শিরোনাম :

সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত নগরদরিদ্ররা


সোমবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:০১ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত নগরদরিদ্ররা

জাহিদ রহমান : ঢাকার মিরপুরের শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বালুর মাঠ বস্তিতে বসবাস করেন ষাটোর্ধ্ব রেহানা। বলা যায় জীবনের পুরো সময় বস্তিতেই কাটিয়েছেন তিনি। সেই কবে বস্তিতে তার ঠাঁই হয়েছে স্মৃতিতে তার কিছুই নেই। রেহানার পৈত্রিক নিবাস নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জে। বস্তিতে ছেলেমেয়ে নিয়ে কষ্টেই থাকেন। ছোট্ট এক রুমের টিনের ঘরে তার সংসার। বস্তিতে পানির কষ্ট, রান্না-বান্নার কষ্ট, হাঁটা-চলার কষ্ট, বাথরুম-টয়লেটের কষ্ট জীবনভর দেখে আসছেন। কিন্তু কিছুই করার নেই বলে বস্তিতেই পড়ে আছেন।

ঢাকা শহরে বস্তি, ঝুঁপড়ি এবং চলাচলের পথে যে অগনিত নগর দরিদ্রদের বসবাস রেহানা তাদেরই একজন। রেহানারা সমস্ত ধরনের মৌলিক অধিকার থেকেই বঞ্চিত। রেহানা এ যাবতকাল সরকার প্রদত্ত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় কোনো সুবিধাও পাননি। তিনি শুনেছেন সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের ভাতা দেওয়া হয়। কিন্তু তার ভাগ্যে কিছুই জোটেনি। রেহানার স্বামী পেশায় দিনমজুর। দুই ছেলে মেয়ে তার। ছেলের বিয়েও দিয়েছেন। বালুর মাঠ বস্তিতে আড়াইজাহার টাকা ঘর ভাড়া দিয়ে থাকেন। এই একই বস্তির বৃদ্ধা আনোয়ারার ভাগ্যেও কোনো ভাতা জুটেনি। রেহানা, আনোয়ারা দুজনেরই জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি কার্ড রয়েছে। কিন্তু কোনো সুবিধাই তাদের কপালে জোটেনি। শুধু রেহানা আর আনোয়ারাই নয়, এরকম আরো শত শত বস্তিবাসী, ঝুপড়িবাসী, পথবাসী রয়েছেন যাদের কপালে সামাজিক নিরাপত্ত কর্মসূচির আওতায় এক কেজি চালও কোনো দিন জোটেনি।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের এক মহৎ উদ্যোগ, যা সমাজের বঞ্চিত ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের এক বৃহৎ প্রচেষ্টা। বেশ আগে থেকেই এই কর্মসূচি শুরু হয়েছে। বর্তমানে সারাদেশে সামাজিক কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা ৮৫ লাখেরও বেশি। গত ৭ জুন উপস্থাপিত বাজেটে নতুন করে প্রায় ১১ লাখ দরিদ্র মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এবারের বাজেটে দেখা যায়, সামাজিক সুরক্ষা বা নিরাপত্তার বিভিন্ন খাতের কলেবর বৃদ্ধি করা হয়েছে। যেমন বয়স্ক ভাতাভোগীর সংখ্যা ৩৫ লাখ থেকে ৪০ লাখ করা হয়েছে। বিধবা ও স্বামী নিগৃহীত ভাতাভোগীর সংখ্যা ১২ রাখ ৬৫ হাজার থেকে ১৪ লক্ষে বৃদ্ধি করা হয়েছে। মাতৃত্বকালীন ভাতা ৫০০ টাকার জায়গায় বাড়িয়ে ৮০০ টাকা করা হয়েছে। একইসাথে ক্যান্সার, লিভার সিরোসিস, জন্মগত হৃদরোগীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এরকম আরো বিভিন্ন খাতে সুযোগ-সুবিধা আরো বাড়ানো হয়েছে। শুধু এই নয়, ভাতাভোগী বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমকে লক্ষ্যভিত্তিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার জন্যে জিটুপি (গভর্নমেন্ট টু পার্সন) পদ্ধতিরও প্রবর্তন করা হয়েছে। অর্থাৎ ভাতাভোগীর ব্যাংক হিসাবেই এখন সরাসরি ভাতার টাকা জমা হচ্ছে। মূলত এই খাতে দুর্নীতি কমিয়ে আনতে এ ধরনের নতুন নতুন ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হচ্ছে।

দারিদ্র্য, বিপদাপন্নতা ও প্রান্তিকীকরণ-এই ত্রয়ী সমস্যা মোকাবেলার একটি মূল কৌশল হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তার গুরুত্বকে স্বীকার করে বাংলাদেশ সে অনুযায়ী কাজ করছে। দ্রুত নগরায়ণ, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ, যোগানকে ছাপিয়ে যাওয়া চাহিদা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিকাশমান প্রভাব ইত্যাদি কারণে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বর্তমান কর্মসূচিগুলোকে প্রধান প্রধান ঝুঁকিসমূহের আলোকে সংহতিকরণ ও যৌক্তিকীকরণের সুযাগ রয়েছে। গত দশকগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তার কার্যক্রম প্রতিবছরই ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। বর্তমানে ২৩টি মন্ত্রণালয়/বিভাগের আওতায় ১৪৫টি প্রকল্প/কর্মসূচি চালু আছে এবং এসব কর্মসূচিতে ব্যয় হচ্ছে জিডিপির প্রায় ২.৫৫ শতাংশ অথবা সরকারের মোট বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশ। তবে সরকারের নীতি পর্যায় থেকেও বলা হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে কর্মসূচিগুওলোর বৃদ্ধির ফলে এগুলো বিক্ষিপ্তভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। তাছাড়া ত্রুটিপূর্ণ টার্গেটিং, অপচয় ও আন্তঃমন্ত্রণালয় ভিত্তিক সমন্বয়ের অভাবে কর্মসূচির বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দ্বৈততা এবং সুবিধাভোগীর আওতা তুলনামূলকভাবে কম হচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা- ‘বাংলাদেশ প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২০২১’ প্রণয়ন করেছে যার উপর ভিত্তি করে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণীত হয়েছে ও বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাও তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়াও সরকার জাতীয় টেকসই উন্নয়ন কৌশল ২০১০-২১ অনুমোদন করেছে। এসব পরিকল্পনা ও কৌশল আমাদের বহু কাঙ্ক্ষিত ‘রূপকল্প ২০২১’ বাস্তবায়নের সাথে সঙ্গতি রেখেই করা হয়েছে। ‘রূপকল্প ২০২১’ এ ন্যায্যতার ভিত্তিতে ত্বরান্বিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথনকশা দেয়া হয়েছে এবং দারিদ্র্য, অসমতা ও মানবিক বৈষম্য দূরীকরণের কৌশল বিবৃত হয়েছে। সরকারের এ সব উদ্যোগই প্রশংসনীয়।কিন্তু সামাজিক সুরক্ষা বা কর্মসূচির আওতা থেকে নগর দরিদ্ররা যে বঞ্চিত তা বলাই বাহুল্য। নগর দরিদ্ররা সেই অর্থে সুবিধা পাচ্ছে না, যতোটা গ্রামের দরিদ্ররা পাচ্ছে। নগর দরিদ্রদের বড় অংশই তাই সরকার প্রদত্ত সুবিধা পাওয়া থেকে কোনো না কোনোভাবে বঞ্চিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত খানা আয়-ব্যয় জরিপ থেকে দেখা যায়, দরিদ্র ও ঝুঁকিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য নেয়া এসব কর্মসূচির আওতা বেড়েছে এবং কর্মসূচিগুলো দারিদ্র্য-হ্রাসে সহায়তা করেছে। তথ্য-উপাত্ত থেকে আরও দেখা যায়, দরিদ্র ও ঝুঁকিগ্রস্ত পরিবারগুলোর যে উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও এসব কর্মসূচির আওতার বাইরে রয়েছে এটি শহরের দরিদ্রদের বেলায় বেশি দৃশ্যমান। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে বেশিরভাগ নগর দরিদ্র জানেই না, তাদের জন্য সরকার প্রদত্ত বিভিন্ন সুবিধাদি রয়েছে। আবার যারা জানে সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম রাজধানী ঢাকার বস্তিবাসীর অধিকার সুরক্ষা কমিটির সভাপতি হোসনে আরা বেগম রাফেজার সাথে। তিনি জানিয়েছেন, বেশিরভাগ বস্তির মানুষই সরকার প্রদত্ত কোনো ধরনের সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় সুবিধা সেভাবে পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের চরম অনীহার কারণেই এমনটি হচ্ছে। প্রচার-প্রচারণা না থাকার কারণে বস্তিবাসীই জানেই না তাদের জন্য কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। ফলে নগরদরিদ্রদের বড় অংশ তাদের প্রাপ্য অধিকার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।খোঁজখবর নিয়ে দেখা গেছে, সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পাওয়া ক্ষেত্রে ঝক্কিও কম না। বিশেষ করে ঘুষ না দিলে টাকা পাওয়া সম্ভব হয় না। ব্যাংক কর্মকর্তারা সু-কৌশলে টাকা গ্রহণ করে থাকে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন ব্যাংক থেকে ভাতার ৩০০০ টাকা (ছয় মাস পর প্রাপ্ত) তুলতে গেলে আগেই কর্মকর্তাদের দেড় হাজার টাকা দিতে হয়। এ ধরনের প্রথা নাকি অনেক আগে থেকেই চালু হয়ে আসছে। রাজধানীর অনেক বস্তিতেই সরেজমিনে গিয়ে এই একই ধরনের অভিযোগ শোনা গেছে। স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সামান্য একটি রেডকার্ডের (যে কার্ড সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত হাসপাতালে ফ্রি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে) জন্যেও বস্তির নারীদের এককালীন দুই থেকে তিন হাজার টাকা দিতে হয়েছে। অথচ সরকারের নীতি অনুযায়ী বস্তির একজন দরিদ্র নারীর একেবারেই বিনামূল্যে রেডকার্ড পাওয়ার কথা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুর‌্যোর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী সারাদেশে বস্তির সংখ্যা ১৩ হাজার ৯৪৩টি। বস্তিবাসীর মোট সংখ্যা প্রায় ২৩ লাখ। এর মধ্যে শুধু ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় মোট বস্তি রয়েছে প্রায় ৪ হাজার। নগরের বস্তিবাসী কেমন আছে তা সরেজমিনে না গিয়ে দেখলে কোনোভাবেই তাদের বঞ্চনা বুঝার উপায় নেই। অনেক বস্তিবাসী রোহিঙ্গাদের চেয়েও খারাপ জীবনযাপন করছে। নিত্য পানি, গ্যাস, বিদ্যুত সমস্যার পাশপাশি সবেচেয়ে যে বড় সমস্যা তাদের যাপিতজীবনকে দুঃসহ করে তুলেছে সেটা হলো-স্যানিটেশন। বেশিরভাগ বস্তিতেই প্রয়োজনীয় টয়লেটের ব্যবস্থা নেই। ফলে দুর্গন্ধ যুক্ত জায়গাতেই পরিবারপরিজন সহ কাটছে বছরের পর বছর। ফিরে যাই রেহানা, আনোয়ারার কথায়। নগরের বস্তিগুলোতে হাজার হাজার রেহানা, আনোয়ারা রয়েছে যাদের পুরো জীবনই বেঁচে থাকার সংগ্রাম, লড়াইয়ে পরিপূর্ণ। কিন্তু কোনো সুবিধাদিই তাদের ভাগ্যে জুটছে না। আবার বস্তির বাইরে নগরে যে বিরাট সংখ্যক ভাসমান পথবাসী রয়েছে তারাও এই সুবিধা থেকে সম্পূর্ণরুপে বঞ্চিত। জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকার কারণে তারা এই সুবিধা পাওয়ার যোগ্যই না বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এসব প্রেক্ষিতগুলো বিবেচনায় নিয়ে অবশ্যই সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নগর দরিদ্রদের দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারকে আরো নতুন কর্মকৌশল বের করতে হবে-যাতে করে সবাই অতিসহজে সুবিধাগুলো পেতে পারেন।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন