শিরোনাম :

একুশ শতকের গুপ্তধন!


বুধবার, ২৫ জুলাই ২০১৮, ১১:৫১ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

একুশ শতকের গুপ্তধন!

আমীন আল রশীদ

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট থেকে স্বর্ণ গায়েবের গুজব অথবা ঘটনার রেশ না কাটতেই খোদ রাজধানীতে গুপ্তধনের সন্ধান!

গুপ্তধন নিয়ে নানাবিধ মুখরোচক গল্প, কাহিনী, মিথ, লোককথা থাকলেও এই একুশ শতকে এসে কেউ এরকম মাটির নিচে গুপ্তধনের সন্ধান পাবেন আর রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেই গুপ্তধনের সন্ধানে দিনভর অভিযান চালাবে—ব্যাপারটা যতটা না বিস্ময়ের তার চেয়ে বেশি অদ্ভুত।

গণমাধ্যমের খবর বলছে, মিরপুর মডেল থানায় একজন এই মর্মে একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন যে, মিরপুর-১০ এর সি-ব্লকের ১৬ নম্বর রোডের একটি বাড়ির মাটির নিচে কমপক্ষে দুই মণ স্বর্ণালংকার আছে।

দাবি করা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই বাড়িতে দিলশাদ খান নামের একজন বিহারী বসবাস করতেন। যুদ্ধের পর তিনি যখন বাড়িটি ছেড়ে পাকিস্তানে চলে যান, তখন তার স্বর্ণালঙ্কারগুলো এই বাড়ির মাটির নিচে গচ্ছিত রেখে যান। ৪৭ বছর পরে এসে সেই সোনার সন্ধান! যদিও পুরো একদিন খোঁড়াখুঁড়ির পরও কথিত গুপ্তধন অধরাই থেকে যায় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান স্থগিত করে।

খোদ রাজধানীর ভেতরে এরকম একটি বাড়ির ভেতরে মাটির নিচে গুপ্তধনের সন্ধানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে পুলিশের এই অভিযান নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ ছিল না। বরং অভিযান শুরুর আগে থেকেই ওই বাড়ির আশেপাশে উৎসুক জনতার ভিড় লেগে যায়। টেলিভিশনে এই অভিযান এবং অভিযান ঘিরে মানুষের ঔৎসুক্য সরাসরি সম্প্রচারও করা হয়।

মোরাল অব দ্যে স্টোরি: মানুষের হাতে হাতে মোবাইল ফোন। বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নয়ন। মুহূর্তেই মানুষ সারা পৃথিবীর খবর জানে। মানুষ এখন যুক্তি মানে। কিন্তু তারপরও যখন কেউ গুপ্তধনের খবর বলে, সেটাও কানে নেয়।

 

২.
রাজধানীর অভিজাত শপিংমলগুলোয় বিশাল আয়োজনে হস্তরেখাবিদ বা জ্যোতিষীদের দোকানে লাখ টাকা দামের আংটি পাওয়া যায়। সেগুলো কেনার লোকেরও অভাব নেই। টিভিতে বিজ্ঞাপনও প্রচার হয়। জ্যোতিষরাজ অমুক তমুক। টেলিভিশন ও সিনেমার বহু তারকাও সেই কথিত জ্যোতিষরাজের গুণকীর্তন করেন। তারা এগুলো পয়সার জন্য করেন সন্দেহ নেই। কিন্তু এইসব আংটিতে ভাগ্য বদলে বিশ্বাসী লোকের অভাব নেই। না হলে মাসে মাসে দোকানের লাখ টাকা ভাড়া দিয়ে এসব জ্যোতিষরাজ বহু আগেই ফতুর হয়ে যেতেন। এরা মানুষের ভুত-ভবিষ্যৎ বলে দেন। অবশ্য নিজেদের ভবিষ্যৎ কতটুকু জানেন তা নিয়ে সন্দেহ করা যেতেই পারে। আবার এইসব জ্যোতিষরাজের কাছে শুধু অশিক্ষিত লোকেরাই যান তা নয়; বরং সমাজের বিত্তবান তো বটেই, শিক্ষিত অংশের লোকেরাও যান।

মোরাল অব দ্য স্টোরি : মানুষের জ্ঞানগম্যি আর বুদ্ধি-বিবেচনা যতই বাড়ুক; মানুষ যতই নিজেকে বিজ্ঞানমনস্ক বলে দাবি করুক—আংটিতে ভাগ্য বদলে বিশ্বাসী লোকের সংখ্যাও এই সমাজে এখনও প্রচুর।

৩.
আন্ডারগ্রাউন্ড বা দুই টাকা দামের রাস্তার কাগজ নয়, দেশের শীর্ষ জাতীয় দৈনিকেও নিয়মিত রাশিফল ছাপা হয়। পৃথিবীর সাতশো কোটি মানুষের জন্য মাত্র ১২টি রাশি। সুতরাং জ্যোতিষী প্রতিটি রাশির বিপরীতে প্রেম ও রোমান্স শুভ, যাত্রা অশুভ, পাওনা আদায় সহজ হবে—জাতীয় যেসব কথাবার্তা লেখেন, তা তো এই সাতশো কোটি মানুষের কারো না কারো সঙ্গে মিলবেই। আজ সকালে পত্রিকার পাতায় আপনার রাশি সম্পর্কে যা লেখা হলো, কাকতালীয়ভাবেও তো সেটিও মিলতে পারে। কিন্তু যদি আপনি রাশিফল নিয়মিত পড়েন, তাহলে আপনি কি বলতে পারবেন, জীবনে কয়বার রাশিতে যা লেখা তা মিলেছে? সংখ্যাটা নিশ্চয়ই অতি সামান্য। কিন্তু তারপরও এই রাশিফল বিশ্বাস করার লোকের অভাব নেই।

প্রশ্ন হলো, দেশের শীর্ষ দৈনিকগুলো, যেখানে বিজ্ঞানমনস্ক আধুনিক মানুষেরা কাজ করেন—সেখানে রাশিফলের মতো জিনিস কী করে ছাপা হয়? জবাব, পাঠক খায়। অসংখ্য মানুষ পত্রিকা হাতে নিয়ে শুরুতেই রাশিফলে চোখ বোলান। যিনি রাশিফল বিশ্বাস করেন না তিনিও পড়েন। অনেকে নিছকই বিনোদনের জন্য পড়েন।

এ বিষয়ে একটা ঘটনা না বললেই নয়। রাজনৈতিক বিশ্বাস যাই থাকুক না কেন, যায়যায়দিনের সাবেক সম্পাদক শফিক রেহমানকে আমরা একজন আধুনিক চিন্তার মানুষ হিসেবেই চিনি। তিনি দৈনিক যায়যায়দিনের সম্পাদক থাকাকালীন একবার এই রাশিফল বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তখন এটি ছাপা হতো পত্রিকার এডিটরিয়াল পাতায়। অর্থাৎ রাজনীতি-সমাজ-অর্থনীতি নিয়ে সিরিয়াস এবং অ্যাকাডেমিক লেখা ছাপা হয় যেখানে। কিন্তু বাণিজ্যিক কারণেই হোক বা অন্য কোনো কারণ—রাশিফল ছাপানোর সিদ্ধান্তই বহাল থাকে। তখন আমি তাকে পরামর্শ দিয়েছিলাম, এটি এডিটরিয়াল পৃষ্ঠা থেকে সরিয়ে বিনোদন পাতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। শফিক ভাই এর যুক্তি জানতে চাইলেন। বললাম, রাশিফল আসলে মানুষ বিনোদন পাওয়ার জন্য পড়ে। সুতরাং এর উপযুক্ত জায়গা নাটক-সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের সাথেই। শফিক রেহমান আইডিয়াটা পছন্দ করেন।

মোরাল অব দ্য স্টোরি: রাশিফল শুধু বিনোদন নয়; অসংখ্য মানুষ এটি বিশ্বাস করে এবং খুব আধুনিক চিন্তা-চেতনার সংবাদপত্রও এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে রাশিফলের মতো একটি বিষয় পুরোপুরি বাদ দেয়ার সাহস করে না।

৪.
বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের একজন যুগ্মসচিব। সিনিয়র বন্ধু। কোনো এক প্রসঙ্গে একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, বাংলাদেশের ৫ জন বিজ্ঞানীর নাম বলো তো। অনেকক্ষণ মাথা চুলকানোর পরে ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস (তিনি আমার একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন) এবং জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. আতিক রহমানের নাম বলতে পারি। কিন্তু তারপরও তিনি আমাকে এই বলে ধন্যবাদ দেন যে, দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর লোকেরাও দুজন বিজ্ঞানীর নাম বলতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ বিজ্ঞান আমাদের পাঠ্যবই থেকেও পারলে উঠে যাচ্ছে।

এইচএসসি পাসের পরে একটা বড় অংশের লক্ষ্য থাকে নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে স্নাতকে ভর্তি হওয়া—যেসব বিষয়ে পড়লে পাস করার সাথে সাথে লোভনীয় বেতনে বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি পাওয়া যাবে অথবা বিসিএস। ফলে বিজ্ঞান পড়ার প্রতি এই প্রজন্মের আগ্রহ কতটা—তা নিয়ে সংশয়ের যথেষ্ট কারণ আছে।

মোরাল অব দ্য স্টোরি: বিজ্ঞান থেকে দূরে গিয়ে চাকরিকেন্দ্রিক পড়ালেখা মানুষকে অনেক বেশি ভাগ্য ও অদৃষ্টনির্ভর করে তোলে। ফলে তাদের রাশিফল কিংবা জ্যোতিষরাজের আংটিতে ভাগ্য বদলে বিশ্বাস করানো যায় সহজেই।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন