শিরোনাম :

স্কুল ফোবিয়ার কারণ ও প্রতিকার


শনিবার, ২৫ জুলাই ২০১৫, ০৭:১৫ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

স্কুল ফোবিয়ার কারণ ও প্রতিকার

স্কুল ফোবিয়ার কারণ ও প্রতিকার মো. জহির উদ্দিন অল্পবয়সী শিশুদের মধ্যে হঠাৎ করে স্কুলে যাওয়া নিয়ে চরম নেতিবাচক অনুভূতি অথবা ভীতি তৈরি হয়। একে বলে স্কুল ফোবিয়া। অনেকে একে স্কুল রিফিউজালও বলেন। স্কুল ফোবিয়ার সঠিক সমাধানের উদ্যোগ না নিলে ফল খারাপ হয়। এই শিশুটির শিক্ষাজীবন ধ্বংসের পাশাপাশি জীবনের রুটিন নষ্ট হবে। সে সঠিক সময় উঠার, সময়মতো খাবার খাওয়া, নিজের যত্ন নেয়া, যেমন, সময় মতো দাঁত মাজা ও গোসল করা, সময় মতো ঘুমানোর অভ্যাস থেকে দূরে চলে যাবে। তার সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে খেলা ও বন্ধুত্ব করা হয়ে উঠবে না। ফলে সে শারীরিক ও মানসিক আনন্দ ও যথাযথ মানসিক, সামাজিক ও শারীরিক বিকাস থেকে বঞ্চিত হবে। এ ধরণের বাচ্চাদের মধ্যে বড় বয়সে মৃত্যু ভীতি, উৎকণ্ঠা ও অন্যান্য মানসিক রোগ হবার হার বেশি দেখা যায়। কাজেই বাবা-মা, স্কুল ও বিশেষজ্ঞদের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে স্কুল ফোবিয়া দূর করা বিশেষভাবে প্রয়োজন। সাধারণত ১ থেকে ৫ শতাংশ স্কুলগামী শিশুদের স্কুল ফোবিয়া বা স্কুল রিফিউজাল থাকে। পাঁচ থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। পরিবারের একমাত্র সন্তান, ছোট সন্তান বা প্রায়ই রোগে ভোগে- এমন শিশুদের মধ্যে এ সমস্যা বেশি দেখা দেয়। বিবিধ কারণে স্কুল ফোবিয়া দেখা দেয়। যখন শিশুর জীবনে কোনো পরিবর্তন আসে তখন এটি হতে পারে। যেমন- ১. প্রথম স্কুল শুরুর সময়, প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্কুল শুরুর সময়, বাবা-মা যে কোনো একজনের মৃত্যুর পর বা বাবা-মার মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের পর পর এটি হতে পারে। এমনকি পোষা প্রাণীর মৃত্যুর পরও স্কুল ফোবিয়া শুরু হতে পারে। ২. কোনো দীর্ঘকালীন ছুটির পর ক্লাসে যাবার সময়, কিংবা দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ক্লাস শুরুর করার পর। ৩. নতুন পরিবেশ এবং সহপাঠীদের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সমস্যা হলে স্কুল ফোবিয়া তৈরি হতে পারে। যেমন, শিশুর হয়তো টয়লেট ট্রেনিং ঠিকমতো হয়নি। টয়লেট করতে বাবা-মার সাহায্য লাগে। এখন স্কুলের টয়লেটে যেতে সে অস্বস্তি বোধ করতে পারে। বাসায় হয়তো ফ্ল্যাট প্যান আর স্কুলে হাই কমোড। অথবা স্কুলের স্টাফ তাকে বার বার বাথরুমে যাওয়া নিয়ে বিরক্ত হলো। অথবা ক্লাসের ঘরটিতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস নেই। ক্লাসে আসতে হলে এমন একটি সিড়ি ব্যবহার করতে হয় যা শিশু ভয় পায়। ইত্যাদি কারণেও স্কুল ফোবিয়া হতে পারে। ৪. শিশু হয়তো কোনো পরীক্ষা, কোনো নির্দিষ্ট ক্লাস, কোনো দলগত উপস্থাপনা এড়িয়ে যেতে চাইছে। এই সূত্র ধরেও শিশুর স্কুল ফোবিয়া শুরু হতে পারে। ৫. শিশু হয়তো অন্য শিশুদের সঙ্গে একসঙ্গে খেলাধুলা করতে চাইছে না। সে হয়তো খুব লাজুক, তার মধ্যে হয়তো সামাজিক ভীতি আছে। ফলে অন্য সহপাঠী ও শিক্ষকদের উপস্থিতিতে ভয় পেয়ে সে এগুলো এড়াতে গিয়ে স্কুলকে এড়িয়ে যেতে চায়। ৬. শিশু হয়তো স্কুলের বাইরে তাৎপর্যপূর্ণ কারো মনোযোগ চাইছে। স্কুলে না গেলে যদি সে বাবা-মায়ের একজনের পূর্ণ মনোযোগ ও সঙ্গ না পায় তবে স্কুল ফোবিয়া হতে পারে। ৭. স্কুলে না গেলে যদি শিশু কম্পিউটার গেমস, টেলিভিশন দেখা বা এ ধরনের মজার ও চিত্তাকর্ষক কাজে ব্যস্ত থাকে, যদি তাকে এই সময়টা পড়তে না হয় তবে স্কুলে না যাবার বিষয়টি আরো পাকাপোক্ত হয়। ৮. শিশুর ওপর বাবা-মা ও শিক্ষকদের এমনকি শিশুর নিজেরই অনেক উচ্চাশা আছে যে সে পরীক্ষায় ভাল করবে। কিন্তু ভালো করার ক্ষেত্রে যদি তার ক্ষমতার ঘাটতি থাকে বা আত্মবিশ্বাস কম থাকে তবে শিশুর মনে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়। পরীক্ষা বা মেধা মূল্যায়নে খারাপ করার ভয় তাকে জেঁকে ধরে। ৯. শিশু যদি ক্রমাগত পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করে, তার যদি বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা বা কোনো ‘স্পেসিফিক লার্নিং ডিজঅ্যাবিলিটি’ থাকে, তবে সে স্কুলের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ১০. স্কুলের বা ক্লাসের অন্য বাচ্চারা যদি শিশুটিকে মারে, লাঞ্ছিত করে, ভয় দেখায় তবে শিশু স্কুলে যেতে চায় না। শিশু অধিক মোটা, অধিক চিকন, কম উচ্চতা সম্পন্ন, বা অধিক কালো ইত্যাদি যেসব বৈশিষ্ট্য অন্যদের মতো নয়, এসব কারণে সে লাঞ্ছিত হতে পারে। ১১. শিশুটি যদি তার নিজের পরিবার, বাবা-মা ও ভাই-বোন নিয়ে উদ্বেগে ভোগে, তবে স্কুলে না গিয়ে বাসায় থাকতে চাইতে পারে। বাসায় পারিবারিক অশান্তি, ঝগড়া-ঝাটি থাকলে বা প্রতিবেশীদের সঙ্গে খুব বেশি মনোমালিন্য হলে শিশুর মধ্যে পরিবার নিয়ে উৎকণ্ঠা বেড়ে যেতে পারে। ১২. বিভিন্ন মানসিক রোগের বহিঃপ্রকাস হিসেবেও স্কুল ফোবিয়া আসতে পারে। শিশু হয়তো উদ্বেগ, বিষন্নতা, মনোদৈহিক রোগ, কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডার, সেপারেশন অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার, জেনারালইজ্ড অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডারে ভুগছে। ফলে সে স্কুল ভয় পাওয়া ও এড়িয়ে যাওয়া শুরু করলো। শিশুর হয়তো ঘুমের রোগ রয়েছে। যেমন, ডিলেইড স্লিপ ফেজ সিন্ড্রোম (ডিএসপিএস)-এর ফলে শিশু সহজে ঘুমাতে পারে না। ফলে সে সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারে না ও স্কুলে যেতে পারে না। স্কুল ফোবিয়ার সমাধানের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া যায়। যেমন- ১. বাবা-মা ও অভিভাবকেরা শিশুকে আবার স্কুলে যেতে উৎসাহিত করবেন। পরিবার ও স্কুলের সঙ্গে এক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় রেখে কাজ করা দরকার। ২. প্রতিদিন স্কুলের শুরুতেই স্কুলের একজন কর্মচারী বাবা-মায়ের কাছ থেকে শিশুকে বুঝে নিয়ে আসতে পারেন। এরপর ছুটির সময় তিনি আবার শিশুটিকে বাবা-মায়ের কাছে বুঝিয়ে দিতে পারেন। ৩. শিশুকে অন্য সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে খেলার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য অভিভাবক ও শিক্ষকদের উদ্যোগী হতে হবে। ফলে ভীত শিশুটি স্কুলে মানসিক সমর্থন পাবে। খেলার মাধ্যমে স্কুলে আসতে সে আগ্রহী হবে। ৪. শিশুর মধ্যে যেসব ভাল গুণাবলী আছে, যেসব কাজ সে ভালভাবে করতে পারে, সেগুলো করার মতো পরিবেশ তাকে করে দিতে স্কুল কর্তৃপক্ষ সহায়তা করবেন। ফলে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়বে। সে স্কুলে ভাল বোধ করবে। ৫. কোনো শিশু ক্রমাগত পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করলে তার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। শিশুটির বুদ্ধি পরীক্ষা করে বুদ্ধাঙ্ক অনেক কম পাওয়া গেলে তার মানসিক ক্ষমতা অনুযায়ী বিশেষ সিলেবাস অনুসরণ করে পড়াতে হবে। ৬. স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, যেমন, ক্লাস-পার্টি, মিলাদ, প্যারেন্টস ডে- এগুলোতে স্কুল ফোবিক শিশুটিকে নিয়ে অভিভাবকেরা নিয়মিত উপস্থিত থাকবেন। ৭. শিশুর সামনে বাবা-মা তাকে আবেগতাড়িত কথা বলা বন্ধ করবেন। যেমন, ‘চলে যাবো। মরে যাবো। আর কোনোদিন দেখবে না আমাকে’- এ ধরনের ক্ষতিকর কথা বলা বন্ধ করতে হবে। বরং তাকে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে সবই ঠিক থাকবে। পারিবারিক সমস্যা অতিরিক্ত হলে প্রয়োজনে পরিবারের সবাই ফ্যামিলি থেরাপি নামের এক ধরনের সাইকোথেরাপি নিয়ে সমস্যা সমাধান করতে পারেন। ৮. শিশুকে রিল্যাক্সেশন ব্যায়াম করানো যেতে পারে। এই ব্যায়ামের মাধ্যমে সে তার উৎকণ্ঠা কমাতে শিখবে। শিশুর মনে সাহস ও আত্মবিশ্বাস বাড়ে এমন ধরনের বই তাকে পড়তে দেয়া যায় বা পড়ে শোনানো যায়। একই ধরনের মুভিও তাকে দেখানো যায়। স্কুলে কীভাবে আবার যাবে, যদি স্কুলে খারাপ লাগে তবে কীভাবে তার সঙ্গে খাপ খাওয়াবে এসব বিষয়গুলো অভিনয় করিয়ে শিশুকে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। ফলে সে স্কুলে যেতে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে। ৯. স্কুলে যাওয়া, পড়া এ ধরনের আকাক্সিক্ষত আচরণের জন্য শিশুকে বাবা-মা ও শিক্ষকেরা প্রচুর প্রশংসা করবেন। তাকে ছোট-খাট পুরস্কার, যেমন- পছন্দের খাবার, ছোট খেলনা, কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাওয়া- এগুলোর সাহায্যে উৎসাহিত করা যায়। শিশুকে ভাল কাজের জন্য তারার বা স্টারের ছবি দেয়া যায়। এভাবে দশটি তারা পেলে সে পছন্দ মতো একটি ভাল পুরস্কার পাবে। যেমন, সে হয়তো দশটি তারা পেলে তার বিনিময়ে একদিন শিশু পার্কে বেড়াতে যেতে পারবে। কোনোটি পুরস্কার হিসেবে ব্যবহার করা হবে তা শিশু, বাবা-মা ও শিক্ষকেরা মিলে ঠিক করতে পারেন। ফলে এসব কাজে শিশুটি উৎসাহিত হবে। ১০. স্কুলে না গেলে এই সময়টিতে যাতে শিশু আনন্দদায়ী কোনো কাজ না করতে পারে, এই সময়টি যাতে তার জন্য ভাল সময় হয়ে না উঠে তা বাবা-মাকে নিশ্চিত করতে হবে। বাবা-মা ও অভিভাবকেরা শিশু প্রতিপালন পদ্ধতি ও শিশুর সমস্যা বিষয়ক বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। ইন্টারনেট থেকে অথবা মানোবিজ্ঞানীদের থেকে এ বিষয়ে তারা শিখে নিতে পারেন। এতোসব করেও যদি সমস্যা না মেটে তবে বিশেষজ্ঞ পরামর্শের প্রয়োজন হয়। কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি নামের এক ধরনের সাইকোথেরাপির সাহায্যে সাইকোলজিস্টরা সমস্যার সমাধান করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে স্কুল ফোবিক বাচ্চাদের জন্য বিকল্প শিক্ষার ব্যবস্থা করে ভাল ফল পাওয়া গেছে। কোনো মানসিক রোগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে স্কুল ফোবিয়া দেখা দিলে মূল মানসিক রোগটির জন্য যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। খুব খারাপ ধরনের অতি তীব্র স্কুল ফোবিয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হিসাবে মানসিক রোগের ওষুধ ব্যবহার করা যায়। উন্নত বিশ্বে স্কুলগুলোতে স্কুলে কাউন্সেলর বা স্কুল সাইকোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া হয়। সমস্যার একদম শুরুতেই শনাক্ত করে তার সমাধানের জন্য উদ্যোগী হন এই কাউন্সেলরেরা। আমাদের দেশেও স্কুলে মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। স্কুল ফোবিয়ার সঠিক সমাধানের উদ্যোগ না নিলে ফল খারাপ হয়। এই শিশুটির শিক্ষাজীবন ধ্বংসের পাশাপাশি জীবনের রুটিন নষ্ট হবে। সে সঠিক সময় উঠার, সময়মতো খাবার খাওয়া, নিজের যত্ন নেওয়া যেমন- সময় মতো দাঁত মাজা ও গোসল করা, সময় মতো ঘুমানোর অভ্যাস থেকে দূরে চলে যাবে। তার সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে খেলা ও বন্ধুত্ব করা হয়ে উঠবে না। ফলে সে শারীরিক ও মানসিক আনন্দ ও যথাযথ মানসিক, সামাজিক ও শারীরিক বিকাস থেকে বঞ্চিত হবে। এ ধরনের বাচ্চাদের মধ্যে বড় বয়সে মৃত্যু ভীতি, উৎকণ্ঠা ও অন্যান্য মানসিক রোগ হবার হার বেশি দেখা যায়। কাজেই বাবা-মা, স্কুল ও বিশেষজ্ঞদের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে স্কুল ফোবিয়া দূর করা বিশেষভাবে প্রয়োজন। লেখক : ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন