শিরোনাম :

বিদেশে গিয়ে কী শেখেন?


রবিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:৪৫ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

বিদেশে গিয়ে কী শেখেন?

গোধূলি খান:

আশরাফ আলী (ছদ্মনাম) বাংলাদেশ সরকারের বড় কর্মকর্তা, এসেছেন ইউনাইটেড নেশন্সে বিশেষ বিভাগের প্রধানের সাথে দেখা করতে, সাথে চেলাচামুণ্ডা আছে তিন বা চার জন। গাড়ি থেকে নেমে কিছুদূর হেঁটে বিল্ডিং-এ ঢুকলেন, সিক্যুরিটি পার হলেন, জ্যাকেট খুলে, ব্যাগ চেক করিয়ে। শুধু তাই না, নিজের পরিচয়পত্র, যা ছবি সংবলিত তা দেখালেন। এর ফাঁকে তিনি সিক্যুরিটি স্ট্যাফদের হাই হ্যালো করলেন, তাদের কর্মদক্ষতার প্রশংসাও করলেন। সব কিছু নিয়মমাফিক শেষ হলে চললেন বিশেষ বিভাগের দিকে।

দেশে ফিরলেন, দুইদিন পর যাচ্ছেন রিপোর্ট দিতে, গাড়ী পারলে অফিসের দোরগড়ায় নামেন। চেকিং মেশিনের পাস দিয়ে ঢুকলেন। নিরাপত্তা কর্মীরা তল্লাসি গেটের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার রিকোয়েস্ট করতেই দিলেন ঝাড়ি, জানো আমি কে?

বশীর চৌধুরী (ছদ্মনাম) আগে ছিলেন মিয়া, অঢেল টাকা পয়সা হবার পরে হয়েছেন চৌধুরী। নিউইয়র্কের রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছেন ট্রাফিক আইন মেনে। পানি খেয়ে গাড়ির মধ্যে রাখছেন খালি বোতল। ব্যস্ত ম্যানহাটানে গাড়ি পার্ক করলেন, ডে পার্কিং এ, ৩২ ডলার দিয়ে ৩ ঘণ্টার জন্য। গাড়ি থেকে নামার সময় খালি চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল, চুইংগামের র‍্যাপার জড়ো করে নিয়ে নামলেন গাড়ি থেকে। বাইরে এসে ফেললেন নির্দিষ্ট বিনে।

চৌধুরী সাহেব ঢাকার রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছেন, পানি খেয়ে খালি বোতল ছুঁড়ে ফেললেন রাস্তায়, একটু পরে ফেললেন চিপসের খালি প্যাকেট। খ্যাঁক করে থুঃথুঃ ফেললেন জানালা দিয়ে। কোন মতে রাস্তার উপরে গাড়ী রেখে নেমে গেলেন দোকানে, কেক পিকআপ করতে। আধ ঘণ্টার মধ্যে পুরো এলাকা জ্যাম হয়ে গেল। ফিরে এসে পাশে পাশের ড্রাইভারদের গালি দিয়ে চালকের সীটে বসে অনবরত হর্ন বাঁজাতে লাগলেন বিরক্তি নিয়ে।

রাসেল মালাকার (ছদ্মনাম) সিঙ্গাপুরের রাস্তায় ময়লা ফেলার জন্য জরিমানা ও ২ দিন সেই রাস্তা ঝাঁট দিয়েছিলেন বছর দশেক আগে। সিংগাপুরের রাস্তায় ময়লা না ফেললে বাংলাদেশে ছুটি কাটানো কালে যত্রতত্র ময়লা ফেলেন, থুঃথুঃ ফেলেন। কারণ এদেশে তার কোন জরিমানা করে না কেউ।

কুশিয়ারা লন্ডনের রাস্তায় পথ পার হন নির্দিষ্ট জায়গা দিয়ে, জেব্রা ক্রসিং দিয়ে। ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হন। ঢাকায় তিনি ব্যস্ত রাস্তার মাঝ দিয়ে হাত দেখাতে দেখাতে পার হয়ে যান।

বিদেশের রাস্তায় সবাই নিয়ম মেনে পথ চলেন। দুই মিনিট রংসাইড দিয়ে গেলে পৌঁছানোর পথ, সঠিক পথ দিয়ে যান ২০ মিনিটে। দেশে উনারা চলাফেরা করেন রং সাইড দিয়ে নিয়মভেঙ্গে। উন্নত বিশ্বে কেউ পাত্তা দেয় না আপনি নেতা কি সাধারণ মানুষ। সেখানে নিয়মটাই মুখ্য বিষয়।

সরকারি ও তার কর্মকর্তা, কর্মচারী, প্রশাসনের মোটামুটি কর্তাব্যক্তিরা এক বা একাধিকবার বিদেশে আসেন। কিন্তু এসে উনার কি করেন? কি দেখেন? কি শেখেন?

নিজের দেশ সবক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া কি অনুধাবন করেন? দেশের প্লেনে উঠার পর থেকে শুরু হয় ভোগান্তি, চলতেই থাকে যত দিন যায়। উন্নত দেশে সরকারি পয়সা মানে জনগণের পয়সায় ঘুরে, খেয়ে, বেড়িয়ে কি শিখলেন যা দেশের কোন সিস্টেমে যোগ করতে পারেন না? সরকারি গাড়ী, পুলিশ প্রটেকশন নিয়ে চললেও একদিন সেটা স্থবির হয়ে যাবে, অনিয়মের বেড়াজালে।

এগারো বছর আগে এসেছিলাম প্রথমবার সিংগাপুরে, মুগ্ধ হয়ে যাওয়ার মত দেশ, ছোট্ট একটা দেশ, পথ ঘাট ঝকঝকে, নেই তীব্র জ্যাম। নেই রাস্তার মাঝ দিয়ে কারো দৌড়ে পার হওয়া, নেই খ্যাঁক করে থুঃথুঃ ফেলা। নেই ট্যাক্সিওয়ালাদের মিটারে না যাবার বায়না। দোকানে ফ্রেশ খাবার বেঁচছে দোকানী, নেই পঁচা খাবার গছিয়ে দেবার চেষ্টা। সাধারণ মানুষের মধ্যে নেই নিয়ম ভাঙ্গার পায়তারা। ১১ বছর পরে এসে দেখলাম, নাগরিক সুবিধা বেড়েছে, নাগরিক সেবা থেকে সবকিছু আধুনিক পদ্ধতিতে চলছে। এয়ারপোর্টে নেমেই মন ভালো হতে বাধ্য। সিংগাপুর নারী ও শিশুদের জন্য দারুণ নিরাপদ শহর। পৃথিবীর অনেক দেশে বেড়ালাম সিংগাপুর আর দুবাইয়ের মত মেন মেইড উন্নত দেশ আশ্চর্য করে দেয়। তবে ১১ বছর পরে এসে মনে হল সিংগাপুরে সবুজ বেড়েছে, আধুনিক নগরায়নের ফলে গাছ কেটে সাফ করে ফেলেছিল। সেটা পোষানোর চেষ্টা চোখে পড়ার মত। এয়ারপোর্টের ভিতর থেকে শুরু, বাইরে পথের দু’ধারে নানান বর্ণের ফুল আর গাছে সিংগাপুর শহরে ঢোকা আরও মনোরম হয়ে ওঠে।

অবাক কাণ্ড এই সিংগাপুরকে ১৯৬৫ সালে মালয়শিয়া, মালয় ইউনিয়ন থেকে বের করে দিয়েছিল। তৎকালীন শাসক প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ কেঁদেছিলেন দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। আজ এশিয়ার সব থেকে ধনী ও দুর্নীতিমুক্ত দেশ সিংগাপুর।

৬৩টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত দ্বীপ দেশ সিংগাপুরের জনসংখ্যা মাত্র ৫৫ লাখ আর মাথাপিছু আয় ৫৬ হাজার ডলার। এশিয়ার দেশগুলোর পারস্পরিক ব্যবসা-বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে সিংগাপুর। তেমন কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ না থাকলেও ব্যবসা-বাণিজ্য করেই আজকের এ অবস্থানে এসেছে দেশটি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিংগাপুরের গগণচুম্বী উন্নয়ন ঘটেছে। মুক্ত বাণিজ্য ও উদার কর ব্যবস্থার কারণে সিংগাপুর এখন বিশ্বের বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সারা বিশ্বের বিনিয়োগের অন্যতম লক্ষ্য সিংগাপুর। আইএমএফের বিশ্লেষণ মতে, দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটির জনপ্রতি বার্ষিক আয় ২০১৮ সালের মধ্যে ৭৭ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলতে গিয়ে অনেকেই মালয়েশিয়া, সিংগাপুর, সাউথ কোরিয়ার কথা বলেন। অথচ ষাটের দশকে এসব দেশের শিক্ষার্থীরা আমাদের দেশে পড়তে আসতো। এখন তারা আমাদের ছেড়ে অনেক এগিয়ে গেছে। এখন আমরা যাচ্ছি তাদের দেশে।

সিঙ্গাপুরমালয় ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি স্বাধীন ও পৃথক দেশ হিসাবে যাত্রা শুরু করেছিল তখন কেউ এর তেমন সম্ভাবনা দেখেনি। দেশটা ছিল ক্ষুদ্র এবং অনুন্নত। ছিল না কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ, ছিল না যোগাযোগ ব্যবস্থা। ছিল জাতিগত দাঙ্গা এবং কমিউনিস্ট বিদ্রোহের হুমকি। শুরু থেকে সিংগাপুরের সরকার ছিল ক্ষুদ্র, দক্ষ এবং সৎ। ব্যবসা বাণিজ্যকে আরো সহজ করতে সরকার নিয়মিত সমীক্ষা চালাত এবং সবচেয়ে কার্যকরী ব্যবস্থাকে বাস্তবায়ন করতো। দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ অনেক অর্থেই একটি স্বৈরাচারী সরকার চালাতেন। তবে সেই ‘স্বৈরাচারী সরকার’ সবসময় ‘ব্যবসা বান্ধব’ ও ‘জনগণ বান্ধব’ ছিল। প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ বিদেশী বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ক্রমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সিংগাপুরকে এই অঞ্চলের মূল কেন্দ্র হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে এবং ব্যবসা প্রসারিত ও উন্নয়ন করতে আগ্রহী হয়।

বিশ্বের অন্যতম সাকসেস স্টোরি, সাকসেস মডেল এই সিংগাপুর।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন