শিরোনাম :

অরক্ষিত শহীদ মিনার


সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০১৫, ০১:২৩ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

অরক্ষিত শহীদ মিনার

মোস্তফা মতিহার অযত্ন-অবহেলা আর সঠিক পরিচর্যার অভাবে ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে ভাষা-আন্দোলনের মহান শহীদদের স্মৃতির স্মরণে নির্মিত শহীদ মিনার। প্রেমিকযুগলের আপত্তিকর কর্মকান্ড ও পথচারীদের দ্বারা নানাভাবে ভাষা শহীদদের এই স্মৃতিস্তম্ভটি দিনের পর দিন অপবিত্রতায় কলুষিত হলেও দেখেও না দেখার ভান করছে শহীদ মিনারের দেখভালের দায়িত্বে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পবিত্র এই স্মৃতিস্তম্ভে জুতা পায়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও শুধু একুশের প্রভাতফেরীর সময় ছাড়া বছরের বাকী সময়টা জুতা পায়ে দিয়েই দর্শনার্থীরা প্রবেশ করছে ভাষা শহীদদের এই পবিত্রবেদীতে। এছাড়া পবিত্র এই বেদীতে কুকুরের আনাগোনাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। অন্যদিকে অনেকে আবার মোটরসাইকেল চালিয়ে উঠে পড়ছে মূল বেদীতে। প্রশাসন এবং কর্তৃপক্ষের নাকের ডগার উপর দিয়েই দিনের পর দিন কলুষিত হচ্ছে মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য আত্মদান দেওয়া রফিক, বরকত, সালাম, জব্বারদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনার্থের এই স্মৃতিস্তম্ভটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শহীদ মিনারের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে থাকলেও শহীদ মিনার বর্তমানে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে এসব চিত্র দেখা গেছে। প্রকাশ্য দিবালোকেই এলাকার স্থানীয় বখাটেরা এই পবিত্র বেদীতে ধূমপানসহ নানা ধরনের মাদক সেবন করছে বলে জানান এই এলাকার দোকানীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দোকানী জানান সাধারনত সন্ধ্যার পরেই এখানকার পরিবেশ বেশী কলুষিত হয়ে থাকে। ঐসময়টাতে শহীদ মিনারের বেদীতে বসে বখাটেরা মাদকসেবন করে এবং প্রেমিকযুগলরাও সন্ধ্যার পর আপত্তিকর কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে বলেও জানান এই দোকানী। অথচ এই শহীদ মিনারের সাথে জড়িয়ে আছে বাঙালির ভাষা আন্দোলন এবং স্বাধিকার আন্দোলনের নানা ইতিহাস। শহীদ মিনারের উদ্দীপনায় একুশের চেতনায় শানিত হয়ে সমগ্র বাঙালি মেতে উঠেছিলো মুক্তির চেতনায়। ৫২’র ভাষা আন্দোলনের মহান একুশে ফেব্রুয়ারী থেকেই সূত্রপাত হয় একাত্তরের। বুকের তাজা রক্তে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত করে মায়ের ভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠার পর একুশ হয়ে উঠে বাঙালির কাছে জাগরনের প্রতীক,অনুপ্রেরনার প্রতীক আর শক্তির প্রতীক। জাতিস্বত্তার এই পবিত্র স্থাপনাটি নানাভাবে কলুষিত ও অপবিত্র হলেও এর রক্ষনাবেক্ষনে প্রশাসন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই বরাবরই গা ছাড়া মনোভাব নিয়ে কাজ করছে বলে মনে করেন এই এলাকার অনেকে। শহীদ মিনারের মূল বেদীতে কোনো রকমের মিটিং, মিছিল, পদচারণা, আমরণ ধর্মঘট করা থেকে বিরত রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ২০১০ সালের ২৫ আগস্ট হাইকোর্টের দেওয়া রায়ে রেসপনডেন্টদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আর সেই নির্দেশে বলা হয়েছিলো মূল বেদীতে ফেব্রুয়ারি মাসে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড চলতে এবং শহীদ মিনারের মূল বেদীতে ভাষাসৈনিকসহ জাতীয় ব্যক্তিত্বদের লাশ সর্বস্তরের জনগণের সম্মান প্রদর্শনের জন্য ব্যবহার এবং বিশেষ দিনে ফুল দিতে কোনো রকম বাধা-নিষেধ থাকবে না। তবে মূল বেদীর পাদদেশে সব ধরনের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠাদি চলতে কোনো রকম বাধা নিষেধ থাকবে না বলেও নির্দেশ প্রদান করা হয়। আর শহীদ মিনারের পবিত্রতা রক্ষার্থে পূর্ত মন্ত্রণালয়কে কমপক্ষে ৩ জন নিরাপত্তাকর্মী এবং ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে ৩ জন পরিচ্ছন্নকর্মী নিয়োগ দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল ওই নির্দেশে। হাইকোর্টের দেওয়া রায় এখন পর্যন্ত কেন কার্যকর হয়নি এই বিষয়েও সাধারন মানুষের মনে নানা ধরনের প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। শহীদ মিনারের পবিত্রতা রক্ষায় এখন পর্যন্ত কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি কেন এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা নিবে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আমজাদ আলী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শহীদ মিনারে কখন,কোন দিন, কি অনুষ্ঠান হবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শুধু সেটাই দেখে। নিরাপত্তা সংক্রান্ত সব কিছু দেখার দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশন এবং পূর্ত মন্ত্রণালয়ের। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও তথ্য মন্ত্রণালয়ে এই বিষয়ে একাধিক সভা হয়েছে। ঐসব সভায় তিনজন সিকিউরিটি গার্ড ও তিনজন পরিচ্ছন্ন কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কিন্তু আজ পর্যন্ত আশানুরুপ কোন কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায়নি। ঢাবি প্রক্টর আমজাদ আলী আরো বলেন,শহীদ মিনারের পবিত্রতা রক্ষায় স্থানীয় থানা থেকে সার্বক্ষনিক এক গাড়ি পুলিশ রাখার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ডিসি রমনাকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন পুলিশের গাড়ি সেখানে দেখা যাচ্ছেনা। এই বিষয়ে জানানর জন্য ডিসি রমনাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এই ধরনের কোন চিঠি আমি পাইনি। প্রশাসন যদি আন্তরিকভাবে এখনই এগিয়ে না আসে তাহলে পবিত্র এই স্থানটিকে অপবিত্রতা ও কলুষতার হাত থেকে রক্ষা করা যাবেনা। এভাবে চলতে থাকলে অরক্ষিতই থেকে যাবে জাতির অহংকার ও গৌরবের স্মৃতি বিজড়িত শহীদ মিনার। বাংলাপ্রেস.কম.বিডি/এমজে

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন