শিরোনাম :

মশার দিন!


সোমবার, ১২ মার্চ ২০১৮, ০৬:১২ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

মশার দিন!

শান্তনু চৌধুরী: মশা! অতিকায় ক্ষুদ্র প্রাণি, কিন্তু ভয়ঙ্কর। বিরক্তির যেন শেষ নেই। স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা না করেই সেকেন্ডে তিনশ’বারেরও বেশি ডানা ঝাঁপটিয়ে কান-মস্তিষ্ক ঝালাপালা করে ফেলছে প্রায়। সময় হিসেবে মাত্র শীত গিয়ে বসন্ত এসেছে। গ্রীষ্মের পর বর্ষা এলেই তবে মশার উৎপাত বাড়ে। তার মানে এখনও মশার উৎপাতের সময় আসেনি। কিন্তু আবহাওয়া ও মৌসুমগত কারণে রাজধানীতে হঠাৎ করেই বেড়েছে মশার প্রকোপ। এতে মশাবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। সবচেয়ে বড় কথা স্বাভাবিক জীবনে ঘটছে ছন্দপতন। তাই শুরুতেই শুরু করতে হবে ক্রাশ প্রোগ্রাম। মশা নির্মূলে কামান না হলেও কামান সাইজের স্প্রে নিয়ে দৌড়ানোর এখনই সময়।

সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসা-বাড়িতে দিনের বেলায়ও মশারি টানিয়ে রাখতে হয়। মশার যন্ত্রণা থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে প্রতিবছর এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলে কাজের মান বাড়ে না। নগরবাসী অভিযোগ করে থাকেন তারা মশক নিধনকারী কর্মীদের দেখা পান না। বিঘ্ন ঘটছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজে। মশা যে কতটা ভয়ঙ্কর সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কথা, বিগত বছরগুলোতে মশা এমন সব রোগের জীবাণু নিয়ে এসেছে যাতে মানুষের মৃত্যু হয়েছে অনেক। এমনকি মহামারি আকারও ধারণ করেছে। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়াসহ, এডিশসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা নিকট অতীতে মানুষের আতঙ্কে পরিণত হয়েছিল। পৃথিবীর অন্য যেকোনও প্রাণির চেয়ে মশার কারণেই মৃত্যু হয় সবচেয়ে বেশি মানুষের। পরিবেশের ওপর মশার কোনও ভালো প্রভাব এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। যদিও অনেকে স্যাটায়ার করে নানা কিছু বলে থাকেন।

মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে এমনও মনে হতে পারে, ক্ষুদ্র অথচ ভয়ঙ্কর এই প্রাণি কি একেবারে মেরে ফেলা সম্ভব নয়। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কি এমন কোনও যন্ত্র আবিষ্কার করতে পারেনি, যা দিয়ে একটি দেশের সব মশা মেরে ফেলা সম্ভব? কোনও কোনও বাসাবাড়ি বা নির্দিষ্ট এলাকায় সেটা সম্ভব হলেও সত্যিটা এই যে, পুরোপুরি মশা নির্মূল কখনোই সম্ভব না। এটি বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়েসের মশক নিধন বিশেষজ্ঞ রজার এস নেস্কি। তার মতে, পৃথিবীর সব মশা মেরে ফেলা অসম্ভব কাজ। কোনও দেশ বা শহর কর্তৃপক্ষ যতই কীটনাশক ব্যবহার করুক না কেন, কিছু মশা থেকেই যায়। আর সেই মশা থেকে আবারও বিপুল পরিমাণ মশা তৈরি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রও নাকি মশা পুরোপুরি নিধনের চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৫০-৬০ দশকে মশা দূর করতে লাতিন আমেরিকায় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। ব্যাপক হারে ডিডিটিসহ বিভিন্ন শক্তিশালী কীটনাশক ব্যবহার করা হয় পুরো মহাদেশে। কিছু সময়ের জন্য মশা দূর হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই ধীরে ধীরে মশা ফিরতে শুরু করে। ধারণা করা হয়, সেখানকার মশা দূর হলেও এশিয়া বা আফ্রিকার জাহাজ থেকে আবার মশা ফিরে এসেছিল। এসব কথা প্রসঙ্গে উদাহরণ টানা। তাই বলে মশা নিধনে থেমে থাকলে চলবে না। খোদ রাজধানীতে মশার উৎপাত কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা গেলো ২৩ ফেব্রুয়ারি বিমানবন্দরের ঘটনার উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে। যা ইতিহাস হয়ে রয়েছে।

শুধুমাত্র মশার কারণেই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের বোয়িং ফ্লাইট বিমানবন্দর ছেড়েছে দুই ঘণ্টা দেরিতে। ওড়ার আগ মুহূর্তে বিমানে মশার যন্ত্রণায় যাত্রীদের চিৎকারে রানওয়ে থেকে ফ্লাইট ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হন পাইলট। এতে সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ায় ক্ষুব্ধ হন দেশটির এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ। এসব ঘটনা নিয়ে আমরা বোধহয় খুব একটা ভাবি না। নইলে এই ঘটনায়ও দেখা গেলো বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আর সিটি করপোরেশন পরস্পরকে দোষারোপ করছে।

সম্প্রতি দক্ষিণের সিটি মেয়র সাঈদ খোকন ও উত্তরের প্রশাসক মশা নিধনে ক্রাশ প্রোগ্রাম চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন। একইসঙ্গে মেয়র দাবি করেছেন তার এলাকায় মশার উৎপাত তেমন নেই। এ ধরনের কর্মসূচির ঘোষণা আমরা প্রায়ই শুনে থাকি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এর থেকে জনগণ সুফল তেমন একটা পান না, যদি না কর্মকর্তারা আন্তরিক হন। গেলো বছরের চিকুনগুনিয়ার অভিজ্ঞতা অন্তত তাই বলে। কতটা আতঙ্কের মধ্য দিয়ে আমাদের দিন কাটাতে হয়েছে। এমনও অভিযোগ শোনা যায়, যারা মশক নিধনের কাজে সম্পৃক্ত থাকে অনেকেই ওষুধ নিয়ে বাইরে বিক্রি করে দেন। আবার অনেক কর্মী কাজ না করে শুধু হাজিরা দিয়েই বেতন-ভাতা নেন। প্রতিদিন সকাল-বিকাল দু’বেলা বিষাক্ত কীটনাশক ছিটানোর কথা থাকলেও তা হয় না। অভিযোগের আসলে শেষ নেই। আবার এটাও ঠিক যে মশা মারার যেসব যন্ত্র সিটি করপোরেশনের রয়েছে তার বেশিরভাগই নষ্ট।

মশা মারার যন্ত্র এমন যে আওয়াজ শুনে পালালেও মশা মরে না। আবার ওষুধে ভেজালের কথাও শোনা যায়। লোকবলের সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। এছাড়াও নগরীর অনেক এলাকায় সিটি করপোরেশনের কর্মীদের ঢুকতে দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। কোটি কোটি মানুষের শহরে সীমাবদ্ধতা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এসব মেনে নিয়েই কাজ শুরু করতে হবে এবং তা এখনই, এই মুহূর্ত থেকেই। কারণ, ইতিহাস বলে মশা কতটা ভয়ঙ্কর। এক মশাই মৃত্যুর কারণ হয়েছিল খোদাদ্রোহী নমরুদের। আর এখন সাধারণ মানুষের কাছে মশা পরিণত হয়েছে আতঙ্কে। সমস্যাটা এমনই, একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মজা করে লিখেছেন, ‘বিশ্বাসতো তখনই ওঠে গেছে যখন দেখলাম কয়েলের ওপর মশা বসেছে।’ বাস্তবিকই তাই। কয়েল জ্বালালেও কাজ দেয় না। মশারিও মানে না মশা। শুধুমাত্র সিটি করপোরেশন বা কর্তৃপক্ষের ভরসায় বসে থাকলে হবে না। নিজেদেরও সামাজিক দায়বোধ বা সচেতনতা থেকে এগিয়ে আসতে হবে। ঝুঁকি এড়াতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ঘরবাড়ি পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। যারা মশার ওষুধ স্প্রে করতে আসেন তাদের ওপর নজরদারি রাখতে হবে।

বিভিন্ন এলাকার কাউন্সিলররা ইতোমধ্যে মশক নিধন কার্যক্রমে যাতে তাদের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয় সে দাবি জানিয়েছেন। বিষয়টিও ভাবা যেতে পারে। এলাকায় এলাকায় কার্যক্রম শুরু হলে সেটি বেশি ফলপ্রসূ হবে বলে আশা করা যায়। সর্বোপরি মশাবাহিত রোগ অতীতে যে মহামারি আকার ধারণ করেছিল তা থেকে শিক্ষা নিয়ে শুধুমাত্র কার্যক্রম নেতাদের বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এখন থেকেই ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। কারণ, সামনের মৌসুমে মশার উৎপাত আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই আশঙ্কা যেকোনও সময় মৃত্যুদূত হিসেবে এসে দেখা দিতে পারে আমার-আপনার বা প্রতিবেশী কারো। সেটি যাতে না হয় তাই আসছে মশার দিন—এখনই ব্যবস্থা নিন।

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন