শিরোনাম :

রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ‘রাজনৈতিক তদন্ত’!


মঙ্গলবার, ২৩ জানুয়ারি ২০১৮, ০৩:২১ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ‘রাজনৈতিক তদন্ত’!

শুভ কিবরিয়া : কখনও কখনও সহজ অনেক প্রশ্নের উত্তর আসলে সহজ থাকে না। এসব প্রশ্নের উত্তরও সহজ পথে মেলে না। তাই অনেকে এসব প্রশ্ন তুলতেই রাজি নন। উত্তর তো দূরের কথা।

কিন্তু জাতিরাষ্ট্রের সামনে সবসময় সহজ পথ খোলা থাকে না। তাকে অনেক সময় কঠিন পথেই হাঁটতে হয়। কঠিন পথে হাঁটতে হিম্মত লাগে। সবাই সেই হিম্মত ধারণও করেন না। কিন্তু অনেক মানুষ আছেন, যারা রাজনীতিতে পোড় খাওয়া, অনেক কঠিন পথে হেঁটেছেন, অনেক মৃত্যু-রক্ত দেখেছেন, জীবনভর রাজনীতির অলিগলি হেঁটে থিতু হয়েছেন, এই সত্যে ভর করেছেন যে, অন্যায় দিয়ে কখনও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা যায় না। তারা তাই রাজনীতির অন্ধকারগুলো কার্পেট দিয়ে ঢেকে রাখতে চান না। এ রকমই একজন পোড়খাওয়া রাজনীতির মানুষ তিনি।
ভারতের প্রতিরক্ষা, অর্থ ও বিদেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজ্যসভা, লোকসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকেছেন। পরিকল্পনা কমিশনে ডেপুটি চেয়ারম্যান ছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে রাজনীতি শুরু করেছেন, শ্রীমতি সোনিয়া গান্ধীর সময়ে দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন। পরে ভারতের ১৩তম প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন।

এসব পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে তার প্রজ্ঞাবান রাজনীতি। বাঙালির জেনেটিক উত্তেজনার বাইরে বের হয়ে এসে সর্বভারতীয় রাজনীতি তো বটেই উপমহাদেশের রাজনীতির একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন সম্পূর্ণ নিজ গুণে। তার স্থিরতা আর ধৈর্যগুণ, বিপদের সময় মাথা ঠাণ্ডা রাখার অভ্যেস, ভারতীয় রাজনীতিতে তাকে শুধু বিজ্ঞই করেনি করেছে প্রয়োজনীয়ও করে তুলেছে। তার চিন্তা আর অভিজ্ঞতার পরশ মিলিয়ে তিনি লিখেছেন ‘দ্য কোয়ালিশন ইয়ারস (১৯৯৬-২০১২)’ নামের একটি সুখপাঠ্য ও গুরুত্বপূর্ণ বই।

রাজনীতিতে তাই তার কথা বা চিন্তার একটা আলাদা মূল্য আছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ মানুষ নানাভাবে ও নানা কারণে। তিনি ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি।

সম্প্রতি তিনি ঘুরে গেলেন বাংলাদেশে। যদিও তিনি এখন ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতার সরাসরি অংশ নন, তবু ভারতীয় রাজনীতিতে তার একটা আলাদা গুরুত্ব আছে। সে বিবেচনায় বাংলাদেশেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানিত। প্রণব মুখার্জির এবারের বাংলাদেশ সফর ছিল তার ব্যক্তিগত কিন্তু এ সফরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডিলিট ডিগ্রি দিয়ে সম্মানিত করেছে। তিনি নানা সুধীজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। বক্তৃতাও করেছেন। এ রকম এক বক্তৃতায় এক গুরুত্বপূর্ণ অথচ জরুরি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। সাধারণত এরকম বিষয় নিয়ে আমাদের সিভিল সোসাইটি আলোচনা করতে স্বস্তিবোধ করে না। জনসমুখে এসব কথা নিয়ে আলোচনায় নিরাপদও বোধ করে না বাংলাদেশের বিজ্ঞ সমাজ। সে হিসেবে প্রণব মুখার্জি এক বদ্ধ বিষয়ের ট্যাবু ভেঙেই কথা বলেছেন। বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে।

সহজ পথ কতটা সহজ

প্রণব মুখার্জি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারতে স্বাধীনতার পরপরই জাতির পিতাদের হত্যা করা হলো। ব্রহ্মদেশে (মিয়ানমার) অং সান সু চি’র বাবা জেনারেল অং সান ব্রাশফায়ারে নিহত হলেন। ১৯৬০ সালে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী নিহত হলেন। ১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধী নিহত হলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলেন। ৩ নভেম্বর যারা মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন তারা নিহত হলেন জেলখানার ভেতরে। পাকিস্তানে জিয়াউল হক নিহত হলেন। জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ফাঁসি দেওয়া হলো। এই যে বিপুলসংখ্যক রাজনৈতিক হত্যা– এর কারণ কী? এর পেছনে সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কাজ করেছে কিনা, আমি জানি না। সমাজতত্ত্ববিদ, ইতিহাসবিদ ও পণ্ডিতদের কাছে নিবেদন করবো, এই বিষয়ে গবেষণা করে এ অঞ্চলের মানুষকে জানাতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অকথ্য নির্যাতন, লাঞ্ছনা, মৃত্যু সহ্য করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। এ স্বাধীনতায় নেতৃত্ব দিয়েছেন সর্বকালের সর্বযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান। আমরা যেমন ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি আততায়ীর গুলিতে ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীকে হারিয়েছি, তেমনি ভাবে শেখ মুজিবুর রহমান ভোরে একদল ঘাতকের হাতে নৃশংস আক্রমণের শিকার হলেন।’

প্রণব মুখার্জি বলেন, ‘একটি সদ্য স্বাধীন দেশ। অসংখ্য সমস্যা ছিল। দেশ গড়ার সমস্যা। দেশকে এগিয়ে নেওয়ার সমস্যা। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূর করার সমস্যা। সেই সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় জন্মলগ্নের মুহূর্তে একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হলো। পৃথিবীর কোনও দেশে এ নজির খুব বেশি নেই। আমেরিকা স্বাধীনতা লাভের বহু বছর পর আব্রাহাম লিংকন নিহত হয়েছিলেন।’

এসব কারণ জানতে গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদদের এগিয়ে আসার আহবান জানিয়ে প্রণব মুখার্জি বলেন, ‘ রাস্তা কোনদিকে, জানতে পারলে সেদিকে চলতে পারব। চলাটা সহজ হয়ে যাবে।’

কেন তদন্ত হয় না

আমরা সবাই সহজ পথেই চলতে চাই। সেটা আমাদের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। তাই হয়তো প্রশ্ন ওঠে কেন এসব বড় বড় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক তদন্ত হয় না?

এর নানা কারণ থাকতে পারে।

প্রথমত, যারা হত্যাকাণ্ডের ইমিডিয়েট বেনিফিশিয়ারি হন, তারা এপথ মাড়াতে চান না নিজেদের রক্ষার স্বার্থেই। তাদের হাতে রাষ্ট্র বা রাজনীতির যে নতুন ইতিহাস লেখা হয়, সেখানে এই অধ্যায়কে এড়িয়ে যাওয়া হয় পরিকল্পিতভাবেই।

দ্বিতীয়ত, এসব বড় বড় হত্যাকাণ্ডে বদলে যায় দেশের রাজনীতির পাটাতন। যারা এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, তাদের দল বা পরিবার হত্যাকাণ্ডের ইমোশনকে ব্যবহার করে বিপদের দিন কাটিয়ে ওঠে রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াই বহাল রেখে নতুন রাজনীতি চালু করেন। রাজনীতির চলার পথে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিও এক নতুন রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে হাজির হয়। তা ক্ষতিগ্রস্ত রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তি সঞ্চয়েও নানানভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে। বংশ পরম্পরায় এই আবেগ রাজনৈতিক সুবিধা দিতে থাকে। ফলে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক তদন্তে অনুৎসাহিত থাকেন রাজনৈতিক দলগুলো।

তৃতীয়ত, যেকোনও বড় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলে তাতে স্থানীয়দের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক পরাশক্তির এক বা একাধিক সূত্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগসাজশ কিংবা সংযোগ থাকার কথাটা ওঠে। এ বিষয়ে কোনও সঠিক তথ্য প্রমাণ না মিললেও এ সন্দেহকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। চলমান রাজনীতির স্থানীয় নীতিনির্ধারকরা এসব আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক শক্তিকে কোনও অবস্থাতেই চটাতে চান না বলেও এসব হত্যাকাণ্ডের বড় কোনও রাজনৈতিক তদন্ত করা হয়তো সম্ভব হয় না।

দরকার কী?

কিন্তু এরকম রাজনৈতিক নেতাদের রক্তঝরা খুন বিস্তারিত রাজনৈতিক তদন্ত দাবি করে কেন?

কারণ, সাধারণ হত্যাকাণ্ডেরও তদন্ত হয়। উদ্দেশ্য থাকে দু’টো। এক. প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করা। অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্যই এই শাস্তি নিশ্চিত হওয়া দরকার।

দুই. প্রকৃত অপরাধীর শাস্তি হলে ভবিষ্যতে অপরাধীরা সতর্ক হবে, এই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা পায়। ভবিষ্যতে কেউ অপরাধ করলেও বিচারের দণ্ড থেকে পার পাবে না, এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করার জন্যই অপরাধীর বিচার নিশ্চিত হওয়াটা খুব জরুরি।

সাধারণ খুন বা হত্যার বাইরে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও এই কথা প্রযোজ্য। শুধু হত্যাকারীকে শাস্তি দিলেই হয় না, যারা এসব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড, তাদের মোটিভ চিহ্নিত করাটাও জরুরি। নইলে দেশের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। দেশের অভ্যন্তরে দেশবিরোধী নানা শক্তির উদ্ভব হতে পারে। রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকতা বিঘ্নিত হতে পারে। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বয়ানও বদলে যেতে পারে।

উপায়ের খোঁজ

প্রণব মুখার্জি শুধু প্রস্তাব উত্থাপন করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি মৃদুস্বরে দৃঢ়ভাবে আবেদন জানিয়েছেন, এতবড় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড কেন ঘটলো, ক্ষুব্ধতাটা কোথায়, কোন অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে এ বিপত্তি ঘটানো গেলো, তা অনুসন্ধান করে সত্যটা জানার। সংকটটা জানতে পারলে সমাধান সহজ হবে। চলার পথটা মসৃণ হবে এবং বিপদগুলোও কেটে যাবে।

এশিয়ার বিজ্ঞ সমাজ বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার বিজ্ঞ সমাজ গবেষণা করে ইতিহাসের গোপন কুঠুরিতে এই কাজে হাত দিলে আমাদের এই অঞ্চলে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড কেন ঘটে, তা নিরসনের উপায়ই বা কী, সেই পথের হয়তো দেখা পাওয়া যাবে।

আজ-কাল অথবা আগাম কোনও একদিনে!

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন