শিরোনাম :

তাঁতপাড়ায় ঈদের শাড়ি


শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০১৫, ০২:৩০ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

তাঁতপাড়ায় ঈদের শাড়ি

গাজী মুনছুর আজিজ : বাঁশের উপর আধবসা। বয়সে যুবক। পরনে লুঙ্গি। শরীর উদম। মুখে গুনগুন গানের শব্দ। হাতদুটো সচল। চোখ সামনের তাঁতের উপর এবং তিনি এক মনে করছেন কাপড় বুননের কাজ। অন্যদিকে তার খুব একটা খেয়াল নেই। কারণ, একটু এদিক-সেদিক হলেই পাল্টে যেতে পারে কাপড়ের নকশার ধরণ। বুননের এই দৃশ্য সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার শাহজাপুর এলাকার। আর বুননের এমন দৃশ্য দেখা যাবে এখানকার প্রায় প্রতিটি বাড়ি-বাড়ি, পাড়ায়-পাড়ায়, মহল্লায়-মহল্লায়। সেই সঙ্গে শোনা যাবে ঠক-ঠক তাঁতের শব্দ। এছাড়া ঈদকে সামনে রেখে এসব তাঁতি পাড়ায় তাঁতিদের ব্যবস্তা এখন দিনরাত।

এখানকার তাঁত পাড়ায় বুনন চলছে শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা ও সালোয়ার কামিজের কাপড়। তবে এখন প্রায় সব তাঁতেই বুনন হচ্ছে শাড়ি। কারণ, ঈদকে সামনে রেখে শাড়ির চাহিদা একটু বেশি থাকে। এখানকার তাঁতি মোসলেম উদ্দিন বলেন, ‘তাঁত বোর্ডের হিসেব অনুযায়ী এ এলাকায় তাঁতের সংখ্যা ৪৫ হাজারের বেশি। সারা বছরই আমরা শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা, সালোয়ার কামিজের কাপড় বুনে থাকি। তবে ঈদের সময় শাড়ির চাহিদা একটু বেশি থাকে। এসব শাড়ি সুতি, সিল্ক, র-সিল্ক ইত্যাদি সুতায় বোনা।’

ঢাকা থেকে ট্রেনে উল্লাপাড়া নেমে লোকাল বাসে বা অটো রিকশায় যাওয়া যাবে শাহজাপুর তাঁতের হাট ও আশেপাশের তাঁত এলাকায়।

ঈদকে সামনে রেখে সিরাজগঞ্জের মতো নারায়নগঞ্জের জামদানি তাঁত পাড়ার তাঁতিদের ঘরে ঘরেও শাড়ি বুননের কাজে ব্যস্ত তাঁতিরা। নারায়নগঞ্জের সোনারগাঁয়ের বেইলর এলাকার জামদানি তাঁতপাড়ায় শাড়ি বুননে ব্যস্ত তাঁতি জসিম উদ্দিনসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। তার ঘরটি টিনের তৈরি। সেই ঘরের ছোট্ট বারান্দার মাটির ভিটায় পাতানো দুটি তাঁত। একটিতে শাড়ি বুনছেন জসিম উদ্দিন ও তার স্ত্রী শাহানাজ বেগম। আর অন্যটিতে শাড়ি বুনছে তাদের ছেলে-মেয়ে শাহিন ও নারগিস। জসিম উদ্দিন ও শাহানাজ বেগম যে শাড়ি বুনছেন তার পাড়ের নকশার নাম ‘করলা’ আর জমিনের নকশার নাম ‘পোনাফুল’। এই শাড়িটি বুনতে সময় লাগবে এক সপ্তাহ। এটা বিক্রি হবে চার হাজার টাকা। আর শাহিন ও নারগিসের শাড়িটি বুনতে সময় লাগবে চারদিন। এটা বিক্রি হবে দুই হাজার টাকা। সব মিলিয়ে পরিবারের সবাই শাড়ি বুননে ব্যস্ত। এখানকার তাঁতি সালমা বেগমের তাঁত তিনটি। একটিতে নিজে বুনেন, অন্যদুটিতে ছেলে রফিকুল ও মেয়ে মর্জিনা বুনে। সালমা বেগম বলেন, ‘শাড়ির নকশা আমি নিজেই করি। অনেক সময় মহাজন বা পাইকারদের দেওয়া নকশা অনুয়ায়ি বুনি। আবার অনেক খুচরা ক্রেতা এসে তার পছন্দের নকশার শাড়ি আমাদের কাছ থেকে বুনিয়ে নেন। এছাড়া সারা বছরের তুলনায় ঈদে শাড়ির চাহিদা বেশি থাকে, তাই এ সময় আমরাও ব্যস্ত থাকি।’

নারায়নগঞ্জের চাষাড়া থেকে জামদানি শাড়ি কিনতে বেইলর জামদানি তাঁতপাড়ায় এসেছিলেন বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা ফাহিম ইসলাম। তিনি বলেন, ‘তাঁতপাড়া থেকে শাড়ি কিনলে কিছুটা কম দামে পাওয়া যায়। এগুলো মানেও ভালো হয়। সেজন্য ঈদ উপলক্ষে কয়েকটি শাড়ি কিনতে এখানে এসেছি।’ এখানকার তাঁতি মাসুদা বেগম বলেন, ‘ঈদের জন্য অনেক ক্রেতা আমাদের কাছে পছন্দেও নকশার শাড়ি বুননের অর্ডার দিয়েছেন।’

কেবল বেইলর নয়, ঈদকে সামনে রেখে নারায়নগঞ্জের সোনারগাঁও, রূপগঞ্জ, তারাব, নোয়াপাড়া, বস্তল, জামপুর, দেওভোগ, সাদিপুর, সিদ্ধিরগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের জামদানির তাঁতিরা জামদানি শাড়ি বুননে ব্যস্ত।

ঈদের জন্য জামদানি শাড়ির চাহিদা বাড়লেও এবং শাড়ির দাম বেশি পেলেও বছরের অন্য সময় তাঁতিরা সঠিক দাম পান না বলে অনেক তাঁতি দাবী করেন। অনেক তাঁতি জামদানি বুনে সঠিক মুজুরি না পাওয়ায় এ পেশা ছেড়েও দিয়েছেন। অবশ্য অনেক নতুন তাঁতিও আসছেন। তবে তুলনা মূলক ভাবে তাঁত ও তাঁতির সংখ্যা বাড়ছে না।

রূপগঞ্জের নোয়াপাড়ার তাঁতি আলী আজগর বলেন, ‘জামদানি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ও আরও প্রসারিত করতে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতায় তাঁতিদের সহজ শর্তে ঋন দেয়া, তাঁত স্থাপনে জয়গা দেয়া, সহনীয় দামে সুতা সরবরাহ, সঠিক মুজুরিসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন।’ অবশ্য কিছু কিছু তাঁতপাড়ায় বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা তাঁতিদের উন্নয়নে এগিয়ে আসছে।

তাঁতপাড়া ছাড়া জামদানির হাট থেকেও শাড়ি কেনা যায়। ঢাকার ডেমরা বাজারে জামদানি শাড়ির হাট বসে প্রতি শুক্রবার ভোর রাত ৩ টা থেকে সকাল ৭ টা পর্যন্ত। হাটের বেশির ভাগ ক্রেতা মহাজন বা পাইকার। খুচরাও বিক্রি হয়। হাটে নারায়নগঞ্জের সোনারগাঁও, রূপগঞ্জ, তারাব, নোয়াপাড়া, বস্তল, জামপুর, দেওভোগ, সাদিপুর, সিদ্ধিরগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের জামদানির তাঁতিরা শাড়ি নিয়ে আসেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পাইকারেরা এই শাড়ি কিনেন। অনেক খুচরা ক্রেতাও আসেন। হাটে তাঁতিদের কাছ থেকে শাড়ি কিনলে দোকানের তুলনায় কিছুটা কম দামে পাওয়া যাবে। তবে শাড়ি অবশ্যই দেখেশুনে কিনতে হবে। কারণ শাড়ির বুননের উপর নির্ভর করে দরদাম।

সোনারগাঁওয়ের তাঁতি মোহাম্মদ হারুন বলেন, ‘জামাদানি বোনা হয় ৪০/৬০; ৪০/৮০ কিংবা এর কমবেশি মানের সুতা দিয়ে। এসব সুতা কোনোটা মোটা আবার কোনোটা চিকন। সুতার মানের উপর শাড়ির দাম কম-বেশি হয়। এছাড়া শাড়ির নকশার উপরও দাম কম-বেশি নির্ভর করে। যে শাড়ির নকশায় সময় ও সুতা বেশি লাগে সেই শাড়ির দাম বেশি। আর যে শাড়ির নকশায় সময় ও সুতা কম লাগে সেই শাড়ির দামও কম।

হাটে শাড়ি কিনতে গিয়ে যদি শাড়ি পছন্দ না হয়, তবে হাটে যেসব তাঁতিরা আসেন তাদের বাসায় গিয়ে পছন্দের শাড়ি বুনিয়ে নিতে পারেন।

ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে লোকাল বাসে বা অটো রিকশায় ডেমরা চৌরাস্তা নেমে রিকশায় বা হেঁটে জামদানি হাটে যাওয়া যাবে। এছাড়া গুলিস্তান ও যাত্রাবাড়ী থেকে বাসে মুগড়াপাড়া নেমে রিকশায় যাওয়া যাবে লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের কারুপল্লীর জামদানি পাড়ায়।

জামদানির মতোই প্রশিদ্ধ বুনন শিল্প মিরপুরের বেনারসি শাড়ি। বিগত দুই দশকে এই শাড়ি বেশ খ্যাতি পেয়েছে। ঈদ উপলক্ষে ধানমন্ডি থেকে রাজিয়া খানম এসেছিলেন মিরপুর বেনারসি পল্লীতে শাড়ি কিনতে। কয়েকটি বেনারসি শাড়ি কিনেছেন তিনি। এ বিষয়ে রাজিয়া খানম বলেন, ‘শাড়ি হিসেবে মিরপুরের বেনারসির ঐতিহ্য আছে। তাই কাউকে শাড়ি উপহার দিলে বেনারসি পল্লী থেকে শাড়ি কিনি। যাদের উপহার দিই তারাও খুশি হন বেনারসি শাড়ি পেয়ে।’

এখানকার মানিক বেনারসি লিমিটেডের কর্ণধার সাফায়েত আলী তরফদার বলেন, ‘এবার ঈদে আমারা বাজারে এনেছি বেশ কয়েকটি নকশার শাড়ি।’ এখানকার দিয়া শাড়ির কর্ণধার মোহাম্মদ কাসেম বলেন, ‘এবার ঈদে আমাদের বেশি চলছে জুট, নেট, মাছ রাইস ও কোটা বেনারসি।’

বেনারসি শাড়ির চাহিদা বাড়লেও বেনারসি পল্লীতে দিন দিন তাঁত ও তাঁতির সংখ্যা কমছে। প্রায় ২৫ বছর ধরে বেনারসি বুনছেন তাঁতি মোহাম্মদ নাসিম। তিনি বলেন, ‘দিন দিন সব কিছুর দাম বাড়ছে, কিন্তু আমাদের মুজুরি বাড়ছে না। আমরা একটি শাড়ি বুনি এক সপ্তাহ ধরে। তার জন্য মুজুরি পাই মাত্র আটশ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। অথচ এই শাড়ি মহাজনরা অনেক দামে বিক্রি করেন। তাই এখানে তাঁত ও তাঁতির সংখ্যা কমছে।’

বেনারসি পল্লীর দোকান ছাড়া পল্লীতে প্রতি শুক্রবার ও মঙ্গলবার ভোর রাত থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত বেনারসি শাড়ির হাট বসে। হাটে তাঁতিরা শাড়ি নিয়ে আসেন। মূলত পাইকারেরা এই হাটে শাড়ি কিনেন। খুচরাও বিক্রি হয়। এতে দোকানের চেয়ে কিছুটা কম দামে শাড়ি কেনা যায়।

জামদানি শাড়ির মতো বেনারসি শাড়িও তাঁতিদের কাছ থেকে নিজের পছন্দের নকশায় বুনিয়ে নেওয়া যায়। মিরপুর দশ নম্বর গোল চত্বর থেকে একটু এগোলেই বেনারশি পল্লীর এলাকা শুরু।

জামদানি ও বেনারসি শাড়ির মতো টাঙ্গাইলের তাঁতিরাও ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছে। এছাড়া দেশীয় শাড়ি হিসেবে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির কদর অনেক আগে থেকেই নারীদের কাছে পছন্দ। তাই সারা বছরের তুলনায় ঈদের জন্য এখানকার তাঁতপাড়াগুলো এখন দিন-রাত সরব। বিশেষ করে-পাথরাইল, চন্ডি, নলশোধা, ডুলুটিয়া, নলুয়া, মঙ্গলহর, বল্লা, রামপুর, কালিহাতী, ঘাটাইল, করোটিয়া, দেলদুয়ারসহ প্রসিদ্ধ তাঁতপাড়াগুলোতে এখন গেলে দেখা যাবে শাড়ি বুননে তাঁতিদের বিরামহীন ব্যবস্তা।

এখানখার তাঁতিরা প্রধানত সুতি শাড়িই বেশি বুনেন। এছাড়া অনেক তাঁতি-হাফ সিল্ক, ফুল সিল্ক, র-সিল্ক শাড়িও বুনেন।

এখানকার তাঁতি রাধাশ্যাম বসাক বলেন, ‘আমাদের তাঁতপাড়া সারা বছরই সরব থাকে। তারপরেও ঈদের সময় পাইকার বা মহাজনরা শাড়ির চাহিদা বাড়িয়ে দেন।’

ঢাকার মহাখালী থেকে টাঙ্গাইলের বাস ছাড়ে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত। বাস থেকে পাথরাইল নেমে তাঁতপাড়ায় যাওয়া যাবে।

বাংলাপ্রেস.কম.বিডি/এমজে

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন