শিরোনাম :

বসবাস ‘অযোগ্য’ ঢাকাকে বাসযোগ্য করবে কে?


মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট ২০১৮, ১২:৩৯ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

বসবাস ‘অযোগ্য’ ঢাকাকে বাসযোগ্য করবে কে?

প্রদীপ চৌধুরী: 

যুক্তরাজ্যের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট-ইআইইউ’র বার্ষিক জরিপে বিশ্বে বসবাস অযোগ্য শহরের তালিকায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। এতে অযোগ্য শহর হিসেবে প্রথম স্থান পেয়েছে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত সিরিয়ার দামেস্ক। গত বছর সংস্থাটির এমন জরিপে ঢাকার স্থান ছিল চতুর্থ।

আমরা জেনেছি, বিশ্বের ১৪০টি শহরকে নিয়ে করা এই জরিপে ঢাকার অবস্থান মূলত ১৩৯। শেষের দিক থেকে ধরলে দ্বিতীয়। একটি শহরের সংঘটিত অপরাধ, সামাজিক অস্থিরতা, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ অথবা যুদ্ধের মতো বিষয়গুলোতে পয়েন্ট বিবেচনায় বসবাস অযোগ্য শহরের তালিকা করা হয়।

ঢাকার ক্ষেত্রে জরিপে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদেরকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এখানে জঙ্গিবাদের উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। যদিও এরইমধ্যে জঙ্গি দমনে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মহলের উচ্চকিত প্রশংসা কুড়িয়েছে। তাই জঙ্গিবাদের উচ্চঝুঁকির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

আমরা প্রায়ই দেখি, বাংলাদেশের রাজধানীকে নিয়ে নানা বিষয়ে এমন অনেক জরিপ করতে। এইতো গত বছর থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনের এক জরিপে বলা হয়, নারীদের জন্য ঢাকা পৃথিবীর সপ্তম বিপজ্জনক শহর। এর বাইরে শব্দ দূষণ, বায়ূ দূষণ, যানজটের মতো বিষয় নিয়েও জরিপের তালিকায় প্রথম দিকেই বারবার ঢাকার স্থান হয়েছে।

এটা ঠিক ঢাকার মতো এমন জনবহুল শহর পৃথিবীতে খুব কমই আছে। যে শহরে কোনো একটা সাধারণ কাজের জন্যও সারাদেশের মানুষ ছুটে আসে। এখানে শিক্ষা, চিকিৎসা, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুই ঢাকা কেন্দ্রিক। তাই শত শত সমস্যার মুখোমুখি হয়েও এখানেই থাকতে হয় উপায়হীন মানুষগুলোকে।

সমস্যার মাপকাঠিতে বিচার করলে ঢাকা শহরের সমস্যার অন্ত নেই। সেইসব সমস্যার সমাধান খুব সহজে হবে না। তবে কেউ কেউ চেষ্টা করেছেন এই শহরটিকে সুন্দর করে সাজাতে। তারা কেউ সাফল্য পেয়েছেন, আবার কেউ পাননি। সবচেয়ে বড় কথা ঢাকা কোনো একক কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনায় পরিচালিত হয় না বলে সমস্যার দায় কেউ নিতে চায় না। এ জন্যই এক প্রতিষ্ঠান বলতে পারে, এই কাজ আমার না। আরেক প্রতিষ্ঠান বলে, এই কাজের কথাতো আমি জানিই না। কোনো প্রতিষ্ঠান আবার ‘ও, দেখছি’ বলে দায় এড়ায়। অার এখানেই সমস্যাগুলো আরো জটিল আকার ধারণ করে।

রাজধানী ঢাকায় অন্তত অর্ধশতাধিক সেবা প্রতিষ্ঠান কাজ করে থাকে। যাদের মধ্যে বেশির ভাগই স্বাধীনভাবে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান। এখানেই বড় রকমের সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। কেউ কারো পরামর্শ না শুনে নিজের মতো করে কাজ করে যায়। এতে অনেক সময় দেখা যায়, একই কাজ একাধিক প্রতিষ্ঠান করছে।

এই সমস্যা থেকে বের হয়ে অাসতে কয়েকজন মেয়র ‘নগর সরকারে’র প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে এ বিষয়ে সরকারকে উদ্যোগ নিতে বলেছে। তাদের বক্তব্য, জনপ্রতিনিধি হিসেবে মেয়রকেই জনগণের কাছে নানা সমস্যায় জবাবদিহিতা করতে হয়। কিন্তু সেইসব সমস্যা সমাধনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মেয়রদের করার কিছু থাকে না। তাই রাজধানীর সবগুলো সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে সমন্বয় করে একটি কর্তৃপক্ষের অাওতায় এনে সমস্যা সমাধানের কথা বলছেন তারা।

এমন জটিলতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। ঢাকার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিফোন, পরিবেশ সংরক্ষণ, নগর উন্নয়ন, সড়ক ও জনপথ, জননিরাপত্তা, পরিবহন, আবাসন ইত্যাদি বিষয়গুলো আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠান দেখে থাকে। তাদেরকে একটি সমন্বিত কর্তৃপক্ষের অধীনে আনা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

মেয়রদের দাবির মুখে নগর সরকার নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় আলাপ-আলোচনা শুরুর কথা জানা গেলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তব রূপ লাভ করেনি। এমনকি এ ব্যাপারে মন্ত্রিসভায় নীতিগত সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছিল। তার মানে দাঁড়াচ্ছে সরকারই চায় না সিটি করপোরেশনগুলোতে বিশেষ করে রাজধানীতে নগর সরকার হোক।

সম্প্রতি নিরাপদ সড়কের দাবিতে আমরা শিক্ষর্থীদের আন্দোলন দেখেছি। বেপরোয়া বাসের চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর ওই আন্দোলন আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে; এই শহরের প্রতিটা ক্ষেত্রেই অনিয়ম। তারা শুধু সেই অনিয়মগুলোই তুলে ধরেনি; তার সমাধানও দেখিয়েছে। বিশৃঙ্খল নগরীতে তারা মাত্র কয়েকদিনেই শৃঙ্খলার মধ্যে এনে দেখিয়ে এটা সম্ভব।

তাই সবকিছুর পরও এই শহরকে একটি মানবিক শহর হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সেই দায়িত্বটা নেবেন কে? যেই নিন না কেন, তাকে পরিকল্পিতভাবে একটু একটু করে রাজধানীকে বাসযোগ্য করে তুলতে হবে।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন