শিরোনাম :

জীবনের মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ


বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৮, ১২:৩৭ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

জেসমিন চৌধুরী: পরিবারের প্রবীণতম সদস্যটি যখন চলাচলে অক্ষম হয়ে পড়েন অথবা ডিমেনশিয়া জাতীয় জটিল রোগে আক্রান্ত হন, তখন যে কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তার সঙ্গে অনেকেরই পরিচয় আছে। বাংলাদেশে এমনটা হলে অনেক ক্ষেত্রেই ছেলেমেয়েদের মধ্যে কেউ একজন দেখাশোনার দায়িত্ব নেন। সহজ নয় এই দায়িত্ব, অসুস্থ মুরব্বির সঙ্গে নিজের চলাফেরাও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। চাইলেই যখন তখন বাইরে যাওয়া যায় না। তারপরও বাংলাদেশে বিষয়টা অপেক্ষাকৃত সহজ। অল্পখরচে নার্স বা কাজের মানুষ রাখা যায়, তাদের কাছে অসুস্থ ব্যক্তিকে রেখে শপিং, বিয়ের অনুষ্ঠান, এমনকি হলিডেতেও যাওয়া যায়।
একই পরিস্থিতি যদি বিলেতে হয়, তাহলে অবস্থা কেমন দাঁড়াবে? আমরা জানি এদেশে মানবাধিকারের চর্চা রয়েছে, সবচেয়ে দুর্বলের জন্যই রয়েছে সবচেয়ে বেশি সাহায্যের ব্যবস্থা। কথাটা যদিও মিথ্যে নয়, তবু পলিসি আর পেপারওয়ার্কের সঙ্গে বাস্তবের অমিলও খুব একটা কম নয়।   

এদেশে অনেক প্রবীণ ব্যক্তিকে একাই থাকতে হয়। কোনও ক্ষেত্রে আত্মসম্মানের বোধ থেকে স্বেচ্ছায়, আবার কোনও ক্ষেত্রে সন্তানদের দায়িত্বপালনের অক্ষমতা বা অনিচ্ছার অসহায়ত্ব থেকে। আমার দেখা দুটো বাস্তব ঘটনার চিত্র তুলে ধরছি।  

এক.

আমার এক আইরিশ কলিগের মা-বাবা দু’জনেই অশীতিপর বৃদ্ধ, নানান রোগে ভুগছেন। তাদের ছেলে-মেয়ের সংখ্যা কম নয় কিন্তু কেউ কাছে নেই, জীবনের প্রয়োজনে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সবাই। আমার কলিগটি একই শহরে থাকে তবু তাদের সামাজিক সংস্কৃতি অনুযায়ী বৃদ্ধ-বৃদ্ধা আলাদাভাবে নিজেদের বাসায়ই থাকেন। রুটিন বেঁধে সকাল-সন্ধ্যা বাসায় কেয়ারার আসে, খাওয়া-দাওয়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কাপড় বদলানো সব কাজ তারাই করে। এই রুটিন-বাঁধা সময়ের বাইরে প্রস্রাব পেতে পারে বলে ন্যাপির মতো করে প্যাড পরিয়ে রাখা হয় তাদেরকে। সময়মত কেয়ারার এসে প্যাড বদলে দেয়। আমি প্রায়ই ভাবি রুটিনের বাইরে যদি তাদের ক্ষিদা পায়? যদি একটু চা খেতে ইচ্ছে করে! এই গল্প শুধু এদের নয়, এদেশের অনেক প্রবীণ ব্যক্তির।  

আমার কলিগকে প্রায়ই দেখি মুখ গোমড়া করে কাজ করছে। জিজ্ঞেস করি,

‘কী হয়েছে ম্যারি?’

‘আমার বাবা আবার হাসপাতালে।’  

‘নিশ্চয়ই তোমার মন খুব খারাপ।’

‘শুক্রবারে আমার হলিডেতে যাওয়ার কথা, হোটেল বুকিং হয়ে গেছে। বাবা হাসপাতালে থাকলে যাবো কী করে? শুক্রবারের ভেতরে ও সুস্থ হয়ে নিজের ঘরে ফিরে গেলেই হয়।’

কখনও মা, কখনও বাবাকে নিয়ে ম্যারির হলিডের পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে থাকে। কখনোবা তারা কিছুটা সুস্থ হয়ে ঘরে ফেরেন, ম্যারি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে স্বামীকে নিয়ে হলিডেতে চলে যায়।  

দুই.

ঘরে ঢোকার সময় আমি জানতাম না কার জন্যে ইন্টারপ্রিটিং করতে এসেছি। দরজা খুললেন একজন মধ্যবয়সী মহিলা, আমাদেরকে বসালেন ড্রয়িং রুমে। কামরাটি বেশ ছোট। একটা সোফা সেট, একটা ডায়নিং টেবিল, একগাদা চেয়ার আর চেস্ট অব ড্রয়ারস দিয়ে একেবারে গাদাগাদি দমবন্ধ একটা কামরা। দেয়াল ঘেঁষে হাসপাতালের বেডের মতো একটা বিছানা, চারপাশে উঁচু রেলিং দেওয়া। বিছানায় লেপমুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে কেউ। আমাদের সাড়া পেয়ে লেপটা নড়ে উঠল। ধীরে ধীরে মাথা বের করলেন এক অশীতিপর বৃদ্ধা। তার মাথাটা অস্বাভাবিক রকম কাঁপছে। উঠে বসবার চেষ্টা করছেন তিনি, মধ্যবয়েসী মহিলাটি বলছেন, ‘আম্মা আপনি হুতি থাকইন, ওঠবার দরকার নাই।’ বৃদ্ধা তবু উঠে বসলেন, অনেক কষ্টে। বিছানা থেকে নেমে কাঁপতে কাঁপতেই সোফায় গিয়ে বসলেন। সোশ্যাল ওয়ার্কার জিজ্ঞেস করলো, ‘হাউ আর ইউ টুডে?’

‘আমি ভালা, তুমরা ভালানি?’ বৃদ্ধার কণ্ঠস্বর তার শরীরের মতই কম্পমান।

একটু পরেই মসজিদ থেকে নামাজ সেরে ঘরে ফিরলেন বৃদ্ধার ছেলে।

‘উঠিয়া বইগেছনি আম্মা?’

মাকে সোফায় বসে থাকতে দেখে ছেলেকে খুব আনন্দিত মনে হলো। বললেন, বাসায় বেশি লোকজন দেখলে খুব খুশি হন বৃদ্ধা। কে কেন এসেছে বুঝতে পারেন না, পরে মনেও থাকে না কাউকে, তবু লোকজন দেখলে তার শরীর মনে হয় কিছুক্ষণের জন্য বেশ ভালো হয়ে গেছে।  

অবশ্য তার মূল সমস্যা শরীরে নয়, বহুবছর ধরে ডিমেনশিয়ায় ভুগছেন। বড় ছেলে হিসেবে বৃদ্ধাকে দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন ভদ্রলোক এবং তার স্ত্রী। এই কাজের জন্য তারা নামে মাত্র সরকারি ভাতা পান যার অনেকটাই আবার বৃদ্ধার ওষুধপত্র এবং নার্সিংয়ের পেছনে খরচ হয়ে যায়। দিনে দুইবার কেয়ারটেকার আসে তাকে প্রস্রাব করানোর এবং কাপড় চোপড় পাল্টে দেওয়ার জন্য কিন্তু তার টাইমটেবলের সাথে তেমন একটা খাতির নেই বৃদ্ধার ব্লাডারের, কাজেই কাজগুলো তার স্ত্রীকেই করতে হয়। আবার কেয়ারটেকারদের বেতনের কিছুটাও তাদেরকেই দিতে হয়।

সকালবেলা বিছানা থেকে ওঠানো যায় না বৃদ্ধাকে, জোর করে ওঠাতে গেলে মারধোর করতে শুরু করেন। ভদ্রলোকের স্ত্রী খুব আন্তরিকতার সঙ্গেই দীর্ঘদিন ধরে বৃদ্ধার দেখাশোনা করে আসছেন কিন্তু আজকাল তিনিও হাঁপিয়ে উঠেছেন। দিনরাত বৃদ্ধাকে চোখে চোখে রাখতে হয়। আগে উপরের তলায় ঘুমাতেন কিন্তু একদিন রাতে সিঁড়ি থেকে উল্টে পড়ে পা ভেঙে যাওয়ার পর থেকে ড্রয়িং রুমে শোবার ব্যবস্থা করতে হয়েছে, বিছানার চারপাশে রেলিং দিতে হয়েছে, সিঁড়ির নিচে গেট লাগাতে হয়েছে যেন তিনি রাতে লুকিয়ে ওপরে উঠে যেতে না পারেন।  

ছেলের বউ ঘর থেকেই বের হতে পারেন না, বিয়ে-জন্মদিনের দাওয়াতে যেতে পারেন না। প্রতি সপ্তাহে তিনঘণ্টার জন্য একজন কেয়ারটেকার আসার কথা যাতে মহিলা এই দায়িত্ব থেকে কিছুটা বিরতি পান কিন্তু সেই কেয়ারটেকারও সময় মতো আসে না, এজেন্সিতে অভিযোগ করে কোনও লাভ হয়নি। কেয়ারটেকার যখন আসে তখন তার বাচ্চাদেরও স্কুল থেকে বাসায় ফেরার সময় হয়ে যায় তাই বের হতে পারেন না তখনও। বহুবছর ধরে স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে কোথাও বেড়াতে যাননি, হলিডেতে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

এই সবকিছুর মধ্যে আনন্দের বিষয় হলো তাদের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনায় ভালো করছে, স্কুলে নিয়মিত ভালো পারফরমেন্সের জন্য অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছে। মা-বাবার স্বপ্ন ছেলেমেয়েগুলো মানুষ হবে, বড় কিছু হবে। তারা যেমন মায়ের সেবাযত্ন করছেন, তাদের বাচ্চারাও বড় হয়ে তাদেরকে দেখবে।

এদের জন্য ইন্টারপ্রিটিং করতে করতে আমার মনে হলো এই সোশ্যাল ওয়ার্কারটি তার কাজে তেমন পারদর্শী নয়, সে এদেরকে ঠিকমত উপদেশ দিতে পারছে না। তারা কোথায় কী সাহায্য পেতে পারেন তা বলে দিচ্ছে না। সে নিজে কী অ্যাকশন নেবে তাও বলছে না। কোনও ধরনের বাড়তি সহায়তার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছে না। এই দম্পতিকেও খুব বেশি ডিমান্ডিং বা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে খুব একটা সচেতন বলে মনে হচ্ছে না।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে অতীতে সোশ্যাল ওয়ার্কারদেরকে অনেক বেশি সাহায্য করতে দেখেছি। একজন দো-ভাষীর বাড়তি কথা বলার নিয়ম নেই, কিন্তু আমি প্রায়ই নিয়ম ভেঙে ফেলি। এবারও নিয়ম ভেঙেই নিজে থেকে এই দম্পতিকে কিছু সংগঠনের নাম বললাম যেখানে হয়ত তারা বাড়তি কিছু সহযোগিতা পেতে পারেন।    

কাজ শেষে বেরিয়ে আসার সময় মনে হলো হয়তো এরা ওই সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগযোগ করবেন না। এভাবেই চলতে থাকবে তাদের বিশ্রামহীন, বিনোদনহীন কেয়ারটেকার জীবন। সন্তানদের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকবেন প্রতিদানের জন্য কিন্তু এরা বড় হতে হতে পৃথিবী আরও অনেক বদলে যাবে। নিজেরা যখন বৃদ্ধ হবেন তখন এদের কী অবস্থা হবে কে জানে!

তিন.

বাসায় ফিরে ছেলের সঙ্গে গল্প করছিলাম, ‘এদেশের জীবন দেখো। আশেপাশে সাহায্য করবার মতো আত্মীয়-বন্ধু কেউ নেই। বাংলাদেশের মতো সস্তায় চব্বিশঘণ্টার নার্স বা বুয়াও রাখা যায় না। দেশে হলে কাজের মানুষের কাছে মাকে রেখে এরা দু’জনে মাঝে মধ্যে একসঙ্গে বাইরে যেতে পারত।’  

একটু ভেবে আমার ছেলে বললো, ‘তুমি তো শুধু ভাবছ তোমার শ্রেণির মানুষের কথা। সস্তায় যেসব কাজের মানুষদের রাখা হয়, যাদের কাছে বৃদ্ধ বা অসুস্থদের রেখে বাইরে যাওয়া হয়, সেইসব কাজের মানুষদের কথা ভেবে দেখেছ? তাদের যখন অসুখ হয়, বৃদ্ধ বয়সে ডিমেনশিয়া হয় তখন কী অবস্থা দাঁড়ায়? এদেশে অন্তত সবার জন্য ভাতার ব্যবস্থা রয়েছে, পরিমাণ যাইহোক। প্রতিদিন ১৫ মিনিটের জন্য করে হলেও দু’বার কেয়ারার আসছে, সপ্তাহে দুইঘণ্টার জন্য হলেও বিরতি মিলছে। আবার যখন সেই কেয়ারার অসুস্থ হবে, বৃদ্ধ বয়সে তার ডিমেনশিয়া হবে সেও আর সবার মতো একই সুবিধা পাবে তা যৎ-সামান্যই হোক। বাংলাদেশে কি এটা সম্ভব? এই দম্পতির হলিডে করতে না পারা থেকে বাংলাদেশের শ্রেণি-বৈষম্য অনেক বেশি করুণ একটা বিষয়।’  

ছেলের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমার পার্সপেকটিভ বদলে গেল। জীবনের মুদ্রার পিঠ শুধু দুটো নয়, বরং অনেকগুলো।  

লেখক: অভিবাসী শিক্ষক ও অনুবাদক

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন