শিরোনাম :

ধূমপানের বিরুদ্ধে সবার সচেতনতা জরুরি


সোমবার, ১৫ জানুয়ারি ২০১৮, ০৩:৪৬ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

ধূমপানের বিরুদ্ধে সবার সচেতনতা জরুরি

অমিত বণিক: আমাদের দেশে সচেতনতার অভাবে জীবননাশী নানা উপাদান প্রতিনিয়ত জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের ফলে বাংলাদেশেও অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রুত। ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক এগুলো সংক্রামক রোগ নয়। এই সব রোগের জন্য যেসব আচরণ ঝুঁকিপূর্ণ বলে গণ্য সেগুলোর মধ্যে অন্যতম তামাক ও সিগারেটের মতো ক্ষতিকর দ্রব্য। তামাক এবং তামাকজাত দ্রব্য মারাত্মক স্বাস্থ্যহানি ঘটিয়ে মৃত্যু পযর্ন্ত ডেকে আনে। বিশ্বের প্রতিটি দেশ জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিষয়টিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া সত্ত্বেও অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব রোগে মৃত্যু ঘটে বা মানুষ পঙ্গু হয়ে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর শতকরা ২৭.৩ ভাগ ঘটে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসতন্ত্রের অসুখ ও ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগে। তামাকের কারণে প্রতি ৬ সেকেন্ডে একজন লোক মারা যায়। বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৬০ লক্ষ লোক এতে মারা যায়, তার মধ্যে আবার ৬ লক্ষেরও বেশি অধূমপায়ী অর্থাৎ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। বিষয়টি নিয়ে কেউ কি ভেবেছেন? বিশ্বব্যাপী ক্যান্সারের প্রায় ৫০ ভাগের জন্য দায়ী হচ্ছে ধূমপান ও তামাক সেবন। এছাড়া শতকরা ৯৫ ভাগ ফুসফুস ক্যান্সারের জন্য দায়ী ধূমপান। আশু পদক্ষেপ না নিলে অচিরেই বিশ্বব্যাপী ধূমপান ও তামাকজনিত মৃত্যুর হার এইচআইভি ও এইডস, যক্ষা, যানবাহনের দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা ও হত্যাকান্ডসহ সকল মৃত্যুর হারকে ছাড়িয়ে যাবে। তামাক এবং বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়ায় নিকোটিনের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে। এই নিকোটিন তীব্র আসক্তি সৃষ্টি করে। আসক্তি সৃষ্টির দিক থেকে এটি হেরোইন, কোকেন, মারিজুয়ানা, এ্যালকোহলের চাইতেও বেশি শক্তিশালী। নিকোটিন দেহের রক্ত সংবহনতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। ফলে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার, হাঁপানী, পায়ের পচন রোগসহ নানা ধরনের কঠিন রোগ হয়ে থাকে।

দু’টি সাধারণ সিগারেটের মধ্যে যে নিকোটিন থাকে তা যদি ইনজেকশনের মাধ্যমে কারো দেহে প্রবেশ করানো হয় তাহলে মৃত্যুর আশংকা থাকে। বিড়ি-সিগারেটের মাধ্যমে নিকোটিন খুবই ধীর গতিতে মানব শরীরে প্রবেশ করে বলে এর ক্ষতিকর প্রভাবও হয় ধীরে। নিকোটিন ছাড়া তামাকে উপস্থিত অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদানের মধ্যে রয়েছে কার্বন-মনোঅক্সাইড। গাড়ি থেকে নির্গত ধোঁয়ায় এই গ্যাসটি পাওয়া যায়। কার্বন-মনোঅক্সাইড আমাদের দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তিকে অবদমিত করে এবং মেধার পরিধি কমিয়ে দেয়। তামাকে রয়েছে হাইড্রোজেন সায়ানাইড, যা মৃত্যুদন্ড প্রদানের জন্য বিষাক্ত গ্যাস হিসেবে গ্যাস চেম্বারে ব্যবহার করা হয়। বেনজোপাইরিন প্রাণী দেহে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী এক ধরনের রাসায়নিক যা আলকাতরায় পাওয়া যায়। অ্যামোনিয়া নামের ঝাঁঝালো গন্ধযুক্ত রাসায়নিকটি অপরিচ্ছন্ন প্রস্রাবখানায় পাওয়া যায়। এ ছাড়া সিগারেটে পাওয়া পোলোনিয়াম ক্যান্সার উৎপাদনকারী একটি তেজস্ক্রিয় পদার্থ।

তামাক সেবনের ফলে মহিলাদের জরায়ুর ক্যান্সার, গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে কম ওজনের কিংবা মৃত শিশু জন্ম দেওয়াসহ অনেক সময় নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই শিশু ভূমিষ্ট হতে পারে। পরোক্ষ ধূমপানের ফলেও মহিলাদের এ ধরনের স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। যারা ধূমপান করে না তাদের আশপাশে কেউ ধূমপান করলে তার ধোঁয়া নিশ্বাসের মাধ্যমে অধূমপায়ীর দেহে প্রবেশ করে একে পরোক্ষ ধূমপান বলে। শিশুরা ধূমপায়ী ব্যক্তির আশপাশে থাকলে তাদের মধ্যে নিউমোনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে, তা ছাড়া কানের প্রদাহ হতে পারে এবং ভবিষ্যতে শ্বাসকষ্টও দেখা দিতে পারে। তামাক সর্বগ্রাসী একটি পণ্য। জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং অর্থনীতির ওপর তামাকের চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সেবন সব ক্ষেত্রেই মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে।

তাই উন্নত দেশগুলো সিগারেটের প্যাকেটের ওপর সর্তক বাণীসহ তামাকের ওপর উচ্চ হারে কর আরোপ এবং কঠোর আইন প্রয়োগ করায় তামাকের চাষ কমেছে। সেই সাথে খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার স্বার্থেও উন্নত দেশগুলো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। ফলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তামাক কোম্পানিগুলোর আগ্রাসন বেড়ে গেছে। বিড়ি কারখানাগুলো নারী ও শিশু শ্রমিকদের অনেক কম মজুরিতে কাজ করিয়ে নিচ্ছে। এতে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে। তামাক চাষের ফলে কৃষি জমি দখল হচ্ছে। হুমকির মুখে পড়ছে খাদ্য নিরাপত্তা। এসব দিক বিবেচনা করে তামাকের ব্যবহার ও তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। সারাদেশে যে পরিমাণ জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে তার পরিবর্তে কৃষিজাত খাদ্য উৎপাদন হলে দেশে খাদ্য ঘাটতি কমে যাবে। জমিতে তামাক চাষ পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনছে। তামাক গাছ মাটি থেকে অধিক পরিমাণে পানি শোষণ করে, এতে জমির উর্বরতা শক্তি কমে যায়। এজন্য তামাক উৎপাদিত জমিতে অন্য কোনো শস্য উৎপাদিত হয় না। প্রতি কেজি তামাক শুকানোর জন্য ২ কেজি কাঠ পোড়াতে হয়। এতে ধ্বংস হচ্ছে আমাদের বনজ সম্পদ, ফলে ভারসাম্য হারাচ্ছে পরিবেশ।

দেশে তামাকের ভয়াবহতা দুর করতে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন। বাংলাদেশে বলবৎ তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন অনুসারে পাবলিক প্লেস এবং পরিবহণে ধূমপান নিষিদ্ধ। আইন অমান্যে অনধিক তিনশ টাকা অর্থদন্ডের বিধান রয়েছে। এ আইনে আঠারো বছরের কম বয়সি কারো কাছে তামাকজাত দ্রব্য বিপণন বা বিক্রয় নিষিদ্ধ, আইন অমান্যে অনধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদন্ড হতে পারে। ২০১৩ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনী এনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল গঠন করা হয়। তবে আইনটির যথাযথ বাস্তবায়নে প্রয়োজন অধিক জনসচেতনতা। ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আর্থিক অপচয়ও বটে। কিশোর বয়সেই ছেলেরা যেভাবে ধূমপানে আসক্ত হচ্ছে, তাতে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা শংকিত।

পরোক্ষ ধূমপানের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীরা। গর্ভের সন্তানও এই নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়ে। পরম নির্ভরতায় শিশুটি বাবার পাশে বসে খেলছে। মিশুটি জানে না তার ধূমপায়ী বাবাই তার সবচেয়ে ক্ষতির কারণ হচ্ছে না বুঝেই। শিশুরা এতে হার্ট অ্যাটাক, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, সিগারেটের ধোঁয়ায় শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ ব্যাপক ভাবে ব্যাহত হয়। ধূমপানকে বলা হয় মাদক গ্রহণের প্রথম ধাপ। বিড়ি-সিগারেটের মাধ্যমেই বেশির ভাগ মানুষ মাদক গ্রহণ করে থাকে। এ ছাড়া আমাদের দেশে ধূমপান থেকে আগুন লাগার ঘটনার উদাহরণেরও কমতি নেই।

ধূমপান রোধে দরকার সচেতনতা। কিন্তু সচেতনতা সৃষ্টি করতে ধূমপানবিরোধী প্রচারণাও তেমন নেই। সরকার গত ১৯ মার্চ থেকে দেশের সব তামাকজাত দ্রব্যের গায়ে ৫০ শতাংশ জুড়ে রঙিন ছবি ও লেখাসংবলিত সতর্কবাণী বাধ্যতামূলক করেছে। তবে বেসরকারি সংস্থা ‘প্রজ্ঞা’র সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের তামাকজাত পণ্যের ৭৫ শতাংশে ছবিসহ স্বাস্থ্য সতর্কবাণী নেই। এটা একেবারেই উচিত হচ্ছে না। সরকারের উচিত এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।

যারা ধূমপায়ী ও মাদকাসক্ত তারা কেবল নিজেদেরই ক্ষতি করছে না, বরং সমাজেরও ভবিষ্যৎ বিনষ্ট করছে। ধূমপানের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী জোরালো অভিযান পরিচালনা না করলে তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের কবল থেকে রক্ষা করা যাবে না। নেশাগ্রস্ত ধূমপায়ীরা কাউকে তোয়াক্কা করছে না। নৈতিক মূল্যবোধ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। অবিলম্বে ধূমপানবিরোধী আইন বলবৎ করা একান্ত প্রয়োজন; প্রয়োজনে আইন আরো কঠোর করা চাই।

প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে ধূমপান ও মদ্যপান মহামারী আকার ধারণ করছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে। প্রতিনিয়ত দেখা যাচ্ছে, স্কুল-কলেজের অনেক শিক্ষকও ধূমপানে আসক্ত। ধূমপানের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সময়ের দাবি। নইলে প্রজন্মের বিপর্যয় অনিবার্য। এজন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের ব্যাপক প্রচারণার সাথে সাথে পর্যায়ক্রমে তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করা এবং তামাক চাষীদের অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত করার ব্যাপারে ব্যাপক উদ্যোগ প্রয়োজন।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন