শিরোনাম :

হায় বাংলাদেশ! এ লজ্জা কোথায় লুকাবো?


শনিবার, ২৯ জুন ২০১৯, ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

হায় বাংলাদেশ! এ লজ্জা কোথায় লুকাবো?

মো. সাখাওয়াত হোসেন: সামাজিক বন্ধন, ভাতৃত্ববোধ, সামাজিক দৃঢ়তা ও সামাজিকীকরণের অপ্রতুলতার কারণে সমাজে অপরাধ প্রবণতা বেড়েই চলেছে। আমরা সবকিছু জানি, বুঝি এবং তৎসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের সুযোগ থাকা স্বত্বেও সমাজকে আমরা ঢেলে সাজাতে পারছি না, কিংবা যথেষ্ট আগ্রহ ও নেতৃত্বের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে আমাদের মধ্যে। কেন আমরা সমাজকে সকলের বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলতে পারছি না? এর পেছনে দায় কার? মাঝে মধ্যে দেখা যায় সরকারের প্রতি বিষোদগার ও দোষারোপ করে আমাদের নিজেদের দায়িত্ব সম্বন্ধে দায়বদ্ধতার কথা অবহেলা করে ভুলে যাই। কিন্তু সমাজের আমূল পরিবর্তনের জন্য প্রত্যেক সেক্টরকেই দায়িত্বশীল ও সুনিপুণ ভূমিকা পালন অবশ্যাম্ভাবী হয়ে উঠেছে।

সমাজে বসবাসরত প্রত্যেক মানুষই সুষ্ঠু সমাজ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, সমাজে প্রত্যেকটি মানুষই এক একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ হিসেবে কাজ করে থাকে। স্ব স্ব জায়গা থেকে যথাযথ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে একটা সুষ্ঠু ও বসবাসযোগ্য সমাজ কাঠামো নির্মাণ সম্ভবপর হয়ে উঠে। কেননা একটি সুষ্ঠু সমাজের মাধ্যমেই অপরাধ প্রবণতা থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দূরে রাখা সহজতর হবে। সমাজের নাগরিকগণ নির্ভয়ে নিরাপদে জানমালের নিরাপত্তাসহ বসবাস করতে পারবে। কাজেই একটি সুষ্ঠু সমাজ বিনির্মাণ ও বাস্তবায়ন ব্যতিরেকে নিরাপদ বসবাস প্রায় অসম্ভব। আপনি যতই নিরাপত্তা কর্মী ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর নির্ভরশীল হোন না কেন সমাজের মানুষের মানবিক উন্নয়ন ব্যতিরেকে সামাজিক মুক্তি কখনোই সম্ভব নয়।

মানুষ হিসেবে আমরা প্রতিনিয়ত অধঃপতনের দিকে ধাবিত হচ্ছি। মানবিক মূল্যবোধ, কারো বিপদে এগিয়ে আসার মানসিকতা, বিপদগ্রস্ত মানুষকে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিন দিন লোপ পাচ্ছে। কিন্তু একটা সময় আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এমন ছিল না। সমাজের প্রত্যেকটা মানুষ, পরিবার একে অপরকে জানতেন, কারো বিপদে এগিয়ে আসার মানসিকতা বপন করতেন। এবং ফলশ্রুতিতে সুষ্ঠু এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিরাজমান ছিল সর্বত্র। কিছু কিছু ঘটনা দেখে আমাদের লজ্জা হচ্ছে! নীতি নৈতিকতার স্খলনের শেষ পেরেকেও আমরা তালা মেরে দিয়েছি যেখান থেকে আমরা আর বেরিয়ে আসতে পারছি না। সর্বশেষ বরগুনার ঘটনাটি আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে সমাজের অধঃপতন কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রতিবাদের লেশমাত্র দেখা যায়নি। অথচ, সামান্য প্রতিরোধ করতে পারলেই ছেলেটিকে বাঁচানো সম্ভবপর হতো।

কালের বিবর্তনে, আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার করাল গ্রাসে, শিল্পায়নের মুখোশে মানবিক সমাজ ব্যবস্থার চিত্র ক্রমশই ধূসর হয়ে যাচ্ছে। গ্রামে এখনো মানবিক সমাজ ব্যবস্থার চিত্র কিছুটা দেখা গেলে শহরে এর চিত্র দিন দিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এক এপার্টমেন্টে বসবাস করা পরিবারগুলো একে অন্যের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে না, কারো বিপদে এগিয়ে আসার প্রশ্নই আসে না। আমরা প্রতিনিয়ত যে সকল ঘটনার সাথে পরিচিত হচ্ছি সে সকল ঘটনাগুলো বিবেকহীন সমাজ ব্যবস্থার প্রতিচিত্র ব্যতিরেকে অন্য কিছু নয়। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর নির্ভর করে আমি/ আপনি/ আপনারা কেউই নিরাপদে নির্ভয়ে দিনাতিপাত করতে পারবো না। এর জন্য সামাজিক বন্ডিং বৃদ্ধি করা প্রয়োজন যার বদৌলতে সমাজের প্রত্যেকটি কাজের সাথে সকলের সংযুক্ততা থাকবে, ইতিবাচক কাজগুলোর সাথে প্রত্যক্ষভাবে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সামাজিক সম্প্রীতি ত্বরান্বিত হবে, সমাজের প্রতি সৃষ্টিশীল কাজের স্বরূপ বিচক্ষণতা তৈরি হবে এবং সমাজের প্রতি বিশ্বাসের জায়গাও শক্তিশালী হবে।

সচরাচরভাবে বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে দেখা যায়, রাস্তাঘাটে কেউ দুর্ঘটনার শিকার হলে ফুটপাতে কিংবা যানবাহনে চলাচলরত মানুষের মধ্যে কোন ভ্রুক্ষেপ পরিলক্ষিত হয় না। দু’ একজন ক্ষতিগ্রস্তকে সাহায্য করার জন্য উদগ্রীব হলেও অন্যরা ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হবে মর্মে সাহায্য করার জন্য নিরুৎসাহ প্রদান করে থাকে। কিন্তু একবারের জন্য হলেও আমাদের মনে প্রশ্ন উঁকি দেয় না যে, আমরা যে কেউই যখন তখন দুর্ঘটনা কিংবা হামলার শিকার হতে পারি সে মর্মে অন্যদের বিপদে এগিয়ে আসা উচিত।

গতকাল বুধবার সকাল ১০টায় বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে শাহ নেয়াজ রিফাত (২৫) নামে এক যুবককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুইজন। রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা স্বামীকে বাঁচানোর শত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, রিফাতকে এলোপাতাড়ি কুপানোর সময় অনেকেই ঘটনাটি স্বচক্ষে দেখেছে কিন্ত কেউই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসেনি, এগিয়ে আসলে রিফাতকে হয়তো বাঁচানো যেতো।

একবার চিন্তা করা যায়, কতটা নৈতিক অবক্ষয় হলে একটা মানুষকে এলোপাতাড়ি কোপানো হচ্ছে অথচ আমরা সেটি নির্বোধের মতো দেখে যাচ্ছি। সেখানে হামলাকারী ছিল দুইজন এবং প্রত্যক্ষদর্শীর সংখ্যা ছিল আরো বেশি। শাহ নেয়াজের স্ত্রী যেভাবে খুনীদের সামনে স্বামীকে রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীরা সামান্য সাহায্য করলেই খুনীদের আটক করা সম্ভব হতো এবং শাহনেয়াজও হয়তো প্রাণে বেঁচে যেতো। ঘটনাটি স্বচক্ষে অবলোকন করলেও কেউই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসেনি।

আমাদের বিবেকবোধ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে? একটা মানুষকে খুনীরা উপর্যপুরি কোপাচ্ছে অথচ আমরা কেউই রক্ষা করার জন্য এগিয়ে যাচ্ছি না। নীতি বিবর্জিত, বিবেক বিবর্জিত সমাজে আমরা কেউই নিরাপদ নয়। আজকে আমি কারো বিপদে এগিয়ে যাচ্ছি না, তার মানে এই দাঁড়ালো যে, আমার বিপদেও কেউই এগিয়ে আসবে না। এ অনিয়মটাই এখন সমাজে নিয়মে পরিণত হয়ে উঠেছে। এভাবে চলতে থাকলে অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে আমাদের সোনার বাংলা।

কিছু দিন পর পর এহেন ঘটনাগুলো ঘটছে কিন্তু প্রতিকার/প্রতিরোধ সেভাবে হচ্ছে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতির যে প্রতিচিত্র আমরা দেখতে পাচ্ছি সে ধারা বহমান থাকলে প্রতিনিয়ত আমাদের ঘটনা/দুর্ঘটনা দেখতে হবে এবং যে কোন সময় আমরা/আমাদের পরিবার আক্রমণের শিকার হতে পারি। কাজেই শক্ত হাতে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে সুষ্ঠু সমাজ বিনির্মাণে, যে সমাজ সকলের জন্য বসবাসযোগ্য ও নিরাপদ হবে। যেখানে থাকবে না কোন ভয়ের সংস্কৃতি কিংবা অপরাধে আক্রমণ হবার ভয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বরগুনার ঘটনার ভিডিওটি ইতোমধ্যে ভাইরাল হয়েছে। সেখানে সকলেই প্রতিরোধের কথা বলেছে এবং অপরাধীদের ভয়াবহ শাস্তি প্রদানের জন্য গুরুত্বের সাথে বলা হচ্ছে। এখন আমার কথা হচ্ছে, আমরা যারা ভিডিওটি শেয়ার করেছি কিংবা ঘটনার সাথে জড়িতদের শাস্তির ব্যাপারে পোস্ট শেয়ার করেছি; আমাদের আশে পাশে যে প্রতিনিয়ত অনাচার/নৈরাজ্যের ঘটনা ঘটে চলেছে সেসব ঘটনায় কি আমরা প্রতিরোধের বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করেছি? অবশ্যই করছি না, আর যদি করা হতো তাহলে প্রতিনিয়ত কিংবা প্রায়শই যে ঘটনাগুলো ঘটছে সেগুলোর সংখ্যানুপাত কমে আসতো ক্রমান্বয়ে। প্রকৃত অর্থে কাউকে না কাউকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে আর এ বিষয়ে যুবসমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেক বেশি। কারণ একটি সমাজকে পরিবর্তনের জন্য যুবসমাজের অগ্রণী ও ইতিবাচক ভূমিকা বলিষ্ঠ সহায়ক হিসেবে কাজ করে যার পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কর্ণধারেরা নিরাপদ বিশ্বের অনুসন্ধানে উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা পাবে।

অবশ্য ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে দুজনকে সনাক্ত করা হয়েছে এবং থানায় ইতোপূর্বে তাদের বিরুদ্ধে ছিনতাই ও মাদক ব্যবসাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। দুজনের একজন নয়ন বন্ড এবং অন্যজন রিফাত ফরাজী। বরগুনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে এবং যেকোনো মূল্যে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হবে। গ্রেপ্তারের পরে ঘটনার সত্যানুসন্ধান করে এর সাথে জড়িত অন্যান্য মদদদাতা যদি কেউ থাকে তাদেরকেও বিচারের মুখোমুখি করে প্রকৃত দোষীদের শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ থেকে এ ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনার দ্বিতীয়টা যেন না দেখতে হয় কাউকে সে জন্য সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন