শিরোনাম :

সৌদি আরব কোন পথে


বুধবার, ১৭ জানুয়ারি ২০১৮, ০৩:০৩ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

সৌদি আরব কোন পথে

সাঈদ ইফতেখার আহমেদ: সময়টা ১৯৮৫ সাল। সারা বিশ্বে তখন সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের রমারমা অবস্থা। একের পর এক রাষ্ট্রে ‘সোভিয়েতপন্থী’ বাম রাজনৈতিক দলসমূহ ক্ষমতাসীন হচ্ছে। সারা পৃথিবীতে আক্ষরিক অর্থেই তখন কমিউনিজমের আতঙ্ক।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুরা পশ্চিমা দুনিয়া উদ্বিগ্ন এ ভেবে যে পৃথিবীর সব জায়গাতেই বোধহয় কার্ল মার্কসের ভবিষ্যৎ বাণী অনুযায়ী কমিউনিজম কায়েম হতে যাচ্ছে।

কমিউনিস্ট আন্দোলন যখন বিশ্বে তুঙ্গে, তখন সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান হয়ে আসলেন মিখাইল গর্বাচেভ। ক্ষমতায় এসে বিশ্ববাসীকে তিনি দুটো রুশ শব্দ শিখালেন; এর একটি হল গ্লাসনস্ত আর আরেকটি হল পেরেস্ত্রয়কা। প্রথমটির দুর্বল বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘খোলামেলা পরিবেশ’ আর পরেরটির মানে হল ‘অর্থনৈতিক পুনর্গঠন’। গর্বাচেভ বোঝালেন সোভিয়েত জীর্ণ অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে হলে খোলামেলা আবহাওয়া দরকার, যেখানে মানুষ প্রাণ খুলে মনের কথা বলতে পারবে।

গর্বাচেভ যেই খোলা হাওয়ার কথা বলতে লাগলেন, ‘মস্কোপন্থী’ হিসাবে পরিচিত সিপিবিও-যারা এক সময় সোভিয়েত একনায়ক যোসেফ স্তালিনকে আইকন মনে করত- তার কর্মীদের বুঝাতে লাগল গ্লাসনস্ত, পেরেস্ত্রয়কার পথ ধরে সমাজতন্ত্র আরো অগ্রসর হয়ে সাম্যবাদী সমাজে রূপান্তরিত হবে। মস্কোতে বৃষ্টি হলে ঢাকায় ছাতা ধরবার মত করে এ দলটি বাংলাদেশে গর্বাচেভ নীতির যৌক্তিকতা বুঝাতে উঠে পড়ে লেগে গেল।

দলটির মুখপাত্র সাপ্তাহিক একতার তৎকালীন সম্পাদক মতিউর রহমান, যিনি বর্তমানে প্রথম আলোর সম্পাদক, সোভিয়েত ইউনিয়ন ঘুরে এসে লিখলেন ‘খোলা হাওয়া, খোলা মন’ শিরোনামে একটি বই। বইটির মূল বক্তব্য ছিল গর্বাচেভের পথ ধরেই সারা দুনিয়াতে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এগিয়ে নিতে হবে। একতায় তখন প্রায় প্রতি সপ্তাহেই গর্বাচেভকে সমর্থন করে কলাম লেখা হত। ‘মস্কোপন্থী’ হিসাবে পরিচিত আরেক রাজনৈতিক দল ন্যাপও (মোজাফফর) তখন বিনা প্রশ্নে গর্বাচেভের চিন্তাধারাকে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের একমাত্র পথ বলে মনে করত।

চরমতম মনস্তাত্ত্বিক দাসত্বের ফলে এ দুটি দলের পক্ষে সেসময়য় সোভিয়েত প্রধানের চিন্তাধারার বাইরে অন্য কোনও রকম চিন্তা করবার ক্ষমতা ছিল না। ফলে, তাদের কারো পক্ষে বুঝে উঠা সম্ভব হয় নাই যে, গর্বাচেভের পথ ধরে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ এর বলয়ভুক্ত এবং এর বলয়ের বাইরের দেশগুলোতে একযোগে অচিরে পুরো সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাই ধসে পড়বে।

মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতার ফলে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার যখন পতন ঘটল, তখন বাংলাদেশের ‘মস্কোপন্থী’ দলগুলি নিজেদের ‘এতিম’ ভাবতে শুরু করল। পিতামাতা দুজনকেই হারাবার পরে কোনো কোনো পরিবারে যেমন সম্পত্তির দখল নিয়ে মারামারি শুরু হয়,তেমনি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দলটির নেতারা আক্ষরিক অর্থেই পার্টির সম্পত্তির দখল নিয়ে কোন্দলে লিপ্ত হলেন।

তবে, সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক কাজটি করলেন তৎকালীন দলটির সভাপতি সাইফুদ্দিন মানিক এবং সাধারণ সম্পাদক, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তাঁরা দুজনে মিলে এ দলটিকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে চিরতরে বিলুপ্ত করে দিতে চাইলেন। বিপুল সংখ্যক কর্মী নিয়ে বেরিয়ে যেয়ে তাঁরা প্রথমে কিছুদিনের জন্য গঠন করলেন রূপান্তরিত কমিউনিস্ট পার্টি। তারপরে দলেবলে মানিক যোগ দিলেন গণফোরামে এবং নাহিদ আওয়ামী লীগে। এটা অনস্বীকার্য যে সেসময়য় দলের বর্তমান সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমসহ দলের মধ্যম সারির নেতারা শক্ত অবস্থান নিতে না পারলে, সিপিবি নামক দলটির কোন অস্তিত্বই আজ বাংলাদেশে থাকত না।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গার প্রভাব শুধু ‘মস্কোপন্থী’ দলেই লাগল না। ‘চীনপন্থী’ এমনকি ‘ভারতপন্থী’ বাম দলের (ভারতের শিব দাস ঘোষের অনুসারী, বাসদ) উপরেও পড়ল। এর ফল হল গত শতাব্দীর আশির দশকে সিপিবির শুধু ঢাকা মহানগর কমিটির ডাকা জনসভায় যে পরিমাণ লোক হত আজকে সব বাম দলগুলো মিলে সারা বাংলাদেশ থেকে কর্মী এনেও সে পরিমাণ জমায়েত করতে পারে না। এক সময়কার রমারমা বাম আন্দোলন আজ শুধুই বিলীয়মান অতীতের স্মৃতি।

সৌদি আরবের সাম্প্রতিক পরিবর্তন নিয়ে লেখায় বাম দলগুলো নিয়ে এ দীর্ঘ গৌরচন্দ্রিকার কারণ শুধু এ কথা বলার জন্য যে বিদেশি রাষ্ট্রের উপর মনোজাগতিক দাসত্ব, সে রাষ্ট্রটিতে সে আদর্শের অবলুপ্তি ঘটলে কীভাবে অন্য একটি দেশে সে আদর্শের অনুসারী দল এবং আন্দোলনকে নিশ্চিহ্ন করে দেয় সেটা বোঝাবার জন্য।

বাংলাদেশের বাম দলগুলির ‘কেবলা’ যেমন ছিল মস্কো এবং পিকিং; তেমনি বাংলাদেশের ইসলামপন্থী দলগুলোর ‘কেবলা’ হল রিয়াদ এবং তেহরান। মস্কো এবং পিকিংয়ের অনুসারী বাম রাজনৈতিক দলগুলি রাশিয়া এবং গণচীন সেসময় যা বলত বা করত তার সবকিছুকেই চোখ বুঝে সমর্থন করত। মনোজাগতিক দাসত্বের কারণে রাশিয়া এবং চীনের ভাল এবং মন্দ কাজের মাঝে প্রভেদ করবার ক্ষমতা তারা হারিয়ে ফেলেছিল।

বামপন্থী দলগুলোর মত জামাতসহ বাংলাদেশের ইসলামপন্থী দলগুলোরও মনোজাগতিক দাসত্ব থেকে বিশেষত রিয়াদের প্রতি এতোটাই অন্ধ যে, যেখানে সুন্নী বা শিয়া কোনো মত অনুসারেই রাজতন্ত্র সমর্থিত নয়, সেই সৌদি রাজতন্ত্রকে তারা বিনা প্রশ্নে সমর্থন দিয়ে আসছে।

পাশাপাশি, রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ ইবন সৌদের নামে পুরো আরবভূমির নামকরণ করা- যেখানে মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র দুটি মসজিদ অবস্থিত— কতটা যৌক্তিক এবং ধর্মসম্মত এ প্রশ্নও কোন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল তুলতে পারেনি।

এ ধর্মভিত্তিক দলগুলোর অন্ধত্ব রিয়াদের প্রটি এতোটাই প্রবল যে, সৌদি নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন জোটের হামলায় এ পর্যন্ত দশ সহস্রাধিক (মুসলিম) নারী, পুরুষ, শিশু ইয়েমেনে নিহত হলেও তার বিরুদ্ধে কোন মিছিল করা ত দুরে থাক, বিবৃতি দিয়ে জামাতসহ কোন ইসলামপন্থী দলকেই এর প্রতিবাদ করতে দেখা যায় নাই; যেমন দেখা যেত না সোভিয়েত বাহিনীর হামলায় নিরীহ আফগান নারী, পুরুষ, শিশু নিহত হলে সিপিবিকেও। বরং অনেক ক্ষেত্রেই সেসময় সিপিবির নেতাকর্মীরা এসবকে পাশ্চাত্যের প্রোপাগান্ডা বলে উড়িয়ে দিত।

বর্তমানে একাধিকবার ইয়েমেনে সৌদি বোমা পড়ছে এমনকি জানাযার নামাজ এবং বিয়ের আসরেও। দেখা দিয়েছে ভয়াবহ কলেরা মহামারী । এর পাশাপাশি অনেকটা দুর্ভিক্ষ অবস্থা বিরাজ করছে। সত্তর লক্ষ মানুষ সেখানে রয়েছে ভয়াবহ খাদ্য সঙ্কটে। সবচেয়ে যেটা ভয়াবহ দিক তাহল সারা দেশের পানির তীব্র সঙ্কট । কিন্তু জামাতসহ ইসলাম ধর্ম নির্ভর রাজনৈতিক দলগুলো যারা কোন অমুসলিমের ফেসবুক স্ট্যাটাসে ইসলাম ধর্ম শেষ হয়ে যাবে বলে চিন্তিত, সেই তারাই ইয়েমেনে হাজার হাজার মুসলমান নারী, পুরুষ, শিশুর মৃত্যুতে থাকছে নীরব।

‘ইসলামপন্থার’ রাজনীতির মূল সংকটটা হল এখানেই। কোন অমুসলমানের ফেসবুক স্ট্যাটাসের সূত্র ধরে তারা হাজার হাজার কর্মী রাস্তায় নামতে পারেন, কিন্তু পাকিস্তান বা মধ্যপ্রাচ্যের কোন দেশ কর্তৃক বা ইসলাম ধর্মভিত্তিক কোন সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী কর্তৃক হাজার হাজার এমনকি লাখ লাখ মুসলমান নিহত হলেও তারা নিশ্চুপ থাকাটাই শ্রেয় মনে করেন।

এর সর্বশেষ উদাহারণ হল দায়েশ বা ইসলামিক স্টেট এবং হায়াত তাহরিয়ার আল শামের (সিরিয়ান আল কায়েদা) সাথে সিরিয়ার সরকারের গৃহযুদ্ধে তিন লক্ষাধিক মানুষ নিহত হলেও এবং তাদের প্রায় সবাই মুসলিম হলেও আমাদের দেশের এবং বিশ্বের অন্যান্য ‘ইসলামপন্থী’ দলগুলো এ সম্পর্কে কোনও অবস্থান নিতে, বক্তব্য দিতে বা অবস্থার বিশ্লেষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে অথবা চায় নাই।

এর সবই ইহুদী-খ্রিস্টান বা আমেরিকা-ইসরায়েলের ষড়যন্ত্র বলে তারা তাদের দায় এড়াবার চেষ্টা করেছে। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী এটা ষড়যন্ত্র হলেও লক্ষ লক্ষ মুসলমান বছরের পর বছর কেন তাদের ষড়যন্ত্রে পা দিয়েই চলছে এ ব্যাপারেও তাঁরা কোন ব্যাখা দাঁড় করাতে পারেনি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় তারা ইসলাম বাঁচাতে আগ্রহী হলেও মুসলমানদের বাঁচাতে আগ্রহী নয়,বিশেষত যদি তারা অপর মুসলমান কর্তৃক নিহত হন।

তবে, বামপন্থী দলগুলোর মত ‘ইসলামপন্থী’ দলগুলো চোখ বন্ধ করে এতদিন রিয়াদ, তেহরানকে সমর্থন দিয়ে আসলেও সেখানকার সাম্প্রতিক পরিবর্তন সমূহ তাদেরকে ‘ইসলামপন্থা’র রাজনীতির ভবিষৎ নিয়ে করে তুলছে উদ্বিগ্ন। নব্বই এর দশকে যেমন মস্কো এবং পিকিংয়ে পরিবর্তনের দোলা লেগেছিল, তেমনি এ দোলা শুরু হয়েছে রিয়াদ এবং তেহরানে।

মস্কোতে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছিল দীর্ঘ অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে উত্তরণের উপায় হিসাবে। রিয়াদেও তাই। এক্ষেত্রে বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রবক্তা কার্ল মার্কসের সেই বিখ্যাত উক্তি, ‘অর্থনীতিই সবকিছুর নিয়ন্ত্রণকারী’, এর সত্যতাই যেন আবার নতুন করে প্রতিভাত হল। মার্কসের মতে অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ীই সমাজের সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন সমূহ সূচিত হয়। কোনো রাষ্ট্র বা সমাজ অর্থনীতির সে চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হলে তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হল সে রাষ্ট্র বা সমাজের ভাঙন বা পতন।

এ ভাঙন বা পতনের ভীতি সৌদি রাজপরিবারকে করে তুলেছে আতঙ্কগ্রস্ত। তেলের দাম অনেকদিন থেকে পড়তির দিকে। মূলত তেল সম্পদের উপর নির্ভরশীল অর্থনীতিতে তাই দেখা দিয়েছে ঘাটতি বাজেট। ২০১৮ সালে এ ঘাটতি বাজেটের পরিমাণ প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার। আর এ ঘাটতি মোকাবেলার জন্য তাই সৌদি আরবকে নিতে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ।

এ অর্থনৈতিক সঙ্কটের সাথে সাথে সৌদি রাজপরিবারে শুরু হয়েছে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। এ দ্বন্দ্বে বত্রিশ বছর বয়স্ক সৌদি যুবরাজ, উপপ্রধানমন্ত্রী এবং পৃথিবীর সবচেয়ে কমবয়সী প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান আল সৌদ আপাতত ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে পেরেছেন বলে মনে হয়। সালমান আল সৌদ রাজদরবারের প্রধান এবং অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন বিষয়ক কাউন্সিলেরও চেয়ারম্যান। এ সালমানই ‘ইরানপন্থী’ হুতি বিদ্রোহীরা যাতে ক্ষমতাসীন হতে না পারে, তার জন্য সৌদি নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন বাহিনী দ্বারা ইয়েমেনে ক্রমাগত বোমা হামলার মূল পরিকল্পনাকারী।

সালমানের পিতা বিরাশি বছর বয়স্ক সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদ এখন শুধু নামেমাত্রই দেশটির বাদশাহ আছেন বলে মনে করা হয়। বয়োবৃদ্ধ বাদশাহকে সামনে রেখে এখন যুবরাজ সালমানের একক সিদ্ধান্তেই দেশটি পরিচালিত হচ্ছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন। তাঁর এ ক্ষমতার উৎস হল প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসাবে দেশটির সেনাবাহিনী এবং বিশেষ এলিট ফোর্সের উপর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব।

আর এ কর্তৃত্ব কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের ক্ষমতা একচ্ছত্র করবার জন্য শুরু করেছেন বাংলাদেশের ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিন সরকারের মত করে দুর্নীতি বিরোধী অভিযান। আর এ অভিযানে তিনি শতাধিক ব্যবসায়ীসহ আটক করেছেন এক ডজনের অধিক যুবরাজকে।

আর এ আটক অভিযানে তিনি ব্যবসায়ীদের জেলে রাখলেও যুবরাজদের রেখেছেন রিজ কার্লটন নামের তারকা খচিত দামী হোটেলে। এখন তিনি অনেকটা ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিন সরকারের মত করে আটককৃতদের বলছেন- তারা যদি তাদের সম্পদের ৭০ শতাংশ তাঁকে দিয়ে দেয় তাহলে তিনি তাঁদের ছেড়ে দিবেন। ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিন এর মত তিনিও বলছেন এ অর্থ তিনি দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাবেন।

আর এ উন্নয়নের প্রয়োজনেই সালমান দেশের রক্ষণশীলতার ট্র্যাডিশন ভেঙ্গে ফেলতে চাচ্ছেন। দেশটিতে এ মুহূর্তে বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি। তারা প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ সৌদি আরব থেকে নিজ নিজ দেশে নিয়ে যাচ্ছেন। অপরদিকে, সৌদি নারী সমাজের প্রায় পুরোটাই বেকার, মাত্র ১৮ শতাংশের মত নানা প্রকার কর্মক্ষেত্রের সাথে যুক্ত, যদিও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েটদের অর্ধেকের বেশি হচ্ছেন নারী। যুবরাজ সালমান চাচ্ছেন এ পুরো নারী সমাজকে উৎপাদন প্রক্রিয়াতে যুক্ত করতে। তিনি মনে করছেন পুরো সৌদি জনসমাজকে কর্মপ্রক্রিয়ার সাথে সাথে যুক্ত করতে পারলে আস্তে আস্তে বিদেশি শ্রমিকদের উপর নিরভরশীলতা কমে যাবে।

এ অর্থনৈতিক চিন্তা থেকেই সালমান চাচ্ছেন নারী সমাজের উপরে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে যাতে তারা স্বাধীনভাবে সব জায়গায় যাতায়াত করতে পারে। বস্তুত এ কারণেই ২০১৮ সাল থেকে সৌদি আরবের নারীরা গাড়ি চালাবার অধিকার পাচ্ছেন। স্টেডিয়ামে যেয়ে খেলা দেখার অধিকার তারা ইতিমধ্যে পেয়েছেন। স্থানীয়সহ সব নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণের পথ খুলে দেয়া হচ্ছে। আস্তে আস্তে বাকি আর যেসব নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সেসবও তুলে নিয়ে সালমান সৌদি নারীদের পাশ্চাত্যের নারীদের মত স্বাধীন এবং কর্মক্ষম দেখতে চান বলে অনেকে মনে করছেন।

নারীদের কর্মক্ষত্রে আনবার পাশাপাশি সৌদি অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করবার জন্য সালমান ব্যাপকভাবে পর্যটন বাড়াবার উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি সৌদি আরবের জন্য ধর্মীয়, ঐতিহাসিক এবং বিনোদনমূলক এ তিন ধরনের পর্যটন বাড়াবার উদ্যোগ নিয়েছেন। এ উদ্যোগের সর্বশেষ সংযোজন হল ২০১৮ সালের মার্চের মধ্যে ১৯৮০ সালে নিষিদ্ধ হওয়া সব সিনেমা হল খুলে দেয়া। এর ফলে সৌদি নাগরিকরা যেমন হলে গিয়ে সিনেমা দেখার সুযোগ পাবেন, তেমনি বিদেশি পর্যটকরা আসলে তাদের জন্যও থাকবে অবসর কাটাবার সু্যোগ। এছাড়া সৌদি আরবের বিভিন্ন জায়গায় নির্মাণ করা হচ্ছে বেশ কতগুলি রিসোর্ট, যেখানে বিদেশী নারী পর্যটকদের আসা উৎসাহিত করবার জন্য আরব আমিরাতের মত বিকিনি পড়বার সুযোগ থাকবে।

দেশটির বর্তমান যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আরো যেসমস্ত উদ্যোগ নিচ্ছেন তার একটি হল পবিত্র নগরী মক্কা এবং মদিনাতে অমুসলিম প্রবেশে যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তা তুলে নেয়া। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবেই কিছুদিন আগে একজন ইহুদী পর্যটককে মসজিদে নববীতে প্রবেশ করতে দেয়া হয়েছে, যেখান থেকে তিনি সেলফি তুলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন। এ ছাড়া সালমান চাচ্ছেন মক্কা নগরীকে ধর্মীয় নগরের পাশাপাশি বানিজ্যিক নগরী হিসাবেও গড়ে তুলতে।

অনেকেই যুবরাজ সালমানের মাঝে বাদশাহ ফয়সলের পুরুজ্জীবন দেখতে পাচ্ছেন। ফয়সল প্রথম সৌদি আরবে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেন। এর ফলে তিনি দেশটিতে টেলিভিশন স্টেশন চালু করেন। টেলিভিশন কেন্দ্র চালু করবার এ উদ্যোগকে অনেকেই তখন ইসলাম ধর্মের পরিপন্থী বলে মনে করেছিলেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সামজিক-অর্থনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগের পাশাপাশি মেয়েদের স্কুল খোলাসহ গণশিক্ষা সম্প্রসারণের বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছিলেন।

কিন্তু, সৌদি আরবের বিভিন্ন স্তরের আলেম সমাজসহ ধর্মীয় নেতৃত্ব বাদশাহ ফয়সালের এ সমস্ত কার্যক্রমকে ভালো চোখে দেখেন নাই। সৌদি জনসমাজের মাঝে আধুনিকায়নের ছোঁয়া লাগলে সমাজ এবং রাষ্ট্রের উপর তাঁদের কোন প্রভাব থাকবে না এ ভীতি তাঁদেরকে পেয়ে বসে। এ জন্য প্রকাশ্যে ফয়সালের বিরোধিতা করতে না পারলেও তাঁরা তাকে সরিয়ে দেবার নানা ষড়যন্ত্র করতে থাকে। এ ধরণের নানামুখী ষড়যন্ত্রের ফল হিসাবেই ১৯৭৫ সালে তিনি তাঁর ভাইপো কর্তৃক নিহত হন।

বাদশাহ ফয়সাল নিহত হবার পরে বিশেষত ১৯৭৯ সালের পর থেকে সৌদি আরব আবার রক্ষণশীল ধারায় ফিরে যায়। ১৯৭৯ সাল সৌদি আরব তো বটেই সারা বিশ্বের ‘ইসলামপন্থার’ আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটা বছর। ওই বছরই আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানে ‘ইসলামী’ বিপ্লব হয়। আধুনিক বিশ্বে ‘ইসলামপন্থার’ রাজনীতির জন্ম ও বিকাশ সুন্নি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এবং নেতৃবৃন্দ দ্বারা হলেও, শিয়া নেতৃত্বে ‘ইসলামী’ বিপ্লব একদিকে ধর্মভিত্তিক সুন্নি রাজনৈতিক দলগুলোকে একধারে বিস্মিত এবং আশাবাদী করে তোলে। তারা একটা বিষয় উপলব্ধি করা শুরু করে যে ‘ইসলামী’ বিপ্লব যা কিনা এতদিন পর্যন্ত ছিলো কাগজে কলমে, তাত্ত্বিক পর্যায়ে তার বাস্তব প্রয়োগ আধুনিক বিশ্বে সম্ভব।

এ উপলব্ধির ফলে বিভিন্ন সুন্নি মুসলমান প্রধান দেশে ‘ইসলামপন্থার’ রাজনৈতিক আন্দোলনে একটা জোয়ার তৈরি হয় এবং ধর্মভিত্তিক সুন্নি রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজ নিজ দেশে অচিরেই ইরান স্টাইলে বিপ্লব করতে পারবেন বলে মনে করতে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৯ সালের ২০শে নভেম্বর ৫০০ সশস্ত্র ব্যক্তি নিয়ে ন্যাশনাল গার্ড থেকে অবসরপ্রাপ্ত সৌদি বেদুঈন, জুহায়মান আল ওতাবী পবিত্র কাবা শরীফ দখল করে নেন এবং তাঁর বোনের স্বামী মোহাম্মদ আল কাতানিকে ইমাম মাহাদি হিসাবে ঘোষণা করেন। তাঁরা সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে তাঁদের ভাষায় পাশ্চাত্য কর্তৃক আক্রান্ত দুর্নীতি এবং অপসংস্কৃতি মুক্ত করবার ঘোষণা দেন।

জুহায়মান আল ওতাবীর ঘোষণা সৌদি রাজতন্ত্রকে ভীত করে তোলে। দুই সপ্তাহ ওতাবীর বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকবার পর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং কাবা শরীফে আটকে পড়া সাধারণ মানুষ এবং নিরাপত্তা বাহিনীসহ শতাধিক ব্যক্তি নিহত হবার মাধ্যমে কাবাকে দখলমুক্ত করা হয়। ইরানের ‘ইসলামী বিপ্লব’, কাবা শরীফের ঘটনা এবং মুসলিম প্রধান বিভিন্ন দেশে ‘ইসলামপন্থার’ রাজনীতির জোরালো হাওয়া সৌদি রাজ পরিবারকে বাদশাহ ফয়সালের সংস্কারকে প্রত্যাখান করে আবারো রক্ষণশীল ওয়াহাবী ধারায় ফিরে যেতে বাধ্য করে। বস্তুত, এরই ফলে ১৯৮০ সালে দেশটিতে চালু থাকা সিনেমা হলগুলি বন্ধ করে দেয়া হয়।

কাবা দখলের পর থেকেই সৌদি রাজনীতিতে শেখ পরিবাবের প্রভাব বাড়তে থাকে। সৌদি আরব পরিচালিত হয় দুটো পরিবার দ্বারা। আল সৌদ পরিবারের হাতে রয়েছে শাসন কার্যের ভার আর অপরদিকে শেখ পরিবার নিয়ন্ত্রণ করে ধর্মীয় বিষয়, ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স, শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়। সৌদি আরব রাষ্ট্রটির গঠন হয়েছে মোহাম্মদ ইবন সৌদ এবং মোহাম্মদ ইবন আবদ আল ওয়াহাবের মাঝে চুক্তির ফলে। এ চুক্তির বিষয়বস্তু ছিল যে সৌদ পরিবার শাসনকার্য পরিচালনা করবে আল ওয়াহাবের ব্যাখ্যা কৃত ওয়াহাবী ইসলাম দ্বারা। সৌদ পরিবার যথাযথভাবে ওয়াহাবী ইসলাম মেনে চলছে কিনা তা তদারকির দায়িত্ব থাকবে আল ওয়াহাবের শেখ পরিবারের হাতে।

যুবরাজ সালমান এখন চাচ্ছেন এ শেখ পরিবারের প্রভাব সৌদি রাজনীতিতে হ্রাস করে তাঁর সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে। শেখ পরিবারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কেন্দ্র থেকে গ্রাম পর্যন্ত সমস্ত ধর্মীয় নেতৃত্ব। সংস্কার হলে এ নেতৃত্ব রাষ্ট্র এবং সমাজে তাঁদের প্রভাব হারাবার ভয়ে ভীত।

১৯৭৯ সালে সেসময় ইরানের ‘ইসলামী’ বিপ্লবের প্রভাবে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক আন্দোলন যাতে দানা না বাঁধে সে কৌশলের অংশ হিসাবে সৌদ পরিবার আরো রক্ষণশীল ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে। মূলতঃ তেল সম্পদের উপর নির্ভরশীল সৌদী অর্থনীতি তখন রক্ষণশীল ব্যবস্থাকে সমর্থন করবার মত অবস্থায় ছিল। সৌদি সরকার জনগণকে এবং যুবরাজদের নানাভাবে ভর্তুকি দিয়ে আসছে। এখন তেলের বাজার পড়ে যাওয়ায় এ ভর্তুকি দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সমাজে বাড়ছে অসন্তোষ। এছাড়া ক্ষোভ দানা বাঁধছে শিয়া সম্প্রদায়ের মাঝে যাদের ধর্মীয় গুরু শেখ নিমর-আল নিমরকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে।

সালমান ভেবেছিলেন ইয়েমেনের যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে; কিন্তু এর পরিবর্তে যুদ্ধ শুধু প্রলম্বিত নয় বরং এখন দেশটির শিয়া হুতি বিদ্রোহীদের থেকে প্রায়ই ক্ষেপণাস্ত্র ধেয়ে আসছে সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে। এ যুদ্ধ চালানো যেমন সৌদি আরবের জন্য বোঝা হয়ে গিয়েছে, তেমনি কঠিন হয়ে গিয়েছে বিশ্বব্যাপী ওয়াহাবী/সালাফি মতাদর্শগত আন্দোলন এবং নানাবিধ সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ সাহায্য দেয়া। যুবরাজ সালমান এসবের পিছনে অর্থ সাহায্য দেয়া বন্ধ করে সে অর্থ দেশের উন্নয়নে ব্যয় করতে চাচ্ছেন।

সালমান বুঝতে পেরেছেন রক্ষণশীলতার বিলাসিতা করবার মত অবস্থায় সৌদি অর্থনীতি নেই। সৌদ পরিবারকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে তাদেরকে যেকোনোভাবেই হোক অর্থনীতিতে টাকার (রিয়াল) সরবরাহ অব্যাহত রাখতে হবে। এ মুহূর্তে রক্ষণশীল পথে চলবার অর্থ হল দরিদ্রতার পথে ক্রমশ দেশকে নিক্ষেপ করা যা কিনা অদূর ভবিষেৎ গণ বিস্ফোরণের জন্ম দিতে পারে। এ দারিদ্রতা এবং গণ বিস্ফোরণের হাত থেকে সৌদি আরবকে রক্ষা করবার জন্য তিনি আধুনিকায়নের পথে হাঁটা শুরু করবার সংকল্প করেছেন এবং এরই ধারাবাহিকতায় চাচ্ছেন সবরকম উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নারীকে অন্তর্ভুক্ত করে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে। এরই প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে এ বছরের জুন মাস নাগাদ দশ হাজার সৌদি নারী ট্যাক্সি ক্যাব চালক হিসাবে নিয়োগ পাচ্ছেন।

সালমান বর্তমানে রয়েছেন শাঁখের করাতের মত এক কঠিন সঙ্কটে। সৌদি সমাজকে আধুমিকায়ন করে অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে না পারলে একদিকে যেমন তাঁর পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকা মুশকিল; আবার, অপরদিকে, আধুনিকায়নের পথে হাঁটলে শেখ পরিবারের নেতৃত্বে সমাজের রক্ষণশীল অংশ হতে রয়েছে প্রবল প্রতিরোধের সম্ভাবনা।

তবে, সালমান আধুনিকায়নের পথে হাঁটবেন বলেই মনে হচ্ছে। অনেকে মনে করছেন তিনি সৌদি আরবকে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত করে আরবের আতাতুর্ক হতে চান। তবে, তিনি আতাতুর্ক হবেন না তাঁকে ফয়সলের পরিণতি বরণ করতে হবে সেটা বুঝার জন্য আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

তাঁকে যদি ফয়সলের পরিণতি বরণ করতে হয় তাহলে বাংলাদেশসহ বিশ্বে ইসলামপন্থার’ রাজনীতি এখন যেরকম চলছে কম বেশি তেমনি চলবে আর তিনি যদি আতাতুর্ক হয়ে উঠেন তাহলে “ইসলামপন্থী” দলগুলোর পরিণতি আজকে বাংলাদেশের বামপন্থী দলগুলোর মত হলে অবাক হবার কিছু থাকবে না। সূত্র: বিডিনিউজ

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন