শিরোনাম :

জামায়াত যেন আওয়ামী লীগের কাঁধে ভর না করে!


রবিবার, ১১ নভেম্বর ২০১৮, ০৮:৩৬ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

জামায়াত যেন আওয়ামী লীগের কাঁধে ভর না করে!

চিররঞ্জন সরকার: 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘বিষফোঁড়া’ হয়ে ওঠা জামায়াতে ইসলামী এবার দল হিসেবে সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। দীর্ঘ পাঁচ বছর অপেক্ষার পর ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। যার মাধ্যমে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সব পথ বন্ধ হয়েছে দলটির।

একটি মামলার রায়ে হাইকোর্ট ২০১৩ সালে দলটির নিবন্ধন প্রক্রিয়া অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেন। সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি সংগ্রহ করে জামায়াতের নিবন্ধন আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করেছে নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশন। যদিও এতোদিন ওই রায়ের ভিত্তিতেই দলটিকে সব নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখে ইসি।

২০১৭ সালের শুরুর দিকে সংসদ নির্বাচনের প্রতীকে তালিকা থেকেও দাঁড়িপাল্লা বাদ দেয় নির্বাচন কমিশন। আর স্থানীয় নির্বাচনের বিধিমালা সংশোধন করে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক বাদ দেওয়া হয় ২০১৫ সালে। সব প্রক্রিয়া শেষে বাংলাদেশে নির্বাচনী ব্যবস্থায় জামায়াতের অংশ নেওয়ার সব পথ মোটামুটিভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। যদিও হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াত আপিল করেছে। কিন্তু আপিল কর্তৃপক্ষ আগের রায় স্থগিত করে আপিল গ্রহণ না করায় নিবন্ধন বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। তবে আপিলে যদি জামায়াতের নিবন্ধন প্রক্রিয়া বৈধ হয়, তবে জামায়াতকে নিয়ে আবারও ভাবতে হবে ইসিকে। সেটা দূরাগত প্রশ্ন।

জামায়াতে ইসলামী একটি যুদ্ধাপরাধীদের সংগঠন। এই দলটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ভূমিকা পালন করেছে। তারা বাঙালি নিধন, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধ করেছে। কিন্তু তারা তাদের এই কৃতকর্মের জন্য কখনও ক্ষমা চায়নি। জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে এ নিয়ে কখনও কোনো অনুশোচনাও দেখা যায়নি।

এই স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তির অপকর্মের বিচারের দাবিটি দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছ থেকে উচ্চারিত হচ্ছিল। কিন্তু সেটা কোনো রাজনৈতিক শক্তিই গ্রাহ্য করেনি। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে ছিলো মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যারা এদেশে গণহত্যা, গণধর্ষণসহ ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিলো তাদের বিচার করা। সরকার গঠনের পর শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল করে এই বিচারের ব্যবস্থা করেন।

এ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর সাতটি রায়ের মধ্যে ৫টিতে জামায়াতে ইসলামীর দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লা ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী ও জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাশেম আলীর ফাঁসি কার্যকর করেছে সরকার। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগ চূড়ান্ত রায় রিভিউতে জামায়াতের নায়েবে আমির দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা আমৃত্যু কারাদণ্ড বহাল রেখেছেন। জামায়াতের মূল ‘থিংক ট্যাংক’ এবং সাবেক আমির গোলাম আযম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মাথায় নিয়ে এরইমধ্যে কারাগারে মারা গেছেন৷ আরেক সাবেক জামায়াত নেতা মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ফাঁসির দণ্ড নিয়ে পলাতক৷ এছাড়া জামায়াত নেতা মাওলানা এটিএম আজহারুল হককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল৷ মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে মুহাম্মদ আব্দুস সোবহানকেও৷ এখন তাদের আপিল শুনানি হওয়ার কথা৷

কারাগারে মারা গেছেন জামায়াতের সাবেক নায়েবে আমীর মাওলানা আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসূফ৷ বিদেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক৷ অপর এক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার জামিনে মুক্তি পেলেও আত্মগোপনে আছেন৷ ফলে জামায়াত যারা চালাতেন বা দলটির মূল নেতৃত্বে ছিলেন, তাদের তেমন কেউই এখন আর নেই৷ হয় ফাঁসিতে ঝুলেছেন, মারা গেছেন, কারাগারে আছেন, নয়ত পালিয়ে বেড়াচ্ছেন৷

এটা ঠিক যে, ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে একটা সময় পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ভোটব্যাংক ছিল জামায়াতের। কিন্তু ধীরে ধীরে তাদের ভোট ও জনসমর্থন যে কমেছে, তা বোধ করি তারা নিজেরাও স্বীকার করবে। স্বাধীনতার পরে দেশের প্রথম যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়, সেখানে তারা অংশগ্রহণের সুযোগ পায়নি। তবে ১৯৭৬ সালের ২৪ আগস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টি, নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফতে রব্বানী পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ নামে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন এবং ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। ওই নির্বাচনে ইসলামিক ডেমোক্রেটি লীগ থেকে মনোনীত জামায়াতের ৬ জন সদস্য নির্বাচিত হন। জাতীয় সংসদে জামায়াতের এটিই প্রথম উপস্থিতি।

এককভাবে জামায়াত জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয় ১৯৮৬ সালে। তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা ৭৬টি আসনে মনোনয়ন দেয় এবং ১০টিতে জয়ী হয়। ওই নির্বাচনে তাদের প্রাপ্ত ভোটের হার ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। ১৯৮৮ সালের চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিরোধী দলগুলো বর্জন করে। ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ১৮টি আসনে জয় পায়। ভোটের শতকরা হার ১২ দশমিক ১৩ ভাগ। ১৯৯৬ সালে তারা ৩টি আসন লাভ করে। ভোট পায় ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ১৭টি আসনে জয়ী হয় এবং শতকরা ৪ দশমিক ২৮ ভাগ ভোট পায়। সর্বশেষ ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ভোট আরও কমে। ৪ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পেয়ে তারা দুটি আসনে জয়ী হয়। বিএনপির জোটভুক্ত দল হিসেবে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন তারা বর্জন করে।

বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে এই অপশক্তিকে তাদের রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পাশে রেখেছে। এ নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে অনেক সমালোচনা হয়েছে, কিন্তু বিএনপি এসব সমালোচনাকে পাত্তা দেয়নি। আওয়ামী বিরোধী ভোটারদের কাছে টানা এবং ধর্মীয় অনুভূতির রাজনীতির মাধ্যমে ভোট বাড়ানোর কৌশল হিসেবেই যে বিএনপি চরম ডানপন্থী দল জামায়াতকে প্রধান সঙ্গী করেছে। এ নিয়ে দ্বিমতের সুযোগ কম। কিন্তু এতে আখেরে বিএনপির কতটুকু লাভ হয়েছে তা বলা মুশকিল। কারণ জামায়াতকে ছাড়াও যে বিএনপি নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে পারে, তার অনেক উদাহরণ আছে। বরং জামায়াত সঙ্গে না থাকলে বিএনপি নিজেকে অধিকতর মডারেট দল হিসেবে প্রমাণের সুযোগ পেতো যা শিক্ষিত তরুণ ভোটারদের মধ্যে তাদের আস্থা বাড়াতো। কিন্তু বিএনপি এই জনগোষ্ঠীর চেয়ে অল্পশিক্ষিত, ধর্মীয় অনুভূতিতে কাতর এবং বুঝে-না বুঝে আওয়ামী লীগ এবং কখনও ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্ট সর্বস্ব ভোটারদেরই মূল টার্গেট করে। ফলে এই রাজনীতিতে জামায়াতের মতো একটি উগ্রবাদী দলকে তাদের সঙ্গে রাখতে হয়।

অতীতে বিভিন্ন নির্বাচনে দেখা গেছে, জনপ্রিয়তা ও ভোটের হার বিবেচনায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অবস্থা কাছাকাছি। ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচন তাই বলে। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি মাত্র শূন্য দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি ভোট পায়। অর্থাৎ ভোটের ব্যবধান এক শতাংশেরও কম। ১৯৯৬ সালে বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগ ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি ১ দশমিক ৩৮ শতাংশ ভোট বেশি পায়। সর্বশেষ ২০০৮ সালে (যেহেতু ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করছে) এ দুটি দলের ভোটপ্রাপ্তির ব্যবধান বাড়লেও (১৫ দশমিক ৮) সেখানে জামায়াতের ভোট যুক্ত করলেই বিএনপি ক্ষমতায় আসতো—এমন নয়।

তারপরও বিএনপি জামায়াতকে ছাড়েনি। বর্তমানে দল হিসেবে বিএনপি খাদের কিনারায় এসে উপনীত হয়েছে। বিএনপির কাছে আপাতত শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের তেমন কিছু প্রত্যাশা আছে বলেও মনে হয় না। যা কিছু করার তা আওয়ামী লীগসহ তার মিত্রদেরই করতে হবে। এর আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করতে তারা প্রচুর অর্থ ব্যয় করে এবং নেতাদের রক্ষায় আন্তর্জাতিক ‘লবিস্ট’ নিয়োগ করে৷ জামায়াতকে নিয়ে অনেকেই অনেকেই কথা বলেছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, দেশকে গৃহযুদ্ধের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। জামায়াত প্রতিশোধ নেওয়া শুরু করল বলে! কিন্তু না জামায়াত কিছুই করতে পারেনি।

আসলে উপযুক্ত জল-হাওয়া ছাড়া কোনো অপশক্তিই টিকে থাকতে পারে না। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনী ফারুক-রশীদরা টিকেছিল এরশাদের জোরে। বিচিত্র নামের জঙ্গি আর জামায়াত টিকে ছিল বিএনপির সহযোগিতায়। এক সময় হিযবুত তাহরির মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। সেই অপশক্তিতে যখন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তখন অনেক বিজ্ঞজনও বলেছিল, এরা এখন জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে ছড়িয়ে পড়বে। জঙ্গিবাদ আরও মাথা চাড়া দিবে। কিন্তু তেমন কিছু ঘটেনি।

মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত একটা ‘বিষবৃক্ষ’। রাজনীতি থেকে এই বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলার এখনই সময়। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে। ভোটের লোভে এই দলের নেতাকর্মীরা যেন প্রশ্রয় না পায়-তা নিশ্চিত করতে হবে। জামায়াত কিন্তু চাইবে বড় দলগুলোর কাঁধে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের কাঁধে সওয়ার হতে। এ জন্য তারা টাকা ছিটাতে কোনো কৃপণতা দেখাবে না। আর তাদের টাকারও কোনো অভাব নেই।

বিএনপি যদি তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও পুনর্বাসন করার নীতি থেকে সরে না আসে তাহলে তারা আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। বিএনপিকেও বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। মনে রাখা দরকার যে, এক সময় মুসলিম লীগের ঘাড়ে ভর করেছিল জামায়াত৷ ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় বাংলাদেশে মুসলিম লীগ নিশ্চিহ্ন হয়েছে৷ এত কিছুর পরও জামায়াতকে যদি বিএনপি আঁকড়ে ধরে রাখে, তাহলে বিএনপিরও মুসলিম লিগের পরিণতি বরণ করতে হতে পারে৷

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন