শিরোনাম :

ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলায় প্রয়োজন কঠোর নজরদারি


মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০৫:০১ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলায় প্রয়োজন কঠোর নজরদারি


কাওসার রহমান : দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি হচ্ছে ব্যাংক। যে দেশের ব্যাংকিং খাত যত বেশি শৃঙ্খল ও শক্তিশালী সে দেশের অর্থনীতিও তত বেশি শক্তিশালী। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠলেও ব্যাংকিং খাত যেন দুর্বল হয়ে পড়ছে। শৃঙ্খলার লেশমাত্র নেই এ খাতে। সেই আশির দশকের মতো এক বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছে ব্যাংকিং খাতে। সেই ব্যাংক পরিচালক ও প্রভাবশালীদের দ্বারা ব্যাংক লুটপাট চলছেই। এত আইন হলো, এতবার ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন হলো, কিন্তু থেমে নেই ব্যাংকিং খাতের অর্থ লুটপাট। একের পর এক ঘটেই চলেছে হলমার্ক ঋণ কেলেঙ্কারি, বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারি, বেসিক ব্যাংক লুটপাট, ফারমার্স ব্যাংকের ঋল কেলেঙ্কারি এবং সর্বশেষ উদ্ভাবিত জনতা ব্যাংকে ইউনূস বাদলের বৃহত্তম ঋণ কেলেঙ্কারি। সরকারি হোক আর বেসরকারি হোক, এসব ব্যাংকে ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটছে ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালক ও কর্মকর্তাদের যোগসাজশে।

বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকরা আরও বেপরোয়া। তাদের ঋণ কেলেঙ্কারির পর্যায়ে না পৌঁছালেও হালে তারা নানা ফন্দিফিকির করে ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন গ্রাহকদের অর্থ। এখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে, পরিচালকরা ব্যাংক করতে গিয়ে যে টাকা বিনিয়োগ করেছেন তার দ্বিগুণেরও বেশি অর্থ তুলে নিয়েছেন। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতের উদ্যোক্তারা এখন পুঁজি ছাড়াই ব্যবসা করছেন। কোনো কোনো উদ্যোক্তা এক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আরেক ব্যাংকের মালিক হয়েছেন। কেউ কেউ বিনিয়োগ করা টাকার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি অর্থ ঋণ নিয়েছেন। অর্থাৎ যাদের ব্যাংকের মালিক বলা হচ্ছে, পুরো ব্যাংকিং খাতে তাদের একটি টাকাও নেই। বরং পরিচালক পরিচয়ে তারা আমানতকারীদের জমানো টাকার ভেতর থেকে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা সরিয়ে ফেলেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে পরিচালকদের বিনিয়োগ মাত্র ৪৬ হাজার ১২৪ কোটি টাকা। এই অর্থ ব্যাংকগুলোর শেয়ারহোল্ডার বা মালিকদের জোগান দেওয়া মূলধন হিসেবে বিবেচিত হয়। এই মূলধন বিনিয়োগের বিপরীতে পরিচালকরা ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে তুলে নিয়েছেন এক লাখ ৪৩ হাজার ৭০৭ কোটি টাকারও বেশি। এ সময়ে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের ঋণ দিয়েছে সাত লাখ ৫২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে আমানতকারীদের ৯ লাখ ৮৪ হাজার ৮১৪ কোটি টাকারও বেশি অর্থ রয়েছে। এই টাকা থেকে ঘোষণা দিয়ে নেওয়া ঋণের বাইরে পরিচালকরা আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব বা অন্য কারও নামে আরও প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন।

ব্যাংকগুলোর পরিচালকের সংখ্যা এখন প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি। এর মধ্যে সমঝোতাভিত্তিক বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছেন শতাধিক পরিচালক। তারা একজন আরেকজনের ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। এই পরিচালকরা ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন ১১ হাজার ৯১০ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংক থেকে নিয়েছেন ৯ হাজার ১০৬ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংক থেকে নিয়েছেন ৮ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে নিয়েছেন ৬ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে নিয়েছেন ৬ হাজার কোটি টাকা, ব্যাংক এশিয়া থেকে নিয়েছেন ৫ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা ও ঢাকা ব্যাংক থেকে নিয়েছেন ৫ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। এর বাইরে আরও ৫০টি ব্যাংক থেকে পরিচালকরা প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন।

এই পরিচালকরা বেপরোয়াভাবে ঋণ নেওয়ার কারণে ঝুঁকিতে রয়েছেন ব্যাংকের আমানতকারীরাই। ব্যাংকিং খাতে যে খারাপ সংস্কৃতি চলছে, এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন পরিচালকরাই। একজন ছয় থেকে সাতটি ব্যাংকের মালিক। এতে নিশ্চিত করে বলা যায়, ওই ব্যক্তি এক ব্যাংকের ঋণ নিয়ে আরেক ব্যাংকের মালিক হয়েছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের ব্যাংকিং খাত। আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দেশের ভালো শিল্প উদ্যোক্তারা। কারণ পরিচালকরা যখন মিলে-মিশে ব্যাংকের সব ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করেন, তখন বিভিন্ন খাতের ভালো শিল্পোদ্যোক্তারা চাহিদা অনুযায়ী ঋণ পান না। আবার ঋণ পেলেও সুদের হার অনেক বেড়ে যায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন তারা। বিশেষ করে যারা সত্যিকার অর্থে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে চান, তারাই বেশি বিপাকে পড়েন। এছাড়া পরিচালকদের অনিয়মের খেসারতও দিতে হয় ভালো উদ্যোক্তাদের।

পরিচালকরা বিনিয়োগের চেয়ে বেশি অর্থ তুলে নেওয়ায় ব্যাংকিং খাত নতুন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। কারণ ব্যাংকে যখন পরিচালকের নিজের কোনো বিনিয়োগ থাকবে না, তখন ব্যাংকের প্রতি তার দরদও কম থাকবে। এতে ব্যাংকটি যেকোনো সময় বিপদে পড়তে পারে। এরই মধ্যে আবার ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে একসঙ্গে এক পরিবারের চার সদস্যের থাকার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এতটাই সক্রিয় যে, ওই আইন পাস এবং রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অনুমোদিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কার্যকরেরও নির্দেশ দিয়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো এক সার্কুলারে বলা হয়েছে, ব্যাংক-কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০১৮ (২০১৮ সালের ০৪ নং আইন) ২০১৮ সালের ২৮ জানুয়ারি কার্যকর হয়েছে এবং একই তারিখে বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। উক্ত আইনের ধারা অনুযায়ী ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ধারা ৩, ধারা ৭, ধারা ৮, ধারা ১৫, ধারা ১৫কক, ধারা ১০৯ এবং ধারা ১১৮-এর বিধানগুলোয় কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। পরিবর্তিত বিধানগুলোর নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট সবার অবগতি ও পরিপালন নিশ্চিত করতে ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০১৮-এর গেজেট মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হলো। এছাড়া প্রত্যেক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরবর্তী সভায় ব্যাংক-কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০১৮ অবগতির লক্ষ্যে উপস্থাপনের জন্যও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সার্কুলারে।

গত ১৬ জানুয়ারি জাতীয় সংসদের বাইরে সমালোচনা এবং সংসদে বিরোধীদলীয় সদস্যদের ওয়াক আউটের মধ্যে সংশোধন হয়েছে ব্যাংক কোম্পানি আইন। এতে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে একসঙ্গে এক পরিবারের চার সদস্যের থাকার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা ব্যাংকগুলোতে ‘পরিবারতন্ত্র’ কায়েমের পথ তৈরি করেছে। এতে অর্থনীতির মেরুদ- হিসেবে বিবেচিত ব্যাংকিং খাতে বিদ্যমান সংকট আরও বাড়াবে বৈ কমবে না। সেই সঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়বে দেশের অর্থনীতিও।

তাছাড়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন, এটা তার সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন একটি বৈষম্যহীন সমাজ। এ জন্য তিনি পাকিস্তান আমলে ২২ পরিবারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন। ব্যাংক আইন সংশোধনের মাধ্যমে পরিচালনা পর্ষদে চারজনকে রাখার সুযোগ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সেই ‘২২ পরিবার’ তৈরির বীজ রোপিত হয়েছে।

এটা স্বাভাবিকভাবেই বলা যায় যে, পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের চারজন সদস্য থাকার কারণে এর ওপর ওই পরিবারের নিয়ন্ত্রণ আরোপ হবে। এতে ঋণদান এবং ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে সঠিক মানদ- বজায় থাকবে না। এমনিতেই বর্তমানে ব্যাংকিং খাত নানা সমস্যায় জর্জরিত। এ খাতে সুশাসনের অনেক ঘাটতি। এর মধ্যে এই সংশোধনীর কারণে সংকট আরও বাড়বে।

এতদিন একই পরিবারের দুই পরিচালকের সময়ে দেখা গেছে, পরিচালকরা কেবল ব্যাংক ব্যবসা করছেন না, তারা পুরো ব্যাংক খাতকে নিয়ন্ত্রণও করছেন। অনেক সময় দেখা গেছে, পরিচালকদের পছন্দের লোক ছাড়া ঋণই দেওয়া হয় না। এখন একই পরিবারের চার পরিচালকের ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলোর অবশিষ্ট সুশাসনও ধ্বংস হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। নতুন ব্যাংক কোম্পানি আইনে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হলে এবং ব্যাংকের কার্যক্রমে পরিচালকদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারির কোনো বিকল্প নেই।

উল্লেখ্য, গত ১৬ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে পাস হয় ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) বিল-২০১৮। এই বিলে বলা হয়েছে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকতে পারবেন একই পরিবারের চার সদস্য। আগে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের দুজন সদস্য থাকতে পারতেন। এছাড়া সংশোধিত আইনে একজন পরিচালক ৬ বছরের স্থলে ৯ বছর দায়িত্বে থাকতে পারবেন।

বর্তমানে দেশে মোট ৫৭টি ব্যাংকে আমানত রাখা ১০ কোটি হিসাবধারী রয়েছেন। তাদের আমানত নিয়েই মূলত ব্যাংকগুলো ব্যবসা করছে। অথচ সেই আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা না করে স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে পরিচালকদের। তাদের সুদ বা মুনাফা কম দিতে গেলেই ব্যাংকগুলোর সমস্যা হয়, কিন্তু নিজেরা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ নিতেও কার্পণ্য করেন না। তাই পরিচালকদের স্বার্থ রক্ষার আগে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা প্রয়োজন। প্রয়োজনে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে পরিচালকদের লভ্যাংশ নেওয়ার বিধান পরিবর্তন করা দরকার। পরিচালকদের লভ্যাংশের বিষয়টি স্ব স্ব ব্যাংকের আমানতের সুদের হারের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে। যাদের অর্থ দিয়ে ব্যাংক ব্যবসা করবে তাদের যদি কম সুদ দিতে হয় তাহলে পরিচালকরাও কম লভ্যাংশ নেবে। অর্থাৎ কোনো বছর আমানতের সুদের চেয়ে বেশি অর্থ লভ্যাংশ হিসাবে শেয়ারহোল্ডাররা নিতে পারবে না। লভ্যাংশ নেওয়ার পর মুনাফার বাকি অর্থ মূলধন হিসাবে ব্যাংকে জমা থাকবে। সরকারের এখন সেদিকে নজর দেওয়া উচিত। সেই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে অর্থনীতির মেরুদ-কে আরও শক্তিশালী করা উচিত। তা না হলে বর্তমান সরকারি বিনিয়োগ হ্রাস পেলে তাসের ঘরের মতো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ধসে পড়বে।

কাওসার রহমান: নগর সম্পাদক, দৈনিক জনকণ্ঠ

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন