শিরোনাম :

আমার শরীর নিয়ে তুমি বলার কে?


বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০১৫, ০৯:৪৪ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

আমার শরীর নিয়ে তুমি বলার কে?

তাবাচ্ছুম:

আমি একজন নারী। আমার যেটা শরীর সেটা বায়োলজিক্যাল আর যেটা লিঙ্গ বা যৌনপরিচয় সেটা সাংস্কৃতিক। আমি আমার বায়োলজিক্যাল পরিচয়কেই সত্য বলে মানি। আমার শরীর শুধুই আমার, এটা কোনো সামাজিক বা সাংস্কৃতিক বিষয়বস্তু না। এটা কোনো রাষ্ট্রীয় কিংবা ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তিও না। একজন পুরুষের শরীর যেমন, আমার শরীরও তেমন- বায়োলজিক্যালি আমরা আলাদা হলেও অস্তিত্বের প্রশ্নে আমাদের ভেতর কোনোই তফাৎ নেই। কেউ আছে মনে করলেও, সাদা বাংলায়, আমি তা মানি না। আমার শরীরের প্রতিটা অঙ্গের যে যৌনপরিচয় দেওয়া হয় আমি তারও বিরোধীতা করি। নারীর সবচেয়ে বড় সর্বনাশটা হয়েছে তার শরীরটা পুরুষের হাতে ছেড়ে দিয়ে। পুরুষ চিত্রশিল্পী, পুরুষ কবি, পুরুষ ভাস্কর, পুরুষ দার্শনিক, পুরুষ তাত্ত্বিক - এদের হাতে ছেড়ে দিয়ে। আমি সর্বনাশের শুরুর ইতিহাসটা জানি না। তবে আমার বিশ্বাস, মানব সভ্যতার শুরুতে বা পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতা বিকাশের আগে নারীদের আজকের যে যৌনপরিচয়, সেটা ছিল না। নারী-পুরুষে বায়োলজিক্যাল-ভিন্নতা থাকলেও সাংস্কৃতিক-ভিন্নতা ছিল না। পরে-পুরুষতান্ত্রিক মানসিকার সঙ্গে সঙ্গে নারীর সেক্স আইডেনটিটি ঘুচে জেন্ডার বা সোস্যাল আইডেনটিটি তৈরি হয়েছে- এবং আজ অবধি তা টিকেও আছে। বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষতার মুখে সময় এসেছে সেদিনের সেই ভ্রান্ত পরিচয় থেকে নারীদের বেরিয়ে আসার। এবং এই কাজটি নারীদের নিজ তাগিদেই করতে হবে। নারী এখন তার শরীরকে তুলে ধরে শক্তি-সামর্থ দিয়ে। শুধু নাক আর বুকের গড়ন দিয়ে নয়। যতদিন নারী ফুলরূপে গণ্য হবে, সৌন্দর্য সর্বস্ব হবে, ততদিন নারীর পুরুষের সমকক্ষে আসতে সক্ষম হবে না। এটা আমার বিশ্বাস।

আমি মনে করি, নারীর সৌন্দর্য বা আদর্শ শরীরের যে সংজ্ঞা যুগে যুগে দেওয়া হয়েছে তা চরম পুরুষবাদী। হোমার থেকে শুরু করে হালের কবিদের কবিতায় নারীদের সুন্দর ঘোষণা করা হয় ‘উন্নত বক্ষ’, স্ফীত নিতম্ব’ এইসব বলে। তার মানে উন্নত বক্ষ না থাকলে একজন নারীর কখনই সুন্দরী হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু সেটা কার দৃষ্টিতে? আমি নারী হয়ে একজন নারীর সুন্দর মুখ-অবয়ব দেখে যদি বলি সে সুন্দর। তাহলে কি সেটা বড় অন্যায় হবে যাবে? আমি মনে করি না। নারীর ওপর পুরুষের চাপিয়ে দেওয়া এই সৌন্দর্যবোধ থেকে বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে। নারীর ভেতর তার সৌন্দর্যবোধের যে ধারণা সেটা একধরনের উপনিবেশিক ধারণা থেকে এসেছে। নারীরা বহুবছর- যুগ যুগ ধরে- পুরুষের উপনিবেশিক ছিল এবং আছে। যেমন করে সাদারা আফ্রিকা ও এশিয়া শাসন করে আমাদের মজ্জায় ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে- সাদা মানেই সুন্দর, সাদা হতে হলে ‘ফেয়ার এন্ড লাবলি’ মাখো- তেমন করেই পুরুষরা আমাদের গভীরে লিখে দিয়েছে- উন্নত বক্ষ মানেই সুন্দর, উন্নত বক্ষ করতে ইম্পøান্ট করো। বলাই বাহুল্য, পুরুষদের এই ভোগবাদী মানসিকতার সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে কর্পোরেট মানসিকতার। আমি এর কোনোটাই মানি না। আমি আবারো বলছি, আমার শরীর শুধুই আমার।

কিছুদিন আগে, আমার এক বান্ধবীকে দেখলাম বিয়ের পরে আমূল বদলে গেছে। সে জিন্স-টি শার্টস পরা ছেড়ে হিজাব শুরু করেছে। কোনো মেয়ে নিজ ইচ্ছা হলে হিজাব করতেই পারে। তা নিয়ে আমার প্রশ্ন তুলবার কোনোই কারণ নেই। কিন্তু ওর এই পরিবর্তনে আমার মনে সন্দেহ জাগলো। ওর সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম- ওর স্বামী ও শ্বশুর-শ্বাশুড়ি চান না সে আর আগের মতো থাকুক। তাদের চাপেই সে বাধ্য হয়ে হিজাব ধরেছে। বিয়ের পর নাকি মেয়েদের জিন্স-শার্টস পরতে মানা। আমার প্রশ্ন এই মানাটা করলো কে? আমার বান্ধবি কোনো উত্তর দিতে পারেনি। সে শুধু আমতা আমতা করে আপোসী মনোভাব ব্যক্ত করে বলেছে- এই ভালো, একজন বিবাহিত মেয়ের দিকে ছেলেরা তাকালে বিষয়টি আসলেই ভাল দেখায় না! এখানেও আমার প্রশ্ন- একজন ছেলে যদি আমার দিকে তাকায় সমস্যাটা কি আমার নাকি ঐ ছেলেটির? কার ভেতরে পরিবর্তন আনা দরকার- আমার না ছেলেটির? কেউ তেতুল তত্ত্বে বিশ্বাসী হলে আমার অবশ্য কিছুই বলার নেই। তবে, এও বলে রাখি- আমি নগ্নতার পক্ষে নয়- সে ছেলে-মেয়ে যেই হোক। আমার শুধু দাবি, ছেলে-মেয়ের পোশাক বিভাজনটা কেটে যাক। শালীনতা পুরুষের যেমন থাক, নারীরও তেমন থাক। সেই শালীনতা মানেই হিজাব করা নয়। তবে আমি এও বলছি, আমি হিজাবের বিপক্ষে নই। আমি শুধু চাইবো না, আমার ওপর কেউ হিজাব জোর করে চাপিয়ে দিক। কারণ শরীরটা আমার। আমি সিদ্ধান্ত নেবো আমি কি পরবো আর কি পরবো না। এটা আমার রুচির স্বাধীনতা। আমার মননের স্বাধীনতা, আমার স্টাইলের স্বাধীনতা। আমি আমার শরীর বিষয়ে কারো সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করতে রাজি নই।

আমি আমার শরীর থেকে ‘নারী’ পরিচয়টা যেমন মুছে ফেলতে চাই না তেমন লাগিয়েও রাখতে চাই না। মুছে ফেলতে চাই না এজন্য যে, আমি নারী, বায়োলজিক্যালি আমার স্বকীয় অস্তিত্ব আছে। আমার পুরুষ হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা আমি পুরুষ নই। কেননা একজন পুরুষ নারী নয়। এখানে শ্রেষ্ঠত্বের বিষয় আসছে না। আবার লাগিয়ে রাখতে চাই না এজন্য যে, আমরা নারীপুরুষ মিলে মানুষÑ আমাদের মাঝে প্রকৃতিগত কোনো ভেদাভেদ নেই। এভাবেই আমরা আলাদা থেকেও অভিন্ন। আর এজন্যই আমি আমার শরীরের ওপর চাপিয়ে দেওয়া তথাকথিত সত্যকে মানি না। আমার কাছে এসব ভুয়া, বানোয়াট।

আমার ভেতর আমার আমিত্ব নিয়ে যে চেতনা তা একদিনে গড়ে ওঠেনি। আমি ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছি তথাকথিত সংকীর্নমনা এক পরিবারে। সেখানে শিশু থাকতেই আমাকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে- তুমি এ পরবে না, সে পরবে না এবং বস্তুত, আমি সেটা মেনেও নিয়েছি। ক্লাস সিক্সে থাকতে বোরখা পরা শুরু করেছি। আমি জানতাম না কেন, খালি মনে হত, বাবা বলেছেন অন্যকিছু আমার পরতে নেই। আমি মেয়ে কেন মেয়ে, মেয়ে কি- এসব আমি বুঝতাম। তখন বুঝবার বয়সও না। তারপর বেড়ে উঠতে উঠতে বুঝলাম- আমার সবচেয়ে বড় শত্রু হল আমার শরীর। তখন শরীরটারও ওপর ঘেন্না হতে থাকলো। আমি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লাম। কিন্তু আমি সুস্থ হতে চাই- ভীষণ সুস্থ। এর একমাত্র উপায় মনে হল, নিজের শরীরকে বন্ধু হিসেবে গড়ে তোলা। আমি সেই সাধনায় শুরু করলাম। জিজ্ঞেস করলাম, আমার শরীর আসলে কি চাই। তারপর আমি আমার শরীরের কথা শুনলাম, মনের কথা শুনলাম। কারণ শরীরটা আমার, যেমন মনটা। এভাবে আস্তে আস্তে আমি আমার শরীরের মাঝে আমার অস্তিত্বকে আবিষ্কার করলাম। যেদিন থেকে আমার শরীরটা আমার নিজের মনে হল, সেদিন থেকে মনে হল আমি হলাম একজন স্বাধীন মানুষ। আমার ওপরে আর কোনো সত্য নেই। আমার এই উপলব্ধিটা আমার কাছের মানুষজন কিছুটা হলেও বুঝতে সক্ষম হল, শুরুতে অবশ্য হয়নি, অনেক সময় লেগেছে তাদের বোঝাতে। আমার স্বামী, যে একসময় আমার প্রেমিক ছিল, এখন আমাকে আমার মতো থাকতে দেয়। আমার পোশাক নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। কারণ সে জানে আমি শালিনতার পক্ষে। সে জানে, আরাম পছন্দ করি, নোংরামি নয়। আমি চাই, প্রতিটা মেয়ে আগে নিজের শরীরটাকে নিজের করুক, এর বিকল্প পথে নারীদের স্বাধীনতা সম্ভব নয়। আর দেহটা অন্যের হলে সে কিসের স্বাধীনতা?

তাবাচ্ছুম ঢাকা। বাংলাপ্রেস.কম.বিডি/এমজে

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন