শিরোনাম :

ইসলামিক স্টেট-এর অতীত বর্তমান


শনিবার, ২৫ জুলাই ২০১৫, ০৭:২৬ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

ইসলামিক স্টেট-এর অতীত বর্তমান

ইসলামিক স্টেট-এর অতীত বর্তমান অরণ্য আহমেদ আমেরিকান সাংবাদিক ফলিকে জবাই করে হত্যার পর ইসলামিক স্টেট (আইএস) নিয়ে বিশ্বব্যাপী শোরগোল ওঠে। এই আইএস এক দিনে গড়ে ওঠেনি। কট্টরপন্থী এই সুন্নি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর নাম ছিল ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া (আইসিস)। মাত্র কয়েকদিন আগে ‘ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া’ বাদ দিয়ে এটি এখন শুধু ইসলামিক স্টেট (আইএস)। অর্থাৎ তারা এখন শুধু ইরাক ও সিরিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না। নৈব্যক্তিক দৃষ্টিতে দেখা নেওয়া যাক এর নেপথ্য কাহিনি। ২০০৯-১০ সালের কথা। আল-কায়দার ছত্রছায়ায় ইরাকের শিয়াপন্থী শাসকদের বিরুদ্ধে সুন্নি ক্ষোভ-বিক্ষোভ শুরু হয়। এই বিক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে সরকারি কর্তাদের হত্যা, দেশব্যাপী বোমা বিস্ফোরণ দিয়ে শুরু হয় আইএস এর যাত্রা। মার্কিন সেনা ২০১১ ইরাক ত্যাগের পর এই উগ্রগোষ্ঠীটি আরও তৎপর হয়ে ওঠে। আবু বকর আল-বাগদাদির নেতৃত্বে অন্যান্য সশস্ত্র সুন্নি ও উপজাতি বাহিনীর সঙ্গে সখ্য বাড়ে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ শুরুর পর এরা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ‘ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া’ (আইসিস )-এর আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে ২০১৩ সালে। তরুণ জিহাদিদের কাছে জাওয়াহিরি নেতৃত্বাধীন আল-কায়দার থেকেও বেশি কদর। ওই বছরই সিরিয়ার আলেপ্পো ও রাক্কা শহর দখলে নেয় তারা। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে দখলে নেয় ইরাকের সুন্নি অধ্যুষিত ফালুজা শহর। এরপর একে একে রামাদি, তুরস্ক ও সিরিয়া সীমান্তে তাল আফার, তিকরিতসহ বেশ কিছু শহর-জনপদ তাদের দখলে চলে যায়। গত জুনে ইরাকের রাজধানী বাগদাদের ঘাড়ের কাছেও নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করে তারা। বাগদাদি-বাহিনীর হাতে মোসুল শহরের পতন হয়। কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরব থেকে পাঠানো বিপুল অর্থ চলে আসে আইএস-এর হাতে। আগস্টে আইএস-কে লক্ষ্য করে ফের ইরাকে শুরু হয় মার্কিন বিমান হামলা। ত্রাণ বিলি করে ব্রিটেনও। মার্কিন সাংবাদিক জেমস ফলির মু- কেটে আমেরিকাকে হুমকি দেয় আইএস। মধ্যপ্রাচ্যের বিশ্লেষকরা মনে করেন, সৌদি বাদশা আবদুল্লাহ গত আট বছর এরই অপেক্ষায় ছিলেন। ইরাকি প্রধানমন্ত্রী তার কাছে শুরু থেকেই ‘ইরানের দালাল’। আল-মালিকির জমানার ইরাকে সৌদি রাষ্ট্রদূত পর্যন্ত পাঠাননি আবদুল্লাহ। গাল্ফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিএসসি ) অর্থাৎ তার অনুগত কুয়েত, বাহরিন, কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সাত প্রধানও একই পথে হেঁটেছিলেন। ২০১১ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে সবার অলক্ষ্যে বাড়ছিল ইসলামিক স্টেট। ইতিহাসের আয়নায় : পশ্চিম এশিয়া এবং ইরাকের রাজনীতিতে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। ১৯২০-এর দশকের একেবারে শেষের দিকে ব্রিটিশরা জন্ম দিয়েছিল আজকের ইরাকের। এর জন্য মেসোপটেমিয়া ও বসরার সঙ্গে মেশানো হয়েছিল উত্তরের কুর্দ জনগোষ্ঠীর বাসভূমিও। বিদ্রোহী কুর্দদের পৃথক ‘হোমল্যান্ডের’ দাবি নস্যাৎ করেই। সেই থেকে ইরাকের দখলদারি নিয়ে শিয়া-সুন্নির দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। বাগদাদ ও সংলগ্ন অঞ্চলে সুন্নি অধ্যুষিত আরবরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। আর বসরা ও দক্ষিণ-পূর্বের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছিল শিয়া আরবদের প্রাধান্য। শিয়াদের চাপে রাখতে ও ইরাকের নতুন শাসক মক্কার শরিফ হোসেন বিন আলির তৃতীয় পুত্র এবং হাশেমি বংশীয় ফয়সলকে ভরসা দিতেই আরব না হওয়া সত্ত্বেও সুন্নি কুর্দদের জোর করে ইরাকের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ১৯৫৮ সালে ইরাকে বাথ পার্টির উত্থান ঘটল হাশেমিদের বংশ নাশ করে। শোনা গেল, তরুণ এক বাথ সদস্য সাদ্দাম হোসেনের নাম। ১৯৭৯-তে এই সাদ্দামই ইরাকের মসনদে বসলেন। তিকরিত গ্রামের এক কৃষক পরিবারের সন্তান সাদ্দাম সৌদি রাজপরিবারের পাত্তা পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না, কিন্তু নিয়তির লিখন অন্যরকম। ইরানে মার্কিনপন্থী রেজা শাহর শাসনের অবসান ঘটল আয়াতুল্লাহ খোমেইনির নেতৃত্বে। কিছুদিন পরই ইরানে মার্কিন রাষ্ট্রদূতদের টানা ৪৪৪ দিন বন্দি রাখল খোমেইনির অনুগতরা। ১৯৮৩ সালে ইরান প্রভাবিত শিয়া জঙ্গিগোষ্ঠী হেজবোল্লার বেইরুট মার্কিন সেনাছাউনিতে হামলায় ২৪১ জন মার্কিন সেনার মৃত্যু সৌদি রাজপরিবার ও তার ঘনিষ্ঠ সখা মার্কিন প্রশাসনের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দিয়েছিল। শিয়া জঙ্গিগোষ্ঠী ও তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইরানকে থামাতে মরিয়া পশ্চিমি দুনিয়ার কাছে তখন সাদ্দামই সম্বল। অন্য দিকে, পশ্চিম এশিয়ায় সৌদি রাজপরিবারের দাপট কমাতে উঠেপড়ে লেগেছিল তেহরানের ধর্মীয় নেতাদের প্রশাসনও। সিরিয়ায় আর এক শিয়াপন্থী হাফিজ আল-আসাদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় একধাক্কায় ইরানের ক্ষমতা বেড়ে গেল অনেকটাই। ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরু হতেই সন্ত্রস্ত আমেরিকা সাদ্দামকে সমর্থন করতে একটুও দ্বিধা করেনি তাই। ১৯৯১-এর উপসাগরীয় যুদ্ধ সাদ্দাম হোসেনের কোমর ভেঙে দেয়। ২০০৩ সালে সাদ্দাম ক্ষমতাচ্যুত হলে পুরোনো ভয় ফের পেয়ে বসল সৌদি রাজপরিবারকে। ময়দান সাফ দেখে ছক সাজাতে শুরু করে আয়াতুল্লাহ খামেনিইয়ের ইরানও। এমন পরিস্থিতিতে ইরাকের শাসনক্ষমতা শিয়াপন্থী নুরি আল-মালিকির হাতে আসায় পশ্চিম এশিয়ায় ফের অ্যাডভান্টেজ ইরান। ৯০ পার করা সৌদি বাদশা আবদুল্লাহ স্মরণকালে এমন ‘দুর্দিন’ আর দেখেননি। এতদিন ছিল ইরান আর সিরিয়া, এ বার ইরাকও সেই শিবিরে! ইরাকে শিয়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও শাসনক্ষমতা ছিল সুন্নিদের হাতেই। কিন্তু এখন আরব দুনিয়ার দু’টি দেশ তো পরোক্ষভাবে শিয়া ইরানেরই হাতে! দুশ্চিন্তায় আবদুল্লাহ সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে বিরোধীদের অর্থ ও অস্ত্র জোগাতে শুরু করলেন। জন্ম নিল কট্টরপন্থী সুন্নি সংগঠন ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া (আইসিস )। উদ্দেশ্য, আরবভূমি থেকে শিয়াদের সমূলে বিনষ্ট করা। অতীতে একাধিকবার এমন চেষ্টা করেছে সৌদি রাজপরিবার। ১৯২৫ সালে বর্তমান শাসক আবদুল্লাহর পিতা ইবন সাউদ মিসরের আল-ইখওয়ান গোষ্ঠীর সাহায্য নিয়ে হাশেমিদের থেকে আরবকে নিজের অধিকারে এনেছিলেন। পরে, আল-ইখওয়ানের পিছু ছাড়াতে ব্রিটিশের সাহায্য নিয়েছিলেন সেবিল্লার যুদ্ধে। ইবন সাউদের ইচ্ছায় আল-ইখওয়ানের উপর বিমান থেকে মেশিনগান চালিয়েছিল ব্রিটিশ সেনা। সে দিনের আল-ইখওয়ান আজ পরিচিত মুসলিম ব্রাদারহুড নামে। ৭০ বছর পর ফের এমন ধর্মীয় উস্কানির সাহায্য নিয়ে তালেবান ও আল-কায়দা নামে দুই গোষ্ঠীকে বিশ্বের দরবারে পেশ করে এই সৌদি রাজপরিবারই। এ বার পশ্চিম এশিয়া দখলের লড়াইয়ে তাদের বাজি ‘ইসলামিক স্টেট’ সংক্ষেপে ‘আইএস’। একা সৌদি রাজপরিবারই নয়, আরব দুনিয়াকে কিছুটা নড়বড়ে দেখে ঘোলা পানিতে মাছ ধরতে নেমে পড়েছে কাতারও। ২০১১ থেকেই মাথাপিছু আয়ের নিরিখে কাতার বিশ্বের ধনীতম দেশ। এ বার আরব বিশ্বের তিন হর্তা কর্তা বিধাতা সৌদি বাদশা আবদুল্লাহ, মিসরের আবেদল ফাতা এল সিসি এবং আবুধাবির মোহম্মদ বিন জায়েদ বিন সুলতান আল-নাইহানকে টপকে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করেছেন কাতারের শাসক তামিম। গত দু’বছরে কাতারেই তৈরি হয়েছে আল-কায়দা ও তালেবানের দুটি দপ্তর। ধনী কাতারি আরবরা প্রকাশ্যে একাধিক জঙ্গি সংগঠনকে অর্থসাহায্য করেছেন। তাদের আটকানোর উপায় এখনও অধরাই। ব্যর্থ হয়েছে আমেরিকা। ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুতে অবসান হয়নি উগ্রপন্থার। সন্ত্রাসের সংস্কৃতির আবাদ দেখছে আজকের দুনিয়া। পূর্বে পাকিস্তান থেকে পশ্চিমে আফ্রিকা পর্যন্ত ছবিটা একেবারে এক। করাচির জিন্না আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তালেবান হামলা, আফগানিস্তানে ভোটদাতাদের আঙুল কেটে উগ্রপন্থার আস্ফালন, আইএসের সিরিয়া ও ইরাকের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল, ইয়েমেনে হাসপাতালকর্মীদের বাসে আল-কায়দার গুলি, আল-শাবাবের হাতে কেনিয়ায় ৪৮ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু, নাইজেরিয়ায় বোকো হারাম উগ্রপন্থিদের হাতে অপহৃত ৩৭৬ জন স্কুলছাত্রী...। অতঃপর, সাংবাদিক ফলির মৃত্যুর পর আমেরিকা নড়েচড়ে বসলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি একাধিকবার বলেছেন, আইএস-কে সামাল দেওয়া তাদের জন্য সহজ হবে না। ফলির শিরোচ্ছেদের ভিডিও ফুটেজে আইএস মুখপাত্র বলেছে, ‘বাগদাদ দখল করেই শেষ হবে না তাদের অভিযান, কারবালা ও নজফের শিয়া ধর্মীয় স্থানগুলিকে মাটিতে মেশাতে পারলে তবেই পূর্ণ হবে তাদের ‘মহান ব্রত’।’ আইএস যেন তরুণ জেহাদিদের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সাড়া ফেলে দিয়েছে। ফ্রান্স থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত নয় শ’ জন সিরিয়া আর ইরাকে পাড়ি দিয়েছে এই জেহাদে সামিল হতে। ব্রিটেন থেকেও যোগ দিচ্ছে অসংখ্য সুন্নী জেহাদি। প্রাথমিক লক্ষ্য পূর্ণ করা গেছে বলে মনে করছে আইএস। সিরিয়া ও ইরাকের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন তাদের দখলে। আইএস প্রধান আবু বকর আল-বাগদাদি মনে করেন, ওই অঞ্চলে এখন তারা সপ্তম শতাব্দীর সেই গৌরবজনক দিনগুলির মতো খিলাফত গঠন করতে পারবে। ভবিষ্যতটা আমরা জানি না এখনও। অরণ্য আহমেদ লেখক ও সাংবাদিক

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন