শিরোনাম :

রায় নিয়ে এত তোলপাড় কেন?


বৃহস্পতিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১২:০১ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

রায় নিয়ে এত তোলপাড় কেন?

মোস্তফা হোসেইন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিলেটে হযরত শাহজালাল ( রা.)-এর মাজার জিয়ারত করে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করলেন। বেগম খালেদা জিয়াও ৫ ফেব্রুয়ারি সিলেট গেলেন। যদিও বিএনপি দাবি করেছে, তারা রাজনৈতিক প্রচারণায় নয়, শুধুমাত্র মাজার জিয়ারত করতেই গেছেন। এদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে পুরোদমে। সুতরাং এই মুহূর্তে নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যস্ততা এবং সাধারণ মানুষের দৃষ্টিও সেদিকেই থাকার কথা পুরোদস্তুর। কিন্তু নির্বাচনি উৎসবের সূচনাপর্বটাই কেমন বেসুরো মনে হতে শুরু করেছে।

এরমধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলা দুর্নীতির মামলার রায়ের সময় নির্ধারণের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে গেলো। হাইকোর্টের সামনে বিএনপি দলীয় কর্মীদের পুলিশের ওপর হামলার পর এই পরিবর্তনটা চোখে পড়ে স্পষ্টভাবে। আন্দোলনের নামে বিএনপির কর্মসূচি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হতে থাকে সেই সুবাদে। এদিকে পুলিশের ওপর হামলার পর স্বাভাবিক কারণেই ধরপাকড় শুরু হয়েছে। প্রকাশ্যে না বললেও এটা যে বিএনপিকে দমিয়ে রাখার সুযোগ হিসেবে সরকার গ্রহণ করেছে তা অনেকটা ওপেন সিক্রেট।

ঘটনাক্রমেই বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে দুটি কারণে। প্রথমত, তাদের নেত্রীর বিরুদ্ধে চলা মামলার রায় কী হবে সেটা, দ্বিতীয়ত, পুলিশের ওপর আক্রমণের সূত্র ধরে বিএনপি নেতাকর্মীদের ধরপাকড়ের বিষয়টি। এরমধ্যে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো বিএনপির নির্বাহী কমিটির বৈঠক। পাঁচতারা হোটেলে দলীয় সভা হিসেবে আকর্ষণীয় হওয়ার পরও কর্মীদের উদ্বেগ দৃষ্টির আড়ালে যায়নি। তারা যখন সভায় যোগ দিয়েছে তখনও তাদের তিন কর্মীকে পুলিশ আটক করে নিয়ে যায় হোটেলের সামনে থেকে। অন্যদিকে তাদের সিনিয়র নেতা রুহুল কবীর রিজভী তো গ্রেফতার এড়াতে শেষ পর্যন্ত সভায় যোগ দেওয়া থেকেই বিরত রইলেন।

তারপরও সভা থেকে কোনও নির্দেশনা পাবেন, এমনটা প্রত্যাশা ছিল সর্বস্তরের নেতাকর্মীর। যার ভিত্তিতে ৮ তারিখে রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে তারা নতুন রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করবে। সেই নির্দেশনা কিন্তু তারা পেলেন না। গতানুগতিক ধারায় বিএনপি নেত্রী নির্বাচন ও তার বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ উত্থাপন করলেন। বললেন, তিনি সবসময়ই দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে আছেন। বিএনপির অভ্যন্তরের দলীয় কোন্দলের প্রতি তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। গতানুগতিক ধারায় তিনি বললেন নির্বাচনে যাওয়ার শর্তসমূহ। তবে কয়েকদিন ধরে যেসব নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন,তাদের মুক্তির বিষয়ে জোরালো বক্তব্য রাখতে দেখা যায়নি তাকে। সঙ্গত কারণেই আন্দোলন প্রশ্নে কর্মীদের মধ্যে ধোঁয়াশা রয়েই গেলো। তিনি বেইমানি না করতে যেভাবে গুরুত্ব দিলেন তাতে দলের বাইরের মানুষও বুঝতে পারলো নেতাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে বেশ। ইতিপূর্বে কেন্দ্রীয় এক নেতাও বলে দিলেন,আন্দোলনের ডাক দিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের ঘরে বসে থাকা আর কর্মীদের দুর্ভোগে ঠেলে দেওয়ার মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। সব মিলে দলের অভ্যন্তরে ধোঁয়াশাটা কিন্তু রয়েই গেলো। এমন পরিস্থিতিতে ৮ তারিখে বিএনপি কী কর্মসূচি দেবে তা আর মুখ্য নয় বলেই মনে করছেন কেউ কেউ।

অন্যদিকে রায় ঘোষণার আগেই বিএনপি বলতে শুরু করেছে,বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য সরকার কৌশল গ্রহণ করেছে। তারা বলতে শুরু করেছে, রায় বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে যাবে এবং বেগম জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এমনকি তারা আভাসে ইঙ্গিতে এমনও প্রচার করছে যে, ৮ তারিখেই যেন বেগম জিয়া কারাগারে ঢুকে যাবেন।

যদি বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে ঢুকেও যান তাহলেও কি বিএনপি ধ্বংস হয়ে যাবে? কিংবা বেগম খালেদা জিয়া দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরই কি তার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে? প্রাসঙ্গিকভাবে স্মরণ করা যায়, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কথা। তিনিও আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। তিনি কিংবা তার দলের অস্তিত্ব কি মুছে গেছে? বাস্তবতা হচ্ছে, জেনারেল এরশাদ আবার নির্বাচন করেছেন এবং বড় দুটি দলই তার দ্বারস্থও হয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে।

দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি বেগম জিয়ার আস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ইতোমধ্যে। রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় ৮ ফেব্রুয়ারি। তাদের আন্দোলনের জোরালো সূত্রও এটা। তারপরও তিনি যখন তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে কর্মসূচি দেওয়ার কথা বলেন, একইসঙ্গে কর্মসূচিতে সবাইকে থাকার আহ্বান জানান,সঙ্গত কারণেই বোঝা যায় তিনি আসলে নেতাকর্মীদের আন্তরিকতা বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করেন। তার সন্দেহটাকে শক্তিশালী করে যখন তিনি বলেন,‘যারা বেইমানি করবে, যারা এদিক-ওদিক, এক পা এদিক অন্য পা অন্যদিকে রাখবে, তাদের চিহ্নিত করা হবে। এদের মূল্যায়নের জায়গা থাকবে না। এদের তারাও (সরকারও) নেবে না, আমরাও নেব না। আমরা আগে একবার ক্ষমা করেছি, ক্ষমা বারবার হয় না।...’

দীর্ঘদিন পর্যন্ত দল ভাঙার বিষয়ে যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল সেই গুঞ্জনটাকে ভিত্তি দিচ্ছে কি এই বক্তব্য?

দলীয় প্রধান তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনার পর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়ার কথা বলেছেন। অথচ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের সাড়ে ৪ মাস পর জাতীয় নির্বাহী কমিটি ঘোষণা করতে হয়েছে। আর ২০১৬ সালে কমিটি ঘোষণা হলেও দুই বছর পর প্রথম সভা আহ্বান করেছেন। যদিও প্রতি ছয় মাসে একবার সভা হওয়ার কথা। এমন পরিস্থিতিতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে কীভাবে পরামর্শ করবেন সেটা প্রশ্ন আকারেই থেকে যায়। দলীয় কর্মসূচিবিহীন সময় গেলো, নেতাকর্মীদের দুর্যোগ গেলো এত পরিমাণ, কখনও নির্বাহী কমিটির সভা ডেকেও পরামর্শ নেওয়া হয়নি। আজ যখন বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে চালিত মামলার রায় ঘোষণার দিন ঘনিয়ে এলো, তখন নির্বাহী কমিটি ও জেলা প্রধানদের ডাকা হলো, এটিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

অন্যদিকে ৮ তারিখে যাতে কোনও বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে না পারে সেইজন্য সরকার সতর্ক পথে হাঁটছে। ইতোমধ্যে সরকার বিএনপি নেতাকর্মীদের আটক করতে শুরু করেছে। তারা কাজে লাগাচ্ছে পুলিশের ওপর হামলাকে। যে কারণে এই ধরপাকড়কে সাধারণ মানুষও ওইভাবে সহানুভূতির চোখে দেখছে না।

এমন পরিস্থিতিতে বলা যাচ্ছে না ৮ তারিখ বিএনপির নেতাকর্মীরা রাস্তায় কিছু একটা করতে পারবে। আবার ২০১৩-১৪ সালের মতো জামায়াতি তাণ্ডব ঘটিয়ে ওই পরিস্থিতি তৈরি করবে কিংবা করতে পারবে সেরকমও মনে হচ্ছে না। যুক্তি হিসেবে বিএনপি জামায়াতের নিরাপদ দূরত্বের কথাও বলা যায়। পরিস্থিতির চাপে পড়ে হোক কিংবা অন্য কোনও কারণেই হোক, বিএনপি মহাসচিবকে বলতে হয়েছে জামায়াতে ইসলামী হচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী দল। দায়িত্বশীল মহল থেকে জামায়াতকে এই তকমা দেওয়ার পর সঙ্গত কারণেই জামায়াতের ভেতরেও অসহায়ত্ব তৈরি হয়েছে। তারা বুঝতে পারছে, বিএনপি প্রয়োজনে তাদের দলীয় প্রধান মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে পুনর্বাসিত করার জন্য জামায়াতকে ‘ল্যাঙ’ মারতেও দ্বিধা করবে না। সুতরাং জামায়াত যে আগের মতো তেমন সক্রিয় হবে না এমনটা তো ভাবাই যায়। এমতাবস্থায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তহীনতার মাত্রাটা যেমন বেড়ে গেছে তেমনি কর্মীদেরও ঘরমুখো হওয়ার মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ৮ ফেব্রুয়ারি বড় কিছু ঘটিয়ে ফেলবে এমন চিন্তা মনে হয় বিএনপিও করছে না। তারপরও দেখতে হবে রায় কী হবে এবং বিএনপিও সেটা কীভাবে গ্রহণ করে সেদিকে।

লেখক : সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক

 সূত্র: বাংলাট্রিবিউন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন