শিরোনাম :

সন্দেহপ্রবণতা


রবিবার, ২১ জুন ২০১৫, ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

মাহবুব মিয়াজী : মানুষের মনের বিভিন্ন প্রবণতার মধ্যে সন্দেহ একটি জটিল কিন্তু বৈচিত্র্যময় প্রক্রিয়া। কর্মচঞ্চল জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষকে প্রতিনিয়ত চিন্তা এবং পরিকল্পনার পাশাপাশি সন্দেহপ্রবণও হতে হয়। সন্দেহ না থাকলে এ সংসারে অনেক ক্ষেত্রেই ঠকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রকৃতিগতভাবেই এটি মানুষের মনে জন্ম, বিস্তার এবং পরিণতিপ্রাপ্ত হয়। সন্দেহ মানুষের অমূল্য সম্পদ। আঠারো হাজার মাখলুকাতের মধ্যে একমাত্র মানুষের বেলাতেই এটি অধিকতর সুস্পষ্ট। অন্যান্য প্রাণীর মধ্যেও এই প্রবণতাটি লক্ষ্য করা যায়। যেমন, কুকুর অন্ধকারে ভয়ে ঘেউ-ঘেউ করে ডাক দেয়। সবসময় কিন্তু চোর থাকে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে সন্দেহপ্রবণ হয়েই চিৎকার জুড়ে দেয়। ফসলের মাঠে অনিষ্টকারী পাখিরা কাকতাড়–য়াকে শিকারী সন্দেহে ভয় পায় এবং ফসল নষ্ট করা থেকে বিরত থাকে। অনেক বন্যপ্রাণী লোকালয়ে আসে না। অনেকে পোষ মানানোর পরও দেখা গেছে, সুযোগ পেলে বন্যরা বনেই ফিরে গিয়েছে। নিশ্চয়ই এর পিছনে তাদের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা বা সন্দেহ প্রবলভাবে কাজ করে। অর্থাৎ, অন্যসব প্রাণীর সন্দেহ খুব একটা স্পষ্ট নয়। মানুষই একমাত্র প্রাণী যারা স্পষ্ট করে বলতে পারে, আমি বা আমরা তোমাদেরকে বা তোমাকে সন্দেহ করি। সন্দেহ করাটা যেমন আমাদের জন্য জরুরী, তার চেয়েও বেশী জরুরী হচ্ছে এর যথাযথ প্রয়োগ। সরাসরি সন্দেহ প্রকাশ করাটা নৈতিকতা বিরোধী। ধর্ম কিংবা রাষ্ট্রবিরোধীও বটে।উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া শুধুমাত্র সন্দেহের বশে কাউকে বিচারের মুখোমুখি করা যায় না। সে রকম কেউ করলে হিতে বিপরীত হতে বাধ্য। সুতরাং সন্দেহ প্রকাশের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সাবধানী এবং সংযত হওয়া প্রয়োজন। স্বাভাবিক অবস্থায় সন্দেহ অস্বাভাবিক। সাধারণত কখনও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরী হলেই সন্দেহের জন্ম হওয়ার কথা। যেমন, হঠাৎ কিছু একটা পাওয়া যাচ্ছে না। সে সময় জনমনে চুরির সন্দেহ তৈরী হওয়াটা স্বাভাবিক। স্থান-কাল-পাত্রভেদে সন্দেহের ধরণটাও ভিন্ন হয়ে থাকে। মানুষের মতো সন্দেহেরও প্রকারভেদ রয়েছে। ব্যক্তিগত সন্দেহ, গোষ্ঠীগত সন্দেহ, সাম্প্রদায়িক সন্দেহ, দলগত সন্দেহ ইত্যাদি আমাদের পৃথিবীটাকে বলা যায় ডুবিয়ে রেখেছে। আমরা হাবু-ডুবু খাচ্ছি সন্দেহের সমুদ্রে। এই সন্দেহের সাগরেই আমাদের মৃত্যু হবে-সন্দেহ নেই। আবার এই সন্দেহের দোহাই দিয়েই ক’টকৌশলে কাউকে লজ্জায় ফেলে দেওয়া সম্ভব। সাধারণতঃ হীনমনস্ক লোকদের দ্বারাই এ ধরণের হীন কার্য সম্পাদিত হয়ে থাকে। একজন সম্মানিত লোককে অযথা চুরির অভিযোগ দিয়ে সামাজিকভাবে হালকা করা যায়। আমাদের সমাজে এহেন হীন চক্রান্ত যুগ যুগ ধরে প্রথার মতো চলে আসছে। রাজনীতিবিদরা এক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির ব্যক্তিগত দুর্বলতাকে দায়ী করে থাকেন। মিথ্যা অভিযোগ এনে ব্যক্তিকে যেমন লজ্জায় ফেলে দেওয়া যায়, তেমনি কাদা ছোড়া-ছুড়ির রাজনীতিতেও এটা সমভাবে কার্যকর। যোগ্যতায় হারাতে না পারলে অনেক ক’টকৌশলী নেতা প্রতিপক্ষকে হেয় করার জন্য জনমনে মিথ্যা অভিযোগ রটিয়ে দেন, যাকে বলে প্রপাগান্ডা। প্রপাগান্ডার শক্তিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানেও স্বীকার করা হয়। সন্দেহ সম্পর্কে আমরা সচেতন হতে চাই। কেননা, সন্দেহ ও বিশ্বাসের সাথে মানুষের সাহসেরও যোগ আছে। সন্দেহ ও বিশ্বাস যদি প্রবল হয়, তবে সাহসও প্রবল হতে বাধ্য। যার এই মানসিক শক্তিগুলো দুর্বল, তার সাহস নেই বললেই চলে। মানুষের দাম্পত্যজীবনেও এগুলোর যথাযথ প্রয়োগ থাকা চাই। দাম্পত্য সম্পর্কের মূল উপাদান হচ্ছে বিশ্বাস। এই বিশ্বাসের পথে যদি সন্দেহ দানা বাঁধে, তাহলে সুখ বিনষ্ট হয়। যেহেতু দাম্পত্যজীবন বলতে দু’টি মানুষের জীবনব্যাপী কোনও প্রতিষ্ঠানকে বুঝায়-সেখানে সন্দেহকে কিছুতেই প্রবল হওয়ার সুযোগ দেওয়া যায় না। বরং বিশ্বাসের ভিতকে মজবুত রাখার জন্যই উভয়কে সচেতন থাকা জরুরী। মানুষ সন্দেহের কাছে পরাভ’ত হতে রাজি নয়। বর্তমান সময়ে মানুষই বরং সন্দেহকে সুচারুরূপে নিয়ন্ত্রণ করতেই সচেষ্ট। স্রষ্টার দানকে পূণ্য হিসাবেই লালন করা উচিৎ। কারো অমঙ্গল কামনা করে এর অপব্যবহার সমীচীন নয়। নিজেদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতেও এর ব্যবহার উচিৎ নয়। আমাদের প্রত্যেকের উচিৎ শুধুমাত্র সত্যকে উদঘাটনের প্রয়োজনেই সন্দেহের পরিমিত প্রয়োগ চর্চ্চা করা। মহাপুরুষেরা যেমন সন্দেহের বশবর্তী হয়েই একদিন বিমূর্ত স্রষ্টাকে মূর্তিমান করার শক্তি অর্জন করেছিলেন, ঠিক তেমনি। অবশ্য মানুষ যতবেশী জ্ঞানী হয়, ততবেশী সন্দেহপ্রবণও হয়। কমজানা মানুষেরা ততটা সন্দেহপ্রবণ নয়। সন্দেহ সবসময় শুধু যে অন্যের বেলাতেই তাড়িত হবে, তা-ও কিন্তু নয়। সন্দেহ করতে হয় নিজের প্রবৃত্তিকে, নিজের গোপন চিন্তাকেও। অতিরিক্ত সন্দেহবাদীরা নিজেকেও ছাড়েন না। আত্মসমালোচক ব্যক্তিরা আগে নিজেদেরকেই যথাযথভাবে সন্দেহের নিক্তি দিয়ে শুচি করে নেন এবং সমাজে সফলরূপে আত্মপ্রতিষ্ঠা অর্জন করেন।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন