শিরোনাম :

রোহিঙ্গা প্রশ্নে আর কত মানবিক হবো


সোমবার, ৫ মার্চ ২০১৮, ০৪:১৯ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

রোহিঙ্গা প্রশ্নে আর কত মানবিক হবো

রেজানুর রহমান: রেজানুর রহমানএই পৃথিবীতে মানুষ একমাত্র মানুষই বোধকরি অসহায় প্রাণী। মিয়ানমারের নির্যাতিত অসহায় মানুষদের দেখে সে কথাই বারবার মনে পড়ছে। একবার কল্পনা করুন তো বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের মাঝামাঝি এলাকায় যাকে বলা হয় ‘নো-ম্যানস ল্যান্ড’ সেখানে আশ্রয় নিয়েছে কয়েক হাজার অসহায় দুঃখী রোহিঙ্গা। বাংলাদেশে ঢোকার পথ পাচ্ছে না তারা। আবার নিজের দেশ মিয়ানমারে ঢোকারও সুযোগ নেই। বরং মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এই অসহায় মানুষগুলোর দিকে বন্দুক তাক করে রেখেছে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে মিয়ানমার তার প্রতিবেশীর সীমান্তরেখায় উত্তেজনা ছড়াচ্ছে।

ব্যাপারটা অনেকটা এরকম–পাশাপাশি দুটি বাড়ি। এক বাড়ির মহিলা স্বামীর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে পাশের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। মানবিক বিবেচনায় এই মহিলাকে আশ্রয় দিয়েছে পাশের বাড়ির লোকজন। এই নিয়ে গ্রামে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়ে গেলো। মহিলাকে আশ্রয় দেওয়ায় গ্রামের ছোট-বড় প্রায় সব বাড়ি থেকেই ‘পাশের বাড়ির’ লোকজনকে সাধুবাদ জানানো হলো। কিন্তু মহিলাকে তার স্বামী নির্যাতন করেছে একথা বলতে অনেকেই নারাজ। বরং মহিলারই দোষ খুঁজতে থাকলেন অনেকে। কেউ কেউ মহিলার বিয়ে বৈধ নাকি অবৈধ এ নিয়েও প্রশ্ন তুলতে শুরু করলেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ গেলো।

তিনি বললেন, আমি ব্যাপারটা দেখতেছি। একটা চাপ শুরু হলো অত্যাচারী স্বামীর বিরুদ্ধে। একদিন বাধ্য হয়ে অত্যাচারী স্বামী বলল, আমাকে একটু সময় দেন। আমি অচিরেই ব্যাপারটা সমাধান করবো। মোটামুটি একটা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরও হলো। মহিলাকে ফিরিয়ে নেবেন তার অত্যাচারী স্বামী, কিন্তু স্ত্রীর ভয় কাটেনি। তার ধারণা, স্বামীর ঘরে ফিরে গেলেই আবার নির্যাতন শুরু করবে। এই যখন অবস্থা তখন দেখা গেলো মহিলার ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বাড়িছাড়া করেছে অত্যাচারী স্বামী। অসহায় বাচ্চারা কোথায় যাবে? দুই বাড়ির মাঝখানে শূন্য ভিটায় বসে তারা কাঁদছে। অত্যাচারী স্বামীর সেদিকে মোটেও মায়া নেই। বরং সে লাঠিয়াল বাহিনীকে খবর দিয়েছে। দুই বাড়ির মাঝখানে ফাঁকা জায়গায় লাঠিয়াল বাহিনী মহড়া দিচ্ছে। যেন গায়ে পড়ে ঝগড়া বাধাতে চায় পাশের বাড়ির সাথে...।

প্রিয় পাঠক, গল্পটা আপনাদের কাছে কেমন লাগল জানি না। কিন্তু একটি বিষয়ে নিশ্চয়ই একমত হবেন, মিয়ানমার সরকার আমাদের সঙ্গে এক ধরনের লুকোচুরি খেলায় লিপ্ত হয়েছে। মুখে বলছে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে মুখের কথা টিকছে না। বরং মনে হচ্ছে মিয়ানমার সরকার গায়ে পড়ে একটা ঝামেলা বাধাতে চাচ্ছে। যাকে বলে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া লাগানোর চেষ্টা। বাংলাদেশ নিশ্চয়ই মিয়ানমারের এই দুরভিসন্ধির জালে পা ফেলবে না। কিন্তু ধৈর্যের একসময় বাঁধ ভেঙে যায়। মানবিক বিবেচনায় আমরা প্রতিবেশী দেশের দশ লক্ষাধিক অসহায় রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছি। কিন্তু আমাদের সামর্থ্যের কথাও তো ভাবতে হবে। আমরা কতদিন এই অসহায় মানুষগুলোকে দেখে শুনে রাখতে পারবো?

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ইতিপূর্বে যে ধরনের সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে তাতে তো পরিস্থিতি এতদিনে শান্ত হওয়ার কথা ছিল। যে মুহূর্তে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে সমঝোতার কথা বলা হচ্ছে সেই মুহূর্তে তো আশা করাই যায় নতুন করে আর কোনও রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকবে না। অথচ প্রায় প্রতিদিনই অসহায় রোহিঙ্গার দল বাংলাদেশে ঢুকছে। উপরন্তু হঠাৎ করেই মিয়ানমার তার সীমান্তে সেনা মোতায়েন করেছে এবং অস্ত্রের মহড়াও করছে। ২ মার্চ দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকার শিরোনাম দেখলেই যে কেউ আঁতকে উঠবেন। একটি দৈনিক পত্রিকার শিরোনাম ‘সীমান্তে মিয়ানমারের সেনা সমাবেশ’। আরেকটি পত্রিকা লিখেছে ‘সীমান্তে সেনা, অস্ত্রের মহড়া মিয়ানমারের’। ৩ মার্চের পত্রপত্রিকায় পাওয়া গেলো আরও ভয়াবহ তথ্য। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে এক পতাকা বৈঠকে মিয়ানমার বলেছে, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষায় তারা বর্ডারে নিজেদের সৈন্য মোতায়েন করেছে। গুলি করার কথা তারা অস্বীকার করেছে। এটাকেই বলা হয় রাষ্ট্রীয় মিথ্যাচার। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষায় পাশের দেশের বর্ডারের পাশেই আইনশৃঙ্খলা জোরদার করার মানে কী? গুলির শব্দ পাওয়া গেলো। অথচ বলা হচ্ছে গুলি করিনি আমরা।

এসব ভেবেই আশঙ্কা হচ্ছে, মিয়ানমার আসলে কী চাচ্ছে? যৌথ পতাকা বৈঠকের পর মিয়ানমার বর্ডারে শূন্যরেখা থেকে একটু দূরে তাদের সৈন্য সরিয়ে নিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে পরিস্থিতির বোধকরি উন্নতি হয়েছে। বাস্তবতা কি তাই বলে? অনেক ব্যাপারে আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার সাম্প্রতিক সময়ে যে আচরণ করছে তাতে সহজেই অনুমেয় সহসাই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তাহলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিয়ে আমরা কী করবো? তারা এখন যেখানে আছে বর্ষাকালে তারা কি সেখানে থাকতে পারবে? কালবৈশাখি ঝড়ের সময় তাদের কী হবে? দিনে দিনে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মনস্তাত্ত্বিক লড়াই বাড়ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর তুলনায় আশ্রিত এলাকায় রোহিঙ্গাদের সংখ্যা এখন তুলনামূলকভাবে বেশি। রোহিঙ্গারা যদি দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় থাকে তাহলে ভবিষ্যতের পরিবেশ কেমন হবে? অভিযোগ উঠেছে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অনেকেই ইয়াবাসহ মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত হচ্ছে অথবা তাদের এই অন্যায় কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। সহসাই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না হলে ওই এলাকায় অবৈধ মাদক ব্যবসা হয়তো বেড়ে যাবে। লাখ লাখ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ কর্মহীন অবস্থায় ক্যাম্পে সময় কাটান। সে কারণে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এরা কেউ অর্থের লোভে পড়ে কোনও জঙ্গিগোষ্ঠীতে জড়িয়ে পড়বে না তো? েএ বিষয়গুলো নিশ্চয়ই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে আছে। তবুও আশঙ্কা হয়। মানবিক বিবেচনায় সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকেই তো আমরা আশ্রয় দিয়েছি। ‘মানবতার জয় হোক’। এটাই সমবেত প্রার্থনা...।

লেখক: সাংবাদিক, নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন