শিরোনাম :

বাঙালি জাতিসত্তার চেতনায় ভাষার মাস


সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০৪:২০ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

বাঙালি জাতিসত্তার চেতনায় ভাষার মাস

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: শেষ হয়ে আসছে ভাষার মাস। এই ফেব্রুয়ারি মাসটি নানা কারণে আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে যেগুলো উল্লেখ না করলেই নয়, তার মধ্যে অন্যতম ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলন। এটি প্রকৃতপক্ষে ছিল, মওলানা ভাসানী প্রতিষ্ঠিত ‘আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন। তবে এর গুরুত্ব ছিল অন্যখানে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যখন বলেন, পূর্ব পাকিস্তান ৯৮% স্বায়ত্তশাসন পেয়েই গেছে, অর্থাৎ পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রয়োজন অস্বীকার করেন এবং আমেরিকার আনুকূল্যে গিয়ে জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির বিপক্ষে অবস্থান নেন, তখনই এই ফেব্রুয়ারি মাসেই এই কাউন্সিল অধিবেশন ডাকা হয়। মূলত, এই সম্মেলনে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই ফেব্রুয়ারি মাসেই ১৯৮৩ সালের ১৪ তারিখে, স্বৈরাচারী সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান দিলোয়ার ও দীপালীসহ কয়েকজন। এখন অবশ্য আমদানিকৃত তথাকথিত ‘ভালোবাসা দিবস’-এর ফূর্তির আবরণ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে সেই আত্মদানের ইতিহাস। এই মাসের আরও কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে রয়েছে, ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা, বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ঐতিহাসিক ৬ দফা ঘোষণা, ১৯৯১-এর নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা, ২০০৯ সালের রক্তাক্ত কলঙ্কিত পিলখানা হত্যাকাণ্ড।

তবে সব ছাপিয়ে ফিরতে হয় একুশে ফেব্রুয়ারির বিষয়ে। আগেই অন্য পর্বে বলেছি যে, রাজনৈতিক নেতাদের চোখে এটা ছিল হঠকারিতা। এর পেছনে মূল কারণ ছিল চেতনাগত। মাত্র ৫ বছর আগে মুসলিম লীগ করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করা নেতাদের কাছে, পাকিস্তান জাতিসত্তার ভুঁই ফুঁড়ে বাঙালি জাতিসত্তার জাগরণ মেনে নেওয়া তাদের জন্যে কঠিন ছিল বৈকি? যে কারণে কাগমারি সম্মেলনের প্রয়োজন হয়েছিল।

যারা হইতো এই দেশেরই জিন্না লিয়াকত

বাইছা বাইছা মারলো রে সেই জাতির ভবিষ্যৎ।

এটা আমার রচিত নয়। একুশের রক্তাক্ত আন্দোলনের পর শোকগাথা লিখতে গিয়ে এক চারণকবি রচিত দীর্ঘ গানের এটি ছিল একটি অন্তরা। এখন অবশ্য এই পঙ্‌ক্তিদ্বয় বাদ দিয়েই গানটি গাওয়া হয়। এ থেকে একটা কথা বোঝা যায়, শুধু নেতারাই নন, সাধারণ মানুষের মধ্যেও নেতার প্রতীক হিসেবে ছিল জিন্নাহ (পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ) ও লিয়াকত (পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান)।

কিন্তু ঘটনার শুরু তো এখান থেকে নয়, ১৯৪৭-এর আগে থেকে। যখন প্রস্তাব উঠেছিল সংযুক্ত বাংলার স্বাধীনতার। এই আন্দোলন বেশ জোরদার হয়ে উঠেছিল। বাঙালি মুসলমান সেটাই চেয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয়, জিন্নাহ সাহেবও বাংলার স্বাধীনতার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। কিন্ত জাত-পাতের কঠিন বিভাজনের মাথা ব্রাহ্মণদের কাছে এটা ছিল কল্পনাতীত। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো কট্টর সাম্প্রদায়িক ব্রাহ্মণের কাছে বাংলার স্বাধীনতার চেয়ে হিন্দির গোলামি করা ছিল অনেক শ্রেয়। তারই প্ররোচনায় পশ্চিমবঙ্গের স্বাধীনতা আন্দোলন হয়ে ওঠে মন্দিরকেন্দ্রিক। এটা ছিল মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করার সক্রিয় ও সফল প্রয়াস। আর এর একমাত্র কারণ ছিল, যুক্ত বাংলা স্বাধীন হলে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যেতো। সে সময় যুক্তবাংলা স্বাধীন হওয়ার আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তাদের প্রাণনাশের আহ্বান জানিয়ে কুৎসিত গালি সংবলিত পোস্টারিং হয়েছে কলকাতার রাস্তার দেয়ালে দেয়ালে।

সে যাই হোক, শ্যামাপ্রসাদ বাবু গান্ধীজি, পণ্ডিত নেহেরু, বল্লভভাই প্যাটেল প্রমুখকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, এটা বাঙালি বর্ণহিন্দুদের জন্যে ক্ষতিকর। নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সঙ্গে মুসলমানদের কোনও বিবাদ ছিল না। কারণ, সমগ্র ইংরেজ আমলজুড়েই এই হিন্দু-মুসলমান ছিল বর্ণহিন্দুদের দ্বারা শাসিত ও শোষিত। সেই জন্যেই শ্যামাপ্রসাদ ধর্মকে সামনে টেনে এনে বিভাজন সৃষ্টিকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে সার্থক হন। কিন্তু বাঙালি মুসলমান যখন দেখলেন যে যুক্তবাংলা স্বাধীন হওয়া আর সম্ভব নয়, তখন নিরুপায় হয়েই তারা পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দেন। ভারতের সঙ্গে যে থাকা সম্ভব নয়, তা বুঝতে তাদের অসুবিধা হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সময়ই, রবীন্দ্রনাথসহ সমগ্র শিক্ষিত বর্ণহিন্দুর প্রবল বিরোধিতা থেকেই তারা বুঝেছিলেন যে, মুসলমানদের শিক্ষার পথ তারা রুদ্ধ করে রাখতে চান। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও তাকে নানাভাবে পঙ্গু করে রাখা হয় বহুদিন। অতএব পূর্ববঙ্গ ভারতভুক্ত থাকলে মুসলমানেরা কখনোই আত্মপরিচয়ে দাঁড়াতে যে পারতো না, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না।

১৯৪৭এ পূর্ববঙ্গবাসী মুসলমানদের পাকিস্তানভুক্ত হওয়াকে যারা ভুল মনে করেন, তাদের ভণ্ডামি দেখলে হাসি পায়। ১৯৪৭ এদেশের মানুষের জন্যে আশীর্বাদ হয়েই এসেছিল। তবে সেটা পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ হওয়ার জন্যেই নয়। বরং পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে হাজার মাইলের ব্যবধান থাকার কারণে। এই ব্যবধানের জন্যেই, করাচি, লাহোর, ইসলামাবাদের সংস্কৃতি আমাদের ওপর সরাসরি কোনও প্রভাবই ফেলতে পারেনি। এখানে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে যেমন পশ্চিমপাকিস্তানি প্রভাবমুক্ত হয়ে, তেমনি কলকাতার প্রভাবকেও অস্বীকার করে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০, মাত্র এই ২২-২৩ বছরে, বিস্ময়করভাবে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবিরা যেমন এই মাটি থেকেই উঠে দাঁড়িয়েছেন, তেমনি বিকশিত হয়েছে গদ্যসাহিত্যও। চারুকলায়, শিল্পকলায়, নাটকে অর্থাৎ সৃজনশীলতার প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘটেছে এক স্বতন্ত্র কিন্তু সম্পূর্ণ উত্থান। ভাষার জন্যে আন্দোলন তাই এই বঙ্গেই জাতিসত্তার চেতনা নিয়ে সূচিত ও সম্পূর্ণ হতে পেরেছে।

দীর্ঘকাল ধরে বাংলা ভাষা-সাহিত্যের কেন্দ্র কলকাতা হওয়ার পরও সেখানে কেন ভাষা আন্দোলন সংঘটিত হতে পারেনি, তার কারণ বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে, ভারতীয় বঙ্গ থেকে স্বতন্ত্র এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে দূরত্ব আমাদের মাথা তুলে দাঁড়ানোর জন্য কতটা সহায়ক হয়েছিল।

ভারতীয় জাতিসত্তা নয়, পাকিস্তানি জাতিসত্তা নয়, স্বাধীন বাংলাদেশের জাতিসত্তাতেই আমাদের আজকের অস্তিত্বের সম্পূর্ণতা। যার উন্মেষ ঘটেছিল ১৯৪৮ সালে বিস্ফেরণ ঘটেছিল ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে।

লেখক: কবি ও কলামিস্ট

source: bangla tribune

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন