শিরোনাম :

প্রতিবাদই কি কেবল যথেষ্ট! প্রতিরোধ কেন নয়?


মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০১৫, ০৩:১০ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

প্রতিবাদই কি কেবল যথেষ্ট! প্রতিরোধ কেন নয়?

মারিয়া সালাম :

জাতি হিসেবে আমাদের যে কোনো বিষয়ে একটি জাতীয় ঐক্যমতে পৌঁছানোর তেমন কোন সুযোগ নেই বললেই চলে। খুব কম বিষয়ই আছে যা নিয়ে আমরা দল মত নির্বিশেষে সবাই একই ধরনের মনোভাব পোষণ করে থাকি। এমনকি যুদ্ধাপরাধের বিচার এর মত একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, যা নিয়ে কোন দ্বিধা দ্বন্দ্বের বিন্দুমাত্রও কোনো অবকাশ নেই, সেখানেও আমরা বিভক্ত হয়েছি, গত ক’বছরে এনিয়ে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছে পক্ষ-বিপক্ষের বহু মানুষ।

সাম্প্রতিককালে দুটি ব্যাপারে আমরা একমতে পৌঁছিয়েছি, এক- ক্রিকেটে আমাদের জয় চায়ই চাই, আর দুই-শিশু রাজন হত্যার বিচার চাই।

আট জুলাই সামিউল ইসলাম রাজনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। অপরাধীরা আবার সেই অত্যাচারের ভিডিও চিত্র ধারণ করে ফেসবুকে ছেড়ে দেয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়ে শুরু হয় তোলপাড়, দল মত নির্বিশেষে সকলেই এরকম জঘন্য এবং ঠাণ্ডা মাথায় শিশু হত্যার ঘটনায় ধিক্কার জানায়, উঠে নিন্দার ঝড়। রাজপথে নেমে আসে মানুষ, সবারই এক দাবি, এরকম জঘন্য কাজ যারা করল, তাদের উপযুক্ত শাস্তি হোক।

সরকারের মন্ত্রিই বলেন আর বিপক্ষের রাজনৈতিক দলের নেতাই বলেন, সবার এক কথা, এক দাবি, হত্যাকারীদের বিচার। কর্তব্যে অবহেলা আর দুর্নীতির জন্য আমরা সবসময় যে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কটাক্ষ করে থাকি তারাও কম যায় না, মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে ধরা পরে গেল মামলার ১৩ আসামি। একজন তো সৌদি আরবে গিয়েও নিজেকে রক্ষা করতে পারল না।

প্রধান অপরাধীরা সবাই প্রায় আইনের আওতায়। মন্ত্রি বলেছেন বিচার হবে দ্রুত। তবুও আমরা থেমে নাই, সোশ্যাল মিডিয়াই বলেন আর চায়ের আড্ডাই বলেন, অফিস, বাসা, সব জায়গায় নিয়েই আলোচনা চলছে, আমরা বিচার চাইছি। এ ঘটনার বিচার চাই, এ নিয়ে আমার কোন দ্বিমত নাই। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে, এ বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত কয়েকটি প্রশ্ন আমাকে বার বার নাড়া দিচ্ছে।

আচ্ছা আমরা যারা রাজপথে নেমে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইছি, তারা কি একবার ভেবে দেখেছি এই জঘন্য ঘটনার জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী, আর দায়ী আমাদের বস্তাপচা একটি ধারণা- চোর ধরা পড়লেই তাকে পিটাতে হবে, মেরে ফেলতে হবে। আমরা অনেকেই তো চোর পিটিয়েছি, আবার চোখের সামনে অনেক চোরকে পিটিয়ে মেরে ফেলতেও দেখেছি। তখন কি প্রতিবাদ করেছি?

Aminbazar-Killingআপনারা কি আমিন বাজারের ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে মেরে ফেলার কথা ভুলে গেলেন? তখন তো আমরা অনেকেই আহা আহা করেছি কেবল, মুখে মুখে বিচার চেয়েছি, অপরাধীরা অনেকে ধরাও পরেছিল, তারা এখন কি জেলে না জামিনে বের হয়ে মহাআনন্দে ঘুরে বেরাচ্ছে, সেটা কি আমরা জানি, আমরা তখন তো বিচার চেয়ে রাজপথে নেমেছিলাম, তাহলে কেন আবার এরকম আর একটি ঘটনা ঘটে গেল? আর এরকম একটি তো নয়, চোর আর ডাকাত সন্দেহে, হ্যাঁ কেবল সন্দেহের জের ধরে আমরা প্রতিদিনই পিটিয়ে মারছি মানুষ। আমরা তো বিচার চেয়েছি, চাচ্ছি, তাহলে কেন প্রতিদিনই মানুষ পিটিয়ে মারার ঘটনা ঘটে চলেছে? প্রশ্নটি খুব একটা জটিল নয়, উত্তরটি আরো সহজ। কারণ আমরা এবিষয়ে জন সচেতনতা মুলক কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারিনি, বা নেয়াটা অত্যন্ত জরুরি বলে মনেই করিনি। ব্যবস্থা নেয়া অনেক দূরের ব্যাপার, চোখের সামনে এরকম ঘটনা ঘটে গেলেও আমরা এড়িয়ে যাই। যত আবেগ নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দি, ততোটা সাহস নিয়ে দল বেঁধে গিয়ে বলতে পারি না, থামেন ভাই, অনেক হয়েছে চোর পিটানো, আসুন একটু অন্য ভাবে ভেবে দেখি, আমার আর চোর পিটিয়ে মারব না, বরং আসুন দেশের জন্য কিছু করি, যাতে করে কেও আর চুরিই না করে।

সেটা আমরা পারি না, কারণ আমরা কাপুরুষ। শুধু চোর, রিকশাওলা, গৃহপরিচারিকা আর ঘরের বউ পেটানোর সময় আমরা সবচেয়ে বেশি বীরত্ব দেখাতে সক্ষম।

Beatingপহেলা বৈশাখে হাজার হাজার বীর পুরুষের সামনে হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন অসুস্থ যুবক নির্মমভাবে নারীদের অত্যাচার করছিলো, তখন লিটন নন্দীদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কোনো বীর পুরুষই এগিয়ে এল না, যেসব নারী নিজেদের সমঅধিকার নিয়ে একশো ভাগ সচেতন, তারাও এল না দল বেঁধে, যে যার মত পালিয়ে বাঁচল সে দিনের মতো। অথচ ভেবে দেখুনতো, ওই দিন ওখানে একজন ছিনতাইকারী বা ছিঁচকে পকেটমার যদি ধরা পড়তো, সে কি প্রাণ নিয়ে ফিরে যেতে পারত?

ছোট্ট একটি হিসাব তুলে ধরছি: বিভিন্ন গণমাধ্যম বলছে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সারাদেশে গণপিটুনিতে খুন হয়েছেন অন্তত ৬৯জন। এদের মধ্যে রাজধানী ঢাকাতেই মারা গেছেন ৩৯জন! নিহতদের মধ্যে কোন দুর্নীতিবাজ, ধর্ষক, নারী নির্যাতনকারী, চোরাকারবারি বা যুদ্ধাপরাধী ছিলো না।

আজ একটা ছোট্ট গল্প বলে শেষ করছি: আমার এক ইউরোপিয়ান বন্ধুর সাথে একবার সভ্যতা নিয়ে খুব তর্কে জড়িয়ে গেলাম। এক পর্যায়ে আমি বলেই বসলাম , তোমরা সভ্যতা নিয়ে বড়াই করোনাতো বাপু, তোমরা জ্যান্ত মানুষ ছেড়ে দিতে বাঘ-সিংহ এর সামনে আর এই তো সেই দিন, এই ১৭০০ সালের কোন একদিন মাত্র ১৪ বছরের এক ক্ষুধার্ত শিশুকে তোমরা ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিলে একটি মাত্র রুটি চুরির অপরাধে। সে দিন সে আর কোনো কথায় বলেনি, শুধু মাথাটা নিচু করে কি যেন ভাবছিল। ২০১০ এর কথা, খুব ছোট্ট দুটি বোন, তারা ঢাকার কোন এক দোকান থেকে একটি পউরুটি চুরি করেছিল কেবল, সেদিন আমরা তাদের অনেক মেরেছিলাম আবার ফেসবুকে সেই নির্যাতন এর ছবি পোস্ট করে মায়াকান্নাও কেঁদেছিলাম। পরদিন সকালেই আমার সেই ইউরোপিয়ান সভ্য বন্ধুটি আমাকে একটি ক্ষুদে বার্তায় লিখেছিল 'ইউরোপ ১৭০০= বাংলাদেশ ২০০০।'

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন