শিরোনাম :

একদিনের চেনা ফয়সাল দীর্ঘস্মৃতি হয়ে গেলো


বৃহস্পতিবার, ১৫ মার্চ ২০১৮, ০৪:৫৭ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

একদিনের চেনা ফয়সাল দীর্ঘস্মৃতি হয়ে গেলো

মোস্তফা হোসেইন: অচেনা কণ্ঠের ফোন। ভাইয়া, কয়েকজন কিশোর মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার নিতে চাই, সহযোগিতা করবেন?  মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে সহযোগিতা প্রশ্নে চেনা-অচেনা মুখ্য নয় আমার কাছে। বললাম, আসুন। এবার বলল,আপনাকেও কিছু বলতে হবে। আমি কি অফিসে আসবো?

জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি এখন বৈশাখী টিভি থেকে আসবেন? জবাব দিলো,আমি আপনার অফিসের নিচেই আছি। বললে এখনই আসবো।
প্রচণ্ড চাপ ছিল কাজের। তাকেও বললাম। বেশি সময় নেব না,ভাইয়া। দশ মিনিটেই হয়ে যাবে।

গেস্টরুমে কথা বলতে বলতে ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম, ৩০ মিনিট শেষ কথায় কথায়। আরো চাইছে সময়। অনুরোধ উপেক্ষা করা গেলো না মুখের দিকে তাকিয়ে। বারবার মনে হচ্ছিলো, আমার ছেলের কথা। বিভুঁইয়ে পড়ে আছে বছরকাল। দেখি না যেন একযুগ। ওর বয়সেরই যে ফয়সাল। হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়েই ঢুকেছে বৈশাখী টিভিতে।

পরদিন আবার ফোন। ভাই, আমি আপনার পারমিশন নিয়েছিলাম কাজটা করার জন্য আপনাকে বিরক্ত করব। আরো কয়েকজনের ফোন নম্বর লাগবে। যদি তাদের সাথে আপনার কথা হয়, তাইলে আমার কথাও বলবেন। কথাবার্তায় কেমন অধিকারের সুর।

কিশোর মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ে যেহেতু সে স্টোরি করবে,তাকে বললাম, ডেইলি স্টার বুকস থেকে প্রকাশিত আমার লেখা ‘কিশোর মুক্তিযোদ্ধা সমগ্র-১’ গ্রন্থটি সে সংগ্রহ করতে পারে। পেশার প্রতি অত্যন্ত আন্তরিক ফয়সাল বিকেলেই বইমেলায় চলে যায়। স্টল থেকে বই সংগ্রহ করে ফোনে জানালো বইটি সে পেয়েছে। আরো কিছু তথ্য সে জানতে চাইলো। তাও তাকে দেওয়া হলো।

খুব খুশি হলো ফয়সাল। আমিও তৃপ্তি পেলাম মুক্তিযুদ্ধের কথা জানানোর সুযোগ পেয়ে। খুশি হলাম,নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকরা মুক্তিযুদ্ধকে হৃদয়ে ধারণ করছে দেখে।

বেশ কয়েকদিন চলে গেছে। ভাবছিলাম,সাক্ষাৎকার হয়তো প্রচার হয়ে গেছে। মোবাইলের কললিস্ট খোঁজাখুঁজি করলে ওর ফোন নম্বরটা হয়তো বের করতে পারতাম। কেন খোঁজা হয়নি জানি না। তাই আর কথাও হয়নি।

১২ মার্চ দুপুরে একটা ম্যাসেজ পেলাম। পড়া হলো বেশ পরে। অফিসিয়াল কিছু ম্যাসেজ পাঠানোর সময়। চোখে পড়লো- ১২টা ২১ মিনিটে সেন্ড করেছে ম্যাসেজটা। প্রেরক ফয়সাল। লিখেছে,(১৪.৩.২০১৮) See our Boishakhi tv news at 10 am, 2 pm, 7 pm, 10 pm & 1 am. Special Report Topic `young Freedom Fighter' Ahmed Foysal, Staff Reporter, Boishaki tv. বিকেলে অফিসে বসেই দেখলাম ইউএস-বাংলার একটি উড়োজাহাজ কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হয়েছে। অজানা একটা শঙ্কা জেগে ওঠে। চ্যানেল পাল্টাতে পাল্টাতে বৈশাখী টিভিতে গিয়ে চোখ আটকে যায়। হায়! এ কেমন কথা। ওই তরুণ সাংবাদিক নিখোঁজ! মোবাইলের ম্যাসেজ অপশনে গিয়ে সময় মিলিয়ে ধাক্কা খেলাম। তার মানে ফয়সাল বিমানে চড়ার ঠিক আগে ম্যাসেজটা পাঠিয়েছিলো? তার মানে বাংলাদেশ ছাড়ার পূর্ব মুহূর্তেও সে ভুলে যায়নি। সে কি বিমানে চড়ার পরই ম্যাসেজ পাঠিয়েছিলো? নাকি পূর্বক্ষণে? নানা ভাবনায় কাতর হওয়ারই কথা।

এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না,ফয়সালের সঙ্গে আর কখনও কথা হবে না। সে কখনও আর ম্যাসেজ পাঠাবে না।

গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়া নিয়ে। তদন্ত কমিশন গঠন হয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে হয়তো এই দুর্ঘটনার ঘটক কে তাও বেরিয়ে আসবে। কিন্তু এই যে প্রাণগুলো চলে গেলো,তাদের কি আর ফিরে পাওয়া যাবে? এই ক্ষতি কি পূরণ করার মতো?

তবু আমাদের ভাবতে হবে,কেন এই দুর্ঘটনা। কাঠমান্ডু বিমানবন্দরকে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে গণমাধ্যমে। এর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণও চলছে। আমার মতো মাঠের মানুষও হিসাব মিলানোর চেষ্টা করছে। আচ্ছা ফয়সাল কি বুঝতে পারছিলো উড়োজাহাজটা বিধ্বস্ত হচ্ছে? আমার কল্পনায় বিমানের ভেতরের সেই সময়ের দৃশ্যগুলো শুধু ভাসে। আহ! সে যদি বেরিয়ে আসতে পারতো। বেরিয়ে এসে যদি আরেকটা ম্যাসেজ পাঠাতো,ভাইয়া আমি নিরাপদে আছি।

আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বেশ। এই কাঠমান্ডু আমাদের কত বড় একটা ঝাঁকুনি দিয়েছিলো বছর কয়েক আগে। ভূমিকম্পের কবলে পড়ে আমাদের দেশের কিছু মানুষকেও প্রাণ হারাতে হয়েছিলো। আর ওদের তো কথাই নেই। এই কাঠমান্ডু বিমানবন্দর যেখানে ৭০টি বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। প্রাণহানি ঘটেছে প্রায় ৭শ’ মানুষের। সেই কাঠমান্ডুই আমাদের দেশের মানুষকে আকর্ষণ করে। সংখ্যাটাও খুব একটা কম না। বছরে ২৬ হাজার মানুষ শুধু ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু যায় পর্যটক হিসেবে।

ওরাও আসে ঢাকায়। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে তো বটেই। সেখানকার অনেক তরুণ-তরুণীর পছন্দ বাংলাদেশ। উচ্চশিক্ষার জন্য ওরা আসে। বিশেষ করে মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে তাদের জন্য খুবই সুবিধাজনক এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। যার বড় প্রমাণও পাওয়া গেলো এই দুর্ঘটনার সময়। সিলেট রাগীব আলী রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজের ১৩ শিক্ষার্থীকে প্রাণ দিতে হয়েছে একটি দুর্ঘটনাতেই। যারা এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে নেপাল গিয়েছিলো মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে। তাদের আর দেখা করা হয়নি। হবেও না কোনও দিনও। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো ৭ হাজার নেপালি শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। তাদের তো আসা-যাওয়া করতে হবে। বাংলাদেশের পর্যটকরাও হয়তো কিছু দিন ভয়ে ভয়ে কম যাবে। কিন্তু ওদের অনেকেই এশিয়া-ইউরোপে যাওয়ার সময়ও ঢাকাকে ব্যবহার করে। বাঙালিরা ভুলোমনের। যেমনি ভূমিকম্পের ভয়াবহতাও ভুলে গেছে বাংলাদেশের মানুষ।

সুতরাং এই দুর্ঘটনা যে অর্ধশতাধিক ফয়সালকেই কেড়ে নিয়েছে তা নয়, দুটি দেশের স্বার্থেও বড় রকমের একটা ধাক্কা দিয়ে গেছে। আমরা নিশ্চয়ই এমন আর কোনও ঘটনা দেখতে চাই না। তাই দুর্ঘটনার কারণটা উদঘাটন করা প্রয়োজন। যদি বৈমানিকের ত্রুটি থাকে, যদি বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা থাকে, সেক্ষেত্রে অন্তত আগামীতে সাবধানতা অবলম্বনের সুযোগ হবে।

আর যদি কাঠমান্ডুর প্রাকৃতিক পরিবেশই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অনুকূলে না হয়,তাহলে তাদের বিকল্প চিন্তা করা উচিত। আমাদেরও সড়ক পথকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত হবে। আমরা আর কাউকে হারাতে চাই না। কাঠমান্ডু আমাদের কাছে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেই থাকুক, বিভীষিকা যেন না হয়।

উপসংহার: বৈশাখী টেলিভিশন তাদের কর্মী আহমেদ ফয়সালের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে বুধবার। ফয়সালের জীবনের শেষ নিউজ স্টোরিও প্রচার হলো। চোখ শুকনো রাখা সম্ভব হয়নি সংবাদ দেখে। বৈশাখী টেলিভিশনের সংবাদকর্মীদের কান্নার দৃশ্য দেখার পর কারো পক্ষেই হয়তো সম্ভব হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি কমিটেড এই সাংবাদিক যে কতটা আন্তরিক, তার প্রমাণ পাওয়া যায় স্টোরিটি দেখার পর। আমার কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে সে চলে যায় জামালপুর জেলার ধানুয়া কামালপুরে। সীমান্তঘেঁষা ধানুয়া কামালপুর কো-অপারেটিভ স্কুলে গিয়ে সে শিক্ষার্থীদের চিত্রধারণ করে,ওই স্কুলের একাত্তরের ৩ শিক্ষার্থী যথাক্রমে নূর ইসলাম বীরবিক্রম-বীরপ্রতীক, মতিউর রহমান বীরপ্রতীক ও বশির আহমেদ বীরপ্রতীকের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। ওই স্কুলের ৪০ শিক্ষার্থীর মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার তথ্য পেয়ে অবাক হয়ে যায়।

তার কাজের সুবিধার্থে এই তিন মুক্তিযোদ্ধার তথ্য সংগ্রহের জন্য ‘কিশোর মুক্তিযোদ্ধা সমগ্র’ বইটি সহায়তা করেছে,সেই কৃতজ্ঞতাও সে জানিয়েছে কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। তার তৈরি স্টোরিটা যেন আমি দেখতে পারি সেই সংবাদও সে জানিয়ে দেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সেই ফয়সালই আজ সংবাদ হয়ে গেছে।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন