শিরোনাম :

খালেদা জিয়ার কয়েদির পোশাক


শুক্রবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

খালেদা জিয়ার কয়েদির পোশাক

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী: গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ মামলার রায় হয়েছে। দীর্ঘ ১০ বছরব্যাপী মামলাটি আইনি প্রক্রিয়ায় ছিল। বেগম খালেদা জিয়ার ৫ বছর জেল হয়েছে, অবশিষ্ট আসামিদের ১০ বছর করে জেল হয়েছে। আর্থিক জরিমানাও হয়েছে। বেগম জিয়া এখন নাজিম উদ্দীন রোডের পুরনো জেলখানায় রয়েছেন। ক্লাস নিয়ে কিছু বিতর্ক হলেও পরে তা মিটে গেছে দেখলাম। তবে কয়েদির পোশাকের বিষয়টি মেটেনি মনে হচ্ছে।

বেগম খালেদা জিয়ার জেলটা সলিটারি কনফাইনমেন্টের মতো। কারণ ৮ হাজার একরের বিশাল এক জেলখানায় তিনি একাই কয়েদি। পেপার পড়ে, টেলিভিশন দেখে দিন কাটাতে হবে। অবশ্য এরপরও বলবো তিনি অনেক সুখে আছেন। পাকিস্তানের সময় শেখ সাহেবকে জেলে রেখেছিলো পাগলা গারদের পাশের রুমে। শেখ হাসিনার সরকার তেমন নির্মম আচরণ করেনি এখনও পর্যন্ত।

বেগম খালেদা জিয়ার গ্রেফতারের পরে দেশে ব্যাপক কোনও গোলযোগ হয়নি। এখন তারা মহাত্মা গান্ধীর অহিংসার পথে আন্দোলন করবে সম্ভবতো। অহিংসার পথও কঠিন পথ। ডান্ডিতে এক টুকরো লবণ নিয়ে গান্ধী ছুড়ে মেরে বললেন এতেই ব্রিটিশের পতন হবে। পতন হোক বা না হোক– পতনের দ্বার প্রান্তে পৌঁছেছিলো। চাউরি চৌরায় পুলিশ হত্যার পর গান্ধী আন্দোলন বন্ধ করে না দিলে তখনই ভারত স্বাধীন হতো।

বৃহস্পতিবারে বাংলা ট্রিবিউনে কলাম লিখি। বিএনপির মামলা আর পরিণতি নিয়ে দুই/তিনটা কলাম লিখেছিলাম। বিএনপি সমর্থকদের গালাগালের সীমা ছিল না। আমাদের যাদের বয়স হয়েছে গত পঞ্চাশ বছরের চিত্র মাথায় আছে তারা নিশ্চয়ই পরিণতি সম্পর্কে আভাস দিতে পারি, উত্তরণের পথ কী হতে পারে তার সম্পর্কে পরামর্শ দিতে পারি। আমরাতো রাজনৈতিক কর্মীদের মতো ‘মিথ্যা মামলা’ বলে স্লোগান তুলতে পারি না। সোজা পথে বিপদের আশঙ্কা থাকলে লম্বা হলেও বাঁকা পথে হেঁটে যাওয়াই ভালো। হয়তবা এমন কথাই বলি। আর দোষকে দোষ বলি।

দোষকে যদি দোষ না বলতে না পারি তবে কলাম লিখেইবা কী লাভ! কলামিস্টরা প্রশংসনীয় কাজের প্রশংসা করবে এবং মন্দ কাজের নিন্দা করবে। এটাই একটা সৎ কলামিস্টের সৎ গুণ। এক চাবি দিয়ে একাধিক তালা খোলার অভ্যাস ভালো নয়। আমাদের মাঝে অনেকে তা করে থাকেন। ২০১৩ সালে ৫/৭টা কলাম লিখে বিএনপিকে নির্বাচনে যোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়ছিলাম। বেগম জিয়া কিছুই শুনলেন না। তাতে বিএনপির লাভ হয়েছে বল মনে হয় না। ২০১৩ সালের আন্দোলনে ৩১৯ জন লোক মরেছে। আর ২০১৫ সালের আন্দোলনে ১৫২ জন লোক মরেছে নিরীহ লোক মেরে কিসের আন্দোলন।

চাউরি চৌরায় ৪ জন পুলিশ হত্যা করেছিলো আন্দোলনকারীরা তাৎক্ষণিকভাবে মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ২০১৩ ও ২০১৫ সালের আন্দোলনে ৪৭১ জন লোকের মৃত্যু হওয়া ছাড়াও অসংখ্য লোক দগ্ধ হয়েছেন। যারা ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে গেছে তারা জানে কী যন্ত্রণায় তারা ভুগেছে। অনেকে মারাও গেছেন। এ নির্যাতিত মানুষগুলো যে দীর্ঘশ্বাস ও চোখের জল ফেলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে নিশ্চয়ই তা কাকেও না কাকেও অভিশপ্ত করে গেছে। ধর্মবিশ্বাসীরা মনে করে নির্যাতিতের অভিশাপে আল্লাহর আরশ কাঁপে।

বিশেষ আদালতের বিজ্ঞ জজ ৬৩২ পৃষ্ঠার সাজানো গোছানো রায় প্রদান করেছেন। রায়টা উচ্চ আদালতেও টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আইনের ফাঁক ফোকরে বের হয়ে গেলে অন্য কথা। ফাঁক ফোকরে বের হওয়াও কোনও বিচারের কথা নয়। এটাও কিন্তু ন্যায় নিষ্ঠার বরখেলাফ। আইন সভ্যতার শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবন। ফাঁক ফোকর দিয়ে গলে আসামি খালাস পেলে তো আইন তার শ্রেষ্ঠত্ব হারালো।

যা হোক, আপিলে শেষ পর্যন্ত কী হয় দেখা যাবে। বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরও নাকি ৩টি মামলার গ্রেফতারি পরোয়ানা ঢাকায় এসেছে। এ মামলাগুলোতে জামিন নিতে হবে। চৌদ্দগ্রামে ৮ ব্যক্তিকে হত্যার যে মামলা হয়েছে তাতে বেগম খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ফাঁসি হয়েছিলো হুকুমের আসামি হিসেবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে যে অসাধারণ তেজ থাকে যাকে সিভিল কারেজ বলে এখন সে তেজ দেখছি না। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তা দেখেছিলাম মানুষের মাঝে। কিছুকেই পরোয়া করেনি মানুষ। ‘ভাঙ ভাঙ’ করে মানুষ সব ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলো।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া অসম্ভব হয়েছিলো। বেগম জিয়ার ব্যাপারেতো মানুষ সেভাবে আসবে না। সুতরাং বিএনপি কৌশলি না হলে এখন যে মুশকিলে বিএনপি পড়েছে তা থেকে মুশকিল আহসান কখনও সম্ভব হবে না। চৌদ্দগ্রামে রাস্তা ওপর ফেলে ইট দিয়ে মেরে মেরে মাথা থেতলিয়ে এক ড্রাইভারকে হত্যা করা হয়েছিলো। আমরা কিভাবে বলি যে এ নিষ্ঠুরতার বিচার হতে পারবে না। ড্রাইভারটা হাতে পায়ে ধরে বিএনপি এবং জামায়াত কর্মীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলো। তারা তাকে ক্ষমা করেনি বরং উল্লাস করে হত্যা করেছিলো। আইন তো কাউকে এভাবে হত্যা করার অধিকার দেয়নি। আইন এখানে যথাযথ তার ভূমিকা পালন না করলেতো আইন অকার্যকর হয়ে যাবে। অনেকে গণতন্ত্রের জন্য সোচ্চার হয়েছেন গণতন্ত্রের প্রাণ হলো আইনের শাসন।

কোনও কোনও পত্রিকায় খবর এসেছে জেলখানায় ডিভিশন দিলেও বেগম খালেদা জিয়াকে কয়েদির পোশাক পরানো হয়েছে। কেউ লিখেছে পরতে হচ্ছে না কারণ ডিভিশন পেলে পোশাক তার পছন্দের মতো পরতে পারবেন। অবশ্য জেল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি এখনও খোলাসা করেনি। বেগম খালেদা জিয়া রাজকীয় মেজাজের মানুষ তার পক্ষে কয়েদির পোশাক মেনে নিতে কষ্ট হওয়ার কথা। আইনের সুযোগ থাকলে আমি এ থেকে তাকে অব্যাহতি দিতে অনুরোধ করবো।

একদিন হযরত আব্দুল কাদের জিলানি (রহ.) এবং এক বুড়ি একটি বনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। বুড়ির পিঠে একটা বোঝা ছিল। হযরত আব্দুল কাদের জিলানি (রহ.) বুড়ির থেকে বোঝাটা নিজে নিয়ে নিলেন। কিছু দূর যাওয়ার পর হযরত আব্দুল কাদের জিলানি (রহ.) এক বাঘ দেখলেন। তিনি বাঘটাকে ডেকে তার পিঠের ওপর বোঝাটা রেখে বাঘকে আদেশ করলেন বোঝাটা অমুক জায়গায় পৌঁছিয়ে দাও। বুড়ি তখন হযরত আব্দুল কাদের জিলানিকে বললেন, ‘তুমি আমার বোঝাটা ফিরিয়ে দাও। তুমি একজন জালেম। বাঘের কাজ বোঝা বহন নয়।’

তখন নাকি হযরত আব্দুল কাদের জিলানি বুঝেছিলেন যে অভ্যাসের বিরুদ্ধে কাজ করানোও জুলুম। সরকারের কাছে একটা বুজুর্গ লোকের দৃষ্টান্ত পেশ করলাম, বেগম খালেদা জিয়াকে তার উছিলায় কয়েদির পোশাক থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য। খালেদা জিয়া গত ৫০ বছর ফ্রান্সের দামী শিপন শাড়ি পরতে অভ্যস্ত। তিনি শিপন শাড়ি পরলেও কয়েদি, কয়েদির পোশাক না পরলেও কয়েদি। এই নিয়ে বাড়াবাড়ি জরুরি না। বাঙালি বড়ই আবেগী জাতি, কয়েদির পোশাকে খালেদা জিয়াকে দেখে আবেগে ভুলে যেতে চাইবেন যে– আইন সবার জন্যই সমান। আর যারা দেশ শাসনে আছেন বা থাকবেন তাদের চরিত্রতো হওয়া উচিত সবার চেয়ে সৎ ও খাঁটি।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

বাংলা ট্রিবিউন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন