শিরোনাম :

আগুনে উদ্বিগ্ন হই, সতর্ক হই না


বুধবার, ৩ এপ্রিল ২০১৯, ১০:৩৫ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

আগুনে উদ্বিগ্ন হই, সতর্ক হই না

কবির য়াহমদ

এক মাসের মধ্যে রাজধানীর দুই প্রান্তে দুইটা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অগণন প্রাণের অপচয় হয়েছে; আহত হয়েছে কয়েকশ’ লোক; সম্পদহানি হয়েছে কয়েকশ’ কোটি টাকার। এ দুই ঘটনা দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। প্রাণের এই সস্তাদাম নিয়ে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানামুখী আলোচনা হয়েছে। সব আলোচনার শেষবিন্দু ছিল ক্ষোভ, এবং এই ক্ষোভের আগুনে পুড়েছে দায়িত্বশীলরা, বিশেষত সরকার ও নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ।

এই সময়ের প্রথম দফা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায়। দ্বিতীয় দফায় আগুনে পুড়েছে রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর এফ আর টাওয়ার। যেখানে প্রাণহানির সংখ্যা ২৬ বলে জানিয়েছে পুলিশ। আহতের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। কত টাকার সম্পদহানি হয়েছে এই আলোচনা এখনই শুরু হয়নি, তবে এটা যে শত কোটি টাকার বেশি হবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

চুড়িহাট্টার আগুনের পর প্রশাসনসহ নানামুখী আলোচনার কেন্দ্রে ছিল অপ্রশস্ত রাস্তা, বিল্ডিংয়ের নিচে রাসায়নিক কারখানা রাখার বিষয়টি। এ নিয়ে এক পক্ষ অন্যপক্ষের দিকে অভিযোগের তীর ছুঁড়েছে। নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্যরা নিজেদের দোষ ঢাকতে কেউ বা দোষ চাপিয়েছে বাড়িগুলোর মালিকদের দিকে, কেউ কেউ দোষ চাপিয়েছে রাসায়নিক কারখানার মালিকদের দিকে। এতে করে প্রকৃতপক্ষে কে দোষী এ নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি।

এমন কিম্ভূত অবস্থায় কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর চুড়িহাট্টার আগুনের তাপ মিইয়ে গেছে। আলোচনার টেবিল থেকে সরে গেছে সেই আলোচনা। এমন অবস্থায় নিশ্চিতভাবেই সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছে গেছেন দায়ী ব্যক্তি-গোষ্ঠী এবং অভিযুক্তরা। ধারণা করা যাচ্ছে বহাল তবিয়তে থাকবে আলোচনায় আসা অভিযুক্তরা।চকবাজার-আগুন-চকবাজারে আগুন-রোহান বাবাটাকে খুঁজে-সতর্ক

এরপর বনানীর আগুনে প্রাণ ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় পুরান ঢাকার অভিযুক্তরা আরও একটু সুবিধাজনক অবস্থায় পৌঁছে গেছেন বিশেষত আলোচনা অন্যদিকে ধাবিত হওয়ায়। রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর যে এলাকায় আগুন লেগেছে সেটা ঘিঞ্জি এলাকা ছিল না, ছিল সুপ্রশস্ত রাস্তা, বিল্ডিংয়ের নিচে রাসায়নিক কারখানা ছিল না। এখন তারা বলছেন হয়ত সব দোষ রাসায়নিকের নয়, সব দোষ সরু গলি আর অপ্রশস্ত রাস্তার নয়। এখন রাসায়নিকের কারখানা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সাম্প্রতিক দাবির বিপরীতে কে জানে হয়ত তারা বনানীর আগুনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করবেন!

চুড়িহাট্টা আর বনানীর দুই ঘটনা অতি-সাম্প্রতিক। এর বাইরে একাধিকবার ঢাকা শহর পুড়েছে এমন আগুনে। এবং প্রতিবারই এধরনের ঘটনার পর নানা কর্তৃপক্ষের নানা তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী শোক জানান; প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক খবরাখবর রাখেন বলে মন্ত্রী-নেতাদের সূত্রে গণমাধ্যম সে খবর দেশবাসীকে জানায়। এই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন, শোকপ্রকাশ, উদ্বেগ আর সার্বক্ষণিক খবর রাখার সবকিছু মূলত ওই সময়ের মধ্যেই সীমিত হয়ে পড়ে। তদন্ত কমিটির তদন্ত শেষ হয়, প্রতিবেদন জমা পড়ে, কিন্তু সেই সব প্রতিবেদনের সুপারিশ কতখানি বাস্তবায়ন হয় এ নিয়ে কেউ আলোচনা করে না, কেউ জানায় না এবং কেউ জানার প্রয়োজনও মনে করে না। এমনকি প্রধানমন্ত্রীও ‘সার্বক্ষণিক খবর’ রাখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন না।

চুড়িহাট্টার সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের পর দায়িত্বশীল বিভিন্ন ব্যক্তি থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত রাসায়নিকের কারখানা ঢাকার বাইরে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের পরের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ভবন মালিকদের আপত্তির কারণে বাস্তবায়ন করা যায়নি বলে অনুযোগ করেছেন। এই অনুযোগ দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা। সরকার-প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা যদি নিজেদের ব্যর্থতা এভাবে আড়াল করতে থাকেন তবে এই ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কার মুখে থাকতে হবে অগণন নাগরিককে। কারখানা সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিশ্চিতভাবেই কিছু ভবন মালিক এবং ব্যবসায়ীদের সাময়িক আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলবে ঠিক তবে সুদূরপ্রসারী ফলাফলের দিক থেকে সকলেই কিন্তু লাভবান হতে পারে। ভবন মালিক কিংবা ব্যবসায়ীরা যেখানে সাময়িক ক্ষতিকে আমলে নিয়ে আপত্তি করছিলেন তখন সরকার-প্রশাসন তাদেরকে বুঝিয়েসুঝিয়ে অথবা প্রয়োজনে বাধ্য করে হলেও স্থানান্তরে রাজি করাতে পারত। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো সেটা তারা করেনি। ফলে যে ঝুঁকি, যে শঙ্কার মধ্যে ছিল ঢাকাবাসী, সে ঝুঁকি সে শঙ্কা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।গুলশান আগুন-নিয়ন্ত্রণে-সতর্ক

চুড়িহাট্টার আগুনের পর সরকার-প্রশাসন-সিটি করপোরেশন রাসায়নিকের কারখানা দূরে সরানোর কথা বললেও আদতে সেটা বাস্তবায়ন হবে বলে মনে হয় না। সরকারি দলের নেতা-এমপি-মন্ত্রী এবং ব্যবসায়ীদের চাপে এখানে শেষ পর্যন্ত সিটি করপোরেশন পিছু হটবে বলে আশঙ্কা করছি। এই শঙ্কা মূলত অতীত ভুলে যাওয়ার প্রবণতা। যখনই কোনো আলোচনা শুরু হয় তখন মুদ্রার একপিঠে সকল মহল সচেতন হয়ে ওঠে, আবার মুদ্রার ওপিঠে দেখা যায় যখনই আলোচনা শেষ হয়ে যায় তখন সকলেই ফের পূর্বেকার অবস্থানে চলে যায়।

আর চুড়িহাট্টার ওই আগুনের পর যখন রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানী পুড়ল আগুনে তখন পুরান ঢাকার সংশ্লিষ্ট ভবন মালিক ও ব্যবসায়ীরা এখন হয়ত জোর গলায় জায়গামত বলতে শুরু করবে কেবল রাসায়নিকের গুদাম কিংবা কারখানাই আগুনের মূল কারণ নয়। এখানে বনানী কিংবা এরপরের গুলশানের সাম্প্রতিক আগুনের ঘটনাকে তারা বর্ম হিসেবে ব্যবহার করবেন। আর এতে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ, কর্মকর্তা ও নেতাগণ ‘কনভিন্স’ হয়ে যেতেও পারেন।

এই আগুন, আগুনে জ্বলেপুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া মানুষদের যে দীর্ঘ লাইন সেটা ক্রমশ দীর্ঘায়ত হচ্ছে। এখানে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ আছে, কিন্তু নেই নিয়ন্ত্রণ। আগুনের মানুষ ও সম্পদ পুড়ে যাওয়ার পর পরিকল্পিত নগরী গড়ার কথা বলা হয়, বিল্ডিং কোডের কথা বলা হয়, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয় কিন্তু তার কোনোটাই বাস্তবায়ন হয়না, বলা যায় বাস্তবায়ন করা হয়না।

সর্বশেষ বনানীর ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ বলছে ভবন নির্মাণে মূল নকশা মানা হয়নি। ১৮ তলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে ২২/২৩ তলা বিল্ডিং বানানো হয়েছে। ভবনের এই বর্ধিতাংশ নিয়ে হঠাৎই আলোচনা শুরু হয়ে গেছে, এবং আলোচনার জ্বালানি হিসেবে হাজির হয়েছে অনুমোদনহীন ওই অংশের মালিকের পরিচয়। অথচ আগুন যেখানে লেগেছে সেটা ভবনের অননুমোদিত বর্ধিতাংশ নয়। আগুন লেগেছিল আটতলায় কিন্তু দোষারোপের ঠেলাঠেলিতে উপরের ৩-৪ তলাকে সামনে নিয়ে আসা উদ্দেশ্যমূলক। এখানে এফ আর টাওয়ারের (ফারুক-রূপায়ন টাওয়ার) সকল মালিকদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত কেন তাদের ভবনে সেফটি ইকুইপমেন্টের ঘাটতি ছিল সহ আনুষঙ্গিক বিভিন্ন বিষয়ে। ওই ভবনে ইমারজেন্সি এক্সিটসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু ছিল কিনা এটা এখন ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সামনে হয়ত আসবে, কিন্তু এত প্রাণ ও সম্পদের যে অপচয় হলো সেগুলো আর ফেরানো যাবে না।আগুনে-সতর্ক

বনানীর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা রাজধানীর প্রথম আর সর্বশেষ ঘটনা নয়। এক মাসের মধ্যে ঢাকা শহরের একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি আমলে নিয়ে বলা যায় এরচেয়ে আরও অধিক প্রাণ ও সম্পদের ক্ষতির মুখে রয়েছে দেশ। রাজধানীসহ সারাদেশের বহুতল ভবনসহ নানা স্থাপনায় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতিসহ আনুষঙ্গিক প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে আমাদের। দমকল বাহিনীর নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সর্বোপরি প্রতি স্থাপনা কিংবা ভবনে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতিসহ এতদসংক্রান্ত কেমন প্রস্তুতি রয়েছে আমাদের এ নিয়ে নেই তদারককারী কোনো প্রতিষ্ঠানের দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ। ফলে ফায়ার সেফটির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কাছেই গুরুত্বহীন হিসেবে মূল্যায়িত হচ্ছে।

আগুনে যখন শহর পুড়ে তখন আমরা উদ্বিগ্ন হই; শোক প্রকাশ করি; সংশ্লিষ্ট এবং দায়িত্বশীলদের সমালোচনায় মুখর হই; কিন্তু সেই তুলনায় সতর্ক হই বলে মনে হয় না। ফলে একেক অগ্নিকাণ্ড আমাদের কাছে একেকটা ঘটনাই। মারা যাওয়া মানুষগুলো একটা সময়ে স্রেফ সংখ্যায় পরিণত হন। আমাদের এই শোকপ্রকাশ আর উদ্বেগ যদি সতর্কতায় রূপ নিত তাহলে আগুন প্রতিরোধে আমরা নানামুখী ব্যবস্থা দেখতে পেতাম; ফায়ার সার্ভিসের আধুনিকায়নে উদ্যোগ দেখতে পেতাম।

এখন সময় ভবনে-ভবনে আগুন নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনায় মনোযোগী হওয়া, তদারকিতে জোর দেওয়া; তা না হলে আগুনে মানুষ আর সম্পদ পুড়বে, আর আমরা লাশের দীর্ঘ সারি থেকে নিজেদের পরিচিত-পরিজন খুঁজতেই থাকব।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন