শিরোনাম :

বাল্যবিবাহ


সোমবার, ৮ জুন ২০১৫, ০৫:০১ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

বাল্যবিবাহ

কঙ্কন সরকার : আমাদের পাড়ার প্রায় লাগোয়া পাশের গ্রাম। গিজ গিজ করে বাড়ি সে গ্রামে। এই গ্রামের পাশেই একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আবার আশপাশে স্কুল-কলেজ। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আছে। পাশ দিয়ে হাইওয়ে রাস্তা চলে গিয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির সকল সুবিধাদি প্রায় উপভোগ করা যায় এখানে। অথচ শিক্ষা ও তাঁর প্রায়োগিক বিষয়টি যেন এ-গ্রামে অনুপস্থিত। তার জ¦লন্ত প্রমাণ বাল্যবিবাহের প্রবল হারটি। বাল্যবিবাহ যে বিরাট বোঝা আর অভিশাপের মতো তা এ গ্রামের কিছু কিছু পরিবারের অবস্থা দেখলেই অনুমান করা যায় সহজেই। বেশ কিছুদিন আগে কেবল ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেছে এমন একটি মেয়ের বিয়ে হলো। এ-বিয়েটি প্রথমবার জানতে পেরে ইউএনও স্যার এসে ভেঙে দিয়ে যায়। কিন্তু সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ঐ অভিভাবক। কেননা কিছুদিন পরেই চুপিসারে অনুষ্ঠান ছাড়াই বিয়ে দিয়ে দেয় মেয়েটির। যাহোক মেয়েটির একটি বাচ্চা কোলে এল। শিশুর কোলে শিশুবাচ্চা! এটাই বাস্তবতা। এক পর্যায়ে মেয়েটির চেহারা খারাপ হতে থাকলো। সামান্য আয়ী পরিবার তো, তাই খাবার পথ্য খুব বেশি যোগান দেয়া সম্ভব হয় না। দিন যায় যেন অসুখ বাসা বাঁধে মেয়েটির গায়ে। ছেলেটি শহরে গিয়ে রিকশা চালায় মাঝে-মধ্যে। এক পর্যায়ে সে অন্য একটি মেয়েকে বিয়ে করে। অপবাদ দেয়, এ-মেয়েটির খালি অসুখ আর অসুখ। যাহোক দ্বন্দ্ব শুরু হয় মেয়েটির সাথে ওর স্বামীর। কেননা বেশ কিছুদিন থেকে ওর স্বামী ওকে কোনো খরচ দেয় না, দেখাশুনা করে না। এমনকি কিছু কথার কমবেশি হলে শারীরিক নির্যাতনও করে। শেষপর্যন্ত স্বামীর বাড়ি আর থাকা হয় না ওর। অগত্যা বাপের বাড়ি। আজও আছে সে। স্বামীর সাথে যোগাযোগ নেই বললেই চলে। এমনি ঘটনা প্রায় বাড়িতেই। কারও কারও দু’তিনটি সন্তান নিয়েও আসতে হয়েছে। এদের বাবা-মাকে জিজ্ঞাসা করলে বলে, তাড়াতাড়ি বিয়া দিছি মেয়ে ডাগর হয়ে উঠছিল যে! আবার কেউ বলে ছেলে পছন্দ করে চাপ দিছিল যে। আরও বলে ছেলেও ভালো। আবার কেউ বলে, মেয়ে বড় হলে পর পথেঘাটে বেড়াতে অসুবিধা হতো যে? নানান কথা কানে আসত। কারও কারও ভালোবাসাও ছিল। তাই তাড়াতাড়ি দিয়েছে বিয়া, সাহায্য নিয়া। কেউ কেউ বলে, ছইল বড় হইলে কী বাড়িত রাখা যায়? বাড়ির কাছে স্কুল আছে বললে, বলে, গরিব মাইনষের কী পড়া আছে? আর পড়বার দিলে খরচ? সরকারতো উপবৃত্তি দেয়, বিনামূল্যে বই দেয়, বিনামূল্যে পড়ায়। কিন্তু তখন বলে, জামা কাপড়ের খরচ আছে না। প্রাইভেটতো পড়া নাগে। সাজগোজের খরচ আছে না? আর বেশি পড়লে বুড়ি হয়া যাবে যে! তখন বিয়া দিতে সমস্যা হবে না? মাইনষে নানাজনে নানান কথা কবে ! কেউ কেউ তার একাধিক সন্তানেরও কথা বলে। এখনও কেউ কেউ বলে, এই স্কুল ফিস্কুলের পড়া, মেয়ে ছইলক পড়া যায় না। যাহোক, এখন যে এসব মেয়ে বাড়িতে এসে থাকছে এমন কথা বললে বলে, ভাগ্যের দোষ। মেয়ের অসুখ এটি কী কম বয়সে বিয়ে দেয়ার জন্য নয়? কেউ কেউ বলে হামার দাদি নানিরও তো ঐ বয়সে বিয়া হচিল। তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে তো মুক্ত হতে চেয়েছিলেন কিন্তু আজ তো... বলে কী করমো বাবা, মোর কপালের দোষ যে? লেখাপড়া করলে কী ভালো হতো না? মেয়েটি সচেতন হতো, হয়ত চাকরি করতো, স্বামীর পরিবারের কত উপকার হতো, আপনাকেও কী ভালো লাগত না? তেমন কোনো উত্তর না দিয়ে মুখপানে চেয়ে থাকে ঐ অভিভাবক...! বাল্যবিবাহ যে একটি দেশের, সমাজের জন্য কত সমস্যাসঙ্কুল তা এদের দেখলে কিছুটা আঁচকরা যায়। অনেক সময় মেয়েটির জীবন ধ্বংস হয়, মেয়েটির কর্ম করার জন্য সে শরীর থাকে না, অসুখ- বিসুখ দানা বাঁধে, পারিবারিক অশান্তি এসে পড়ে। প্রায় দেখা যায় বাপের বাড়িতে ফিরে এসে বাবা- মার কাছে থাকতে হয়। আর যে শিশুর জন্ম হয় সে বচ্চাটিও প্রায় অপুষ্টিতে ভোগে না কী? বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকার যথেষ্ট সচেষ্ট। বেসরকারি পর্যায়েও চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু শুধু আইন প্রয়োগ করে এ-সমস্যাটি মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। আর সরকারের ইউএনও এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষেও সম্ভব নয়। কেননা তার প্রমাণ উদাহরণের মেয়েটি। প্রচলিত আইনকে যুগোপযোগী করে যথাযথ প্রয়োগ অব্যাহত রাখার সাথে সাথে সচেতনতা বৃদ্ধি আরও ব্যাপকভাবে করতে হবে। কেননা, শিক্ষার হার বেড়েছে ঠিকই কিন্তু কু-সংস্কার থেকে এখনও বের হতে পারেনি এই লোকগুলো। তাই এ-ব্যাপারে স্থানীয় সরকার যথেষ্ট ভূমিকা পালন করতে পারে। আর স্থানীয় সরকার তৃণমূলের কেন্দ্র হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ। যদিও তাদের কিছু করণীয় আছে এ-বিষয়ে । তবে তারা আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তারা সচেতনতা বৃদ্ধি ও তা কার্যকরী করতে শিক্ষক সমাজ (কেননা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক ক্ষেত্রেও তাদের ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে হবে), মিডিয়া ব্যক্তিত্ত, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ত (যাদের দিয়ে ব্যাপক ভূমিকা রাখা যেতে পারে), শিক্ষিত সমাজ, সাংস্কৃতিক সমাজকে নিয়ে এগোতে পারে। এ-ক্ষেত্রে যারা বিবাহ রেজিস্টার কাজে নিয়োজিত তাদেরকে নিজ দায়িত্ব ও আইনের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ইউপিকে লক্ষ্য রাখতে হবে জন্মনিবন্ধন সনদ প্রদানের ক্ষত্রে। সরকার অনেক সুবিধাদি সৃষ্টি করেছে মেয়েদের লেখাপড়া আর উন্নয়নের ক্ষেত্রে। কিন্তু এ সকল বিষয় এসব লোকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে যে-যে দায়িত্বে আছি আসুন তার যথাযথ প্রয়োগ ঘটাই আরও আরও। কেননা এ সমস্যা জাতি উন্নয়নের জন্য বিরাট প্রতিবন্ধকতা। আর বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বয়সও একটি বড় ফ্যাক্টর। তাই মেয়েদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ১৮ বৎসর এবং পুরুষের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ২১ বৎসরই থাক বিবাহের বয়সের ক্ষেত্রে। তা যেন কমিয়ে আনা না হয়। এটাই প্রত্যাশা। সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন