শিরোনাম :

ফোর-জি নাকি প্রযুক্তি বৈষম্য?


শনিবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০৯:৩৯ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

ফোর-জি নাকি প্রযুক্তি বৈষম্য?

রেজা সেলিম: দেশে পাঁচ হাজার কোটি টাকার ফোর-জি ইন্টারনেট এসেছে, এই কথা শুনে এক সাংবাদিক বন্ধু বললেন দেশে ফোর-জি আসে নাই, ঢাকায় আসছে, তিন বছর পরে ঢাকার বাইরে যাবে।

ঢাকা-কে নিলামে নিয়ে মোবাইলওয়ালারা দেশ থেকে আলাদা করে দিলো! সব দোষ আমাদের, কারণ আমরা সারাদেশে ন্যায্য দামে, উচ্চগতির ইন্টারনেট দাবি করি। আর সব দোষ আমাদের, কারণ আমরা সংখ্যায় বেশি আর ঢাকার বাইরে থাকি।

ইংরেজিতে ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ বলে একটা কথা বেশ চালু ছিল ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত। কথা ছিল কেমন করে দেশে দেশে প্রযুক্তির এই বিভাজন কমিয়ে আনা যায়। এই নিয়ে দুনিয়াজুড়ে নানারকম কাজ হয়। শ্রেণিবৈষম্য কমাতে যেমন দেশে দেশে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়, যার চাবিকাঠি ছিল সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আর দার্শনিক সমাজের হাতে, সেরকম ডিজিটাল ডিভাইড ঘুচাতে কোনও ব্যবসায়ী বা বিজ্ঞানীদের পাওয়া যায়নি। এই নিয়ে হাতেগোনা কয়েকজন কথা বলতেন যাদের মধ্যে নাইজেরিয়ার ফেন্টম ফাউন্ডেশন নামে এক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার একজন কর্মী (জন দাদা নামে সমধিক পরিচিত), যিনি ২০০০ সালে ইস্তাম্বুলে আইটিইউ-র ‘ইনফরমেশন সোসাইটি’ কেমন হতে পারে তার ঘোষণাপত্রে এই নিয়ে বিস্তর শর্ত জুড়ে দেন। এর আগে কানাডায় ১৯৯৭ সালে গ্লোবাল নলেজ (জিকে) সম্মেলন হয়, সেখানে চেষ্টা করেও ডিজিটাল ডিভাইড-এর চক্রাবর্ত নিয়ে কোনও আলাপ করা যায়নি। ইস্তাম্বুলের ঘোষণার পরে ধনী দেশগুলো নড়েচড়ে ওঠে। মে মাসে জাপানের ওকিনাওয়ায় জি-৮ সম্মেলনে ক্লিনটন সাহেব এই নিয়ে প্রস্তাব তোলেন, যা পরে ডিজিটাল অপরচুনিটি টাস্ক ফোর্সের মাধ্যমে ২০০৩ সালে জাতিসংঘে এসে পৌঁছায়। একটি ঘোষণাপত্র তৈরি করতে সব দেশের সময় লেগেছিল ৩ বছর। ২০০৫ সালে এই ঘোষণাপত্রের চূড়ান্ত অনুমোদন হয়। বাংলাদেশ সেই ঘোষণাপত্র মেনে চলতে প্রতিশ্রুত।

মালয়েশিয়ার তখনকার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ ২০০০ সালেই জিকে-২ সম্মেলনের আয়োজন করে ডিজিটাল ডিভাইড দূর করতে বিশ্ব জনমত তৈরিতে কিছুটা সফল হন। ভারতের কয়েকজন উদ্যোগী ব্যক্তিত্ব এই সময়ে বিশেষ ভূমিকা রাখেন, যাদের কাজের মাধ্যমে দুর্বল দেশগুলো উদাহরণ তৈরি দেখাতে সমর্থ হয়। এক্ষেত্রে পন্ডিচেরিতে স্বামীনাথন ফাউন্ডেশন পরিচালিত ‘গ্রাম কেন্দ্র’ ও মধ্য প্রদেশের ধর জেলায় ‘জ্ঞানদূত’ প্রকল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নেপালে প্রায় একই সময়ে রেডিও সাগরমাথা কমিউনিটি রেডিও প্রচারের উদাহরণ তৈরি করে দক্ষিণ এশিয়ার উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হাজির করে। ২০০২ সালের দিকে বাংলাদেশে আমাদের গ্রাম বাগেরহাট জেলার রামপালে ‘জ্ঞান কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করে ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ সংকোচনে ভূমিকা রাখতে শুরু করে। ডি-নেট-সহ বেশ কিছু সংস্থা ২০০১ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে উন্নয়ন খাতে তথ্য-প্রযুক্তির ভূমিকা নিয়ে যথেষ্ট কার্যকরী উদাহরণ তৈরি করতে সমর্থ হয়। আমাদের গ্রাম ও ডি-নেট এ সময়ে জাতিসংঘসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের আইসিটি পুরস্কার অর্জন করে।

বাংলাদেশে মোবাইল ফোন প্রসারণ, ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনা ও তথ্য প্রযুক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট নীতিমালাগুলো খুব বেশি দিনের নয়। যেহেতু উদাহরণ তৈরিতে বাংলাদেশ ভূমিকা রাখতে সমর্থ হয় ফলে নীতিগুলো রচিত হতে খুব বেশি সময় প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের তথ্য-প্রযুক্তি নীতিমালা, সংশ্লিষ্ট ব্রডব্যান্ড নীতিমালা বা ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনা নীতি আমরা হালনাগাদ করতে পারছি না। এর অন্যতম প্রধান কারণ এই খাত সম্পূর্ণ ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রকদের হাতে চলে গেছে। ফলে উদ্ভাবনের নামে শুরু হয়েছে প্রতিযোগিতা, যেখানে প্রযুক্তির অসম বিস্তরণ ঘটেছে কিন্তু বিশ্ববাজারে উল্লেখ করার মতো কোনও দৃষ্টান্ত আমরা তৈরি করতে পারছি না। প্রতি বছর ডব্লিউএসআইএস যে পুরস্কার দেয় যার অনেকগুলো বাংলাদেশ সরকারের নানা প্রকল্প-সহ কয়েকটি বেসরকারি উদ্যোগও পেয়েছে, সেগুলো ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে, উদ্ভাবন হিসেবে নয়। উদ্ভাবন হলে ইতোমধ্যে অন্তত একটি প্রকল্পে বাংলাদেশ স্টার্টআপ স্ট্যাটাস অর্জন করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে পারতো। আমাদের মনোযোগ কেমন করে টাকার অঙ্কে হিসাব কষে দেখানো যায় আমরা কতদূর এগিয়েছি, কিন্তু আমরা এটা ভাবি না অন্যের কাজ করে দিয়ে টাকা বা মুনাফা অর্জন সব ক্ষেত্রে হলেও তথ্য-প্রযুক্তি ক্ষেত্রে একে কোনভাবেই উদ্ভাবন বলা যাবে না। মিলিয়ন ডলারের হিসাব দিয়ে কী হবে যদি আমি প্রমাণ করতেই না পারি যে আমাদের দেশের সব মানুষের কাছে ইন্টারনেট আছে, যারা কাজ করতে চায় তাদের কাছে চাহিদা অনুযায়ী উচ্চগতির নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট পৌঁছে দেয়া হয়েছে। আমরা এখনও আমাদের স্কুলগুলো পর্যন্ত ভালোমানের ইন্টারনেট আর বিদ্যুৎ দিয়ে নিরাপদ রাখতে পারছি না, যাতে প্রশ্নফাঁসের মতো ভয়াবহ ঘটনা না ঘটতে পারে। আমরা বলতে পারছি না আমাদের ইন্টারনেট চাহিদা ঠিকমতো জানি, কোথায় কী দরকার হবে আর আমরা তা নিশ্চিত করতে পেরেছি। তা না করে, তরুণদের এক ভুল স্বপ্নে আমরা আঘোর বিপদে ফেলে দিচ্ছি। সবচেয়ে বড় ভুল করে ফেলেছি আবার, এত সতর্ক কথার পরেও, উচ্চগতির ৪-জি আমরা দিচ্ছি শুধু ঢাকা শহরে, যা করে আমরা এতকাল পরে এত কাজ করেও ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ সৃষ্টিকারী দেশ হিসেবে এখন থেকে পরিচিত হবো। ঢাকার বাইরের তরুণদের আমরা প্রযুক্তি বৈষম্যের দেশের অবহেলিত ইন্টারনেট অধিকার নিয়ে ভেবে ভেবে মনমরা হয়ে বসে থাকতে দেখবো।

লেখক: পরিচালক, আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্যে তথ্য প্রযুক্তি প্রকল্প

rezasalimag@gmail.com

source: bangla tribune

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন