শিরোনাম :

রাজনৈতিক, উমেদার, ঘুষ, পুরস্কার


সোমবার, ২৯ জানুয়ারি ২০১৮, ১১:৩৪ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

রাজনৈতিক, উমেদার, ঘুষ, পুরস্কার

দাউদ হায়দার: শেয়াল বললো, ‘হুজুর, এরা সব পাগল আর আহাম্মক, এদের সাক্ষ্যের কোনও মূল্য নেই’। শুনে কুমির রেগে লেজ আছড়িয়ে বললো, ‘কে বললো মূল্য নেই? দস্তুরমতো চার আনা পয়সা খরচ করে সাক্ষ্য দেওয়ানো হচ্ছে।’ (হ-য-ব-র-ল: সুকুমার রায়)। অর্থাৎ ঘুষ। পশু জগতে বলা হয়, শেয়াল সবচেয়ে চালাক-চতুর। শেয়ালই বলছে, সাক্ষীরা পাগল, আহাম্মক; এদের সাক্ষ্যের মূল্য নেই! একেবারেই কি নেই? সাক্ষীর বয়ান শুনেই বিচারক রায় দেন, মানতেই হবে, উচ্চবাচ্য, প্রতিবাদ করা চলবে না। করলে, প্রতিবাদী পাগল বা আহাম্মক।
আমরা জানি, পৃথিবীজুড়ে পাগল আর আহাম্মক সাক্ষী ভূরি-ভূরি। নির্ভরযোগ্য সত্যতা আবিষ্কার মুশকিল। কে একজন বলেছিলেন, নাম স্মরণ হচ্ছে না, ‘পৃথিবী অসত্যের, পাজি, দুর্নীতিবাজের আখড়া।’ নিত্যদিনই আমরা টের পাচ্ছি, ক্ষণে-ক্ষণে, নানা কাণ্ডে। হোক তা সামাজিক, রাজনীতিক সাংস্কৃতিক এমনকী শিল্পসাহিত্যে, শান্তির নামাবলীর উত্তরীয়তেও।

সাহিত্য পুরস্কার নিয়েই বলা যাক। নোবেল পুরস্কার নিয়ে বলছি। টলস্টয়কে পুরস্কার দেওয়া হলো না। বেছে বেছে প্রুধোকে দেওয়া হলো। তিনি ফরাসি লেখক। কী লিখেছেন? এমন কী লেখা? ফরাসিরাই নাম জানে না, ভুলেও গেছে। টলস্টয় এখনও দিব্যি, দুনিয়ায় যতদিন উপন্যাস থাকবে, টলস্টয়ই গুরু। অবশ্য ভুলছি না সার্ভেন্তিসের কথাও। দস্তয়ভোস্কি, প্রুস্ত, বালজাককে। জেমস জয়েস, কাফকা, বোর্হেসকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি। নোবেল কমিটি লজ্জিত কিনা, কে জানে। এমন ঘটনাও ঘটেছে, নোবেল কমিটির (সাহিত্য) দুই বিচারক, দু’জনেই লেখক, পুরস্কার ভাগাভাগি করে নেন, ‘বিশ্বসাহিত্যের মহৎ লেখক’ ঘোষণা করেন নিজেদেরই।

সালমান রুশদীকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে না, হবে কিনা, সন্দেহ। কারণ একটিই, পুরস্কার দিলে সৌদি আরব, ইরানসহ মুসলিম বিশ্ব গোস্বা করবে, সুইডেনের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যেও ঝামেলা, টানাপড়েন শুরু হতে পারে। ‘একজন সালমান রুশদী’র জন্য কেন এই রিস্ক নেবে সুইডেন! প্রত্যেকেই চায় আখের গোছাতে।

শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের কেচ্ছা আপনাদের জানা। মহাত্মা গান্ধীকে শান্তি নোবেল পুরস্কার দেওয়া হবে, প্রায়-চূড়ান্ত। কানে গেলো ব্রিটিশ শাসকদের। তীব্র আপত্তি। বাদ সাধলো। ঘাড় গুঁজে মেনে নিলো শান্তি নোবেল কমিটি।

দক্ষিণ আফ্রিকার দুই নোবেল প্রাপক (শান্তি) ডেসমন্ড টুটু, নেলসন ম্যান্ডেলার গুরু কে? মহাত্মা গান্ধী। নোবেল পুরস্কার পাননি ঠিকই, কিন্তু মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের কাণ্ডারি মহাত্মা গান্ধী।

ড. মুহম্মদ ইউনূস অর্থনীতিবিদ। গ্রামীণ ব্যাংকের তকমায় দেওয়া হলো শান্তিতে নোবেল পুরস্কার। গ্রামীণ ব্যাংকের কেরামতিতে বাংলাদেশে কতটা শান্তি, গ্রামে-সমাজে-রাজনীতিতে, ঘরে-বাইরে?

এও বাহ্য। বারাক ওবামার প্রেসিডেন্সির দশ মাসও হয়নি, শান্তি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন ওবামাকে, ‘বিশ্বশান্তির জন্য কী করেছেন?’ ওবামার উত্তর, ‘তা তো জানি না। শান্তির নোবেল কমিটি জানে’। এখন প্রমাণিত আইএস (ইসলামিক স্টেট) প্রতিষ্ঠায় হিলারি ক্লিনটন, বারাক ওবামার সক্রিয়তা। সাহায্যকারী। মালালা ইউসুফজাইকে কেন শান্তি নোবেল পুরস্কার দেওয়া হলো? গুলি খেয়ে বেঁচে গেছে, তাই? তালেবানের তাণ্ডব, মালালার পুরস্কারের পরে শতগুণ। নারীশিক্ষা নিয়ে কেবল কি মালা উচ্চকণ্ঠী? পাকিস্তানে, আফগানিস্তানে, আফ্রিকায়, মুসলিম দুনিয়ায় আরও অনেকে অকুতোভয়।

সাহিত্য পুরস্কার নিয়ে তিনটি ঘটনা মনে পড়ছে। তিনটিই পশ্চিমবঙ্গের। রবীন্দ্র পুরস্কার চালু হয়েছে। সভাপতি ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। কুলোকের কুকথা, ‘সুনীতিবাবুর টাকার দরকার। হিন্দুস্তান পাকে ‘সুধর্মা’ বাড়ি শুরু করেছেন, নির্মাণাধীন, ট্যাঁকে ঘাটতি। নিজেই পুরস্কার প্রাপক। কোন বইয়ের জন্য?–না, বই প্রকাশিত নয় তখনও। বেরুবে। বইয়ের একটি প্রবন্ধ একটি পত্রিকায় মুদ্রিত। তাতে কী! বই প্রকাশিত হবে ভবিষ্যতে। এখনই পুরস্কার নিতে নিতে দোষ কী’।

কলকাতাসহ গোটা ভারতে, তামাম দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় প্রাইভেট স্কুল সাউথ পয়েন্ট (বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় সাউথ পয়েন্টের একাংশ উদ্বাস্তুদের জন্যে বরাদ্দ। বাংলাদেশের অনেক শিক্ষককে চাকরিও দেওয়া হয়)।

স্কুলের মালিক সতীকান্ত গুহ। আদি বাড়ি বাংলাদেশের টাঙ্গাইল।

সতীকান্ত গুহ, উপন্যাস (মূলত ক্রাইম) লেখেন। রবীন্দ্র পুরস্কার পেলেন। তাজ্জব কাণ্ড। মহা হৈচৈ। সংবাদপত্রের অনুসন্ধান রিপোর্টে জানা গেলো, সাউথ পয়েন্টের উপদেশকমণ্ডলির মাথায় কবি সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র, অন্নদাশঙ্কর রায়, নীহাররঞ্জন রায় প্রমুখ। প্রেমেন্দ্র মিত্র নিয়মিত মাসোহারা পান। অন্নদাশঙ্কর রায়ের কন্যা জয়া রায় সাউথ পয়েন্টে শিক্ষিকা। প্রেমেন্দ্র মিত্র, অন্নদাশঙ্কর রায়রা রবীন্দ্রপুরস্কার কমিটির মুখ্যকর্তা।

আনন্দবাজার পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক সন্তোষকুমার ঘোষ (সাহিত্যিক) কড়া উপ সম্পাদীয় লেখেন, বুদ্ধিজীবীদের ‘ঘুষ খাওয়া’ ও ‘ভীমরতি’ নিয়ে। সন্দেহ করা বুদ্ধিজীবীর বুদ্ধিমত্তায়। ‘পদদলিত’ শব্দটিও ব্যবহার করেন। ‘এদের বিবেচনায় আমাদের সাহিত্য নিরাপদ নয়’।

আরেকটি ঘটনা কমল দাশকে একাডেমি পুরস্কার দিয়ে। ভদ্রমহিলা কিচ্ছু লিখতে জানেন না, কিন্তু পুরস্কার পান। ওর স্বামী দেবেশ দাশ, একদা ব্রিটিশ আমলের আইসিএস। কমল-দেবেশ দাশের বাড়িতে নিয়মিত পার্টি, কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের জমায়েত। খানাপিনা ও ঘুষ। আইসিএস-এর সরকারি ও রাজনৈতিক প্রভাব। কমল দাশ একাডেমি পুরস্কার পেয়ে যান।

নজরুল, জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অন্নদাশঙ্কর, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর-মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এমনকী হালের শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাহিত্যে ডিলিট পান না। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পান না। পান জয় গোস্বামী, সুবোধ সরকার। সাহিত্যে। ওরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলের। রাজনীতি, ঘুষ, লোবি (তোষামুদি তথা তৈলমর্দন) আজকের দিনে সাহিত্য পুরস্কার, উপাধি পাওয়া অনায়াস। যোগ্যতার বালাই নেই। যোগ্যতা বিচার্য নয়, কে কত রাজনীতি করবে, নান-কায়দায় ঘুষ দেবে, ঘুষ খেয়ে বিচারক স্ফীত, কৃতার্থ হবে, শেয়ালের কথায় পাগল আর আহাম্মকের সাক্ষ্য বিচার্য।

আমরা, এই বিচারকদের তুচ্ছ জ্ঞান করি। বাংলাদেশের সাহিত্য বিচারকদের এলেম জানা আছে।

বেশি তর্ক করবেন না। এখনও চুপ আছি। কাকে পুরস্কার দিচ্ছেন? কেন? ঘুষ!

–শেয়াল কথকমাত্র।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

সূত্র: বাংলাট্রিবিউন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন