শিরোনাম :

তামারা, ভালো থাকিস মা…


বুধবার, ১৪ মার্চ ২০১৮, ০৩:১৭ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

তামারা, ভালো থাকিস মা…

রেজানুর রহমান: একটি বিমান দুর্ঘটনা আমাদের অনেক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। যে সত্য করুন এবং নিষ্ঠুরও বটে। পত্রিকায় প্রকাশিত একটি ছবির দিকে তাকিয়ে আছি। কান্না সংবরণ করতে পারছি না। বাস্তবতা এত নিষ্ঠুর হয়? হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের লাউঞ্জে বাবা-মায়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছে ছোট্ট মেয়ে তামারা। বাবা-মায়ের পাশে একটি লাল ব্যাগের আড়ালে দাঁড়িয়েছিল। ছবিতে ওর ঘাড় আর মাথা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বাবা-মা দুজনের মুখেই প্রশান্তির ছায়া। পাশে দাঁড়ানো তাদেরই এক আত্মীয়া। তিনিও স্বামীর সাথে নেপাল যাচ্ছিলেন। ছবিতে তার স্বামীকে দেখা যাচ্ছে না। কারণ, আত্মীয়ার স্বামীই ছবিটি তুলেছেন। ছবি তুলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দিয়েছেন। এরই মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর ছবির দুজন মানুষ বাবা আলোকচিত্রী এফ এইচ পিয়ক এবং তার আদরের শিশুকন্যা তামারা পৃথিবী থেকেই নাই হয়ে গেল।


কী নির্মম ও নিষ্ঠুর বাস্তবতা। ইউএস-বাংলার একটি ফ্লাইটে আকাশে উড়ে নেপাল যাচ্ছিল তারা। ফ্লাইটের ভেতর বাবার কোলে বসেছিল তামারা। হয়তো অনেক কথাই জিজ্ঞেস করেছিল– বাবা আমারা তো আকাশে উড়ে যাচ্ছি? বাবার উত্তর- হ্যাঁ, আমরা আকাশে উড়ে যাচ্ছি। মেয়ে কি বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল, বাবা আমরা কি পাখি? পাখিরাই তো আকাশে ওড়ে...? তামারা হয়তো ভেবেছিল পাখি হলেই ভালো হতো। ঝড়ঝাপটা ছাড়া আকাশে ওড়ার ক্ষেত্রে পাখিদের কোনোই সমস্যা নাই। সেদিন তো নেপালের আকাশে ঝড়ের কোনও আভাস ছিল না। পাখি হলে ঠিকই নেপালে পৌঁছে যেতো তামারা। কিন্তু বিমানও তো পাখির মতোই। সেদিন কি হয়েছিল পাখি-বিমানের? তামারাইবা কি দোষ করেছিল যে পাখি-বিমান তাকে দুনিয়া থেকে নাই করে দিল? বিমানটা যখন দুম করে আকাশ থেকে পড়ে যায় তখন বাবা তামারাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছিল। ততক্ষণে উড়োজাহাজে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে শুরু করেছে। আহারে ছোট্ট তামারা! বাবার বুকেই বুঝি আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। আঁখি ও মিনহাজের কথা ভেবেও তো কান্না থামানো যাচ্ছে না। চার বছর প্রেমের পর বিয়ে করেছে। হানিমুন করতে নেপালে এসেছিল। এ কেমন পুড়ে ছাই হওয়া হানিমুন? অন্যদিকে রিমু, বিপাশা ও তাদের একমাত্র সন্তান অনিরুদ্ধর ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটার দিকে তো তাকানো যাচ্ছে না। সুখী এই পরিবারটিও নেপালে যাচ্ছিল। তারাও একসাথে মারা গেছে। হায়রে নিয়তি!

পুড়ে যাওয়া লাশগুলো নেপালের হাসপাতালে পোড়া কাঠের মতো পড়ে আছে। ইউএস-বাংলার বিশেষ বিমানে ঢাকা থেকে নেপালে যাওয়া মৃতদের আত্মীয়-স্বজনরা কিছুতেই স্বজনের লাশ শনাক্ত করতে পারছেন না। পরিস্থিতি যখন এতটাই নির্মম ও নিষ্ঠুর তখন তো আশা করতেই পারি স্বজন হারানোর বেদনায় আমরা কাতর হবো। চোখে কষ্টের অশ্রু ঝরবে। হ্যাঁ, চোখে অশ্রু ঝরছে অনেকের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কান্নার রোল পড়েছে। অভিনেত্রী রুনা খান লিখেছেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে কারোর সাথেই আমার পরিচয় নাই। তবুও এত মৃত্যু দেখে কষ্ট হচ্ছে, নিঃশ্বাস নিতে পারছি না।’ বিমান দুর্ঘটনায় নিহত ফয়সাল ছিলেন বৈশাখী টেলিভিশনের রিপোর্টার। টেলিভিশন চ্যানেলটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বৈশাখীর জন্মদিনে তোলা একটি স্মৃতিকাতর ছবি ফেসবুকে আপলোড করে লিখেছেন, ‘এই পরিবার থেকে হারিয়ে যাবে আমাদের ফয়সাল। ৫ দিনের ছুটি নিয়ে জীবনের তরে ছুটি... অবিশ্বাস্য! মেনে নিতে পারছি না...।’ বিশিষ্ট অভিনেত্রী ডলি জহুর লিখেছেন, ‘ঘুম ভেঙ্গে যদি বুঝতাম নেপালের ভয়াবহতা আসলে স্বপ্ন ছিল...।’ নিহত আলোকচিত্রী এফ এইচ প্রিয়কের সাংবাদিক বন্ধু ইজাজ আহমেদ মিলন পরিবারের পক্ষে লাশ গ্রহণের জন্য ইউএস-বাংলার বিশেষ ফ্লাইটে নেপালে পৌঁছার পর পোড়া কাঠের মতো দুমড়ানো মোচড়ানো মানুষের লাশ দেখে কাঁদতে কাঁদতে জানিয়েছেন, লাশগুলো পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। কার লাশ কোনটা শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। আহারে! তাহলে কি ছোট্ট তামারার লাশটা খুঁজে পাওয়া যাবে না? ওর ছোট্ট শরীর পুড়ে নিশ্চয়ই দলা হয়ে গেছে। কী নিষ্ঠুর! কী বীভৎস বাস্তবতা।

লেখার শুরুতে বলেছিলাম একটি বিমান দুর্ঘটনা আমাদের অনেক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে কার ভুলে আকাশপথে উড়ে যাওয়া ৫০ জন মানুষ নিমিষে পুড়ে ছাই হয়ে গেল? ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষের দাবি, দুর্ঘটনার জন্য ইউএস বাংলার পাইলটের কোনো ত্রুটি ছিল না। প্রকারান্তরে নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকেই তারা দায়ী করেছে। প্রযুক্তির কল্যাণে ইউএস-বাংলা ফ্লাইটের কর্তব্যরত পাইলট ও ত্রিভুবন বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্য সারাবিশ্বে ভাইরাল হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আশা করা যায় দুর্ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটিত হবে। পরিসংখ্যান বলছে, নেপালের এই বিমানবন্দরটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। ইতোমধ্যে ৭০টি বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে ত্রিভুবনে। ইউএস বাংলার নির্ধারিত ফ্লাইটটির পাইলট আর ত্রিভুবন এয়ারপোর্টের কর্তব্যরত কর্মকর্তার কথোপকথন থেকে এক ধরনের অসংলগ্নতার চিত্র ফুটে উঠেছে। ইউএস বাংলার নির্ধারিত এই ফ্লাইটটির উড়ার সক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু এই প্রশ্নের কি কোনো ভিত্তি আছে? সহকারী পাইলটের ব্যাপারেও স্পর্শকাতর মন্তব্য ফেসবুকে ছড়িয়ে গেছে।

পৃথুলা রশিদ ইউএস-বাংলার ফ্লাইটটিতে সহকারী পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে পাইলটের সাথে তার ঘনিষ্ঠতার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। অথচ সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করা হচ্ছে, পৃথুলা তার জীবন দিয়ে ১০ জন নেপালি যাত্রীর প্রাণ বাঁচিয়েছেন। এই খবরটিই সবার অন্তর ছুঁয়েছে। আলম মেহেদী নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘হতভাগ্য উড়োজাহাজটির পাইলট ক্যাপ্টেন সুলতান আর বেঁচে নেই।’ মিডিয়া তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে জানতে চাইতে পারে প্রতিদিন কতঘণ্টা ফ্লাই করতেন তিনি। নেপাল থেকে ফিরে ওই দিনই তাকে আর কটা ফ্লাইট পরিচালনা করতে হতো? সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দুবারের রিটার্ন যাত্রায় ঢাকা-চট্টগ্রাম ফ্লাই করে সাড়ে ১২টায় নেপালের উদ্দেশে একই উড়োজাহাজ নিয়ে উড়াল দিয়েছেন বলে শোনা যাচ্ছে। আরও শোনা যাচ্ছে তিনি নাকি ইউএস-বাংলার চাকরি থেকে রিজাইন দিয়েছিলেন? ঘটনা কি সত্যি? আমাদের বিশ্বাস এ ধরনের কোনো অভিযোগই হয়তো সত্য নয়। তবু নানান প্রশ্নের ডালপালা বেড়েই যাচ্ছে।

কথায় আছে যা রটে তা কিছুটা বটেও...। উড়োজাহাজ চালানো তো আর বাসের ড্রাইভারি করা নয়। সড়কপথে দূরপাল্লার অনেক পরিবহনের ক্ষেত্রে একই ড্রাইভারকে দিয়ে রাত-দিন ৪৮ ঘণ্টারও বেশি সময় একটানা গাড়ি চালানোর অভিযোগ শোনা যায়। এবার একই অভিযোগ শোনা যাচ্ছে আকাশপথের ব্যাপারেও। আমাদের বিশ্বাস এই অভিযোগের তদন্ত হবে। নেপালে বাংলাদেশের উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার পর আকাশপথের ভ্রমণ নিয়ে ভালো-মন্দ অনেক কথাই আলোচিত হচ্ছে। নেপালের এই দুর্ঘটনা না হলে আমরা হয়তো জানতেই পারতাম না ইউএস-বাংলার দুর্ঘটনা কবলিত উড়োজাহাজটি অনেক পুরনো ছিল।

বেসরকারিভাবে দেশে এখন একাধিক বিমান সংস্থা যাত্রীসেবা দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠতেই পারে প্রতিটি সংস্থাই কি মানসম্পন্ন উড়োজাহাজ অপারেট করে? অথচ শুধু আন্তর্জাতিক রুটে নয়, অভ্যন্তরীণ রুটেও দেশের বেসরকারি বিমান খাত অনেক সক্রিয়। সৈয়দপুর বিমানবন্দর একদা খালি পড়ে ছিল। এখন এই বিমানবন্দরে দিনে ৪টি এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১১ বার নামে। ঢাকায় অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরে ঢুকলে যাত্রীদের ভিড় দেখে সহজেই বোঝা যায় আকাশপথের যাত্রা এখন কতটা জনপ্রিয়।

কিন্তু নেপালের দুর্ঘটনা যাত্রীদের মনে অনেক শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। কিছুদিন আগে সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে একটি এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ঢাকার পথে উড্ডয়নের সময় একটি চাকা খুলে মাটিতে পড়ে যায়। ক্যাপ্টেনের বিচক্ষণ বুদ্ধিমত্তায় ওই অবস্থায় এয়ারক্রাফটি কোনও দুর্ঘটনা ছাড়াই ঢাকায় এসে ল্যান্ড করে। ওই ঘটনা আকাশপথের যাত্রীদের মনে কিছুটা হলেও ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। এবার ইউএস-বাংলার ঘটনায় ভীতিটা আরও বেশি ছড়িয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, এই ভীতি দূর করতে সংশ্লিষ্টরাই উদ্যোগী হবেন। অভ্যন্তরীণ রুটে টিকিটের দাম নিয়ে যাত্রীদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। যে টিকেট ৩ হাজার টাকায় পাওয়া যায় সেই টিকেটই কখনও কখনও ৮ হাজার টাকায়ও কিনতে হয়। অভিজ্ঞ মহল মনে করেন, শুধু ব্যবসায়িক মুনাফা নয়, যাত্রীর স্বচ্ছন্দ ভ্রমণ ও নিরাপত্তার বিষয়টিকে আকাশপথের ভ্রমণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া জরুরি।

আরেকটি কথা, নেপাল দুর্ঘটনার পর বিভিন্ন এয়ারলাইনসের এয়ারক্রাফটের ফিটনেস নিয়ে কথা উঠেছে। বিভিন্ন টেলিভিশনে এতদসংক্রান্ত রিপোর্টও চোখে পড়েছে। আমাদের দেশে কিছু একটা ঘটলেই আমরা তার পিছনে ছুটতে থাকি। এটা ভালো লক্ষণ। আর তাই অনুমান করাই যায় বেশ কিছুদিন দেশের বিমান সেক্টর নিয়ে ভালো-মন্দ অনেক কথাই বলব আমরা। তবে এসব কথাবার্তায় বিমান সেক্টরের পজিটিভ অগ্রযাত্রা যাতে ব্যাহত না হয় সেদিকে যেন নজর রাখি। তবে একথা সত্য, আমাদের দেশে ক্ষুদ্র, মাঝারি পর্যায়ের ব্যবসায় দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে আমরা যত না কথা বলি, তার ছিটেফোঁটাও বলি না উচ্চপর্যায়ের অনিয়ম, দুর্নীতির ক্ষেত্রে। শত কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ নিয় পরিশোধ না করে দেদার ঘুরে বেড়াচ্ছেন কেউ কেউ। পাশাপাশি হয়তো কয়েক হাজার টাকার ব্যাংক ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়ার অপরাধে অনেকে সাজা ভোগ করছেন। আমরা দূরপাল্লার বাসের ফিটনেস নিয়ে অনেক বেশি সোচ্চার থাকি। কিন্তু কখনও কী আকাশপথের কথা ভাবি? এই যে এত এয়ারলাইনস আকাশপথে যাত্রী আনা নেয়া করছে, তাদের সব এয়ারক্রাফটই কি আকাশপথে ওড়ার যোগ্যতা রাখে? এর সঠিক উত্তর কি আমাদের জানা আছে?

নেপাল দুর্ঘটনায় নিহত স্বজনদের জন্য আসুন সমবেত প্রার্থনা করি। না ফেরার দেশে সবাই যেন অনেক ভালো থাকেন! পরীর মতো ছোট্ট মেয়েটি তামারা... সৃষ্টিকর্তা যেন ওকে পরপারে অনেক আনন্দে রাখে। তামারা... ভালো থাকিস মা...।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন