের বাজেট ধরা হয়েছিল ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি ডলার। ২০১৭ সালে মানে সাড়ে ৭ বছরে তা বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার হয়ে গেল কেন? ৭ বছরে বাজেট বেড়ে গেল ১ হাজার কোটি ডলার। বাজেট বৃদ্ধির এই অঙ্কে মুহম্মদ জাফর ইকবাল অবাক হচ্ছেন না, তার ভেতরে কোনও প্রশ্নও তৈরি হচ্ছে না।

অথচ নিউক্লিয়ার প্রযুক্তির দাম এই ৭ বছরে পৃথিবীতে বাড়েনি। শক্তিকেন্দ্র নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনও কিছুর মূল্যই উল্লেখ করার মতো বাড়েনি। তাহলে বাজেট কেন ১ হাজার কোটি ডলার বাড়ল?

ঘ. ৩ থেকে ৪ শতাংশ সুদে এই পুরো অর্থ বাংলাদেশকে পরিশোধ করতে হবে। ৪০০ কোটি ডলারের কাজ ১৪০০ কোটি ডলারে (আরও বাড়বে) করে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, তা দিয়ে ‘বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে যাবে’? ঝুঁকির বিষয়টি যদি বাদও দেই, ঋণ শোধ করতে গিয়ে ডোবার আশঙ্কা কি একেবারেই মুহম্মদ জাফর ইকবাল দেখছেন না?

৫. মুহম্মদ জাফর ইকবাল প্রায় লেখেন ‘আমি রাজনীতি বুঝি না’। এ কথা মানুষ তিন কারণে বলে থাকতে পারে, বিনয় থেকে, আত্মঅহমিকা থেকে বা সত্যি বোঝেন না বলে।ধরে নেই তিনি বিনয় করেই বলেন। বিনয় করে এক কথা বার বার বললে তা আত্মঅহমিকার মতো শোনায়।ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ছাত্রলীগ কর্তৃক লাঞ্ছিত হয়ে ‘গলায় দড়ি দিয়ে মরার ইচ্ছে’ প্রকাশ করেন, দেয়ালে ‘মাথা ঠুকতে’ চান। ভুলে যান যে, শিশুরা তাকে অনুসরণ-অনুকরণ করে। পরীক্ষায় খারাপ করে বাবা-মা’র কাছে বকা খেলে শিশু-কিশোররাও অসম্মানিত বোধ করে।আপনাকে অনুসরণ করে শিশু-কিশোরদেরও যদি গলা দড়ি বা দেয়ালে মাথা ঠুকতে ইচ্ছে হয়? অং সান সু চিকে তার কাজের কারণে কঠিন ভাষায়ই সমালোচনা করা দরকার, তাই বলে আপনি তাকে ‘ফটোজেনিক’ নেত্রী লিখবেন? আপনার রুচি নৈতিকতার সঙ্গে তা যায়?

যাদের কারণে কোনও সরকার এদেশের জনগণের সম্পদ—কয়লা-গ্যাস বিদেশে পাচার, লুটপাট করতে পারল না, তাদের আপনি ‘খাঁটি বুদ্ধিজীবী’ বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য-কটাক্ষ করবেন? আপনি যেকোনও কারণে বা অকারণে নীতি-অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেন, নীতি-নৈতিকতা-সম্পন্ন সৎ মানুষদের দাবির সঙ্গে দ্বিমত করতে পারেন, বিরোধিতা করতে পারেন কিন্তু তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা কটাক্ষ করতে পারেন না। শিশু-কিশোর বা জনমানুষের মনে তিনিও ঘৃণা ছড়াতে পারেন না।

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন