শিরোনাম :

৭ মার্চের ভাষণ: এক কবির সাতরঙা কবিতা


বুধবার, ৭ মার্চ ২০১৮, ০২:৫১ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

৭ মার্চের ভাষণ: এক কবির সাতরঙা কবিতা

কমলেশ রায়: সাত সংখ্যাটির আলাদা মাহাত্ম্য আছে। আমাদের জীবনে, আমাদের যাপনে। আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যে। সুরের স্বরগ্রাম সাত সুরে বাঁধা। সপ্তাহ সাতদিনে। সাত নক্ষত্র, সপ্তর্ষি। সাত রং, সাত সাগর, সাতপুরুষ, সাতনরী হার, সাতপাঁচ, সাতসতেরো...। আমাদের গর্বের সাত বীরশ্রেষ্ঠ। আর কালজয়ী ৭ মার্চের ভাষণ। ঐতিহাসিক, আজও সমান অনুপ্রেরণার।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান (তখনকার রেসকোর্স ময়দান)। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিয়েছিলেন এই ভাষণ: ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ অনবদ্য, অভূতপূর্ব! এ কি শুধুই ভাষণ? না, অবশ্যই তার চেয়ে বেশি কিছু। এটি একটি কালোত্তীর্ণ কবিতা। আর বঙ্গবন্ধু হলেন ‘রাজনীতির কবি’। ‘নিউজউইক’ ম্যাগাজিন জাতির পিতাকে দিয়েছিল এই অ্যাখ্যা। আরও বড় স্বীকৃতি মিলল ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর। ইউনেস্কো দিয়েছে এই স্বীকৃতি। এই ভাষণ এখন ঐতিহাসিক দলিল। ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ইউনেস্কোর ‘মেমোরি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’।

ঢাকা ছিল সেদিন অন্যরকম। বদলে যাওয়া এক নগরী। মিছিলের শহর। দলে দলে মানুষ সমবেত হয়েছিল রেসকোর্স ময়দানে। মানুষ এসেছিল দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে। মুহুর্মুহু গর্জন। লাখো বিক্ষুব্ধ মানুষ। হাতে বাঁশের লাঠি। বাতাসে উড়ছে বাংলার মানচিত্র আঁকা পতাকা। বিকেল ৩টা ২০ মিনিট। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি আর হাতাকাটা কালো কোট পরে মঞ্চে ওঠেন বঙ্গবন্ধু। বাঙালির স্বপ্নসারথি। প্রাণপুরুষ। স্লোগান আর মুহুর্মুহু করতালি। অপেক্ষমান জনসমুদ্রের উদ্দেশে হাত নাড়লেন তিনি। অভিনন্দন জানালেন। হঠাৎ পিনপতন নীরবতা। তারপর শুরু সেই ঐতিহাসিক ভাষণ। ভাষণের ব্যাপ্তি ১৮ মিনিট। তাৎপর্য ব্যাপক, বহুমাত্রিক। শব্দ সংখ্যা ১১০৫ (এক হাজার একশত পাঁচ)। প্রতিটি শব্দ কী যথাযথ। কী সব কথামালা! যেন খোদাই করা একেকটা বাক্য। ব্যঞ্জনায় পূর্ণ, গীতিময়। মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। আবিষ্ট হয়ে বার বার শুনতে ইচ্ছে করে। আর প্রতিবারই নতুন মনে হয়।

সময় ও প্রেক্ষাপট তখন সহজ ছিল না। বঙ্গবন্ধুকে সতর্কতা আর কৌশলের সঙ্গে দিতে হয়েছিল এই ভাষণ। প্রকৃতপক্ষে এদিন তিনি স্বাধীনতার ডাক দেন। আবার বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে যেন অভিহিত করা না হয়, সেদিকেও তাকে খেয়াল রাখতে হয়। কঠিন এক পরিস্থিতিতে তিনি এই ভাষণে অভাবনীয় ভারসাম্য রক্ষা করতে পেরেছিলেন৷ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু না বলেও সাধারণ মানুষকে দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর এই কৌশলী অবস্থান বিজ্ঞ সব সমরকুশলীকেও অবাক করে দেয়। ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তো এই জনসভার ওপর হামলা করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত তারা তা করতে পারেনি। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার মন্তব্য উল্লেখ করার মতো। এ ঘটনার পর এক প্রতিবেদনে তার ভাষ্য ছিল, ‘শেখ মুজিব কৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গেল, কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারলাম না।’ ওই প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধুকে ‘চতুর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ কেন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ ? ইতিহাস বলে শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়। শ্রেষ্ঠ ভাষণমাত্রই মুহূর্তে মানুষকে উজ্জীবিত করে। চেতনায় জাগিয়ে তুলে বিজয় অর্জনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে উদ্দীপ্ত করে তোলে। আমাদের মুক্তির সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের অবদান অসামান্য। এই ভাষণ গোটা জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে তুলেছিল, অফুরন্ত শক্তি জুগিয়েছিল। উত্তাল জনসমুদ্রের সামনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো৷ মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো- এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাল্লাহ।’ তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এদেশের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। দেশের জন্য অকাতরে প্রাণ দিয়েছিল। একসাগর রক্তের বিনিময়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল।

লক্ষ্য অর্জনের সঠিক দিক নির্দেশনাও শ্রেষ্ঠ ভাষণের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য। ৭ মার্চের ভাষণে যেটা সুস্পষ্টভাবে আছে। এতে লক্ষ্যের কথা বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। লক্ষ্য হলো: মুক্তি ও স্বাধীনতা। এজন্য করতে হবে মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। পাকিস্তানের শাসন-শোষণ থেকে মুক্তি পেতে কী করনীয় সেটারও উল্লেখ রয়েছে। ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু, আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে।’
শ্রেষ্ঠ ভাষণের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এর শব্দপ্রয়োগ, বাক্যবিন্যাস ও কাব্যময়তা সবাইকে মুগ্ধ করে। এর শ্রুতিমধুরতা শ্রোতাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। ৭ মার্চের ভাষণে এর সবগুলো উপাদান বর্তমান। ‘রাজনীতির কবি’র ভাষণ বলে কথা। স্বতঃস্ফূর্তভাবে হৃদয় থেকে উৎসারিত হয় শ্রেষ্ঠ ভাষণ। এবং সেটা তাৎক্ষণিক ও পরিস্থিতির চাহিদায়। একথা অনেকেরই অজানা নয়, ৭ মার্চের ভাষণও ছিল অলিখিত । শুধু তাই নয়, ইতিহাসশ্রেষ্ঠ অন্য ভাষণগুলোর মতো আকারে এটিও নাতিদীর্ঘ। এবং অতি অবশ্যই চিরকালের জন্য প্রেরণাদায়ী। ‘সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না’। বঙ্গবন্ধুর এ কথাগুলো আজও আমাদের প্রেরণার উৎস।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ কেন ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’র স্বীকৃতি পেয়েছে? এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে স্বীকৃতিপ্রাপ্তির সময় সে সময়ের ইউনেস্কো মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভার বক্তব্য। তিনি বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এসব স্মৃতি ও দলিল সংরক্ষণের এ কর্মসূচি এমনভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত, যাতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আলোচনা, সহযোগিতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়।’

বিশ্ব দরবারে বাঙালি জাতি নতুন এক পরিচয় লাভ করে ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে। এই ভাষণে সামরিক আইন প্রত্যাহার, সেনাবাহিনীর ব্যারাকে ফেরানো, শহীদদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতার দাবি জানান বঙ্গবন্ধু। এছাড়াও ভাষণে মনকাড়া অনেকগুলো বিষয় আছে। এতে কৌশলে বঙ্গবন্ধু নিরস্ত্র জনগোষ্ঠীকে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেওয়ার কথা বলে দিয়েছেন। পাশাপাশি রয়েছে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কথা। ‘যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজন যদিও সে হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব’। আছে মানবিকতার কথা। ‘গরিবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে, সেইজন্য সমস্ত অন্যান্য জিনিসগুলো আছে, সেগুলোর হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিকশা ঘোড়াগাড়ি চলবে, রেল চলবে, লঞ্চ চলবে।’ রয়েছে অসাম্প্রদায়িক আদর্শ ও সম্প্রীতির উল্লেখ। ‘এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-নন বাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের উপরে’। আছে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রচেষ্টার কথা। এবং সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার কথা। ‘আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।’

প্রাসঙ্গিক একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা এখানে উল্লেখ করতে চাই। রিকশায় দরকারি একটা কাজে যাচ্ছি। ৭ মার্চের ভাষণ বাজছে। মাইকের কাছাকাছি আসতেই রিকশাচালক গতি কমিয়ে দিলেন। বয়স কত আর, বড়জোর বছর পঁচিশ। বললাম, কী হলো ? পেছনে তাকিয়ে সে বলল, ‘ভাষণডা শুনলে রক্ত টগবগ কইরা ওঠে। গায়ে কাঁডা (কাঁটা) দেয়’। আমি বললাম, তাই নাকি ? রিকশাচালক বলল, ‘একদম হাচা কথা। আমার বাজানও কিন্তুক এই কথাডা কয়’।

সত্যি তো এমন গায়ে কাঁটা দেওয়া ভাষণ এই পৃথিবীতে ক’টা আছে? আজও যখন এই ভাষণ কোথাও বাজে বাঙালির হৃদয়ে উদ্দীপনা জাগায়। এই ভাষণ মহামূল্যবান দলিল। এটা অনেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। শুধু আমাদের নয়, এটা এখন গোটা বিশ্বের সম্পদ। বিশ্ব মানবতার মুক্তির সংগ্রামে যুগে-যুগে অনুপ্রেরণা জোগাবে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। বৈষম্য-নিপীড়ন, দুঃশাসন-শোষণের থেকে মুক্তির পথ দেখাবে। এই ভাষণ থেকে শেখার অনেক কিছু আছে। আর তা সাধারণ নাগরিক থেকে রাষ্ট্রনায়ক সবার জন্যই সমান প্রযোজ্য। আমরা এর থেকে প্রেরণা পেয়েছি, পাচ্ছি এবং ভবিষ্যতেও পেতেই থাকব। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই ভাষণ একইভাবে অনুপ্রেরণা জোগাবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের মাহাত্ম্য এখানেই।

এই মাহাত্ম্য একেবারেই অপরিমেয়। অক্ষর, শব্দ, বাক্যের সাধ্য কী তাকে বর্ণনা করে। সিন্ধুকে কখনও বিন্দুতে ধারণ করা যায়? না, যায় না। কোনোভাবেই যায় না। সেটা সম্ভবও নয়। আমরা শুধু মাহাত্ম্যের বিশালতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারি। গভীর ভালোবাসায় স্মরণ করতে পারি। অনুধাবনের চেষ্টা করতে পারি। ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র অংশও যদি অনুধাবন ও ধারণ করতে পারি সেটাও তো অনেক। আমরা আর পারি প্রেরণার এই আধার থেকে অফুরন্ত অনুপ্রেরণা নিতে।

বিশাল জনসমুদ্র। তাতে স্লোগানের ঢেউ...। সপ্তর্ষির মতো আলোকময় এক কবি। ৭ মার্চে উঠে এলেন মঞ্চে। সাতসুরে বাঁধা তাঁর কবিতা। তাতে সাত সাগরের গর্জন। সাতপুরুষের লালিত আকাঙ্ক্ষা। সাতরঙা সব স্বপ্ন। মায়ের সাতনরী হার। সাত সংখ্যাটা সত্যি সৌভাগ্যের।

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যসেবক

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন