শিরোনাম :

মানুষ কোনটা বিশ্বাস করবে?


বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০১:৫৪ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

মানুষ কোনটা বিশ্বাস করবে?

আমীন আল রশীদ: 

একই বিষয়ে দেশের দুটি শীর্ষ জাতীয় দৈনিকের খবর; একই দিনে প্রকাশিত। একটির শিরোনাম ‘প্রয়োজনে খালেদা ছাড়াই নির্বাচনে যাবে বিএনপি: লন্ডনে ফখরুলের সঙ্গে বৈঠকে তারেকের নির্দেশনা’। অন্যটির শিরোনাম ‘খালেদা জিয়া ছাড়া নির্বাচন নয়: ফখরুলকে লন্ডনের বার্তা’। এর মধ্যে কোন তথ্যটি সঠিক এবং পাঠক কোনটি বিশ্বাস করবে?

১৭ সেপ্টেম্বর যুগান্তরের খবরে বলা হয়: ‘খালেদা জিয়া ছাড়া নির্বাচন নয়—সবাইকে এমন বার্তা দিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নির্দেশ দিয়েছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হবে। তবে কোনোভাবেই এ সরকারের অধীনে নির্বাচন নয়।’

‘সংশ্লিষ্ট সূত্রের’ বরাত দিয়ে এই সংবাদে লেখা হয়, ‘বৈঠকে ড. কামাল হোসেন ও বি. চৌধুরীর জাতীয় ঐক্যের প্রসঙ্গটিও আলোচনা হয়। এ ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ইতিবাচক মনোভাব দেখান এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ারও নির্দেশ দেন তিনি। আন্দোলনের লক্ষ্যে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত করতে মহাসচিবকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার নির্দেশ দেন।’

খবরের এর পরের অংশে যা লেখা হয়েছে তার সবই পুরনো, অর্থাৎ এরইমধ্যে সব গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। পুরো রিপোর্টের তিন চতুর্থাংশই পুরনো কথা। নতুন শুধু প্রথম প্যারা এবং সেখানেও কোনো সূত্রের উল্লেখ নেই।

একই বিষয়ে কালের কণ্ঠ’র সংবাদে বলা হয়েছে: ‘নির্বাচনে অংশ নেওয়া না নেওয়ার সিদ্ধান্তসহ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামনে রেখে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সঙ্গে লন্ডনে বৈঠক করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ সময় দুই নেতার মধ্যে আগামী নির্বাচনসহ বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জানা গেছে, মির্জা ফখরুলকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে লন্ডনে ডেকে নিয়ে তারেক রহমান যেকোনো মূল্যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নির্দেশনা দেন। নির্বাচনের আগে কারাবন্দী খালেদা জিয়ার মুক্তি না হলে প্রয়োজনে তাকে কারাগারে রেখেই নির্বাচন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে বৈঠক সূত্র নিশ্চিত করেছে।’

ফখরুলএই সংবাদেও তারেক-ফখরুল বৈঠকের আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট সূত্রের উল্লেখ নেই। বলা হয়েছে, ‘জানা গেছে’। এই সংবাদেরও পরবর্তী অংশগুলো পুরনো কথা। মির্জা ফখরুল কবে যুক্তরাষ্ট্রে গেলেন, কী করেছেন, সেখান থেকে লন্ডনে গেছেন, তারেক রহমানের সাথে বৈঠক করেছেন ইত্যাদি।

বস্তুত রাজনীতি বিষয়ে বিশেষ রিপোর্ট মানেই গালগল্প—এটি এখন মোটামুটি স্বতঃসিদ্ধ। এবং এসব বিশেষ রিপোর্টের পেছনে গণমাধ্যমপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষ উদ্দেশ্যও থাকে। অর্থাৎ অনেক সময় এসব রিপোর্টের মূল উদ্দেশ্য কারো না কারো পার্পাস সার্ভ করা। কখনও রাজনৈতিক দলের কখনো মালিকপক্ষের কখনো বিশেষ কোনো মহলের। যে কারণে একই বিষয়ে রাজনৈতিক বিশেষ রিপোর্ট দু’রকম হয়। এতে আখেরে প্রশ্নবিদ্ধ হয় সাংবাদিকদের পেশাদারিত্ব এবং ভাবমূর্তি।

একই বিষয়ে রাজনৈতিক বিশেষ রিপোর্ট ভিন্নতর হওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ সোর্স বা সূত্রের ভিন্নতা। যেহেতু তারেক রহমানের সাথে বৈঠকে কী আলাপ হয়েছে সে বিষয়ে মির্জা ফখরুল নিজে কিছু বলেননি, তাই এ বিষষয়ে দুটি পত্রিকা বিএনপির ভিন্ন ভিন্ন সূত্রের সাথে কথা বলে রিপোর্ট করেছে। ফলে একেকজন একেকরকম তথ্য দিয়েছেন। আবার হতে পারে যারা এ বিষয়ে কথা বলেছেন তারা নিজেরাও পরিষ্কার জানেন না যে ফখরুল ও তারেকের মধ্যে আসলে কী নিয়ে কথা হয়েছে। কিংবা সাংবাদিক যা জেনেছেন সেটি অতিরঞ্জিত করে লিখেছেন। সংবাদে বাড়তি রঙ চড়ানো মানেই সেটি আর বস্তুনিষ্ঠ থাকে না। আবার মানুষ যেহেতু রাজনৈতিক ইস্যুতে সেনসেশনাল খবর পছন্দ করে, সে কারণে সাধারণ বিষয়কে অসাধারণ করে পরিবেশনে সাংবাদিকদের মধ্যে তাড়া থাকে। আবার তাড়া থাকে বলে অনেক বিষয় ম্যাচিউরড হওয়ার আগে সে বিষয়ে অস্পষ্ট বা ধোঁয়াশাপূর্ণ রিপোর্ট করার প্রবণতাও দেখা যায়। বিশেষ করে রাজনীতি বিষয়ক সংবাদে। এসব রিপোর্টের সবচেয়ে বড় ফাঁকিবাজি কথিত ‘সংশ্লিষ্ট সূত্র’ এবং ‘জানা গেছে’। পুরো রিপোর্টে কোনো একজন সূত্রের নাম উল্লেখ না করেই বলা হয় ‘সূত্র জানায়’। তবে টেলিভিশনে এই ফাঁকিবাজিটা সম্ভব নয়। সে কারণে টেলিভিশনের চেয়ে পত্রিকায় রাজনৈতিক গালগল্পের পরিমাণ বেশি।

এ থেকে উত্তরণের উপায় কী?

১. মিডিয়া লিটারেসি বাড়ানো।

২. বিশেষ রিপোর্টের নামে গালগল্প এবং বিভ্রান্তিকর খবর ছেপে গণমাধ্যমের ওপর জন আস্থা না কমানো।

৩. সংবাদের সূত্র শক্তিশালী করা এবং সবচেয়ে উত্তম সোর্সের সাথে কথা বলার চেষ্টা করা।

৪. সেকেন্ডারি সোর্সের উপর ভরসা করে বিশেষ ও সংবেদনশীল রিপোর্ট না করা।

৫. রিপোর্টের সংশ্লিষ্ট পক্ষের সাথেই কথা বলা এবং প্রয়োজনে তার জন্য অপেক্ষা করা।

৬. রাজনৈতিক বিষয়ে বিশেষ রিপোর্টে সরাসরি সংশ্লিষ্ট পক্ষকে সময় মতো পাওয়া না গেলে দলীয় মুখপাত্রের সাথে কথা বলা।

৭. প্রতিষ্ঠানের মালিক বা অন্য কারো বিশেষ এজেন্ডা থাকলে সে বিষয়ে সাংবাদিকের সতর্ক থাকা এবং পারতপক্ষে এজেন্ডা রিপোর্ট থেকে দূরে থাকা।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন