শিরোনাম :

আমি যখন বলতে শিখেছি


বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০১৫, ০৫:৪৩ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

আমি যখন বলতে শিখেছি

আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধুটি ইতিহাসের একজন শিক্ষার্থী হওয়ায় ইতিহাসের কিছু বিষয় সম্পর্কে আমার অল্পস্বল্প জ্ঞান অর্জিত হয়েছে। তারই চর্চায় ১৮৩০ সালের একটা ঘটনা দিয়েই শুরু করি। ১৮৩০ সালে ফ্রান্সে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্রান্সের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটেছিল। সেই সময়ে কলকাতার কয়েকজন সাধারন ছাত্র এক গভীর রাতে নবনির্মিত (১৮২৮ সাল) অক্টরলনি মনুমেন্টের (শহীদ মিনার, কলকাতা) চুড়া থেকে ইংরেজদের পতাকা নামিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল ফরাসী বিপ্লবের স্বাধীনতার পতাকা। যদি প্রশ্ন করি গত শতাব্দী থেকে আজকের দিন পর্যন্ত আমাদের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কি, হাজারো তর্ক-বিতর্ক, প্রশ্ন ও বিশ্লেষণ করেও ঐক্যমতে পৌঁছানো কখনই সম্ভব হবে না। কিন্তু যদি প্রশ্ন করি গত শতাব্দী থেকে আজকের দিন পর্যন্ত কারা ছিল আমার দেশের মূল শক্তি, উত্তর কেবল ও কেবল মাত্র একটি- ছাত্ররা। ছাত্র শব্দটা বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য একটা গর্বের, একটা অহংকারের এবং সর্বোপরি একটা সম্মানের শব্দ। তাদের কারনেই আজ আমরা বাংলায় কথা বলি। তাদের কারনে আজ আমরা জয় বাংলা (এটা কোন রাজনৈতিক দলের শব্দ না, এটা বাংলার শব্দ) বলে চিৎকার করতে পারি, তাদের কারনে আমরা আমাদের মাটিকে বাংলাদেশ নামে ডাকতে পারি। কেউ স্বীকার করুক আর নাই করুক এটাই সত্য। সেই ছাত্রদের বাক স্বাধীনতা, স্বাধীনচেতা মনোভাব, মননশীল চেতনা, সাংস্কৃতিক উপলব্ধি, এবং নৈতিক প্রতিবাদের উপর কেউ যদি অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করে বা তার প্রয়াস করে তবে তার প্রতিবাদ করাটাকে আমি দায়িত্ব মনে করি, এবং অবশ্যই মনে করা উচিত। গত ২৫/০৮/২০১৫ তারিখে যবিপ্রবির ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা বিভাগের সম্মানিত পরিচালক কর্তৃক প্রদানকৃত এক বিজ্ঞপ্তি দেখে বেশ হতবাক হয়ে কিছু ভাবার চেষ্টা করছিলাম। বিজ্ঞপ্তিতে লেখা- “যবিপ্রবি ক্যাম্পাসে যেকোনো বিভাগের ছাত্র-ছাত্রী কর্তৃক আয়োজিত আলোচনা সভা, নবীণবরন, বিদায় সভা, সংগঠন ও ক্লাব তৈরিকরণ, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, ক্যাম্পেইন, র্যা লী ও মানব বন্ধন ইত্যাদি করার পূর্বে স্ব স্ব বিভাগীয় দপ্তর প্রধান অথবা প্রধান পৃষ্ঠপোষক গণের মাধ্যমে পরিচালক (ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা) কে অবগত করার জন্য বিশেষ ভাবে অনুরোধ করা যাচ্ছে।” যদি খুব সহজ করে বলি তাহলে, এই বিজ্ঞপ্তিটি স্পষ্টত ছাত্র-ছাত্রীদের বাক স্বাধীনতা, স্বাধীনচেতা মনোভাব, মননশীল চেতনা, সাংস্কৃতিক উপলব্ধি, এবং নৈতিক প্রতিবাদের কণ্ঠকে রোধ করার একটা অন্যায় প্রয়াস। আমি আমার লেখা দিয়ে এর প্রতিবাদ করলাম। ঠিক মনে নেই, তবে কোথায় যেন পড়েছিলাম- “পৃথিবীটা খারাপ মানুষের কর্মের কারনে ধ্বংস হবেনা, ধ্বংস হবে ভালো মানুষগুলোর অন্যায়ের প্রতিবাদ না করার মনোভাবের কারনে”। অপেক্ষায় আছি। কাল হয়ত এরকম একটা বিজ্ঞপ্তি হাতে নিয়ে আবার ভাববো, যাতে লিখা থাকবে- “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোন কমেন্ট, শেয়ার এমনকি কোথাও লাইক দেয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবগত করতে হবে”। সেদিন অবশ্য অবাক হবনা কারন অলিখিতভাবে এর চর্চাও কেউ কেউ করে যাচ্ছেন। কোন বুদ্ধিজীবী যদি প্রশ্ন করেন বা ভেবে বসেন একজন শিক্ষক হয়ে কেন আমি ছাত্রছাত্রীদের বিষয় নিয়ে কথা বলি, তাহলে উত্তর একটাই। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক হচ্ছে ব্রেইন আর স্পাইনাল কর্ডের মত, যদি কোন একটাতে আঘাত লাগে তাহলে অন্যটির অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হয়। চোখে আগুন জল নিয়েই বলি- শুধু নাম আর কাঠামোতেই যবিপ্রবি একটি বিশ্ববিদ্যালয়। সত্যজিৎ রায়ের “হিরক রাজার দেশ” চলচ্চিত্রের সেই যন্তর মন্তর ঘরের কথা মনে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়টা একটা যন্তর মন্তর ঘরের মত যেখানে শুধু রাজার শেখানো বুলিই সবাইকে আওড়াতে হবে। শিক্ষার পাশাপাশি বাক স্বাধীনতা, স্বাধীনচেতা মনোভাব, মননশীল চেতনা, সাংস্কৃতিক উপলব্ধি, এবং নৈতিক প্রতিবাদের কোন চর্চা হবে না। প্রতিবাদ করেই না হয় নতুন একটা নাম দেই- যশোর যন্তর মন্তর ঘর। মাহফুজ আল হাসান সহকারী অধ্যাপক পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগ যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন