শিরোনাম :

শিশুহত্যার এই উৎসবের কালে ‘হু ক্যান কিল এ চাইল্ড?’


শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০১৫, ০৯:৫৬ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

শিশুহত্যার এই উৎসবের কালে ‘হু ক্যান কিল এ চাইল্ড?’

মুরাদুল ইসলাম : মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত সাত মাসে অর্থাৎ এই ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে মোট শিশুহত্যা হয়েছে ৬৯টি। সিলেটে শিশু সামিউল আলম রাজন হত্যা এবং তাকে নির্যাতনের ভিডিও নিয়ে সারাদেশে অনেক প্রতিবাদ হয়েছে। বলা যায় দেশবাসী অবাক হয়েছেন এর নৃশংসতায়। ভিডিওর কারণেই মূলত। ভিডিও না হলে শিশুহত্যার খবর কে রাখে? পরিসংখ্যান মতে ২০১২ তে ১২৬, ২০১৩ তে ১২৮, ২০১৪ তে ১২৭টি শিশুহত্যা হয়েছে এদেশে। এগুলো গণমাধ্যমে তেমন আসে নি। রাজন হত্যার ভিডিওর পরপরই বিষয়টি গণমাধ্যমে গুরুত্ব পেতে শুরু করে। জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত নৃশংস শিশু হত্যা হয়েছে ১৩টি। ভয়াবহ এক অবস্থা! আসকের এই পরিসংখ্যানের খবর প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার ০৬ আগষ্ট, ২০১৫ তারিখে। বিশেষজ্ঞরা এসব হত্যার বিভিন্ন কারণের কথা বলছেন। রাজনহত্যা পরবর্তী সময়ে আমি একটি স্ট্যাটাস লিখেছিলাম ফেসবুকে যা এখানে তুলে ধরছি, প্রাসঙ্গিক বিধায়ঃ আবু গারিব কারাগারের বন্দি নির্যাতনের চিত্র হয়ত দেখেছেন আপনি। একসময় তা হয়েছিল পপুলার নিউজ আইটেম। দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্নকালে এই রকম নৃশংস নির্যাতন হয়েছে। মানুষ মানুষকেই নির্যাতন করছে। এইরকম কাজকর্মের সাইকোলোজি জানতে একটা এক্সপেরিমেন্ট করা হয়েছিল। যার নাম স্ট্যানফোর্ড প্রিজন এক্সপেরিমেন্ট। কিছু লোককে বানানো হয়েছিল প্রিজন গার্ড, আর কিছু লোককে প্রিজনার। তাদের উভয়কেই লক্ষ করা হয়েছিল এবং দেখা গেল ক্ষমতা পেয়ে কীভাবে তাদের একদল নৃশংস হয়ে উঠে। এর আরো অনেক ফাইন্ডিংস আছে। এইট নিয়ে জার্মান একটা ফিল্ম আছে, হলিউডে যার রিমেকও হয়েছে। এছাড়া এর নিজস্ব ওয়েবসাইটে ফুটেজ, স্লাইড ইত্যাদি আছে। আমার এই এক্সপেরিমেন্টের গান গাওয়ার কারণটা হল, আমি বলতে চাচ্ছি, এইটা মানুষ নামক এনিমেলের একটা বৈশিষ্ট্য যে সে ক্ষমতা পেলে হিংস্র হয়ে ওঠে। ক্ষমতার ব্যাপ্তী যত বড় হয় হিংস্রতা তত বড় হয়। যুগে যুগে সেটা দেখা গেছে। ইম্পেরিয়ালিস্টরা যখন কলোনি করত, তখন ওইসব দেশের লোকদের দাসের মত কাজ করতে বাধ্য করত। ব্রিটিশ শাসিত বাংলার নীলচাষের কথাই ধরেন। নীল কুটিতে টর্চার সেল থাকত। টর্চার করার অদ্ভুত জিনিসপত্র ছিল তাদের। সেকালের দারোগার কাহিনী নামে একটা বইতে এ নিয়ে কিছু তথ্য পাওয়া যাবে। এছাড়া যদি দেখেন হাইতিতে। সেইখানে ফ্রেঞ্চরা কুত্তার মত ব্যবহার করত কালো শ্রমিকদের। দাস হিসেবে তাদের জীবন আয়ু ছিল বড়জোর সাত বছর। এই সাত বছরের মধ্যেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের খুন করা হত। তারপর ফ্রেঞ্চ রেভ্যুলুশনের পরে এই দাসেরা যখন বিদ্রোহ করে দুনিয়ার প্রথম দাস বিপ্লব সফল করল, তখন তারাও ক্ষমতা পেয়ে সাদাদের উপর গণহত্যা চালাল। আমাদের দেশে চা শ্রমিকদের যে মানবেতরভাবে জীবনযাপন করতে বাধ্য করা হয় সেটা আমরা জানি। যারা জানি না, তারা জানার চেষ্টা করি না। কারণ হচ্ছে সচেতনে না হোক, অবচেতনে আমরা মনে করি এরা আমার মত না, আমার কেউ না। আমি তার জন্য দুঃখিত হতে পারি, কিন্তু আমার করার কিছুই নাই। তার দূর্ভাগ্য। তার জন্য সমবেদনা। এইরকম মনোভাব তাদের প্রতি আমাদের। এবং তাদের প্রতি যে নির্যাতন করা হচ্ছে সে নির্যাতনে আমরা অংশগ্রহণ করছি প্রতি কাপ চা পানের মাধ্যমে। এটা আমাদের ভাবায় না। এটাই মানবতার ইতিহাস। আমি দেখছি যে এটা সুপিরিয়র-ইনফিরিয়র পলিটিক্সের ব্যাপার। কলোনিয়ালিস্টরা তাদের হত্যা, খুন, নির্যাতন এর জাস্টিফিকেশনের জন্য বলে, এরা ছিল পিছনের পড়া বর্বর, অবহেলিত। আমরা এদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত করছি। নিজেকে সুপিরিয়র আর অন্যকে ইনফিরিয়র মনে করা মানেই নির্যাতনের জাস্টফিকেশন তৈরী করা। একই ব্যাপার ঘটে মুরগী, গরু, ছাগল ইত্যাদি প্রাণী হত্যার ক্ষেত্রে। মানুষ এইগুলা মেরে খায়। শুধু খাওয়ার জন্যই এদের উৎপাদন করে, বন্দি করে রাখে। তারপর নৃশংসভাবে হত্যা করে। সুন্দর নাম দেয় খাবারের কারণ সরাসরি বললে আধুনিক মানুষের রুচীতে সমস্যা হয়। এটার জাস্টিফিকেশনও তৈরী হয় আমি শ্রেষ্ট আর বাকী প্রাণীরা তুচ্ছ এই চিন্তাধারার মাধ্যমে। আসল কথা হল এই প্রাণিজগতের মধ্যে মানুষও একটা প্রাণী এবং সে তার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য থেকে বের হতে পারে না। মানুষের অন্য মানুষকে নির্যাতন করার যে প্রবণতা তা কিছুটা হলেও বুঝা যায় উপরের এক্সপেরিমেন্ট হতে। তবে যে মুভিটার কথা বলতে এই লেখা শুরু তা কিন্তু এই এক্সপেরিমেন্ট বা তার সম্পর্কিত ফিল্মগুলো নয়। শিশুহত্যা এবং শিশুদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে ১৯৭৬ সালের স্প্যানিশ ফিল্ম হু ক্যান কিল এ চাইল্ড নিয়ে লেখাই মূল উদ্দেশ্য। ফিল্মটির মূল স্প্যানিশ নাম আমি উচ্চারণ করতে পারি না বিধায় আর উল্লেখ করলাম না। হরর ক্যাটাগরিতে ফিল্মটাকে ফেলা যায়। এর শুরুতে দেখা যায় বিভিন্ন যুদ্ধের প্রভাব শিশুদের উপর কত নিষ্ঠুরভাবে পড়ছে তা নিয়ে ডকুমেন্টারির বিভিন্ন ক্লিপ। আর একটা অদ্ভুত গানের সুর। যে সুর পুরো মুভিতেই থাকে। ভৌতিক ভৌতিক কিন্তু মায়াবী একটা সুর। পৃথিবীতে যত যুদ্ধ হয়েছে বা হচ্ছে তার সবচেয়ে মারাত্মক ভুক্তভোগী হচ্ছে শিশুরা। এই মেসেজই ডকুমেন্টারিগুলোর মাধ্যমে দেখানো হয় সরাসরি। এর ব্যাপ্তী বেশি না। পাঁচ দশ মিনিট। তারপর মূল গল্প শুরু হয়। ইংরেজ এক কাপল ছুটি কাটাতে যায় একটা দ্বীপে। ভদ্রমহিলা প্রেগন্যান্ট, তার তৃতীয় বাচ্চা পেটে। দ্বীপে যাবার পর তারা লক্ষ করে যে দ্বীপটা খুব নীরব। কয়েকটা শিশুর সাথে তাদের দেখা হয়। আর কোন মানুষজনের দেখা মিলে না। একসময় তারা আবিষ্কার করে শিশুগুলো আসলে এক ধরনের সাইকো। এরা নির্মমভাবে মানুষদের হত্যা করে খেলায় মাতে। এভাবে দ্বীপের সব মানুষ খুন হয়ে গেছে। দেখা যায় শিশুরা অন্য শিশুদের দিকে তাকিয়ে তাদেরও সাইকো বানিয়ে ফেলে। ভদ্রমহিলার পেটের সন্তানকেও তারা নিয়ে নেয় তাদের দলে। ফলে মায়ের পেটেই সে তার ক্রিয়া শুরু করে এবং খুন করে মাকে। দ্বীপে তখন একমাত্র জীবিত থাকেন সেই ভদ্রলোক এবং সেই সাইকো শিশুরা। তারা তাকে তাড়া করে। সে পালিয়ে যেতে শিশুদের আঘাত করতে থাকে বাঁচার জন্য। ওদিকে দ্বীপের বাইরে থেকে পুলিশ আসে। তারা কোনভাবে জানতে পেরেছিল এখানে খারাপ কিছু হচ্ছে। তা না হলে পর্যটকেরা যোগাযোগ করছে না কেন। পুলিশেরা যখন আসে তখন তারা দেখতে পায় শিশুদের আঘাত করে যাচ্ছেন ভদ্রলোক। তারা কয়েকবার ওয়ার্নিং দেয় এবং শেষ পর্যন্ত লোকটাকেই সাইকো ভেবে গুলি করে বসে। লোকটা মারা যায়। কোমলমতি শিশুদের বাঁচাতে পেরে পুলিশেরা খুশি হয়। তারা দ্বীপের মধ্যে বের হয়। এইসময় শিশুরা দখল করে নেয় তাদের ইঞ্জিন চালিত নৌযান এবং তাতে রাখা সব অস্ত্র। সাইকো শিশুরা পুলিশদের গুলি করে মারে এবং নৌযান দিয়ে যাত্রা শুরু করে মূল ভূমির দিকে। যেখানে তথাকথিত সভ্য আধুনিক মানুষদের বসবাস। তখন তাদের কথোপকথনঃ “Do you think the other children will start playing the way we do?” “Oh, yes…there are lots of children in the world. Lots of them.” এখানেই ফিল্মের সমাপ্তি। এই শিশুরা মূল ভূমিতে যাবে। অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে সভ্য আধুনিক মানুষদের উপর। অন্য শিশুদের সম্মোহিত করে নিয়ে নেবে নিজেদের দলে। এবং শুরু হবে সব শিশুদের নৃশংস প্রতিশোধ। এই প্রতিশোধ যুদ্ধের বিরুদ্ধে, তাদের বিরুদ্ধে করা সভ্য ও আধুনিক মানুষদের দীর্ঘকালের অন্যায়সমূহের প্রতিবাদ। এই গল্পের লেখক আসলে গল্পের আকারে এক প্রতিবাদ করেছেন। আবহমান কাল ধরে শিশুদের প্রতি মানুষদের করে আসা অন্যায়ের প্রতিবাদ। তিনি এক আশংকা করেছেন। এই অসুস্থ পৃথিবীতে শিশুরাও যদি এরকম অসুস্থ হয়ে যায় এই আশংকা। মুভি দেখতে গিয়ে অবশ্যই নায়ক ভদ্রলোক এবং তার স্ত্রীয়ের প্রতি দর্শকের পক্ষপাত থাকবে। কারণ দ্বীপের শিশুরা তো ভয়ংকর। কিন্তু ফিল্মের আগে যেসব ম্যাসেজ দেয়া আছে তার নিরিখে শিশুদের এই আচরণের একটা জাস্টিফিকেশনও তৈরী হয়। যদিও এটা রূপক। এর মূল উদ্দেশ্য যাতে মুভিটি দেখে মানুষ বুঝতে পারে শিশুদের কথা ভেবে হলেও যুদ্ধ বন্ধ করা হোক। শিশুদের প্রতি অন্যায় বন্ধ করা হোক। লেখক : তরুণ কথাসাহিত্যিক। সিলেট। বাংলাপ্রেস.কম.বিডি/এমজে

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন