শিরোনাম :

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়ন যেন দীর্ঘস্থায়ী হয়


শনিবার, ১০ মার্চ ২০১৮, ১১:৫৬ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়ন যেন দীর্ঘস্থায়ী হয়

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার কার্যালয়ে ২০১৫-২০১৬ সালের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের স্বর্ণপদক প্রদান অনুষ্ঠানে বলেছেন, মার্চ মাস থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাবে। প্রধানমন্ত্রীকে অশেষ ধন্যবাদ তিনি এককভাবে দীর্ঘদিন পর্যন্ত পরিশ্রম করেছেন জাতিকে এ পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। তিনি তার প্রচেষ্টায় সফলকাম হলেন। ১৫৫৮ সালে রানী প্রথম এলিজাবেথ আক্রমণকারী হিম্পানি আর্মাডাকে পরাজিত করার পর তীব্র জাতীয়তাবোধের ভিত্তিতে ইংল্যান্ডকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছানোর জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা অনুরূপ একটা প্রচেষ্টা চালিয়েছেন গত দশ বছরব্যাপী। কোনও আন্তরিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় না। শেখ হাসিনাও ব্যর্থ হননি।

পুরাণে আছে এখানকার লোক পক্ষীসদৃশ্ যাযাবর জাতি। হাঁটু জলে বাস করে মাছ ধরে খায়। হিমালয়ের জলস্রোতে পলি এসে এ বদ্বীপ গঠিত, তাই খুব উর্বরা। পলি মাটিতে গ্যাস আর কয়লা ছাড়া তেমন কিছু প্রাকৃতিক সম্পদ পাওয়া যায় না। এখানেও তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। এখানে কোনও কোনও খানে উঁচু টিলা জাতীয় কিছু এলাকা আছে সত্য কিন্তু সর্বত্র কুমারী মাটি। ফরিদপুর জেলা জেগেছে মাত্র ৪০০ বছর আগে। তখন বরিশাল মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। আইনে আকবরিতে তাকে চন্দ্রদ্বীপ বলা হয়েছে।

ইংরেজরা ভারতে প্রবেশ করেছিলো বাংলা হয়ে। তখন বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা। যুবক মানুষ। হিন্দু মহাজন আর ইংরেজদের ষড়যন্ত্রে সিরাজ রাজ্য হারিয়েছিলো। রাজ্যহারা মুসলমানদের প্রতি ইংরেজরা সহানুভূতিশীল হওয়ার কথা নয়। কারণ, রাজ্য হারিয়ে মুসলমানদের মনে দুঃখ বেদনা থাকারই কথা। কিন্তু হিন্দু সমাজের কাছে ছিল শাসক বদল। তাই তারা ইংরেজদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিলো মন খুলে। বিনিময়ে পেয়েছিলো অনেক কিছু। ১০/১৫ বছর আগে যারা মুসলমানদের গোমস্তা ছিল তারাই হয়ে বসলো বড় বড় জমিদার।

হান্টার সাহেব ‘মুসলমানস্ অব ইন্ডিয়া গ্রন্থে লিখেছেন ‘একটা ধনী শ্রেণি রাতারাতি ভিখারি হয়ে গেল।’ বাংলার শেষ গভর্নর পূর্ব বাংলাকে বলতেন দরিদ্র কৃষকের বস্তি। পূর্ব বাংলায় তো বন্যার কারণে ফি বছর ফসল মারা যেত। আমার এলাকায় একটা বিরাট বিল ছিল। আমার মুরব্বিদের মুখে শুনেছি, ৩৫ বছর নাকি কৃষক কাঁচি নিয়ে বিলে যায়নি। আমার বয়সে আমি বেটা বেটা ছেলেদের লেংটি পরতে দেখেছি। এ দেশটা তার দরিদ্রতা ঘুচিয়ে ধীরে ধীরে উন্নত দেশে পরিণত হচ্ছে শুনলে তো মন পুলকিত হয়ে যায়।

৫৬ হাজার বর্গমাইল এরিয়ার দেশ ১৬ কোটি মানুষের বসবাস। এদেশের মাটি এদেশের মানুষের খাদ্য সরবরাহ করতে পারছে এটা তো কম বড় উন্নয়ন নয়। স্বাধীনতার সময় লোকসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। আর খাদ্য ঘাটতি ছিল সাড়ে সাতাশ লক্ষ টন। কাগজে দেখলাম কৃষি বিজ্ঞানীরা পাটের জিন আবিষ্কার করার পর পাট নিয়ে গবেষণা করছেন এখন। তারা পাট থেকে এমন সুতা উৎপাদন করতে সক্ষম হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, ভবিষ্যতে সুতা উৎপাদনের জন্য আর তুলা আমদানি করতে হবে না।

নতুন নতুন উদ্ভাবন ছাড়া এ জাতির টিকে থাকার ভরসা কোথায়! কৃষিমন্ত্রী কৃষি বিজ্ঞানীদের বলেছিলেন লবণের মাটিতে ধান উৎপাদন করতে হবে। লক্ষ লক্ষ একর উপকূলীয় এলাকার জমিতে লবণাক্ততার কারণে ধান উৎপাদন হতো না। এখন আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীরা লবণ সহনীয় ধানের বীজ উদ্ভাবন করেছেন। এ যদি না হয় কোটি কোটি মানুষের খাদ্য সরবরাহ হবে কীভাবে? এখানে জায়গা কম মানুষ বেশি। সুতরাং এ জাতির সন্তানদের এক মুহূর্ত অলসভাবে বসে থাকার কোনও অবকাশ নেই।

জওহর লাল নেহরুর মন্ত্রিসভায় হিন্দু মহাসভার সভাপতি শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি মন্ত্রী ছিলেন। শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি তখন নেহরুকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন পূর্ব বাংলা থেকে সব হিন্দু ভারতে নিয়ে ভারত থেকে সমপরিমাণ মুসলমান পূর্ব বাংলায় পাঠানোর জন্য। তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ভারত সফরে ছিলেন। নেহরু বলেছিলেন ভৌগোলিক বৈচিত্র্যতার কারণে পাকিস্তান ১৫/১৬ বছরের মাঝে ভেঙে যাবে। তখন পূর্ব বাংলার পক্ষে স্বাধীন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। বাধ্য হয়ে পূর্ব বাংলা ভারতের সঙ্গে যোগদান করবে। সুতরাং লোক-বিনিময়ের মতো একটা ঝামেলাপূর্ণ কাজে জড়িয়ে লাভ কী। কয়দিন অপেক্ষা করলে যা এমনিতেই হবে।

নেহরুর কথা মতো বিলম্ব হলেও পাকিস্তান ভেঙেছে। পূর্ব বাংলা বাংলাদেশ হিসেবে ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন হয়েছে আর বাংলাদেশ গত ৪৬ বছর স্বাধীন দেশ হিসেবে টিকে আছে। বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান ভারতের চেয়ে উন্নত। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, বহু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে অগ্রগামী। ভারত বিরাট দেশ, ১২৫ কোটি লোক। লোকগুলো দেখলাম অল্পে তুষ্ট। গাছতলায় ছায়ার নিচে বসে বসে পাশা খেলে। মুখরোচক কথা বলে। শত শত বিলোনিয়র আছে। পৃথিবীর আর কোনও দেশে এত বিলোনিয়ার নাকি নেই।

আবার হাওড়া ব্রিজে জীবনযাপন করা লক্ষ লক্ষ লোকও আছে। সেখানেই তাদের জন্ম, সেখানেই তারা বড় হয়েছে, সেখানেই তারা আবার সংসার পেতেছে। সমাজে কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। মাঝে মাঝে চারু বাবু কানু বাবুরা জেগে ওঠে জোরদার বলে কিছু মানুষের গলাও কাটে। আবার সব থেমে যায়। হিমালয় থেকে কন্যাকুমারী, মেঘালয় থেকে কাশ্মির- এ ব্যাপক ভারতে সর্বভারতীয় কোনও জাগরণ মনে হয় সম্ভব নয়। আবার জাত-পাতের প্রশ্নও আছে। এক ঠাকুর টমটমওয়ালা অম্বেৎকরকে তার টমটমে তোলেনি। কারণ, অম্বেৎকর ঝাড়ুদারের ছেলে, যদিওবা তিনি ব্যারিস্টার ছিলেন আর ভারতের শাসনতন্ত্রের রচয়িতা ছিলেন। কত মারাত্মক ব্যাধিতে ভুগছে তারা।

যা হোক, ভারত সম্পর্কে আলোচনা করলাম। এখন আমাদের কথায় ফিরে আসি। আমরা প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো উন্নয়ন যেন টেকসই হয়। কয়দিন আগে পত্রিকায় দেখলাম একটা ব্রিজের একপাশের গারড়ার আগাগোড়া ভেঙে গেছে। অথচ ব্রিজটা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। গারডারে পর্যাপ্ত রড থাকলে এভাবে ভেঙে পড়তে পারে না। ডিজাইনে যত রড দেওয়ার কথা ছিল সম্ভবত ঠিকাদার আর সড়ক ও জনপথের ইঞ্জিনিয়ার মিলে রড চুরি করেছে। যে কারণে গারডার নিজের জমানো কনক্রিটের ওজনের ভার সহ্য করতে না পেরে ভেঙে গেছে। আমি বহু ব্রিজের কথা জানি। সে সব ব্রিজের পাইল ফাউন্ডেশনে সম্পূর্ণ রড দেয়নি। এ সমস্ত ব্যাপারে শক্ত মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এবং কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

পত্রিকায় দেখলাম দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর কথা চিন্তা করা হচ্ছে অথচ গঙ্গা বাঁধের কাজ পড়ে আছে। চুক্তির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার সময়ও এসে যাচ্ছে। ভারত আর চীন আগেকার বড় শক্তিগুলোর মতো নয়। তারা তাদের স্বার্থের প্রতিকূলে কোনও কাজই করে না। আমি যদিওবা এ বিষয়ে কোনও বিশেষজ্ঞ নই তবুও বলি, গঙ্গা বাঁধ আর বৃহত্তম সিলেট ও ময়মনসিংহের হাওরগুলো সংস্কার করে রিজার্ভার সৃষ্টি করা গেলে আমাদের পানি সমস্যার একটা সমাধানে পৌঁছানো হয়ত সম্ভব হবে। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোর পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। ক’দিন পর চাষাবাদে হয়তবা সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। কৃষির গুরুত্বকে ছোট করে দেখলে হবে না। গোলাভরা ধান থাকলে মানুষ নিশ্চিন্ত থাকে।

মুহিত সাহেব আবেগী প্রকৃতির লোক। আবেগী লোক দিয়ে অর্থ দফতর চলে না। অর্থ দফতরের লোক আবেগহীন রক্ষণশীল হতে হয়। তিনি প্রায় ৯ বছর অর্থ দফতরের দায়িত্বে আছেন। অর্থ দফতরে বহু বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। অর্থ দফতর বিনাশ হলে উন্নয়নই বাধাগ্রস্ত হবে। মুহিতের বিরুদ্ধে কোনও দুর্নীতির অভিযোগ শুনেনি। ওনার বয়স হয়েছে প্রচুর, এখন তার স্থলে অন্য লোক নিয়োগ দেখা প্রয়োজন। শুনেছি আরও তিনখানা ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। ছোট একটা দেশে দেশি-বিদেশি ৫৭ খানা ব্যাংক রয়েছে। আর কত ব্যাংকের প্রয়োজন!

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কথা নাকি তফসিলি ব্যাংক শুনছে না। এটা তো জঘন্যতম অভিযোগ। পাকিস্তানে ইউনাইটেড ব্যাংকের হেড অফিসের বিল্ডিং পাকিস্তান স্টেট ব্যাংকের হেড অফিস বিল্ডিংয়ের ওপরে উঠতে দেয়নি। তারা মনে করেছে এটাও অনিয়ম। যেখানে শেষ নয়টা ব্যাংকের অনুমোদন না দিলেও চলতো সেখানে আরো তিনটা ব্যাংকের প্রয়োজন কী?

সমাজের বিবর্তনে ধনতন্ত্রেরও একটা প্রগতিশীল ভূমিকা আছে সে কথাটা ধনতান্ত্রিক সমাজ মানছে না। শুধু দেখছি দক্ষিণ ভারতের দু-একটা রাজ্যে কিছু জনকল্যাণে কাজ হয়ে থাকে। অনুরূপ কাজ আমাদের সমাজে করা সম্ভব কিনা তা চিন্তা করা প্রয়োজন যেমন তামিলনাড়ুতে ডিএমকে ক্ষমতায় আসুক বা আন্না-ডিএমকে ক্ষমতায় আসুক, ৩/৪ টাকা কেজিতে চাল সরবরাহ করে থাকে। সমাজের নিম্ন-স্তরের মানুষের জন্য এটি বড় উপকার।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন