শিরোনাম :

আইয়ুব বাচ্চু: আপনার অনুপস্থিতি রিয়েল না পারসেপচুয়াল


মঙ্গলবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৮, ০৯:৫৮ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

আইয়ুব বাচ্চু: আপনার অনুপস্থিতি রিয়েল না পারসেপচুয়াল

খান মো. রবিউল আলম: গত ১৩ অক্টোবর ২০১৮’তে আইয়ুব বাচ্চু তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন- There is no reality as such, There are only perception! (প্রকৃত বাস্তবতা বলে কিছু নেই, আছে কেবল বিমূর্ত উপলব্ধি)। তাহলে আপনি যে চলে গেলেন তা কি রিয়েল না পারসেপচুয়াল? আপনার প্রস্থান রিয়েল ও পারসেপচুয়াল দুটোই। রিয়েল মানে তো কেবল বস্তুগত উপস্থিতি নয়। কারণ, বস্তুগত উপস্থিতি শেষ কথা নয়। আমাদের চারপাশে অনেক কিছুর বস্তুগত উপস্থিতি থাকে। আমরা সেগুলো দেখি এবং স্পর্শ করি। তাই বলে এগুলোর সবকিছু রিয়েল হয়ে যায় না। অনুভব বা চেতনায় না আসা পর্যন্ত কোনো সত্তাকে কী রিয়েল বলা যায়? বস্তুঅবয়ব রিয়েল আর চেতনা/উপলব্ধি হলো পারসেপচুয়াল। রিয়েল আর পারসেপচুয়াল মিলিয়ে আইয়ুব বাচ্চু আজ হাইপাররিয়াল বা অতিবাস্তব।

কাকতালীয় ব্যাপার হলো আইয়ুব বাচ্চুর শেষনিবাসের নামটি বেশ আগ্রহউদ্দীপক চৈতন্যগলি। বাংলা চৈতন্যের যে সোনালী জামা আইয়ুব বাচ্চু পরেছিলেন তার উপহার হিসেবে তিনি চৈতন্যগলি পেয়েছেন। প্রাণহীন শরীরের জন্য এ এক অনন্য উপহার। আইয়ুব বাচ্চু একদা বলেছিলেন, পৃথিবী থেকে কেউ জীবন নিয়ে ফেরে আসে না। কথাটি চরম সত্য। ঋদ্ধতায় পূর্ণ। তিনি সাধনায় নিষ্ঠাবান। বাংলার লোকায়ত গায়ক ও সাধকদের মধ্যে মৃত্যু ভাবনার যে প্রাধান্য দেখা যায় আইয়ুব বাচ্চুও এ আবেশের বাইরে নন। মৃত্যু ভাবনা তাঁকে কতটা আচ্ছন্ন করেছে তার ছাপ রেখেছেন অনেকগুলো গানে। শাহ্ আব্দুল করিম বা বারী সিদ্দিকীর মতো তিনিও জীবনে মায়া ছেড়ে যেতে চাননি। যদিও মাঝে মাঝে চলে যাবেন বলে ভয় দেখাতেন। হয়ত তিনি ভয় পেতেন বলেই ভয় দেখাতেন। আইয়ুব বাচ্চু বেশ নিখুঁতভাবে মৃত্যুকে উপলব্ধি করেছেন। রুপালি গিটার বা একচালা টিনের ঘরসহ বেশকিছু গানে তাঁর চিরপ্রস্থানের আকাঙ্খা পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ে।

বাংলা গানের নতুন ধারার অন্যতম শেরপা তিনি। গৎবাঁধা, মোটা দাঁতালো শব্দের পরিবর্তে তিনি বাংলা গানে যে আধুনিক শব্দ ও মেটাফোর ব্যবহার করেছেন যা পরিশীলিত মননের পরিচয় বহন করে। আপনার গানের কথাগুলো এতো আধুনিক এবং সময়প্রসৃত যে প্রতিটি শব্দে গভীরভাবে মনোনিবেশ না করলে অনুভবের পরম্পরাটা বুঝা যায় না। আইয়ুব বাচ্চুর গানের প্রক্ষেপণটা এতো স্পষ্ট যে তা পশ্চিমাধাঁচের যন্ত্রানুসঙ্গের প্রভাবে তা হারিয়ে যায়নি। আইয়ুব বাচ্চুর সংগীত সাধনা কথা ও সুর দ্বারা শাসিত। সোলো বা মেটাল ইন্সট্রুমেন্টের ব্যবহার তাঁর গানের মর্মবাণীকে পরাস্ত করতে পারেনি। তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সংগীতের বহুমাত্রার সহনশীল কলতান তৈরি করেছেন।

এ প্রসঙ্গে কালিকা প্রসাদের সঙ্গে শাহ্ আব্দুল করিমের কথোপকথনটি স্মরণ করা যেতে পারে। শাহ্ আব্দুল করিম কালিকা প্রসাদকে বলেছিলেন আমার গান আধুনিক ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহার করে গাওয়া হোক তাতে আপত্তি নেই কিন্তু গানের অর্থ যেন হারিয়ে না যায়। আইয়ুব বাচ্চুর গায়কী দেখলে সহজেই বুঝা যায় তিনি গানের অর্থ হারাতে চাননি। তাঁর গানের অন্তঃপ্রবেশ এতোটাই প্রবল যে অতিসাধারণ শ্রোতাও তা অনায়াসে ঠোটে তুলতে পারেন। আইয়ুব বাচ্চুর গান বুকে থাকা মানেই দুঃখের বা প্রত্যাখ্যানের পাথর হালকা হওয়া। তাঁর গানের কথা ও সুর জমা রাখা মানেই এক অন্যরকম শক্তি সঙ্গে রাখা। এ শক্তি থেকে যতই খরচ করা যায় না কেন তা শেষ হয় না। আইয়ুব বাচ্চুর গান বঞ্চনার শোষক। শোষণ করে, দুঃখ-কষ্ট নিগ্রহ ও পরাজয়কে। তাঁর গান দুঃখ-কষ্ট পঙ্গু করে দেয়। শ্রোতাকে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়াতে প্রেরণা দেয়।

যোগাযোগের বিখ্যাত তাত্ত্বিক হ্যারল্ড ইনিং যোগাযোগ মিডিয়াকে দু’ভাগে ভাগ করেছেন, স্পেসবায়াস ও টাইমবায়াস। আইয়ুব বাচ্চু অনন্য সময়ের যোগাযোগীয় আধার। এক বিশেষ সময়ের মায়াবী ও নিপাট বুনন হয়েছে তাঁর হাতে। ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়েই তা হাঁড়িতে ফোটা ভাতের মতো টগবগ করে ফুটেছে। একজন সম্পন্ন গায়ক হিসেবে তিনি নতুন সময়, নতুন স্বাদ, নতুন ইন্দ্রিয়, নতুন অনুভব, আর নতুন সংগীত চেতনার জন্ম দিয়েছেন।

আইয়ুব বাচ্চুকে পড়তে হলে শীতলপাটির পুরোটা না খুলে উপায় নেই। তিনি তারুণ্যের প্রতীক। তারুণ্যকে তিনি মনে প্রাণে ধারণ করতেন। তাঁর বহিরঙ্গের প্রকাশে তা স্পষ্ট। তাঁর পোশাক, রিস্টব্যান্ড, ঘড়ি, ক্যাপ, টিশার্ট, জিন্সপ্যান্ট, সানগ্লাস সবমিলিয়ে তিনি একজন তরুণের চেয়েও আরও একধাপ তরুণ। তিনি ভক্তের অধীন হতে পছন্দ করতেন। কারণ, ভক্তের অধীন হলে চিরস্থায়ী হওয়া যায়। তরুণদের প্রণোদনা দিতেন, বুকে টেনে নিতেন। তরুণদের মধ্যে অমিত সম্ভাবনা দেখতেন। তাঁর ছিল দেখার আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি গুরুমুখী সংগীত সাধনার ধারাটি পুনরুজ্জীবিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ছিলেন। সামর্থ্যের মধ্যে সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করতেন। তিনি নিভৃত পল্লি বা নদীর ধারে বসে সংগীত সাধনা করেননি, করেছেন সোডিয়াম বাল্বের নিচে, আধুনিক নগরে। মানুষ কোথায় বাস করে তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ ঠিক তেমনি কী দৃষ্টিভঙ্গি লালন করেন সেটিও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ছিলেন আধুনিক নগরে সহজিয়া গায়ক।

আইয়ুব বাচ্চু-মরদেহ-চট্টগ্রাম

আইয়ুব বাচ্চু সত্তর দশকের শেষের দিকে ঢাকায় আসেন। একটু স্থির হওয়া বা সংগীত অঙ্গনে একটু জায়গা পেতে তাঁকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। সবকিছু অনিশ্চিত জেনেও তিনি হতাশ হতেন। তাঁর বন্ধু কুমার বিশ্বজিৎ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানালেন, পারফর্মেন্সের জন্য কোনো ডাক নেই, কোনো সম্ভাবনা নেই তারপরও বাচ্চু আস্থার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টার গিটার বাজিয়ে চলেছেন, চর্চা চালিয়ে গেছেন। নিজের অনিশ্চিত ভবিষ্যতকে তুচ্ছ জ্ঞান করা বা পাত্তা না দেওয়া কেবল একজন সমৃদ্ধ গায়কের পক্ষেই সম্ভব। আইয়ুব বাচ্চু অদম্য, অপরাজেয়। অক্ষয় তাঁর জীবনীশক্তি। শত প্রতিকূলতার মাঝেও কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয় সেই আশার বাতিঘর তিনি।

আইয়ুব বাচ্চু কেবল গায়ক নন তিনি গীতিকার, সুরকার ও গিটারিস্ট ও কম্পোজার। ব্যান্ড সংগীতের ধারায় আইয়ুব বাচ্চু একটি টোটাল ব্র্যান্ড। তাঁর গানের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করলে যে মূলভাবগত দিক পাওয়া যায় তারমধ্যে অন্যতম হলো প্রেম বা বিরহ, মৃত্যু ভাবনা এবং সামাজিক ইস্যু। প্রেম বা বিরহ নির্মাণে আইয়ুব বাচ্চু স্বতন্ত্র দক্ষতার নজির রেখেছেন। তাঁর কম্পোজিশন অন্যমার্গের। ৯০-পরবর্তী তাঁর গান আছড়ে পড়ছে হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর প্রাণ থেকে প্রাণান্তরে। তিনি ছিলেন সমগ্রকের প্রতিনিধি। তিনি শ্রোতাদের অন্তর্জগতের খোঁজ-খবর রাখতেন। প্রতিটি ব্যথাতুর হৃদয়ের আত্মীয় হতে পেরেছিলেন।

আইয়ুব বাচ্চুর মনোজগতে প্রবাহমান ছিল বাংলার লোকায়ত মিস্টিক ধারা। সোলো বা হার্ড ইন্সট্রুমেন্ট হাতে তিনি এ মাটির অমূল স্বাদ আস্বাদন করেছেন। তাঁর যোগাযোগ নৈপুণ্য ছিল ঈশ্বর্ণীয়। তাঁর বারতা সেজেছে নব নব পোশাকে, সূরে, ছন্দে, আবেগ আর আবেশে। খুব সাবলীল গায়কী অথচ, দৃপ্ত এবং আস্থাশীল পারফর্মেন্স। তিনি যখন মঞ্চে গিটার হাতে শ্রোতাদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় লিপ্ত হতেন মনে হতো তিনি জনে জনে চেনেন। তিনি লাউড স্পীকারের পা দিয়ে যেভাবে বাকপ্রকাশ করতেন তাতে যেমন নাটকীয়তা থাকতো একই সঙ্গে থাকতো গতি ও ছন্দ। তিনি ক্ষণে ক্ষণে অনন্য হয়ে উঠতেন। নিজেকে পরাজিত করে নতুন উচ্চতা নির্মাণ করতেন।

আইয়ুব বাচ্চুর গান হাজারো শ্রোতার হৃদয়ে গেঁথে আছে। তিনি আবেশী গায়ক। নিঃসঙ্গতা বা প্রস্থানের সূরপ্রকৌশল বুনেছেন আপন গিটারে। নির্মোহভাবে বেদনার নির্যাস ছেঁকে তুলেছেন। তিনি চরম বেদনা পূর্ণ উপস্থাপনার মধ্যে দিয়ে আরেক বেদনাকে পরাজিত করতে চেয়েছেন। আইয়ুব বাচ্চার গান সাহস ও প্রেরণার উৎস। তাঁর গান শিখিয়েছে গভীরভাবে দুঃখ বা কষ্ট অনুভব করতে পারলে প্রকারান্তরে সুখ পাওয়া যায়। বস্তুতপথে প্রত্যাখিত বা পরাজিত মনের জন্য আইয়ুব বাচ্চুর গান একধরনের কাইন্ড থেরাপি। মহা ঔষধ। প্রত্যাখ্যান বা পরাজয় জীবনের পর্দা টেনে দেয় না বরং জীবনকে অন্যভাবে দেখতে শেখায়। আইয়ুব বাচ্চুর গানের মধ্যে আশ্রয় পাওয়া যায়। তিনি অনায়াসে কুঁড়েঘর থেকে রাজপ্রসাদে বীরের বেশে বিচরণ করেছেন। তাঁর জন্য আজ হাজারও শ্রোতার মন কাঁদছে।

আইয়ুব বাচ্চু আপনি জীবিত আছেন। কোনো সাধক গায়কের মৃত্যু নেই। আপনি যখন জীবিত ছিলেন তখনই তো মরে যাওয়ার বাসনা ও যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। অনেকের মতো আপনিও এ পৃথিবীর মায়া ছেড়ে যেতে চাননি। জালাল উদ্দীন রুমি যেমন বলেছেন, আমরা বিছানায় মৃত্যু নিয়ে ঘুমাই। আপনিও গিটারের স্ট্রিং-এর ফাঁকেই সন্তর্পনে মৃত্যু লুকিয়ে রেখেছিলেন। হয়ত আপনি তা অনেকবার নেড়েচেড়ে দেখেছেন এর ভার মেপেছেন। আপনার মতো গায়কের কাছে মৃত্যু অতি তুচ্ছ ব্যাপার। আপনি মারা যাওয়ার পর হাজারও প্রাণে নতুনভাবে জীবিত হচ্ছেন। যে মায়া আপনি মাখিয়েছেন তাতেই তো অমরত্ব লাভ করেছেন। আপনার কফিন আজ ফসলে পূর্ণ এক গর্বিত জমিন। রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর কবিতা থেকে ধার করে বলতে ইচ্ছে করছে –
‘যাকে তুমি মৃত্যু বলো, যাকে তুমি বলো শেষ সমূল পতন
আমি তার গভীরে লুকানো বিশ্বাসী বারুদের চোখে দেখে বলি
এইসব মৃত্যু কোনো শেষ নয়, কেনো বিনাশ, পতন নয়…’

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন