শিরোনাম :

সহমর্মিতার জয় হোক


শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

সহমর্মিতার জয় হোক

শিশুহত্যা ও যৌননিপীড়নের মাত্রা হঠাৎ করেই যেন বেড়ে গেছে। হিউম্যান রাইটস মনিটরিং রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০০৮ সালে ৪শ’ ৫৪জন ধর্ষণের শিকার হয় বাংলাদেশে। এদের মধ্যে ২শ’ ৫২জন শিশু। আর ২০১৪ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছে মোট ৫শ’ ৫৬জন। এর মধ্যে শিশুর সংখ্যা ৩শ’ ০৮। পরিসংখ্যানের হিসেবের তুলনায় প্রকৃত অপরাধের ঘটনা আরও অনেক বেশি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো- গত ১০ বছরে শুধুমাত্র ঢাকাতেই ধর্ষণসহ নারী ও শিশুনির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ৯শ’ ৮০টি। মামলা হয়েছে ১ হাজার ৫শ’ ৫৬টি, অথচ শাস্তি হয়েছে মাত্র ৪০টি ঘটনায়। বাংলাদেশে শিশুধর্ষণের মামলায় ১শ’ ৮০দিনের মধ্যে বিচার শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বছরের পর বছর মামলা ঝুলতে থাকে। সাধারণভাবে ১০ বছরের নীচে শিশুরা ধর্ষণের শিকার হলে গরিব বাবা-মা টাকার বিনিময়ে মীমাংসা করে ফেলেন। এখানেই শেষ নয়, ১০ বছরের ওপরে মেয়েদের সঙ্গে ধর্ষকের বিয়ের ঘটনাও ঘটে অহরহ।

প্রশ্ন হলো, এই ধরনের অপরাধ বেড়ে যাওয়ার নেপথ্য কারণ কী হতে পারে? তথ্যপ্রযুক্তির এই উৎকর্ষের যুগে মানুষের মনের ঔৎকর্ষের অবক্ষয় ঘটছে নিরন্তর। সস্তা ও সহজসভ্য মাল্টিমিডিয়া মোবাইলের কারণে একজন নিম্নআয়ের মানুষের হাতেও পর্নোগ্রাফি জাতীয় ফুটেজ ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। জার্মানির বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি জানিয়েছেন, পর্নোগ্রাফি এক ধরনের অ্যাডিকশন। এই নেশা মাদকের মতোই ভয়াবহ। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কথা, এই অ্যাডিকশনে মানুষের ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয় ঘটে। আর এর সঙ্গে রয়েছে মানুষের নিষ্ঠুর মানসিকতা। ধর্ষকদের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে আরো একটি ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ করেছে ব্রিটেনের ল্যানসেট জার্নাল। এক-তৃতীয়াংশ পুরুষ শুধু নারীকে শাস্তি বা অপদস্থ করার জন্য এমনটা করে বলে গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে।

অপরাধ ও সহিংসতার আরো বহুমাত্রিক কারণ রয়েছে। বিশ্বখ্যাত মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক সাইমন ব্যারন-কোহেন দেখেছেন, মানুষের নিষ্ঠুরতা কিংবা সহমর্মিতা মূলত নির্ভর করে শৈশবে একজন মানুষ মা-বাবার কতটা স্নেহ পেয়েছে, তার ওপর। এমন সমাজও আছে, যেখানে অপরাধকে সাহস বলে, অত্যাচারকে পৌরুষ বলে প্রশংসিত করা হয়। বাবা হয়ত রিকশাওয়ালাদের নিয়মিতই মেরে থাকেন। বাসায় মাকেও মারেন। ছেলে বাবাকে শক্তিশালী মনে করে। সেও বাবার আচরণকেই অনুসরণ করবে। অর্থাৎ, মানুষ কোন পরিবেশে বড় হচ্ছে সেটা অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য স্নেহবঞ্চিত কিংবা বাবা-মাহারা পথশিশুরা যদি বড় হয়ে অপরাধী হয়ে ওঠে সেই দায় সমাজেরও। আর সহমর্মিতার অবক্ষয়ে বেড়ে ওঠা এসব শিশুর সংখ্যা আমাদের দেশে লাখ লাখ।

অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর যদি অপরাধীর সাজা না হয়, তবে তার অপরাধপ্রবণতা আরো বেড়ে যায়। একটি গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নারী ও শিশুনির্যাতন আইনে দেশে প্রতিবছর হাজারো মামলা হলেও মামলায় অভিযুক্তদের সাজা পাওয়ার হার এক-শতাংশেরও কম।

আমরা কোন বীভৎস নরকের ভেতর দিয়ে সন্তর্পণে পা ফেলে চলছি, এসব তথ্য-উপাত্ত সেই চিত্রকেই প্রকটভাবে প্রকাশ করে। তাই, এই দেশকে বাসযোগ্য করতে সবার মধ্যে জেগে উঠা দরকার সহমর্মিতার সুকুমার পুষ্পদল। জয় হোক অন্যের প্রতি সহমর্মিতার মানবিক অনুভব। (সৌজন্যে : পাক্ষিক অনন্যা)

তাসমিমা হোসেন সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক ও পাক্ষিক অনন্যা

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন