শিরোনাম :

নদীভাঙন কী বন্ধ করা যায় না?


রবিবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১২:২২ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

নদীভাঙন কী বন্ধ করা যায় না?

জাহিদ রহমান:

২০১৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর দৈনিক ডেইলি স্টারে নদীভাঙন সম্পর্কিত একটি রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল। যেখানে তৎকালীন পানিসম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেছিলেন, নদীভাঙনের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৫০,০০০ মানুষ গৃহহীন হয় যা কিনা দেশের মোট গৃহহীন মানুষের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ।

ইন্সটিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং আয়োজিত সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেছিলেন। সেখানে তিনি আরও বলেছিলেন, বন্যা নিয়ন্ত্রণে সরকার অস্থায়ী বাধের পরিবর্তে স্থায়ী কোনো স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা করছে কারণ অস্থায়ী বাঁধ পানির উচ্চতা ও পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে প্রতি বছরই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। একই সেমিনারে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট অথোরিটি (বিআইডব্লিউটিএ)-এর তৎকালীন চেয়ারম্যান এম. মোজাম্মেল হক বলেছিলেন স্থানীয় সরকারের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, বিআইডব্লিউটিএ শীঘ্রই একত্রে একটি ড্রেজিং উদ্যোগ নেবে যা আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ৪০০ নদীর প্রাণসঞ্চার করবে।

বাংলাদেশের নদীগুলোতে কতোটা প্রাণসঞ্চার হয়েছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তবে নদীভাঙন যে একটুও কমেনি তা বলাই বাহুল্য। প্রতিদিনই গণমাধ্যমে নদীভাঙনের খবর আসছে। ঘরবাড়ি আর সহায় সম্পদ হারানো মানুষের করুণ মুখচ্ছবি বলে দিচ্ছে নদী তাদের সব কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে এবারে পদ্মা ও মেঘনার ভাঙন শত শত মানুষকে গৃহহীন করেছে। শরীয়তপুরের নড়িয়াতে চারতলা বিল্ডিং পর্যন্ত নদী গর্ভে চলে গেছে। নদী ভাঙনের মুখে পড়েছে কুষ্ঠিয়ার শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি পর্যন্ত।

তবে প্রতিবছরই সবচেয়ে বেশি নদীভাঙনের করুণ শিকার হন মূলত চরে বসবাসকারী মানুষগুলো। অনেক শহরও এখন হুমকির মুখোমুখি। তবে চরাঞ্চলে বসবাসরত মানুষের নিয়তিই বেশি নিষ্ঠুর। পুরনো স্মৃতির মতো রাত পোহাবার পরপরই দেখেছে পানির হুংকার চারিদিকে। পানির তোড়ে দুপাড় ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে। দ্রুতই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, দোকানপাট, ফসলের মাঠ, সাজানো-গোছানো ঘর সংসার। পদ্মার আরিচা থেকে চাঁদপুর এই একশত কিলোমিটারে এবার সর্বগ্রাসী নদীভাঙন চলছে। এখানকার নদীভাঙা মানুষের দুর্ভোগের সীমা ছাড়িয়ে গেছ। চারিদিকে এখন গৃহহীন মানুষের ছড়াছড়ি। সবার চোখেমুখে শঙ্কা।

ঘরবাড়ি ভেঙে যাওয়ায় স্বভাবতই অনেকের বাড়িতে রান্নাবান্না নেই। খাবার পানির সংকটও দেখা গেছে। ছোট ছোট শিশুদের অনেকেই না খেয়ে থাকছে। নদী গর্ভে চলে যাওয়ার আগেই নিজের প্রিয় ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলছেন অনেকে। আসবাবপত্র নিয়ে অন্য দিকে চলে যাচ্ছেন কেউ কেউ। বসতভিটা নদীতে চলে যাওয়ায় অনেকে শোকে দুঃখে কাঁদছেন।

বাংলাদেশে যে ব্যাপক সংখ্যক অতিদরিদ্র বা হতদরিদ্র মানুষ রয়েছে তার বড় একটি অংশের বসবাস দ্বীপচরে। হিসেবে মতে, এই মানুষের সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০ লক্ষের কম হবে না। এর মধ্যে বড় অংশই অতিদরিদ্র। যারা পেশায় দিনমজুর। কেউ কেউ কৃষি কাজ ও মাছ শিকারের সাথে জড়িত। এর মধ্যে অতিদরিদ্র নারীদেও অবস্থা সবচেয়ে করুণ। চরের এই অতিদরিদ্র মানুষের বছর ধরেই খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হয়। এই দরিদ্ররাই সবচেয়ে বেশি নদী ভাঙনের শিকার হচ্ছেন প্রতিবছর। এসব মানুষেরা মূলত উত্তরাধিকার সূত্রেই বছরের পর বছর ধরে চরাঞ্চলে বসবাস করে থাকে। নদীই তাদের জীবন এবং মরণ। আর এ কারণেই শত প্রতিকূলতা বা বাঁধা এলেও মানুষগুলো নদীর বুকেই আঁকড়ে পড়ে থাকে। বছর দুয়েক আগে বিবিসি বাংলা এক রিপোর্টে জানিয়েছিল গত চার দশকে বাংলাদেশের প্রধান তিনটি নদীতে দেড় লক্ষ হেক্টর জমি হারিয়ে গেছে। আর ফেরত পাওয়া গেছে প্রায় পঞ্চাশ হাজার হেক্টর জমি। চরে বসবাসরত অনেক মানুষই আছে গড়ে ৭ থেকে ১০ বার নদী ভাঙনের শিকার হয়েছেন। তবু উপায়ান্তর না দেখে নদী তীরেই বা চরে থেকেছেন।

এবারও নদী ভাঙনের করুণ শিকার হয়ে হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে। তাদের কান্না যেনো কেউ শুনছে না। শোনার মানুষও বোধ হয় নেই। কী রাজনীতিবিদ, কর্পোরেট এনজিও অথবা সুশীল সমাজের প্রতিনিধি।দেশের বিভিন্ন ইস্যুতে যারা কান্নায় বুক ভাসান, বুক চাপড়িয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, নানা উন্মাদনা তৈরি করেন তারাও চুপচাপ। যেসব কর্পোরেট এনজিও দরিদ্র মানুষের নাম ভাঙিয়ে দেশে সম্পদের পাহাড় বানিয়েছে, নানানরকম ব্যবসা-বাণিজ্য ফেঁদেছে, নিজেরাই মহাবিত্তশালী হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তাদের কাছেও নদীভাঙা মানুষের কান্নার কোনো মূল্য আছে বলে মনে হয় না। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষগুলোর তীব্র ক্ষোভ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর আগে লালমনিরহাটের নদীভাঙ্গা মানুষেরা বলেছিল ‘আমরা ত্রাণ চাই না, আগে নদী ভঙন ঠেকান’।

নদী ভাঙা প্রতিরোধ এবং নদীভাঙা মানুষের পুনর্বাসন এবং প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা প্রদানে সরকারেরও তেমন আলাদা বরাদ্দ নেই। জেলা বা উপজেলাগুলোতে সরকারের যে ডিজাস্টার ফান্ড রয়েছে সেখান থেকে নামকাওয়ান্তে কিছু খয়রাতি সাহায্য সহযোগিতা করা হলেও ফান্ড অপ্রতুলতার কারণে সেটা খুব বেশি ফলদায়ক কিছু হয় না। নদীভাঙা মানুষের যে নিয়ত দুর্ভোগ তা থেকে তাদেরকে মুক্তি দিতে হলে সরকারের কিছু সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। প্রথমত: নদী ভাঙা মানুষের পূনর্বাসনে জেলা-উপজেলাগুলো সরকারের সুনির্দিষ্ট ফান্ড থাকা প্রয়োজন। যেখান থেকে ভাঙন কবলিত মানুষগুলোকে দ্রুত সাহায্য সহযোগিতা করার সুযোগ থাকবে। একইভাবে নদী ভাঙন এলাকাতে যে সব উন্নয়ন সংগঠন কাজ করে তাদের একটি সমন্বিত ফান্ডের ব্যবস্থা থাকবে যা থেকে তারা দ্রুতই দুর্যোগ এলাকাগুলোতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সক্ষম হবে। এদিকে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো-নদী ভাঙনকে আজ পর্যন্ত ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়নি। অথচ এটি সারাবছর ধরেই চলে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কোনো দুর্যোগের চেয়েই কম নয়।

নদীভাঙন রোধে সরকারের উদ্যোগ যে মোটেও কার্যকর হচ্ছে না তা নদীভাঙা মানুষগুলো সরাসরিই বলছেন। নদীভাঙন রোধে কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, রাজবাড়িসহ বিভিন্ন জায়গাতে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাতে বাঁধ দেওয়া হলেও চরম দুর্নীতির কারণে বাঁধগুলো এখন হুমকির সস্মুখীন। আবার গত কয়েকবছরে নদীগুলো পরিকল্পিতভাবে ড্রেজিং হয়েছে বলে মনে হয় না। ড্রেজিং-এ লুটপাটের খবর এ এসেছে গণমাধ্যমে। ফলে নদীভাঙনের তীব্রতা বেড়েই চলেছে। এবারে এখনও বন্যা না হলেও যেভাবে নদীভাঙন হচ্ছে তা অবশ্যই চিন্তার বিষয়। সামনে যদি সত্যি সত্যিই বড় ধরনের বন্যা হয় তাহলে নদীভাঙন আরো অনেক বাড়বে।

নদী ভাঙনরোধে আমাদের সামর্থ্য এ যাবৎকাল খুব একটা প্রমাণিত হয়নি বলেই প্রতীয়মান। কাজের চেয়ে প্রতিশ্রুতি আর দুর্নীতিই বেশি হয়েছে। প্রতিবছর নদীভাঙন হলেও ভাঙন প্রতিরোধের পরিকল্পনা ও প্রয়োগের অব্যবস্থাপনা বড্ড বেশি ফুটে উঠে। এবারও তাই। আর কেবলই কাঁদছে নদীভাঙনের শিকার হওয়া গৃহহীন মানুষেরা।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন