শিরোনাম :

কালি কিন্তু ক্ষমতাসীনদের মুখেও লাগছে!


সোমবার, ২৯ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:০২ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

কালি কিন্তু ক্ষমতাসীনদের মুখেও লাগছে!

চিররঞ্জন সরকার: 

আবারও রাজধানীসহ সারাদেশে পরিবহন ধর্মঘটের নামে তাণ্ডব চালিয়ে দেশবাসীকে জিম্মি করে তোলা হয়েছে। সংসদে সদ্য পাস হওয়া ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’-এর কয়েকটি ধারা সংশোধনসহ আট দফা দাবি আদায়ে রোববার সকাল থেকে সারাদেশে ডাকা ৪৮ ঘণ্টার পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়। আকস্মিক এই ধর্মঘটের কারণে দেশের সাধারণ মানুষকে সীমাহীন ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়। সারাদেশে সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে শুরু হয় অচলাবস্থা।

পরিবহন শ্রমিকদের ধর্মঘট শুরু হওয়ার পর কার্যত জনসাধারণ জিম্মি হয়ে পড়েছে পরিবহন শ্রমিকদের হাতে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ধর্মঘটের সমর্থনে পরিবহন শ্রমিকরা জনসাধারণের সাথে চরম আপত্তিকর ও অপরাধমূলক আচরণ করেছে। তারা অনেক যাত্রী ও চালকের মুখ, কাপড়ে গাড়ির ব্যবহৃত ইঞ্জিন অয়েল (পোড়া মবিল) লাগিয়ে দিয়েছে। রিকশায় আসা অনেক যাত্রীর মুখ ও কাপড়ে পোড়া মবিল লাগিয়ে দেয় এই শ্রমিক নামধারী দুর্বৃত্তরা। তারা বিভিন্ন স্থান থেকে ছেড়ে আসা অনেক দূরপাল্লার বাস-ট্রাকও আটকে দেয়। এমনকি ব্যক্তিগত গাড়িগুলোকেও আটকে দেয়ার চেষ্টা করে। উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিকদের বাধার কারণে যথাসময়ে হাসপাতালে পৌছতে না পারায় এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এই খুনের দায়ও কিন্তু সংশ্লিষ্ট শ্রমিক সংগঠন ও তার নেতাদেরই নিতে হবে। সরকারের উচিত অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট শিশু খুনের দায়ে ওই শ্রমিক সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা করা।

এমন নৈরাজ্য সৃষ্টির পরও কেন এখনও পর্যন্ত একজনকে গ্রেপ্তার করা হলো না? কোথায় পুলিশ-র‌্যাব-গোয়েন্দা বাহিনী? তারা কি শুধু সরকার বিরোধী মত দমন করার জন্য? পুরো ঘটনায় জনরোষ গিয়ে জমা হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে। এর মাশুল ক্ষমতাসীনদেরই দিতে হবে।

সাধারণ মানুষ অভিযোগ করছে, যে এটা ‘সরকারি ধর্মঘট’। এই অভিযোগের বাস্তব ভিত্তিও আছে। নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বাংলাদেশে পরিবহন শ্রমিক সংগঠনগুলোর শীর্ষ ফোরাম বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি। গত ৬ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে যখন সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এর খসড়া অনুমোদন হয়, শাজাহান খানও সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। সেই বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকেই সড়ক পরিবহন আইনের কয়েকটি ধারা সংশোধনসহ আট দফা দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার ‘কর্মবিরতি’ চলছে সারা দেশে।

শাজাহান খানের দ্বৈত ভূমিকা নিয়ে গত ১০ বছরে বহুবার বহু সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু তার ব্যাপারে কখনওই কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। যেন তিনি সরকারের চেয়েও বড়। তার সব আচরণই ক্ষমতাসীনদের জন্য কল্যাণকর! তার প্রতি সরকারের এমন আত্মঘাতী মোহের কারণ কি? তার হাতে শ্রমিক সংগঠন আছে বলে? কিন্তু সরকার কি জানে না, দেশে পরিবহন শ্রমিকের সংখ্যা বড় জোর ৪০ লাখ? কিন্তু সাধারণ ভোটারের সংখ্যা অন্তত ১২ কোটি। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে চটিয়ে একটি ছোট গোষ্ঠীর আশীর্বাদ নিয়ে আবার ক্ষমতায় যাওয়া যাবে?

এর আগে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান কোন ক্ষমতাবলে মন্ত্রী পদে এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ও শ্রমিক ফেডারেশনে সভাপতি রয়েছেন তার কারণ ব্যাখ্যা করতে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেছিলেন এক আইনজীবী। নোটিশে বলা হয়, বিগত ৫ জানুয়ারি ২০১৪ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদীয় আসন ২১৯ মাদারীপুর-২ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। পরবর্তীকালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের তৃতীয় তফসিলের ১৪৮ ধারা মতে ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। সংবিধান সংরক্ষণ, সব নাগরিকের প্রতি সমান আচরণ ও রাগ-অনুরাগ বিরাগের বশবর্তী হয়ে কোনো কাজ করবেন না। যেহেতু শ্রমিক সংগঠন একটি কালেকটিভ বার্গেলিং এজেন্ট (সিবিএ) যা শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কাজ করার নিয়ম রয়েছে। সেখানে রাষ্ট্রের একজন মন্ত্রী হয়েও তিনি সিবিএর কার্যকরী সভাপতি হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন যা অসাংবিধানিক। কিন্তু এই নোটিশের কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। অবশ্য ক্ষমতাসীনরা আইন-নীতি-সংবিধানের খুব বেশি ধার-ধারেন বলেও মনে হয় না!

মাত্র কয়েকমাস আগেই নিরাপদ সড়কের দাবিতে অভূতপূর্ব আন্দোলনে নেমেছিল স্কুল-কলেজের ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা। ওদের দুজন বন্ধুকে রাস্তায় পিষে মেরে ফেলেছিল জাবালে নূর বাসের চালক। এরপরেও সড়কে ঝরেছে আরও অনেক রক্ত। অনেক প্রতিবাদ-সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর মিছিল থামেনি।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর সরকারের কিছুটা হলেও টনক নড়ে। নড়েচড়ে বসে সরকার। তৈরি করা হয় ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’। এই আইনে সাজার মাত্রা বাড়ানো হয়েছে। তাছাড়া চালক কর্তৃক দুর্ঘটনার জন্য শাস্তি দেওয়া হবে দণ্ডবিধি অনুযায়ী। মানুষের মৃত্যু হলে ৩০২ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড। আহত হলে ৩০৪ ধারা অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে। বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে মৃত্যু ঘটালে ৩০৪ (বি) ধারা অনুযায়ী ৩ বছরের কারাদণ্ড হবে।

পরিবহন শ্রমিকদের বেপরোয়া আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে এমন আইন মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিল। সবাই ভেবেছিল এবার হয়তো আইনের ভয়ে বেপরোয়া চালকেরা সোজা পথে আসবে। কিন্তু কোথায় কী? নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের সংগঠন আবার বেঁকে বসে। তাদের দাবি, নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধন করতে হবে। নেশাগ্রস্ত ড্রাইভার জোশের বশে গাড়ি চালিয়ে মানুষ মেরে ফেললেও তাকে কোনো সাজা দেওয়া যাবে না! মৃত্যুদণ্ড তো দূরের কথা!

দেখা গেছে পরিবহন শ্রমিকরা সড়কে একের পর এক অন্যায় করলে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে গেলেই ধর্মঘট, অবরোধের নামে দেশের সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে তারা। শ্রমিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের নামে চরম ভোগান্তিতে ফেলে দেয় নগরবাসীকে। তারা সন্ত্রাসী কায়দায় বারবার মানুষকে জিম্মি করে আইনকে বাধাগ্রস্ত করে, যা কখনও মেনে নেয়া যায় না।

মনে রাখতে হবে যে, আইন জনগণের কল্যাণে তৈরি হয়, আর পরিববহন শ্রমিকরা জনগণের বাইরের কেউ না। তারা আইন মেনে সড়কে চললে, ফিটনেবিহীন গাড়ি না চালালে কোনো আইনই তাদের জন্য সমস্যার কারণ হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তারা যদি সব রকম অপকর্ম থেকে ‘দায়মুক্তি’ চান অর্থাৎ ড্রাইভারের সাত খুন মাফ করতে হবে। তাহলেই রাস্তায় গাড়ি চলবে; না হলে চলবে না। কী সুন্দর দাবি! মানুষ প্রতিদিন রাস্তায় গাড়ি চাপায় মরবে; কিন্তু পরিবহন শ্রমিকরা তাদের ইচ্ছে মতো চলবে। ‘মানুষ মারার লাইসেন্স’ দাবি করবে। যখন ইচ্ছা, যেখানে ইচ্ছা যাকে ইচ্ছা তারা পিষে মেরে ফেলবে। এটা কি মগের মুল্লুক?

জনপ্রত্যাশা সত্ত্বেও পরিবহন শ্রমিকদের যথেষ্ট ছাড় দিয়ে নতুন সড়ক পরিবহন আইন পাস করেছে সরকার। তবুও তারা এই আইন বাতিলের দাবি করছে। এরা আবারও দেশবাসীকে জিম্মি করে আগের আইনে ফিরে যেতে চায়, যা জনগণ কখনোই মেনে নেবে না। এদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

শ্রমিকদের এই কথিত আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে মুখে কালি মাখিয়ে দেওয়া! অফিসগামী মানুষ; শিক্ষার্থী এমনকী নারীরাও রক্ষা পাননি এই সন্ত্রাস থেকে! প্রশাসন এই সন্ত্রাসের সামনে নীরব দর্শক। প্রশাসনের এই ভূমিকার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই।

প্রশ্ন হলো, সড়কের নৈরাজ্য আর কতদিন চলবে? শাজাহান খান ও তার শ্রমিক সংগঠন আর কতকাল দৌরাত্ম্য দেখাবে? সরকারের মেরুদণ্ড কি শাজাহান খান ও তার পেটোয়া বাহিনীর প্রতি নুয়েই থাকবে? খুনি চালকদের থামানোর কোনো উদ্যোগই কি কার্যকর হবে না?

ক্ষমতাসীনদের মনে রাখতে হবে, সামনে কিন্তু নির্বাচন! এক ব্যক্তি ও একটি বিশেষ গোষ্ঠীর কারণে জনভোগান্তি সৃষ্টির আগে তলিয়ে ভাবতে হবে। শেষ পর্যন্ত কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছেই ভোট চাইতে হবে। কিন্তু এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে কোন মুখে ভোট চাইবেন? কালি কিন্তু শুধু যাত্রী বা চালকের মুখেই লাগছে না, ক্ষমতাসীনদের মুখেও লাগছে। সেটা দেখার মতো চোখ কি তাদের কোনো কালেই ফুটবে না?

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন