শিরোনাম :

মীর জাফরের মত বিশ্বাসঘাতক মশা!


রবিবার, ২৫ মার্চ ২০১৮, ০৪:২৬ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

মীর জাফরের মত বিশ্বাসঘাতক মশা!

আহসান কবির: মশা ভ্যান ভ্যান করে কচু বনের মশা আইলো রাজার দরবারে!’ ছোটকালে দেখা একটা বাংলা ছবির গান (সম্ভবত ছবির নাম বন্ধু) এটা। ছবি দেখে ফেরার সময় এই গান গাইবার অপরাধে আমার বন্ধু গায়ক কালামকে চড় মারা হয়েছিল। যিনি চড় মেরেছিলেন তার মনে হয়েছিল কালাম তাকে ব্যঙ্গ করার জন্যই এই গান গাচ্ছে। চড় মারনেওয়ালার নাম ছিল মোশারফ, এলাকার মানুষ তাকে ব্যঙ্গ করে মশা নামেই ডাকতো! চড় মারার পর ভদ্রলোকের ডায়ালগ ছিল- মশাদের এমনেই মারতে হয়! মোশারফের ভাইয়ের (সহোদরের) নাম ছিল তোসারফ। লোকজন তারে ‘টসটসা’ (মশার ভাই তশা। সেখান থেকে টসটসা!) বলে ডাকতো!

অবশ্য চড় মারার মতো করে একহাতে কেউ মশা মারে না। মশা মারার সবচেয়ে ভালো ও জনপ্রিয় পদ্ধতি হচ্ছে তালি বাজানো পদ্ধতি। মশারাও এটা জানে। কৌতুক আছে এমন—বাচ্চা মশা উড়তে শিখেছে। প্রথম যেদিন সে বাইরে গেলো মা মশা খুব টেনশনে ছিল। বাচ্চা মশা ফেরার পর মা মশা জানতে চাইলো কেমন লাগলো? কতটা ওড়াউড়ি করলি? বাচ্চা মশা জবাব দিল—দারুণ সুন্দর। আমার ওড়াউড়ি দেখে কত মানুষ যে তালি দিল! মা মশা উত্তর দিল, শোন মানুষের তালির আশপাশে যাবি না! এটা মশা মারার কামানের চেয়েও ভয়ঙ্কর!

শুধু মশা না, ঢাকা শহরের তাবৎ মানুষ জানে সিটি করপোরেশনের মশার কামানে কাজ হয় কিনা! মশার জন্য আমপাবলিকের হাত কিংবা তালিই ভরসা (থাকিতে আপন হস্ত/নাহি হব কামান দারস্থ!) যদিও ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন বলেছেন, যে বাড়িওয়ালার বাসায় মশা জন্ম নেবে সেই বাড়িওয়ালাকে তিনি শাস্তির আওতায় আনবেন। ঢাকা শহরের বেশিরভাগ লোক এই ঘোষণায় আদৌ ভয় পায়নি। কারণ, তারা বাড়ির মালিক নন,ভাড়াটে মাত্র।

পৃথিবীতে মশাবাহিত রোগের কারণেই সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায়! মশা নিয়ে আসলে সারা পৃথিবীর মানুষই বিরক্তিতে ভোগে। মশা রোগ ছড়ানো আর বিরক্তি উৎপাদন ছাড়া কিছুই করে না। মানুষকে মেরে ফেলা ও সভ্যতা ধ্বংস করার জন্য মানুষ অনেক মারণাস্ত্র তৈরি করেছে, যা দিয়ে হয়তো পৃথিবীর সব মানুষকে দুই তিন দিনের ভেতর মেরে ফেলা সম্ভব। কিন্তু সব মশা একসঙ্গে মেরে ফেলার মতো কোনও অস্ত্র তৈরি করতে পারেনি মানুষ! শরৎচন্দ্র লিখেছিলেন, অতিকায় ডাইনোসর লোপ পাইয়াছে কিন্তু ক্ষুদ্রাকায় তেলাপোকা টিকিয়া আছে। মশা আর তেলাপোকার অভিযোজন ক্ষমতা মারাত্মক! বিষ দিলে নাকি প্রথম প্রথম তেলাপোকা মরে যায় ঠিকই কিন্তু ওই মাত্রার বিষ এরপরই কিছুটা কার্যকারিতা হারায়। কারণ, তেলাপোকার দেহে নাকি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিরোধক তৈরি হয়ে যায়। মশাও তেমন। যতই কীটনাশক ব্যবহার করা হোক না কেন, পুরোপুরি ধ্বংস করা যায় না মশাদের, কিছু না কিছু মশা থেকেই যায়। তবে এশিয়া ও আফ্রিকায় যত মশা আছে তা নাকি অন্য কোথাও নেই। ইউরোপিয়ানরা বলে থাকেন, যখনই তাদের দেশে মশা কমে যায় তখনই নাকি জাহাজে করে এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে মশা চলে আসে! ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ শাসন করার কারণে তাদের কাছ থেকে মশা সম্পর্কে অনেক বেশিই জানা যায়। ভারতবর্ষ তাদের কাছে ছিল খরা,বন্যা,বৃষ্টি,মশা ও ম্যালেরিয়ার দেশ!

ম্যালেরিয়া,ডেঙ্গু,চিকুনগুনিয়া,ফাইলেরিয়া,গোদ,টাইফয়েড (আগের কালের কালাজ্বর)-সহ আরও কিছু প্রাণঘাতী রোগের বাহক মশা। মশার আসল খাদ্য কিন্তু মানুষের রক্ত নয়। বেঁচে থাকার জন্য ফুলের মধু বা রেণু থেকে শুক্রোজ সংগ্রহ করে মশা, পচা জল থেকে সংগ্রহ করে খাদ্যরস। হাস-মুরগির ডিমে তা দেওয়ার মতো মানুষ বা অন্যকোনও স্তন্যপায়ীর রক্ত মশা খায় তাদের শক্তিবৃদ্ধি ও ডিমের জন্য। মশার ডিম তৈরি, নিষেক এবং ডিম ফুটে মশা তৈরি হওয়া পর্যন্ত গর্ভাশয়ের পরিবেশ ঠিক রাখার জন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর তাজা রক্ত দরকার মশাদের। ডিম নিষেকের জন্য এক ধরনের অ্যামিনো এসিড দরকার, যা তাজা রক্তে পাওয়া যায়। শুধুমাত্র স্ত্রী মশা তাই নতুন মশা জন্ম দেওয়ার জন্য মানুষের রক্ত খায়। মানুষের গায়ে হুল ফোটানোর সময়ে সে এমন ব্যবস্থা করে যেন রক্ত জমে না যায়!

বেশিরভাগ মানুষ জানে না মশারা অতিমাত্রায় রোমান্টিক এবং পুরুষ মশারা অতিমাত্রায় সাহায্যকারী! মানুষ মশার যে গান শোনে (কানের কাছে মশার গুনগুন) সেটা আসলে তাদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ। সেকেন্ডে দুই তিনশত বার নাকি মশারা ডানা ঝাপটায় এবং ঘণ্টায় দেড় দুই কিলোমিটার বেগে ছুটতে পারে। পুরুষ মশারা ব্যতিব্যস্ত রাখে মানুষকে যেন নির্বিঘ্নে স্ত্রী মশা তাদের রক্ত শুষে নিতে পারে! মশারা রোমান্টিক সময় কাটায় আকাশেই! ডিম থেকে পরিপূর্ণ মশা হতে সময় লাগে সপ্তাহ খানেক। একটা স্ত্রী মশা জীবদ্দশায় দশ হাজার ডিম পাড়তে সক্ষম। স্ত্রী মশার এই পারঙ্গমতার কারণে সহজে মশার সংখ্যা কমে না।

স্ত্রী মশারা কিন্তু পুরুষের চেয়ে নারীদেরই (গর্ভবতী নারীদের আরও বেশি) বেশি কামড়ায়! কারণ, নারীর শরীরের কার্বন-ডাই অক্সাইড ও অ্যামিনো এসিডের ঘ্রাণ বেশি টানে মশাদের। এমনকি যারা বেশি ব্যায়াম করে কিংবা বেশি বেশি বিয়ার ও অ্যালকোহল পান করে মশা নাকি তাদেরকেই বেশি কামড়ায়! মশার কামড় এবং সেটা নাকে ঢুকে যাওয়া নিয়ে নমরুদের গল্প এখনও মানুষের মাঝে জনপ্রিয়। খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার বছর আগেও রোমান সাম্রাজ্য,চীন কিংবা মিশরীয় সভ্যতায় মশার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। অনেকে ব্যঙ্গ করে বলে থাকেন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ভারতবর্ষে ঢুকতে পারেননি মশার ভয়ে, উল্টো তিনি যখন ফিরে যান মশার ঝাঁক নাকি গিয়েছিল তার পিছু পিছু! মশা আসলে কোথায় নেই? মশা আছে সেক্সপিয়রের নাটকে কিংবা কার্টুন এনিমেশন ছবিতেও! পুরাণের কাহিনিতেও আছে মশা। চামচিকা আর মশার সঙ্গে শত্রুতা নাকি বহুদিনের। আসলে বাদুড় বা চামচিকা ছোটখাটো পোকামাকড়ের সঙ্গে মশাও প্রচুর খায়। পাহাড়ি বা বনমানুষরা মশার হাত থেকে বাঁচার জন্য ঘুমাত নিম গাছের নিচে কিংবা তুলসি গাছের সঙ্গে। নিম,তুলসি কিংবা পুদিনার পাতার ঘ্রাণ মশা সহ্য করতে পারে না, তাই এসবের ধারে-কাছেও ঘেঁষতে চায় না।

চিল আর মশার ভেতর একটা মিল আছে। চিল যেমন বহু ওপর থেকে মুরগির বাচ্চাকে দেখতে পায়, মশাও তেমনি ১২০-১৫০ ফুট দূর থেকে খাবারের ঘ্রাণ পায়। মানুষের গায়ের ঘ্রাণ স্ত্রী মশাকে পাগল করে তোলে। পৃথিবীতে মশা আছে তিন হাজারেরও বেশি প্রজাতির। বাংলাদেশেই আছে নাকি ১১৪ প্রজাতির মশা। অ্যানোফিলিস, কিউলেক্স এবং এডিস মশাই সবচেয়ে বেশি জীবাণু ছড়ায়। ২০১৫ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৭ কোটি লোকের ভেতর দেড় কোটি লোক ম্যালেরিয়ার মতো অসুখে ভুগেছে। এই দেড় কোটির ভেতর এক কোটি মানুষই পার্বত্য এলাকার। বাঘ ভাল্লুক ততটা পারে না যতটা মশা পারে মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হতে!

আবার এই মশার জন্য কয়েকটা শিল্প দাঁড়িয়ে গেছে। কিছু মানুষ কাজ করে খেতে পারছে! হোক সে মশা মারার স্প্রে কিংবা কয়েল (হোক সেটা বৈদ্যুতিক মশার কয়েল) কিংবা ধূপ তৈরির কারখানা। মশারি কিংবা দরোজা জানালার নেট তৈরির কারখানা। মিউনিসিপ্যালিটির মশা নিধন কর্মসূচিতে অনেক লোক কাজ করছে। একসময়ে মশা নিধনের জন্য যত কীটনাশক বা ডিডিটি তৈরি হতো, মানুষের কল্যাণে সেসবের কিছু কিছুর উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মশা না কমার সেটাও একটা বড় কারণ। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের বিরক্তি উৎপাদন ও প্রাণঘাতী হওয়ার জন্য মশা একরকম টিকেই গেল। কী আর করা? প্রয়োজনে শিশুদের হাফপ্যান্ট না পরিয়ে ফুলপ্যান্ট ও মোজা পরিয়ে রাখুন, বড়রাও সেটা করুন আর মশারির নিচে আশ্রয় নিন, ঘরের আশপাশে নিম, তুলসি ও পুদিনার গাছ লাগান, তবু সুস্থ্ থাকুন! আর মশার কিছু মজার নাম শুনে ঘুমুতে যান!

এক. মশারা বাছবিচার করে না। তাই যে মশা এইডস রোগীকে কামড়ায় সে চরিত্রহীন মশা।

দুই. মশারা মানুষও চেনে না। তাই যে মশা গোলাম আজমকে কামড়ায় সে রাজাকার মশা।

তিন. মশার ঘ্রাণশক্তি যতই প্রবল হোক, নোংরাতেই তার বিস্তার। তাই যে মশা নাকে কামড়ায় সে নমরুদী মশা।

চার. মশারা সময় বোঝে না। তাই যে মশা বাসর রাতে কামড়ায় সে সবচাইতে বিরক্তিকর মশা।

পাঁচ. শুধুমাত্র স্ত্রী মশা রক্ত খায়। তারপরও যে মশা নারীদের কামড়ায় সে বিশ্বাসঘাতক মশা!

লেখক: রম্যলেখক

সূত্র: বাংলাট্রিবিউন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন