শিরোনাম :

চট্টগ্রামে পানি বাণিজ্য!


বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

চট্টগ্রামে পানি বাণিজ্য!

আজাদ সোহাগ, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম মহানগরীতে আবাসিকের নাম দিয়ে পানি বাণিজ্য চলছে। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি, চট্টগ্রাম ওয়াসার কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী এতে যুক্ত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মূলত প্রায় বাড়ির মালিকরা আবাসিকের পানি ব্যবহারের নাম করে বাণিজ্যিকভাবে চালিয়ে যাচ্ছে পানির ব্যবসা। এই পানি বোতলজাত করে বাজারে ও বিভিন্ন কারখানায় সরবরাহ করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র বলছে, চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রতিষ্ঠার ৫২ বছর পরও নগরীর ৫৮ শতাংশ এলাকা পানি সরবরাহের আওতায় আসেনি। ৪২ শতাংশ এলাকা এর আওতায় আসলেও চাহিদার তুলনায় পানি সরবরাহ এখনো এক তৃতীয়াংশের কম। সরকারি এই সেবা খাতের আওতায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ৬৮ভাগ কম থাকলেও অবৈধভাবে প্রতিদিন চট্টগ্রাম ওয়াসার কোটি টাকার পানি বাণিজ্য চলছে। আর এই বাণিজ্যের সাথে জড়িত খোদ ওয়াসার উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

ওয়াসা সূত্র জানায়, নগরবাসীর পানির চাহিদা পুরণে ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম ওয়াসা। এরই মধ্যে ৫২ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু নগরীর অধিকাংশ এলাকায় এখনো পানি সরবরাহে সক্ষম নয় ওয়াসা। ফলে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানির হাহাকার লেগেই আছে। আর এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ এক শ্রেণীর প্রভাবশালী মহলকে ব্যবহার করে অবৈধভাবে চালিয়ে যাচ্ছে পানি বাণিজ্য।

ওয়াসার তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় দৈনিক দেড় থেকে দুই কোটি লিটার ওয়াসার পানি অবৈধভাবে বিক্রি হয়। এলাকাভিত্তিক সিন্ডিকেট করে ব্যবসায়ীরা এ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। তারা ওয়াসার লাইন থেকে পানি চুরি করে এ বাণিজ্য চালাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট এলাকারবাসীর অভিযোগ রয়েছে। নানান কারণে একদিকে জনগণের অসুবিধা হচ্ছে অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব।

এলাকাবাসীরা জানান, কিছু ব্যক্তি কেন্দ্রিক লোকের কারণে আমরা যারা লিয়েল ওয়াসার পানি ব্যবহার করছি, তারা ঠিক মত পানি পাচ্ছি না। অথচ ওয়াসার পানির বিল প্রতিমাসে যথাসময়ে পরিশোধ করছি। কিন্তু সেই অনুযায়ে ওয়াসা থেকে সেবা পাচ্ছি না।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নগরীর স্টীলমিলস থেকে দক্ষিণ হালিশহর ইপিজেড এলাকার রেলক্রসিং পর্যন্ত আনুমানিক ৫০টির মতো অবৈধ আবাসিকের নামে বাণিজ্যিক পানির লাইন। ১ নম্বর মাইলের মাথায় লিমনের দোকান, ব্যারিস্টার কলেজ, তিন রাস্তার মোড়, আব্দুল মাবুদ সওদাগরের বাড়ির পাশে, ফ্রি পোর্ট বে শপিং গণশৌচাগার, কমপক্ষে শতাধিক ব্যক্তি ওয়াসার এই অবৈধ পানি ব্যবসার সাথে জড়িত।

অভিযোগ আছে, এসব অবৈধ পানির ব্যবসার সাথে ওয়াসার লোকের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের কিছু কর্তা ব্যক্তিরা এসব জায়গা থেকে প্রতিমাসে মাসোহারা নেয়। যার কারণে সিন্ডিকেটধারী ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে এসব অবৈধ ব্যবসা সহজে চালাতে পারছে।

মূলত এই দুষ্ট চক্রের সহযোগিতায় ব্যবসায়ীরা ওয়াসার পানি সরবরাহের সময় নিজেদের ইচ্ছেমতো পানি বড় ট্যাংকে মজুদ করে রাখে। পরবর্তীতে ওই পানি জারে সংরক্ষণ করে বিক্রি করা হয়। এছাড়াও ওয়াসার পানি সরবরাহকারী গাড়িতে করেও চলছে এই ব্যবসা। ওয়াসার পানি বিক্রির ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয় না কর্তৃপক্ষ।

দৈনিক কী পরিমাণ পানি বিক্রি করেন জানতে চাইলে বাবুল বাংলাপ্রেস.কম.বিডিকে বলেন, প্রতি জার ১৫ টাকা করে নেয়া হয়। প্রতি ভ্যানে ১৫ থেকে ২০টি জারে পানি সরবরাহ করা হয়। প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০ ভ্যান পানি বিক্রি করা হয়। কখনো কখনো এর চেয়ে বেশিও বিক্রি হয়।

জানা গেছে, নগরীর হালিশহর থেকে বন্দরটিলা পর্যন্ত প্রতিদিন অন্তত ৩০ লাখ লিটার ওয়াসার পানি অবৈধভাবে বিক্রি হয়। এসব জায়গায় দীর্ঘ লাইনে ভ্যান গাড়ী পানি ভর্তি করার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে। ভ্যানে করে জারের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরাই চাহিদা অনুযায়ী গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেন। প্রতি জার পানি বিক্রি হয় ১৫-২০ টাকায়। আর ভ্যানে করে এলাকায় নিয়ে সেই পানি ভর্তি জার বিক্রি হয় ৩৫-৫০ টাকায়।

স্থানীয়রা জানান, একজন বিক্রেতা প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ ভ্যান পানি বিক্রি করেন। প্রতি জারে ২০ লিটার হিসেবে একজন বিক্রেতা প্রতিদিন বিক্রি করেন অন্তত ৩০ হাজার লিটার পানি। সেই হিসেবে অবৈধপথে যায় অন্তত ৩০ লাখ লিটার পানি। জার প্রতি পাইকারি হিসেবে ১৫ টাকা ধরা হলে একজন বিক্রেতা প্রতিদিন ২২ হাজার ৫০০ টাকার পানি বিক্রি করেন। সেই হিসাবে ওই এলাকায় প্রতিদিন পানি বিক্রি হয় ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকার। এভাবে নগরীর সহস্রাধিক পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন কোটি টাকার পানি অবৈধপথে বিক্রি হয়।

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম ফজলুল্লাহ বাংলাপ্রেস.কম.বিডিকে বলেন, ওয়াসার পানি ব্যবহারে ধরা-বাধা কোনো নিয়ম নেই। তবে ওয়াসার পানি নিয়ে ব্যবসা করার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে গ্রাহকের লাইন কেটে দেওয়া হয়। বিধিমতে জরিমানাও করা হয়।

তিনি আরো বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের লোকবল অনেক কম। তাই সবকিছু সঠিকভাবে তদারকি করা আমাদের পক্ষে অনেক সময় সম্ভব হয় না। পানি বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেলেও অভিযানে গিয়ে আলামত পাওয়া যায় না। এ কারণে অপরাধীদের ধরা যাচ্ছে না।

বাংলাপ্রেস.কম.বিডি/এএস/এএইচ

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন