শিরোনাম :

‘দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো’


বৃহস্পতিবার, ৪ জানুয়ারি ২০১৮, ০৯:১৭ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

প্রভাষ আমিন: প্রবাহমান নদীতে প্রবল জোয়ারে যেমন পানি আসে, পলি আসে; তেমনি আসে কচুরিপানাও। উর্বর ভূমিতে যেমন জন্মে ফসল, তেমনি জন্মে আগাছাও। বাংলাদেশ ক্রিকেটের দশাও হয়েছে তাই। জনপ্রিয়তার জোয়ারে আমরা যেমন পেয়েছি মাশরাফি, আশরাফুল, সাকিব, তামিম, মুস্তাফিজের মতো ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভা। তেমনি পেয়েছি সাব্বির, সাকিব, আল আমিন, রুবেল, শাহাদাতদের মতো উদ্ধত, উশৃঙ্খল, সমর্থক নির্যাতনকারী, নারী নির্যাতনকারী, গৃহকর্মী নির্যাতনকারী ক্রিকেটারও।

শেষটা বাদ দিলে গতবছরটা দারুণ কেটেছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের। সূচি অনুযায়ী এ বছরটাও দারুণ ব্যস্ততায় কাটার কথা। কিন্তু বছরের প্রথম দিনেই অনাকাঙ্ক্ষিত এক ধাক্কা খেলো বাংলাদেশ ক্রিকেট। সাব্বির রহমানের ক্রিকেটীয় প্রতিভা নিয়ে কারও কোনও সন্দেহ নেই। টুকটাক ঝলক দেখালেও তার প্রতিভার পুরো বিকাশ হয়নি এখনও। সাব্বিরকে ধরা হচ্ছিল, বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নির্মাতাদের একজন হিসেবে। ‘ধরা হচ্ছিল’ লিখলাম, কারণ সাব্বির যেভাবে নিজেই নিজেকে পতনের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন; তাতে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

সাব্বির রহমানের ক্রিকেটীয় সাফল্যের চেয়ে অক্রিকেটীয় কুকীর্তিও ফিরিস্তি বরং লম্বা। যৌনকর্মী নিয়ে হোটেলে রাত কাটানো নাকি সমর্থককে পেটানো– কোনটার চেয়ে কোনটা খারাপ তা নিয়ে তর্ক হতে পারে, তবে সর্বশেষ অপকর্মটার জন্য তাকে অনেক মূল্য দিতে হচ্ছে। আর্থিক অঙ্কে যা কোটি টাকা। তারচেয়ে বড় কথা হুমকির মুখে পড়ে গেছে। গুডউইল বা সুনাম সম্পর্কে আমার মনে হয় তার কোনও ধারণা বা ভাবনা নেই। হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে কারো চিত্ত ঝলমল করে ওঠে, কারো চোখ ধাধিয়ে যায়। হঠাৎ পাওয়া খ্যাতিতে মাথা বিগড়ে গেছে সাব্বিরেরও।

আপনি যতই ভালো খেলুন, আপনি যত ভালো মানুষই হোন না কেন; কখনোই আপনি সব মানুষের প্রিয় হতে পারবেন না। ভালো খেললে যারা আপনাকে মাথায় করে নাচবে, খারাপ দিনে তারাই আপনার চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করবে। এটাই বাস্তবতা। এমনকি শচীনকেও ক্যারিয়ারের শেষ দিকে দুয়ো শুনতে হয়েছে। তাই মাঠে কে, কী বললো; পত্রিকায় কে, কী লিখলো; তা নিয়ে ক্রিকেটারদের মাথা ঘামালে চলবে না। তাদের মনোযোগ দিয়ে নিজের কাজটা করতে হবে। মাঠে পারফর্ম করতে হবে। আপনি বলতে পারেন, ক্রিকেটাররাও মানুষ।

সমালোচনায় তারাও মেজাজ হারাতে পারেন। খালি ক্রিকেটারদের কাছ থেকে দায়িত্বশীলতা, পারফরম্যান্স, ভালোমানুষি আশা করবেন; আর দর্শকদের কী যা ইচ্ছা তাই বলার স্বাধীনতা আছে? না নেই। দর্শকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। খারাপ সময়ে গালি না দিয়ে প্রিয় ক্রিকেটারের পাশে থাকতে হবে। কিন্তু জাতীয় দলের ১১ ক্রিকেটারের কাছে প্রত্যাশা আর মাঠে উপস্থিত হাজারো দর্শকদের কাছে প্রত্যাশা তো এক নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ক্রিকেটাররা প্রায়ই নানা হেনস্থার শিকার হন। এটাকে আপনার খ্যাতির বিড়ম্বনা হিসেবে মেনে নিতে হবে। দর্শকরা ভালো আাচরণ করলে ভালো, না করলে তো আপনি তাকে বাধ্য করতে পারবেন না।

সাব্বির রহমান যা করেছেন, তা অবশ্য সকল সীমা ছাড়িয়ে গেছে। গত ২১ ডিসেম্বর রাজশাহীতে শহীদ কামরুজ্জামান স্টেডিয়ামে জাতীয় লীগের খেলায় সাব্বির মাঠে ঢোকার সময় ১০/১২ বছরের এক কিশোর তার উদ্দেশে ‘মিউ’ বলে। এটা অবশ্যই খুব খারাপ হয়েছে। ‘মিউ’ বলার দু’টা ব্যাখ্যা আছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের আদর করে আমরা ‘টাইগার’ বলে ডাকি। কিন্তু খারাপ খেললে রাগ করে ‘বিড়াল’ ডাকি। তাই হয়তো সাব্বিরকে দেখে মজা করে বিড়ালের ডাক দিয়েছে সেই কিশোর। আবার সাব্বিরের চোখ বিড়ালের মতো। তাই আদর করে তাকে বিড়ালের ডাক দেওয়া হতে পারে। কিন্তু সাব্বির এরপর যা করেছেন, তা দূর কল্পনার সীমাকেও ছাড়িয়ে গেছে। খেলা চলার সময় আম্পায়ারের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে সাব্বির সেই কিশোরকে ডেকে পাঠিয়েছেন এবং সাইট স্ক্রিনের আড়ালে নিয়ে মারধোর করেছেন।

তাৎক্ষণিক উত্তেজনার কারণে কিছু করে থাকলে সাব্বিরের হয়তো অত বড় সাজা হতো না। কিন্তু সাব্বির খুব পরিকল্পিতভাবে ঘটিয়েছেন পুরো অপকর্ম। কিশোরটিকে ডেকে পাঠিয়েছেন, আম্পায়ারের কাছ থেকে ছুটি নিয়েছেন, সাইট স্ক্রিনের আড়ালে গিয়ে মারধোর করেছেন। কিন্তু এখানেই শেষ নয়।
আম্পায়ার ও ম্যাচ রেফারির সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন। তাদের হুমকি দিয়েছেন রিপোর্ট না করতে। একই ম্যাচে আকসুর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মাঠে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেছেন। তার আচরণই বিসিবিকে বাধ্য করেছে তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিতে। বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে, জরিমানা করা হয়েছে ২০ লাখ টাকা। ছয় মাস খেলতে পারবেন না ঘরোয়া ক্রিকেটেও। বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বলে দিয়েছেন, এটা তার শেষ সুযোগ। এরপর না শুধরালে তাকে আজীবন নিষিদ্ধ করা হতে পারে।

শেষ সুযোগ বলা হচ্ছে, কারণ সাব্বির এর আগেও নানা অপকর্ম করেছেন। ২০১৬ সালে বিপিএলে গুরুতর অসদাচরণের দায়ে তার ১২ লাখ টাকার জরিমানা হয়েছিল। অসদাচরণটা বিসিবি কখনও ব্যাখ্যা করেনি। কিন্তু অভিযোগ আছে হোটেল রুমে অনৈতিক কার্যকলাপের। বাংলাদেশের একজন ক্রিকেটারের কাছে এটা অবিশ্বাস্য। এবার বিপিএল’এ আম্পায়ারকে গালি দিয়ে ম্যাচ ফি’র ৪০ শতাংশ জরিমানা গুনেছেন। সব মিলিয়ে গত দুই বছরের সাব্বির জরিমানাই দিয়েছেন ৩৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ‘ডিমেরিট পয়েন্ট’ পাওয়া প্রথম ক্রিকেটার সাব্বির। এরই মধ্যে তিনটি পয়েন্ট পেয়ে গেছেন। অক্টোবরের মধ্যে আরেকটি পেলে আইসিসির নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়তে হতে পারে।

বিষয়টা অনেক পুরনো এবং অনেক আলোচিত। শুধু ভালো ব্যাটিং বা বোলিং করলেই ভালো ক্রিকেটার হওয়া যায় না। খেলাধুলা হলো মানুষের জীবনকে মানবিক উৎকর্ষের নতুন স্তরে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যম। তাই একজন স্পোর্টসম্যানকে অবশ্যই অনুকরণীয় চরিত্রের মানুষ হতে হবে। বাংলাদেশে ক্রিকেট আর নিছক ব্যাট বলের খেলা নয়। ক্রিকেট আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। ক্রিকেটাররাও এখানে রক্তমাংসের সাধারণ মানুষ নন। একেকজন জাতীয় বীর। কিন্তু তারা যে বীর সেটা বোধহয় তারা ভুলে যান। আচরণ করেন সাধারণ মানুষের মতো। তাদেরকে বুঝতে হবে, তারা সাধারণ মানুষ নন। কোটি কোটি মানুষ তাদের ভালোবাসে, লাখ লাখ শিশু-কিশোর-তরুণ তাদের অনুসরণ করে। তাই তাদের প্রত্যেকটা পা ফেলতে হবে চিন্তা করে। কিন্তু সাকিবের মতো তারকা গ্যালারিতে গিয়ে মারামারি করে, ক্যামেরায় অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে; গৃহকর্মীকে মারার দায়ে শাহাদাত দম্পতি জেল খাটে, ম্যাচ পাতানোর দায়ে আশরাফুল নিষিদ্ধ হয়, হোটেল রুমে নারী নিয়ে যাওয়ায় জরিমানা গুণতে হয় সাব্বির, আল আমিনকে। তাহলে আমাদের সন্তানেরা কাদের আইডল মানবে। আগে মানে রকিবুল, লিপু, আকরাম, বুলবুল, নান্নু, সুমনদের সময় তো এসব হতো না। এখন কেন হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুব সোজা। আগে ক্রিকেটাররা যতটা ভালোবেসে খেলতেন, এখন ক্রিকেটাররা ততটা বাসেন না। এখন ক্রিকেটে অনেক বেশি বাণিজ্য, অনেক বেশি চাকচিক্য, অনেক বেশি গ্ল্যামার। আলো ঝলমলে গ্ল্যামারের জগত তাদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। হঠাৎ পাওয়া জনপ্রিয়তায় তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করে।

তাই কোনও ক্রিকেটারকে জাতীয় দলে ডাকার আগে তার পারফরম্যান্স যেমন বিবেচনায় নিতে হবে, নিতে হবে তার আচার-আচরণও। ক্রিকেটারদের শুধু ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং শেখালেই হবে না; নীতি-নৈতিকতাও শেখাতে হবে। কারণ শিশুরা তো সাকিব-সাব্বিরদের দেখেই শিখবে। কিন্তু সাকিব-সাব্বিররা যা করছেন, তাতে কি ভবিষ্যতে শিশুরা ক্রিকেটার হতে চাইবে? সাব্বিরের শাস্তি হওয়ার খবর শুনে আমার এক সহকর্মী বললেন, দুঃখ হয়, আমাদের ক্রিকেটাররা মাশরাফি দেখে শেখে না, শেখে সাকিবকে দেখে। মাশরাফি মাঠে ঢুকে পড়া দর্শককে বুকে আগলে রক্ষা করেন আর সাকিব-সাব্বিররা তাদের ধরে ধরে পেটান।

অনেকে বলেন, একজন খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স আর ব্যক্তি জীবনকে আলাদা করে দেখতে। কিন্তু এটার কোনও সুযোগ নেই। একজন খেলোয়াড়কে অবশ্যই আদর্শ-অনুকরণীয় চরিত্রের অধিকারী হতে হবে। বিসিবিকে ধন্যবাদ। তারা সাব্বির রহমানের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এর আগে সাকিব আল হাসানকেও তারা ছাড় দেয়নি। এই কঠোর অবস্থান থেকে যেন অন্যরা শিক্ষা নেয়। দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন