শিরোনাম :

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কোনো টুরিস্ট স্পট নয়


বৃহস্পতিবার, ৪ জানুয়ারি ২০১৮, ১২:৩১ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কোনো টুরিস্ট স্পট নয়

শেখ আদনান ফাহাদ: সুন্দর শহর দেখতে উন্নত বিশ্বের কোনো দেশে যেতে চায়, কিন্তু টাকা নাই, এমন কারো সাথে কথা হলে আমি বলি, দেশের ক্যান্টনমেন্টগুলোই তো উন্নত শহরের মত। বিদেশ যেতে না পারলে ক্যান্টনমেন্টগুলোতে ঘুরে আস। কিন্তু সবাই তো আর ক্যান্টনমেন্ট এরিয়ায় ঢুকতে পারে না। বিনা কারণে তো নয়ই, সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়েও অনেক সময় এসব নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রবেশ করা যায় না। ফলে ‘পাবলিক’ সেসব স্থানেই বউ, বাচ্চা, বন্ধু, বান্ধব নিয়ে ভিড় করে যেখানে কোনো বাধা নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এমন উন্মুক্ত একটি জায়গা। সকাল থেকে রাত অবধি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বাইরের মানুষের ভিড় থাকে। ঢাকা শহরের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে হওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর দিয়ে ক্রমাগত যাত্রীবাহী বাস, ট্রাকসহ অসংখ্য যান চলাচল করে। ছাত্র-ছাত্রীদের খারাপ লাগে। প্রতিবাদ হয়, কিন্তু কাজ হয় না। ঢাকার পাশে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকার এত কাছে, এত সবুজ, পাহাড়ি আবহ নিয়ে আর কোনো প্রতিষ্ঠান জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। যে কেউ বাসে উঠে, ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে, কেউ ঢাকা থেকে সাইকেল চালিয়ে বা স্কেটিং করে জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে চলে যায়। ফেসবুক আসার পর থেকে প্রতিদিন শত শত ছবি অনলাইনে চলে আসছে। অনলাইনে সুন্দর সুন্দর ছবি দেখে আরও মানুষ আগ্রহী হচ্ছে। শীতকাল আসলে শীতের পাখি দেখতে যাওয়া দিন দিন যেন শহুরে সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে।

শীতের পাখি দেখতে জাহাঙ্গীরনগরে আসা মানুষগুলোর অধিকাংশই পাখি বা প্রকৃতিপ্রেমী নয়, এরা মূলত বিনোদন-প্রেমী। পাখি দেখার নামে এরা বিনোদন খুঁজে, মজা লুটতে চায়। মনে হয় যেন দার্জিলিং বা বান্দরবান ঘুরতে আসছে। হৈ-চৈ করে, গাড়ি নিয়ে একেবারে লেকগুলোর কাছে চলে যায়। যে দৃশ্য জীবনে জাহাঙ্গীরনগরে কেউ দেখেনি, সে দৃশ্য এখন নিয়মিত। যানজট হয় জাহাঙ্গীরনগরের ভেতরে। নিজের মত করে জাহাঙ্গীরনগরের বাসিন্দারা হাঁটাহাঁটি করতে পারে না, সাইকেল চালাতে পারে। গাড়ির হর্ন, মানুষের হৈচৈ সব মিলে হাজার হাজার মাইল দূর থেকে সাময়িক আশ্রয় নিতে আসা নানা প্রজাতির পাখিদের জন্য এক বিরক্তিকর এবং ভীতিপ্রদ পরিবেশ তৈরি হয়। এবার যা ঘটল, তা খুব দুঃখজনক। পরিবহন চত্বর লাগোয়া লেকে এবার পাখি আসলেও দেখা গেল, পাখিগুলো চলে যাচ্ছে। প্রতিদিন পাখি কমতে কমতে একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। গত কয়েকদিনের আপডেট জানি না, তবে আমি ডিসেম্বর মাসে এই পরিবর্তন নিজে প্রত্যক্ষ করেছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গীতিআরা নাসরিন এবং সিনিয়র সাংবাদিক মামুন নেসার জানিয়েছেন, অতিথি পাখিরা একবার কোনো জায়গা থেকে চলে গেলে আর ফিরে আসে না!  সাংবাদিক মামুন এক্ষেত্রে বরিশালের দুর্গাসাগর দিঘির উদাহরণ দিয়েছেন। ভাগ্য ভালো, জাহাঙ্গীরনগরে অনেকগুলো লেক আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোট-বড় ১৪-১৫টি লেক আছে। তবে পরিবহন চত্বর সংলগ্ন লেক, জাহানারা ইমাম ও প্রীতিলতা হলসংলগ্ন লেক, জিমনেসিয়াম-সংলগ্ন লেক ও ডব্লিউআরসি (ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টার)-সংলগ্ন লেকে অতিথি পাখির পদচারণ তুলনামূলক বেশি। প্রাণীবিদ্যা বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, বাংলাদেশে মোট ৬৯০ প্রজাতির পাখির মধ্যে প্রায় ২৩৮ প্রজাতির অতিথি পাখি আছে। ১৯৮৬ সাল থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি পাখির পদচারণ। শুধুমাত্র অতিথি পাখি নয়, কয়েক শ প্রজাতির স্থানীয় পাখি আছে জাহাঙ্গীরনগরে। আমি নিশ্চিত নই, তবে ভারতের আগরতলার প্রখ্যাত আলোকচিত্র শিল্পী বিশ্বজিৎ সাহা ক্যাম্পাসে এসে জানিয়েছিলেন, জাহাঙ্গীরনগর নাকি পাখির জন্য বাংলাদেশে দ্বিতীয় বৃহত্তম অভয়ারণ্য; এক নম্বরে মৌলভীবাজার এর লাওয়াছড়া। বিশ্বজিৎ সাহা ব্যাচেলর্স কোয়ার্টারে দিন কয়েক অবস্থান করে ক্যাম্পাস ঘুরে এমন সব ছবি তুলেছিলেন যা দেখে জাহাঙ্গীরনগরেরই অনেক মানুষ চমকে উঠবেন।

এই সুন্দর, জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ জায়গাটিকে আমাদেরই মত কিছু মানুষ দিন দিন হুমকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। কিন্তু পাখির জন্য মানুষের আনাগোনা তো আর বন্ধ করা যাবে না। তাহলে এমন কিছু করতে হবে, যাতে পাখিও বিরক্ত না হয়, বাইরের মানুষের আসাও বন্ধ না হয়। ক্যাম্পাসবাসীদের মূল আপত্তি বাইরের মানুষের প্রাইভেট কার, মোটর সাইকেলের বেপরোয়া চলাফেরা, ক্যাম্পাস ময়লা করা নিয়ে। গাড়ির হর্ন, দ্রুতগতিতে চলাফেরা ইত্যাদি কারণে পাখিদের জন্য যেমন বিপদ সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি ক্যাম্পাসবাসীদের স্বাভাবিক চলাফেরাও বিঘ্নিত হচ্ছে। তাহলে সমস্যা সমাধান কল্পে কী করা যায়?

বাইরে থেকে আসা গাড়িগুলোকে এক/একাধিক নির্দিষ্ট স্থানে পার্ক করতে বাধ্য করা গেলে এ সমস্যার সমাধান করা যায়। ডেইরি ফার্ম গেইটের উল্টো দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল গেইট দিয়ে যেসব বহিরাগত গাড়ি আসবে, সেগুলোকে নির্দিষ্ট অংকের টাকার বিনিময়ে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ এবং টারজান পয়েন্ট সংলগ্ন স্থানে পার্ক করানোর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রান্তিক বা অন্য গেইট দিয়ে যেসব বাইরের গাড়ি ঢুকবে সেগুলোকেও নির্দিষ্ট জায়গায়, লেক থেকে দূরে কোথাও পার্ক করার ব্যবস্থা করতে হবে। এটা করতেই হবে। না হলে জাহাঙ্গীরনগর তাঁর সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি এমন সিদ্ধান্ত নেয়, তখন বাস্তবায়ন করা হবে মূল চ্যালেঞ্জ। সুনির্দিষ্টভাবে এই কাজটি করার জন্য নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিয়োগ নিয়ে একটি ছোট বাহিনী তৈরি করা যায়। পুলিশের যেমন ট্রাফিক বিভাগ আছে। সরকারি কাজ ছাড়া যত বড় মানুষই ক্যাম্পাসে আসুক না কেন, তাঁকে গাড়ি সেসব স্থানে রেখে আসতে হবে। ভিআইপি হলে, কর্তৃপক্ষই তাঁদের জন্য রিকশা বা বিশেষ কোনো যানের ব্যবস্থা করবে।

এমন একটা সিদ্ধান্ত নেয়া এবং বাস্তবায়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ পর্যায়ের সকলের সদিচ্ছা লাগবে। জানি না, আমাদের লেখালেখিতে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না? তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য রক্ষা করতে হলে কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই নতুন করে আগের যে কোনো সময়ের চাইতে বেশি আন্তরিক এবং সিরিয়াস হওয়া লাগবে। ছাত্র-ছাত্রীদের ভেতরে এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। ক্ষোভ প্রশমন করতে হবে, পাখিদের ফিরিয়ে আনতে হবে।

লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন