শিরোনাম :

নিঃসঙ্গতাই তাকে কুরে কুরে খেয়েছে


বৃহস্পতিবার, ২৪ জানুয়ারি ২০১৯, ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

নিঃসঙ্গতাই তাকে কুরে কুরে খেয়েছে

বুলবুলের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় স্বাধীনতার পরে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কাজ করার জন্য দেশের বাইরে ছিলাম। কিন্তু বুলবুল ছিল দেশে। সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল।

সত্য সাহা, আলাউদ্দিন আলী ও আমার সঙ্গেই বুলবুল ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে কাজ করত। ১৯৮০ সালে আমি যখন ছবির সঙ্গীত পরিচালনার কাজ শুরু করি তখন থেকেই তার সঙ্গে আমার কাজ শুরু হয়।
বুলবুল সিনিয়রদের খুব সম্মান করত, পরামর্শ, উপদেশ নিত। আর ছোটদের খুব স্নেহ করত। সে সময় সে খুব ভালো গিটার বাজাত। তারুণ্যের একটি বিষয় ছিল তার মধ্যে।
আমরা প্রায়ই একসঙ্গে কাজ করতাম। একদিন হঠাৎ একটি গান নিয়ে আমার কাছে এলো। ‘ও আমার আট কোটি ফুল’ শিরোনামের গানটির সুর করেছে সে। আমাকে শোনানোর ইচ্ছা প্রকাশ করল। আমিও শুনলাম। আমার ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়ে বুলবুল ওই সময় খুব খুশি। তো আমার কাছে পরামর্শ চাইল গানটি কাকে দিয়ে গাওয়ানো যায়। আমি তাকে তার পছন্দের কাউকে দিয়ে গাওয়ানোর কথা বলি।

পরে সেই গানটি সাবিনা ইয়াসমিনকে দিয়ে গাওয়ায়। গানটি প্রচারে আসার পর দারুণ শ্রোতাপ্রিয়তা পায়। সুরকার হিসেবে বুলবুলের আবির্ভাব ঘটে। খুব সুন্দর কথায় গান লিখতে পারত। সুর করতে পারত। এভাবে ধীরে ধীরে গানের ভুবনে তার পথচলা শুরু।
দেশের প্রতি বুলবুলের একটা কমিটমেন্ট ছিল, তা তার চিন্তা, কথা এবং গানে পাওয়া যায় পরবর্তী সময়গুলোয়। প্রয়াত নজরুল ইসলাম বাবুর লেখা ‘সবকটা জানালা খুলে দাও না’ গানটির সুর করে বাংলা গানের ভুবনে বুলবুল দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর দেশাত্মবোধক গানের পাশাপাশি সিনেমার গানে মনোনিবেশ করে।
তার সুর ও সঙ্গীত পরিচালনায় একের পর এক জনপ্রিয় গান তৈরি হতে থাকে। আধুনিক এবং রোমান্টিক গানেও তার ভালো দক্ষতা ছিল। খুব কম বয়সেই জনপ্রিয়তা পাওয়া বুলবুল ধীরে ধীরে একজন সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যেতে থাকে।
সেই বুলবুল আমাদের আগেই এভাবে চলে যাবে, এটা ভাবতে পারিনি। তার জন্য খুব খারাপ লাগছে। আলম খান, আলাউদ্দিন আলী এবং আমাদের পরের প্রজন্মের প্রতিনিধি ছিল বুলবুল।
সঙ্গীত জগতের সহকর্মী হলেও স্নেহের ছোট ভাই হিসেবেই আদর পেত আমার। তার সঙ্গে কাজ করার নানা স্মৃতি এখন মনে হচ্ছে স্মৃতির জানালায়। কত কথা, কত স্বপ্ন ঘিরে আছে। বারবার সেসব স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে। দেশ স্বাধীনের পর আমাদের সংস্কৃতিকে শুদ্ধ এবং সুন্দরভাবে এগিয়ে নেয়ার জন্য আমরা অনেক কথা, পরিকল্পনা ও স্বপ্ন বুনেছি একসঙ্গে।
বুলবুল দেশ নিয়ে সব সময় ভাবত। এর বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অনেক দেশের গান তার হাত দিয়ে তৈরি হয়েছে। আমরা দেশের গান কিংবা আধুনিক গান নিয়ে যেসব কথা আড্ডায় বলতাম, বুলবুল সেখান থেকে তার ভালোলাগা অনুযায়ী যা দরকার তা লুফে নিত। দারুণ এক স্বপ্নবাজ মানুষ ছিল।
সে চলে গেল, আমাদের সঙ্গীত জগতের এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হল। জানি না এটা কীভাবে পূরণ হবে। ফেসবুকে নিয়মিতই যোগাযোগ থাকলেও সরাসরি দেখা হয়েছিল আরও দুই বছর আগে। নানা কারণে তার মধ্যে একটা অস্থিরতা ছিল।
পারিবারিক জীবনে বুলবুল খুব সুখী ছিল না। সংসার ভেঙেছে আরও আগেই। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে সেসব সময় ভাবত। ব্যক্তিজীবনের এই ছন্দ পতন তার মধ্যে মারাত্মক এক চাপ তৈরি করেছিল বলে আমার মনে হয়। কিছুদিন আগে তার ছোট ভাই মারা যাওয়ার পর সে বেশ ভেঙে পড়ে।
জীবনের শেষ সময়গুলোয় অনেকটাই নিঃসঙ্গ ছিল আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। এই নিঃসঙ্গতাই তাকে কুরে কুরে খেয়েছে বলে আমার মনে হয়। তা ছাড়া সঙ্গীতাঙ্গনে কাজ কমে যাওয়ায় একটা যন্ত্রণা বুলবুল সয়ে গেছে শেষ সময়ে।
এটাও একটি হতাশার কারণ হতে পারে ওর জন্য। আর কয়েক বছর ধরে সার্বক্ষণিক পুলিশ প্রহরায় চলতে হতো তাকে। সে জন্য অবাধ চলাফেরা করা কমে গিয়েছিল তার। এটাও এক ধরনের চাপ ছিল তার জন্য।
এ জন্যও বুলবুল মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল, যা আমরা শুনেছি অন্যদের কাছ থেকে। নিঃসঙ্গ এ সঙ্গীতপ্রিয় মানুষটি জীবনের শেষ বেলায় একা হয়েছিলেন। সেই একা থাকতেই তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তার আত্মার শান্তি কামনা করছি। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাত নসিব করেন।

লেখক : শেখ সাদী খান, সঙ্গীতজ্ঞ

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন